
মেহদি আমিনরাজাভির ‘দ্য ওয়াইন অব উইজডম: দ্য লাইফ, পোয়েট্রি অ্যান্ড ফিলোসফি অব ওমর খৈয়াম’ গ্রন্থ (পৃষ্ঠা ১৩৭-১৫৬) অবলম্বনে ‘ওমর খৈয়াম: সুফি, সংশয়বাদী নাকি দুয়ের মাঝখানে’ শিরোনামের এ ভাবনানুবাদ করেছেন মু. হাবিবুর রহমান চৌধুরী
ওমর খৈয়ামকে এক কথায় চেনা যায় না। তিনি কি দার্শনিক, কবি, সংশয়বাদী, নাকি সুফি? এ প্রশ্নের সহজ উত্তর নেই, কারণ তাঁর রুবাইগুলো যেন আয়না; যে চোখে তাকাও, সেই মুখাবয়বই প্রতিবিম্বিত হয়। কেউ সেখানে মদের পেয়ালা দেখে, কেউ দেখে প্রেমের প্রদীপ, আবার কেউ দেখে খোদায়ী নুরের ঝলক। এ আলোচনা সেই নুরকেই অনুসরণ করে।
লেখকের উদ্দেশ্য খৈয়ামকে জোর করে সুফি প্রমাণ করা নয়, বরং তাঁর কবিতার প্রতীকগুলোকে সুফি দৃষ্টিতে পড়ে দেখা। কারণ, তিনি প্রচলিত অর্থে কোন তরিকার সুফি ছিলেন, এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। তবু তাঁর কবিতায় এমন বহু প্রতীক আছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সুফি কবিতার প্রাণ হয়ে আছে। তাই এ আলোচনায় আসল প্রশ্ন রুবাইয়ের ঐতিহাসিক সত্যতা নয়; প্রশ্ন হলো, খৈয়ামের চিন্তার আত্মা কোথায়?
লেখক সাতটি স্তম্ভের ওপর তাঁর আলোচনা দাঁড় করিয়েছেন—আল্লাহর অতীন্দ্রিয় সত্তা, মহাবুদ্ধি ও ক্ষুদ্রবুদ্ধি, প্রেম ও প্রিয়তম, ত্যাগসাধনা, মুর্শিদ, আধ্যাত্মিক যাত্রা এবং শেষ পর্যন্ত ঐক্য।
সুফিবাদ সন্দেহ দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় বিস্ময় দিয়ে। খৈয়াম ধর্মের অনেক বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু তাঁর কোনো রুবাইয়ে আল্লাহর অস্তিত্ব অস্বীকার করেননি। বরং তিনি এমন এক আলোর কথা বলেন, যা হৃদয়কে বদলে দেয়।
‘তিনি আছেন, এই সত্যে প্রাণ জ্বলে যায়,
সৃষ্টিরই গ্রন্থ খুলে সে সংবাদ গায়।
হৃদয় যখন ভরে তাঁর নুরের আলো,
কুফরের কালো রাত ইমান হয়ে যায়।’
এখানে ‘নুর’ শুধু আলো নয়, এটি অন্তরের জাগরণ, অন্ধকার থেকে আলোর উত্তরণ।
খৈয়ামের আরেকটি রুবাই যেন লাও-ৎসুর রহস্যময় ভাষার সঙ্গে কথোপকথন করে। আল্লাহকে তিনি একই সঙ্গে গোপন ও প্রকাশ্য দেখেন।
‘হে সত্তার গোপন স্বামী, তুমি সবখান,
তোমারই ছাপে জাগে অস্তিত্বের গান।
মহিমার আবরণে ঢাকা সবার চোখে,
তবু হাটের ভিড়েও তুমি অধিপান।’
আল্লাহ আড়ালে আছেন, আবার প্রকাশেও আছেন, দেখার চোখটাই কেবল বদলায়।
খৈয়াম ছিলেন জ্যোতির্বিদ, গণিতজ্ঞ, দার্শনিক। তবু তিনি জানতেন, সব জ্ঞান একসময় এসে নতজানু হয়।
‘অস্তি-অনস্তির কত রহস্য করেছি জয়,
উচ্চ-নীচের মাপকাঠিও ছিল যে পরিচয়।
তবু শেষে বলি, লজ্জায় নত এ প্রাণ,
অন্ধকারের ওপার জানি না আর ক’য়।’
এ স্বীকারোক্তি পরাজয়ের নয়, এটি বিনয়ের; সত্যের সামনে মাথা নত করার শক্তির।
এবার খৈয়াম আরেকটি দরজা খুলে দেন; বুদ্ধির দরজা। সুফিরা বলেন, দুটি বুদ্ধি আছে: একটি তর্ক করে, অন্যটি দেখে। প্রথমটি ক্ষুদ্রবুদ্ধি, দ্বিতীয়টি মহাবুদ্ধি। খৈয়ামের কাছে আল্লাহকে কেবল যুক্তি দিয়ে ধরা যায় না, কারণ চিন্তা সময়ের মধ্যে হাঁটে, আর তিনি সময়ের অতীত।
‘তোমার শিখর ছুঁতে পারেনি কোনো জ্ঞান,
ভাবনা তো সময়-স্থানের পথিক প্রাণ।
হে প্রভু, তোমার পূর্ণতা ধরবে কে আর?
তোমার উচ্চতা জানো শুধু তুমি, মহান।’
এরপর আরেকটি রুবাইয়ে তিনি নিজের সীমা স্বীকার করেন।
‘উড়ন্ত মনও পায় না আরশের সন্ধান,
তাই ধূলির বুকে রাখি চুম্বনের দান।
হে বিস্ময়-সুন্দর, তোমায় চিনবে কে আর?
হয়তো তুমিই জানো তোমার পরিচয়-প্রাণ।’
এখানেই ইশরাকি দর্শনের একটি শব্দ আসে ‘ধাওক’, অর্থাৎ স্বাদ নিয়ে জানা; যে জ্ঞান বইয়ে আসে না, হৃদয়ে আসে।
পরমহংস যোগানন্দ খৈয়ামের একটি রুবাইয়ের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, এখানে প্রতিটি প্রতীক একেকটি গোপন দরজা।
‘ভোরের বাঁহাত ছুঁয়েছিল নীল আকাশ,
সরাইখানা ভরে উঠল ডাকার সুবাস।
ওঠো প্রিয়, পেয়ালা ভরো আজই এবার,
শুকিয়ে যাওয়ার আগে জীবনের নিশ্বাস।’
এবার খৈয়াম আরেকটি দরজা খুলে দেন; বুদ্ধির দরজা। সুফিরা বলেন, দুটি বুদ্ধি আছে: একটি তর্ক করে, অন্যটি দেখে। প্রথমটি ক্ষুদ্রবুদ্ধি, দ্বিতীয়টি মহাবুদ্ধি। খৈয়ামের কাছে আল্লাহকে কেবল যুক্তি দিয়ে ধরা যায় না, কারণ চিন্তা সময়ের মধ্যে হাঁটে, আর তিনি সময়ের অতীত।
যোগানন্দের ব্যাখ্যায় ভোরের বাঁহাত মানে চিরন্তন প্রজ্ঞা, সরাইখানা মানে অন্তরের নীরব আশ্রম আর পেয়ালা মানে মানুষের আত্মা। এ পাঠ সবার কাছে গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে, তবু এটি দেখায়, খৈয়ামের প্রতীকগুলো কত বিচিত্র অর্থ ধারণ করতে পারে।
খৈয়ামের ‘মদ’ নিয়ে বিতর্ক সবচেয়ে বেশি। তিনি কি সত্যিই মদের কথা বলেছেন, নাকি এটি ঐশী প্রেমের প্রতীক? লেখক বলেন, সুফি পাঠে এটি দ্বিতীয় অর্থেই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
‘বন্ধুরা, আজ বসুক আনন্দের আসর,
দুই পেয়ালায় ভরুক প্রাণের অন্তর।
যুক্তি-ধর্মকে দিলাম তিন তালাক আজ,
আঙুরকন্যাই হলো হৃদয়ের ঘর।’
এখানে ‘তালাক’ ধর্মত্যাগ নয়; শুষ্কতার পরিত্যাগ, অন্তরের উষ্ণতার প্রত্যাবর্তন।
যেখানে যুক্তি থামে, সেখানে প্রেম কথা বলে। সুফিবাদ প্রেমকে কেবল অনুভূতি বলে না, একে একটি জ্ঞান বলে। প্রেমের মধ্য দিয়েই প্রেমিক সত্যকে চেনে, যেমন পতঙ্গ আগুনে পুড়ে আলোকে চেনে।
‘প্রেম ছাড়া জগৎ শুধু অস্থির ঘূর্ণায়,
বাঁশির সুরে হৃদয় জাগে, তখন তিনি ধায়।
বিশ্ব ঘুরে শেষে পেলাম এই পরিচয়।
প্রেমই সত্য; বাকিটুকু প্রতিধ্বনি হয়ে যায়।’
এই কয়েকটি পঙ্ক্তিই হয়তো খৈয়ামের সবচেয়ে গভীর পরিচয়।
ফারসি ভাষায় খারাবাত মানে ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু সুফিদের কাছে এটি ভাঙা ইট নয়, ভাঙা অহংকার। তাই খৈয়াম বলেন,
‘ধ্বংসাবশেষে প্রেমিক মিলুক বারেবার,
সাধক জ্বলুক নিজের আগুনে অপরপার।
রঙিন আলখাল্লাও শেষে নত হবে এসে
প্রেমিকের চরণেই চুম্বন হবে উপহার।’
তিনি বাহ্যিক সাধুতাকে সন্দেহ করেন, কারণ রূপের পূজা নিরাকারকে দেখায় না।
প্রিয়তম—মানুষ, না আল্লাহ?
খৈয়ামের ‘মদ’ নিয়ে বিতর্ক সবচেয়ে বেশি। তিনি কি সত্যিই মদের কথা বলেছেন, নাকি এটি ঐশী প্রেমের প্রতীক? লেখক বলেন, সুফি পাঠে এটি দ্বিতীয় অর্থেই সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
এখানেই খৈয়ামের সবচেয়ে বড় রহস্য। ‘প্রিয়তম’ কাকে বোঝায়? যদি তিনি কেবল জাগতিক প্রেমিকার কথা বলেন, তবে তিনি ভোগের কবি। যদি ‘প্রিয়তম’ আল্লাহ হন, তবে তাঁর রুবাই নতুন আলোয় জ্বলে ওঠে। লেখকের মতে, এই দ্বিতীয় পাঠই পারস্যের দীর্ঘ সুফি ঐতিহ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
‘সত্যের বইয়ের প্রথম বাণী প্রেমের গান,
যৌবনের শুরুর সুরেও প্রেমেরই তান।
হে পথিক, মনে রেখো জীবনের অন্তর
প্রাণের মর্ম, জগতের মূল প্রেমই মহান।’
খৈয়ামের কাছে সত্যের প্রথম দরজা খুলে যায় প্রেমে আর সেই প্রেমই ধীরে ধীরে মানুষকে নিয়ে যায় অন্তরের আরও গভীর যাত্রায়—ত্যাগের এবং শেষে ঐক্যের পথে।
প্রেম যদি নদী হয়, তবে ত্যাগ তার তীর। সুফিরা বলেন, প্রেম কখনো একা আসে না। তার সঙ্গে আসে ব্যথা, বিচ্ছেদের বিষাদ আর সেই পুরোনো ঘরের স্মৃতি, যেখান থেকে মানুষ একদিন পৃথিবীতে নেমেছিল। এ কারণেই ত্যাগ বা ‘জুহদ’ সুফিবাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর।
খৈয়ামও আত্মশুদ্ধির কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি নিজে কঠোর ত্যাগী জীবন যাপন করেছিলেন, এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং তাঁর রুবাইয়ে বারবার ফিরে আসে মানুষের অন্তরের যুদ্ধ।
‘অহংকারের সাথে যুদ্ধ করি নিরন্তর,
নিজেরই কর্ম দেখে জ্বলে ওঠে অন্তর।
জানি, রহমত শেষে ক্ষমা করে সবই,
তবু পাপের লজ্জা পোড়ায় বারবার।’
এখানে যুদ্ধ বাইরের নয়, ভেতরের শত্রুও নিজের, আঘাতও নিজের।
খৈয়াম বাহ্যিক সাধুতার প্রতি খুব একটা আস্থা রাখেন না। তাঁর চোখে আলখাল্লা মানুষকে সাধু বানায় না, হৃদয় বানায়।
‘প্রেমিকের কাছে কালো-সাদা একাকার,
স্বর্গ বা নরকেও নেই কোনো বিচার।
ইটের বালিশ হোক, রেশমি শয্যাই হোক
প্রিয় যদি থাকে, পূর্ণ সব সংসার।’
এই চারটি পঙ্ক্তি যেন তাঁর নীরব ঘোষণা: প্রেম থাকলে অভাবও আশীর্বাদ, প্রেম না থাকলে প্রাচুর্যও শূন্য।
‘প্রিয়তম’ কাকে বোঝায়? যদি তিনি কেবল জাগতিক প্রেমিকার কথা বলেন, তবে তিনি ভোগের কবি। যদি ‘প্রিয়তম’ আল্লাহ হন, তবে তাঁর রুবাই নতুন আলোয় জ্বলে ওঠে। লেখকের মতে, এই দ্বিতীয় পাঠই পারস্যের দীর্ঘ সুফি ঐতিহ্যে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে।
তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। খৈয়াম ভণ্ড ত্যাগের সমালোচনা করেন, কিন্তু সংযমকে অস্বীকার করেন না। তাঁর ‘রিসালাহ ফিল-উজুদ’ গ্রন্থে তিনি বলেন, যারা গভীর সত্য বুঝতে চায়, তাদের আত্মাকে শাসন করতে হবে, অন্তরকে পরিষ্কার করতে হবে আর পথনির্দেশ চাইতে হবে আল্লাহর কাছেই। এখানে সংযম শাস্তি নয়, প্রস্তুতি।
প্রচলিত সুফিবাদ তিনটি ধাপে মানুষের অন্তরযাত্রাকে ব্যাখ্যা করে—জুহদ (ত্যাগ), ইশক (প্রেম), ও ইরফান (অন্তর্দৃষ্টি বা মারিফাত)। খৈয়ামকে এ তিন ধাপের মধ্যে কোথায় রাখা যায়? লেখকের মতে, তিনি প্রথম ধাপের মানুষ নন, তৃতীয় ধাপের মানুষও নন। সবচেয়ে বেশি তিনি দাঁড়িয়ে আছেন প্রেমের সিঁড়িতে।
খৈয়ামের ভাষায় বারবার একটি বিষয় ফিরে আসে—সত্য, অর্থাৎ হাকিকত। তাঁর কাছে ধর্মের বাহ্যিক রূপের চেয়ে সত্যের অন্তরের রূপ বড়। তিনি বলেন,
‘আজ প্রেমে মত্ত, আজই প্রাণের উচ্ছ্বাস,
আজ মদের নেশায় জাগে অন্তর-আভাস।
আজ নিজেকে ছাড়িয়ে গেছি বহুদূর—
আজ প্রিয়তমে বাঁধা চিরদিনের শ্বাস।’
এখানে ‘মদ’ আবারও প্রতীক। ঐশী উন্মাদনার প্রতীক।
তিনি কি কোনো তরিকার মানুষ ছিলেন?
এ প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস দেয় না। জানা যায়, বাগদাদে একদল সুফি তাঁর কাছে এসেছিলেন, কিন্তু খৈয়াম তাঁদের দলে যোগ দেননি। আল-কিফতির বর্ণনায় তিনি ছিলেন খোরাসানের ইমাম, গ্রিক জ্ঞানের পণ্ডিত এবং জ্যোতির্বিদ্যার অনন্য সাধক। পরে সুফিরা তাঁর কবিতা নিজেদের আসরে পড়েছেন, কিন্তু সেটি তাঁর সদস্যপদের প্রমাণ নয়।
তবু একটি সম্ভাবনা লেখক উড়িয়ে দেন না; খৈয়াম হয়তো উয়াইসি ধারার মানুষ ছিলেন। এ ধারার বিশ্বাস, সব মুর্শিদ দৃশ্যমান হন না; খিজিরের মতো গোপন পথপ্রদর্শকেরাও মানুষের অন্তরে শিক্ষা দেন। মধ্যযুগে সুফি তরিকা আজকের মতো সংগঠিত ছিল না, তাই কোনো প্রতিষ্ঠানের বাইরে থেকেও একজন মানুষ অন্তরের পথে চলতে পারতেন।
খৈয়ামের লেখায় কোনো মানব মুর্শিদের নাম নেই, এটাই বিস্ময়। কিন্তু তাঁর কবিতায় যেন আরেকটি ইঙ্গিত আছে: তিনি হয়তো নিজের ভেতরেই মুর্শিদকে খুঁজে পেয়েছিলেন।
‘দিনরাত প্রভুকে খুঁজো দূর আকাশ-পার,
আধো-অন্ধ চোখে ফেরো দিগন্তের দ্বার।
তিনি বলেন, ‘তোমার ভেতরেই আমি আছি,
মাথা থেকে পা পর্যন্ত আমাকেই দেখো বারবার।’
এখানে খোঁজ শেষ হয় না, খোঁজের দিক বদলে যায়।
খৈয়াম সম্ভবত নবীদের কেবল ইতিহাসের মানুষ বলে দেখেননি; তিনি তাঁদের দেখেছেন আধ্যাত্মিক দীক্ষার দ্বার হিসেবে।
‘নববর্ষ জাগায় পুরোনো সাধের ডাক,
নির্জনতায় ফেরে চিন্তার পাখির পাখ।
ডালে জ্বলে মুসার শুভ্র হাতের আলো—
প্রতিটি শ্বাসে ইসার দীর্ঘশ্বাসের ফাঁক।’
মুসার শুভ্র হাত, ইসার নিশ্বাস—এই দুটি চিত্র একসঙ্গে দেখায় যে ঐশী উপস্থিতি সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সুফিদের কাছে তরিকাহ মানে জাহির থেকে বাতিনে যাওয়া, রূপ থেকে অর্থে, শব্দ থেকে নীরবতায়। কিন্তু খৈয়াম কোথাও বলেননি, কত দিন রোজা রাখতে হবে, কীভাবে জিকির করতে হবে, কোন নিয়মে চলতে হবে। তবু তিনি বারবার সেই অন্তরযাত্রার কথাই বলেন। তাই লেখক প্রশ্ন করেন, খৈয়ামের পথ কি নিয়মের পথ? উত্তর আসে, না। তাঁর পথ ছিল উপলব্ধির পথ।
জীবনের ধুলা, সত্যের দিশা
এ ভাবনার এক অনবদ্য প্রকাশ তাঁর একটি রুবাই।
‘খাঁটি সোনা হয়ে এসেছিলাম এ সংসার,
ধুলায় মিশে মলিন হলো প্রাণের হার।
হাসিমুখে এসেছিলাম জ্বলন্ত হৃদয় নিয়ে
শেষে বাতাসে উড়ে গেল জীবনের ভার।’
এই চারটি পঙ্ক্তি যেন মানুষের সমগ্র জীবনের প্রতিচ্ছবি—জন্ম, বিস্ময়, বেদনা, বিলয়।
খৈয়ামের চোখে পৃথিবী স্থায়ী নয়; এটি এক অস্থায়ী আসর। আর এ উপলব্ধিই আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রথম ধাপ। তিনি মনে করিয়ে দেন, জীবনকে আঁকড়ে ধরা আর জীবনকে বোঝা—দুটি আলাদা বিষয়। যে মানুষ ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ী ভেবে বসে, সে পথ হারায়; আর যে ক্ষণস্থায়িতার ভেতরেই চিরন্তনের ইশারা খুঁজে পায়, সে পথিক হয়ে ওঠে।
‘চলমান ছায়া আমরা, ক্ষণিকের সারি,
জাদুর মতো এসে যাই ফিরে যে ভারী।
সূর্যপ্রদীপ ঘিরে ঘুরি রাতের শেষে
খেলার অধিপতি হাসে নীরব পিয়ারি।’
এ পথ প্রচলিত সুফিবাদের সব শর্ত পূরণ না-ও করতে পারে, কিন্তু এটি মানুষকে একে একে মায়ার স্তর খুলতে শেখায়।
ফানা: আমি, না তুমি?
এবার আসে সবচেয়ে সূক্ষ্ম প্রশ্ন—ফানা। সুফিদের ভাষায়, এর অর্থ নিজেকে আল্লাহর মধ্যে বিলীন করে দেওয়া। বায়াজিদ বলেছিলেন, ‘এই আলখাল্লার ভেতর আল্লাহ ছাড়া আর কিছু নেই।’ হাল্লাজ বলেছিলেন, ‘আনাল হক।’ খৈয়ামের ভাষা আরও সংযত, তবু তাঁর প্রশ্ন একই দরজায় এসে দাঁড়ায়।
‘বিপদের পথে কে ডাকে—আমি, না তুমি?
বাঘের সাথে কে খেলে—আমি, না তুমি?
যদি আমি তোমারই হই, তবে কথা বলে কে?
আমি যদি তুমি হই, বক্তা কে, আমি না তুমি?’
এখানে বিপদ মানে আধ্যাত্মিক পথের পরীক্ষা, আর শেষ প্রশ্নটি অহংকারের নয়; অহংকারের অবসান।
লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য টানেন। খৈয়াম কোথাও প্রচলিত সুফিদের মতো ফানার স্পষ্ট মতবাদ নির্মাণ করেননি; বরং কোথাও কোথাও মনে হয়, তিনি মৃত্যুকেই জীবনের শেষ সীমা হিসেবে দেখেছেন।
‘কাল যখন ছাড়ব এ ক্ষয়মান সংসার,
সাত সহস্র বছরের মৃতের সমান ভার।
মৃত্যু এসে মুছে দেয় সব পরিচয়ের রেখা
ধুলোর রাজ্যে সবাই একই অধিকার।’
তবু লেখক বলেন, ফানার আরেক অর্থও হতে পারে—প্রেমে সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়া, অস্তিত্বের বিস্ময়ে বিলীন হওয়া। খৈয়ামের কাছে ঐক্য হয়তো আকাশে নয়, হৃদয়ে।
‘হে আলোর সন্ধানী, ডাকো তাঁরই নাম,
হৃদয়েই লুকায় তাঁর উচ্চতম ধাম।
যদি তিনি তোমার ভেতরেই না থাকেন
কোথায় খুঁজবে তাঁকে? বলো কোন অবিরাম?’
এ পর্যন্ত এসে লেখক থামেন এবং বলেন, খৈয়ামকে রুমি, বায়াজিদ বা হাল্লাজের মতো প্রচলিত সুফি বলা কঠিন। তাঁর কোনো মুর্শিদের খবর নেই, কোনো তরিকার দীক্ষার প্রমাণ নেই। তবু তাঁর কবিতায় এমন এক অন্তর-আলো আছে, যা সুফি পাঠকে সম্ভব করে।
খৈয়ামের চোখে পৃথিবী স্থায়ী নয়; এটি এক অস্থায়ী আসর, আর এই উপলব্ধিই আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রথম ধাপ। তিনি মনে করিয়ে দেন, জীবনকে আঁকড়ে ধরা আর জীবনকে বোঝা—দুটি আলাদা বিষয়। যে মানুষ ক্ষণস্থায়ীকে চিরস্থায়ী ভেবে বসে, সে পথ হারায়; আর যে ক্ষণস্থায়িতার ভেতরই চিরন্তনের ইশারা খুঁজে পায়, সে পথিক হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন তাই আর ‘তিনি সুফি কি না’ নয়। প্রশ্ন হলো, তিনি কেমন সুফি হতে পারতেন? ফুরুঘি বলেন, খৈয়াম হয়তো সুফি নীতিকে ভালোবাসতেন, কিন্তু আনুষ্ঠানিক সুফি ছিলেন না। লেখক তিনটি সম্ভাবনা রাখেন: উয়াইসি, মালামাতিয়া অথবা স্বাধীনচেতা সুফি। এর মধ্যে মালামাতিয়ার সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে বেশি মিল। মালামাতিয়ার জন্ম খোরাসানে, নিশাপুরে; তারা ধর্মের বাহ্যিক ভণ্ডামির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।
এ ধারার মানুষ ক্ষমতাকে ভয় পেত না, গোঁড়ামিকেও না। তাদের চোখে সত্য ছিল মানুষের অন্তরে। খৈয়ামের জীবনেও এ বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।
‘মসজিদ-মাদ্রাসা ভাঙুক অহংকারের ভার,
সুফির পথ খুলুক তখন অন্তরদ্বার।
ইমান-কুফর মিলুক যখন এক আলোয়।
তখনই দেখা দেবে এক আল্লাহ অপার।’
এখানে ‘ধ্বংস’ মানে ভবন ভাঙা নয়, ভ্রান্তি ভাঙা।
খৈয়াম দরিদ্র সাধু ছিলেন না। তিনি আরামদায়ক জীবন কাটিয়েছেন, এমনকি নিজামুল মুলকের কাছে ভাতাও চেয়েছিলেন। তবু তাঁর কবিতায় পৃথিবীর ক্ষণস্থায়িত্বের বোধ স্পষ্ট। তিনি বর্তমানকে ভালোবাসতেন, কারণ সৌন্দর্য এখন, রহস্য এখন, বিস্ময়ও এখন। সুফিদের একটি প্রবাদ আছে, ‘সুফি সময়ের সন্তান’। খৈয়াম যেন এ কথাই নতুন ভাষায় বলেন।
এরপর আসে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়। রবার্ট গ্রেভস ও ওমর আলী শাহ দাবি করেছিলেন, তাঁরা খৈয়ামের ‘আসল রুবাইয়াত’ পেয়েছেন, যেখানে মদ মানে ঐশী প্রজ্ঞা, প্রিয়তম মানে আল্লাহ আর মাতলামি মানে আধ্যাত্মিক উন্মাদনা। তাঁরা জান-ফিশান খানের একটি গল্পও বলেন। তিন ছাত্র রুবাই পড়ল—একজন নতুন চিন্তা পেল, একজন খৈয়ামকে নাস্তিক ভাবল, তৃতীয়জন রহস্য অনুভব করল। মুর্শিদ প্রথমজনকে রেখে দিলেন, তৃতীয়জনকে আবার পড়তে পাঠালেন। অর্থাৎ রুবাইয়ের দরজা সবার জন্য একসঙ্গে খোলে না।
গ্রেভস ফিটজজেরাল্ডকে অভিযুক্ত করেন এই বলে যে তিনি নিজের ভোগবাদী দৃষ্টিভঙ্গি চাপিয়ে দিয়েছেন। ওমর আলী শাহ আরও দূর এগিয়ে দাবি করেন, খৈয়ামের নামেরও নাকি গুপ্ত সুফি অর্থ আছে। কিন্তু লেখক কঠোরভাবে বলেন, এসব দাবির কোনো শক্ত ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। পরে গবেষকেরা দেখান, যে কথিত পাণ্ডুলিপির ওপর এই সব দাবি দাঁড়িয়ে ছিল, সেটি আদৌ ছিল না।
অবশেষে লেখক তাঁর সিদ্ধান্ত জানান। খৈয়ামকে পুরোপুরি সুফি বলা যায় না, আবার সুফি নন, তা–ও বলা যায় না। তিনি দুই তীরের মাঝখানে দাঁড়ানো মানুষ। কখনো যুক্তি তাঁকে টেনে রাখে, কখনো প্রেম তাঁকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কখনো তিনি মদের পেয়ালায় পৃথিবীর সৌন্দর্য দেখেন, কখনো সেই একই পেয়ালায় ঐশী প্রজ্ঞার দীপ্তি।
অ্যান মেরি শিমেলের কথাই যেন তাঁর জন্য সবচেয়ে মানানসই: অর্থ ইচ্ছা করেই দোলায়মান রাখা হয়েছে। যেমন পারস্যের মসজিদের টাইলস দিনের আলো বদলালে নতুন রং ধারণ করে, তেমনি একই শব্দ নতুন অর্থে জেগে ওঠে।
এ দোলাই খৈয়ামের শক্তি। তিনি কোনো একক পরিচয়ে বন্দী নন। তিনি এমন এক কবি, যিনি প্রশ্ন রেখে যান, উত্তর চাপিয়ে দেন না। আর তাঁর রুবাই আজও সেই পুরোনো আহ্বানই শোনায়—
‘প্রিয়তমকে দূরে খুঁজো না। নিজের হৃদয়ের নীরবতায় তাঁর পদধ্বনি শুনতে শেখো।’