
গল্পটি প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯৮ সালের ২৫ ডিসেম্বর। আজ অন্য আলো অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো। অনুবাদ: শাহেদ সাদ উল্লাহ
রাসকিন বন্ডের জন্ম ১৯৩৪ সালে ভারতের হিমাচল প্রদেশে। কিন্তু বসবাস করছেন মাসউরিতে। তিনি সিমলাতে পড়ালেখা করেন। তরুণ বয়সেই একজন পেশাদার লেখক হিসেবে পরিচিত লাভ করেন। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দি রোম অন দি রোফ’ এবং ছোট গল্পগুলোর একটি ‘আ ফ্লাইট অব পিজনস’। পরবর্তীকালে এ গল্পটি ‘জানোন’ নামে চলচ্চিত্রে রূপ লাভ করে।
রোহানা পর্যন্তই ট্রেনে একটা কম্পার্টমেন্টে আমি সিট পেয়েছিলাম। একসময় একটি মেয়ে এসে ঢুকল আমার কম্পার্টমেন্টে। মেয়েটিকে বিদায় জানানোর জন্য যে দম্পতি এসেছিলেন তাঁরা ছিলেন মেয়েটির পিতামাতা। মনে হলো তাঁরা খুব উদ্বিগ্ন। বিশেষ করে তাঁদের মেয়েটি যাতে আরামে ভ্রমণ করতে পারে সেদিকেই দৃষ্টি ছিল তাঁদের। মহিলাটি তাঁর মেয়েকে উপদেশ দিলেন কীভাবে সে তার জিনিসপত্রগুলো রাখবে, জানালার বাইরে যাতে সে না ঝোঁকে এবং অপরিচিতদের কাছ থেকে যাতে দূরে থাকে সে।
অবশেষে তাঁরা বিদায় জানালেন মেয়েটিকে। ট্রেনও তখন চলতে শুরু করল। এ সময় আমি পুরোপুরি এক অন্ধকার রাজ্যে ছিলাম; কারণ আমি অন্ধ। আমার চোখজোড়া শুধু আলো–অন্ধকারকেই প্রত্যক্ষ করতে পারে। আমি সত্যিই অক্ষম ছিলাম, মেয়েটি দেখতে কেমন—এটুকু বলতে। কিন্তু মেঝেতে তার হাইহিলের শব্দে—সে যে পায়ে হিল পরেছিল সেটাই বুঝতে পারলাম। এই শব্দ আমাকে হয়তো তার চেহারা সম্বন্ধে কিছু একটা আবিষ্কারের অবকাশ দেবে। যদিও আমার পক্ষে কখনো তা সম্ভব নয়। কিন্তু তার কণ্ঠস্বর, এমনকি তার পায়ের শব্দে আমি ছিলাম উদ্বেলিত। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম।
—আপনি কি সব রাস্তা ডেহারার উদ্দেশেই পাড়ি দেবেন? আমি বসেছিলাম একটি অন্ধকার কোণে; ফলে আমার এ শব্দ তাকে চমকিত করে। সে বিস্ময়ের সঙ্গে বলে ওঠে, ‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না এখানে আর কেউ আছেন কিনা।’
তার এ প্রত্যুত্তর আমাকে বিচলিত করেনি, কারণ—এ ধরনের ঘটনা প্রায়ই ঘটে, যখন মানুষ তার ভালো দৃষ্টি দিয়েও কাছের জিনিসটি দেখতে ভুল করে অনেক সময়। তবে এ সময় তাদের অনুধাবন করার আছে অনেক কিছু। পক্ষান্তরে যারা একেবারেই দেখতে পারে না অথবা অল্প দেখে, তাদেরকে অনুধাবন করতে হবে বিশেষ করে অপরিহার্য বিষয়গুলোকে। ইন্দ্রিয় দিয়ে তাদেরকে বিশেষ পরিস্থিতিগুলো নিরিখ করতে হবে। আমি তাকে আবার বললাম, আমি আপনাকে একবারও দেখতে পাইনি, কিন্তু আপনার উপস্থিতি টের পেয়েছিলাম।’
আমি নিজেই এক প্রকার বিস্মিত হচ্ছিলাম এই ভেবে যে আমি তাকে আমার অন্ধত্ব আবিষ্কার থেকে বিরত রাখতে পারব কি না। ভাবলাম, এ হয়তো আমার জন্য তেমন সমস্যা হবে না।
মেয়েটি বলল, ‘আমি শাহারানপুর যাচ্ছি। আমার আন্টি সেখানেই আমার জন্য অপেক্ষা করবে।’
আমি প্রত্যুত্তরে বললাম, আমার তার সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত না হওয়াটাই বরং উচিত হবে। আন্টিরা সাধারণত একটু ভারি স্বভাবেরই হয়।’
তখন মেয়েটি আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি বললাম, ‘প্রথমে ডেহারা ও পরে মাসউরি পর্যন্ত।’
মেয়েটি তত্ক্ষণাৎ এক প্রকার উদ্বেলিত হয়ে বলল, ‘আপনি সত্যিই ভাগ্যবান। আমি যদি মাসউরি যেতে পারতাম! আমি পাহাড় ভালোবাসি। বিশেষত অক্টোবরে।’
আমি তাকে বললাম, ‘হ্যাঁ, অক্টোবর মাসই সবচেয়ে উপযোগী।’
তখন আমি আমার স্মৃতিগুলো সামনে রেখে মাসউরির দৃশ্যপটগুলো বর্ণনা করতে লাগলাম, ‘ওই সময় পাহাড়গুলো বন্য ডালিয়ায় আবৃত্ত থাকে, সূর্য মিষ্টি আলো ছড়িয়ে দেয় আর রাতে আপনি বসতে পারেন জ্বলন্ত কাঠের গুঁড়ির সামনে, আর খেতে পারেন সামান্য ব্রান্ডি। অধিকাংশ ট্যুরিস্ট এ সময়ই যায়। এ সময় রাস্তা নীরব, প্রায় জনশূন্যও। তাই অক্টোবরই সবচেয়ে ভালো সময় মাসউরি যাওয়ার।’
আমি কথা বলার সময়, সে ছিল নীরব; ফলে আমি বিস্মিত হলাম—আমার কথাগুলো তাকে স্পর্শ করেছে কিনা অথবা সে আমাকে মনে করেছে কিনা আমি একজন বোকা রোমান্টিক। আর ঠিক সে মুহূর্তেই আমি একটি ভুল করে বসলাম। আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা ওখানকার বাইরের দৃশ্যগুলো কেমন?’
আমার এই প্রশ্নে তাকে একটুও আশ্চর্যান্বিত মনে হলো না। তাহলে কি সে আমি যে দেখতে পারি না এটা বুঝতে পেরেছে? কিন্তু তার পরের প্রশ্ন আমার সন্দেহ দূর করে। সে বলে, ‘কেন আপনি জানালার বাইরে তাকাচ্ছেন না?’
আমি খুব সহজেই ঘুমানোর জায়গাটির পাশে গেলাম আর জানালার তাকটি হাতড়ে খুঁজতে লাগলাম। জানালাটা খোলাই ছিল। আমি জানালার মুখোমুখি হলাম আর বাইরের দৃশ্য দেখার ভান করলাম। আমি শুনতে পেলাম ইঞ্জিনের হাঁপানো, চাকার ঘরঘর শব্দ। কিন্তু আমার হৃদয়চক্ষু দিয়েও আমি টেলিগ্রাফ পোস্টগুলোর প্রতিচ্ছবি দেখতে ব্যর্থ হলাম।
আমি অত্যন্ত সাহসের সঙ্গে মেয়েটিকে বললাম, ‘আপনি কি লক্ষ করেছেন, ওই যে গাছগুলো—মনে হয় তারা দ্রুত ছুটছে; তখন আমাদের মনে হয় আমরা স্থির দাঁড়িয়ে আছি।’
মেয়েটি বলল, ‘ও রকম প্রায়শ ঘটে।’ সে তুরিতে আবার বলে উঠল, ‘আপনি কি কোনো জীবজন্তুও দেখেছেন?’
আমি অত্যন্ত আত্মবিশ্বসের সঙ্গে বললাম, ‘না, কখনো নয়।’ আসলে আমি জেনেছিলাম, ডেহারার পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলে খুব কম জীবজন্তুই ছিল।
আমি জানালা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম এবং মেয়েটির মুখোমুখি হলাম। কিছু সময়ের জন্য আমরা নিস্তব্ধতায় হারিয়ে গেলাম।
প্রথম আমি নীরবতা ভেঙে বললাম, ‘আপনার নিশ্চয় আকর্ষণীয় একটি চেহারা আছে।’ আমি ক্রমশ সাহসী হয়ে উঠছিলাম। কিন্তু আমার এ মন্তব্যটি ছিল যথেষ্ট সংগতিপূর্ণ। কিছু মেয়ে আছে, যারা নিজেদের ব্যাপারে প্রশংসার আবেগ ধরে রাখতে পারে না। আমার সামনে বসা মেয়েটিও ছিল সে রকম। সে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে হেসে উঠল; চমত্কার হাসি—যেন হাসির ঝংকার।
‘এটা দারুণ বলা যাবে, আমার একটি আকর্ষণীয় চেহারা আছে। মানুষের এ মন্তব্যে আমি সত্যি ক্লান্ত—তারা আমাকে প্রায়ই বলে, আমার একটি সুন্দর চেহারা আছে।’
উহ, তাই—আপনার অবশ্যই একটি সুন্দর চেহারা আছে, যেটা আমিও মনে করি। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, ‘একটি আকর্ষণীয় চেহারাও সুশ্রী হতে পরে।’
মেয়েটি বলল, ‘আপনি খুবই চমত্কার পুরুষ। কিন্তু আপনি কেন এত আগ্রহী আমার ব্যাপারে?’
তখন আমি ভাবলাম, আমি হাসার চেষ্টা করব। কিন্তু হাসার এই প্রচেষ্টা বরং আমার মাঝে সমস্যা এবং নিঃসঙ্গতাই সৃষ্টি করল।
প্রসঙ্গ ঘুরিয়ে বললাম, ‘আমরা শিগগিরই স্টেশনে পৌঁছব। ধন্যবাদ স্রষ্টাকে—আমাদের এই সংক্ষিপ্ত ভ্রমণের জন্য।
আমি ট্রেনে দুই থেকে তিন ঘণ্টার বেশি বসে থাকতে পাারি না। তবু আমি প্রস্তুত ছিলাম দীর্ঘ সময় এখানে বসে থাকতে, শুধু তার কথাগুলো শোনার আগ্রহে। তার কণ্ঠস্বর ছিল পর্বত স্রোতের মতো আন্দোলিত। যখন সে ট্রেন ত্যাগ করবে, হয়তো সে ভুলে যাবে আমাদের এ অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতের কথা। কিন্তু এই স্মৃতি আমাকে আঁকড়ে ধরে রাখবে অবশিষ্ট ভ্রমণ পর্যন্ত। হয়তো অনেক দিন জাগ্রত থাকবে আমার হৃদয়ে।
ভাবনায় যখন আমি আড়ষ্ট হয়ে রইলাম, তখনই ট্রেনের হুইসেল চেঁচিয়ে উঠল। ধীরে ধীরে চাকাগুলো থেমে যেতে লাগল। মেয়েটি সিট থেকে ওঠে তার জিনিসপত্র গোছাতে শুরু করল। আমি বিস্ময়ের সঙ্গে ভাবলাম, মেয়েটির চুলগুলো খোঁপা বাঁধা অথবা ছিল বিনুনি করা; হয়তো তার এলায়িত চুল কাঁধ বেয়ে নেমে পড়েছে, কিংবা চুলগুলো তার ছোট করে কাটা।
আমাদের ট্রেনটি খুব ধীরে স্টেশনে এসে থামল। বাইরে কুলি আর ফেরিওয়ালাদের চেঁচামেচি, সেই সঙ্গে একটি উচ্চ শব্দে একজন মহিলার আওয়াজ শুনতে পেলাম ট্রেনের জানালা থেকে। কণ্ঠস্বরটি ছিল নিশ্চয়ই মেয়েটির আন্টির।
ট্রেন থেকে নেমে মেয়েটি আমাকে বিদায় জানিয়ে বলল, ‘গুডবাই।’ সে আমার খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল; এতই কাছে যে তার চুলের সুগন্ধ আমাকে প্রলুব্ধ করছিল তার আরও কাছে যেতে। আমি আমার হাত উঠিয়ে তার চুল স্পর্শ করার জন্য প্রস্তুত হতেই সে দ্রুত স্থান ত্যাগ করল। কিন্তু তখনো তার পারফিউমের গন্ধ ছড়ানো ছিল, যেখানে সে দাঁড়িয়েছিল।
এ সময় দরজার পথে যেন সামান্য বিভ্রান্তি দেখা দিল। এক ভদ্রলোক কম্পার্টমেন্টে ঢুকেই অনেকটা কাঁপা কণ্ঠে ক্ষমা চাইলেন। ঠিক ওই মুহর্তেই ট্রেনের দরজা সজোরে বন্ধ হয়ে গেল। আমার মনে হলো যেন গোটা পৃথিবীটাই বন্ধ হয়ে গেল মুহূর্তে। আমি আমার সিটের দিকে ফিরে গেলাম। গার্ড তার হুইসেল বাজাল। আমরা আবার গন্তব্যের পথে ছুটতে লাগলাম। আমি আবার একজন নতুন যাত্রীর সঙ্গে তাস খেলায় মেতে উঠলাম।
ট্রেন দ্রুত ছুটছে। চাকাগুলো আবার ঝকর ঝক বা কু ঝিকঝিক ছন্দে ফিরে গেল। ট্রেন ঘরঘর শব্দে নড়তে লাগল। আমি দিনের আলোতে চোখ রেখে জানলাম সামনেই বসে পড়লাম; কিন্তু ওই আলো ছিল আমার জন্য অন্ধকারই।
জানালার বাইরে অনেক কিছুই ঘটছে। এগুলো হতে পারে আমার অনুমানে অদ্ভুত, আকর্ষণীয় কোনো খেলা।
হঠাৎ ট্রেনে ওই নতুন আগন্তুক লোকটি আমার কল্পনার পাহাড় মাড়িয়ে বলে উঠলেন, ‘আপনি অবশ্যই নিরাশ হবেন, কেননা আমি সদ্য ট্রেন ছেড়ে যাওয়া আপনার ওই ভ্রমণসাথির মতো ততটা আকর্ষণীয় নই।’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ, সে ছিল সত্যিই চমত্কার এক মহিলা। আপনি কি বলবেন, আমাকে, সে তার চুলগুলো দীর্ঘ এলায়িত না ছোট করে রেখেছিল?’
লোকটি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বলল, ‘আমি ঠিক স্মরণ করতে পারছি না, কারণ আমি তার চোখই লক্ষ করেছিলাম, চুল নয়। তার চমত্কার এক জোড়া চোখ ছিল। কিন্তু সে চোখ তার ব্যবহারের প্রয়োজন পড়েনি। সে ছিল সম্পূর্ণভাবে অন্ধ। আপনি কি লক্ষ করেননি?’