গল্প

এমন খাবার হয় না...

অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

‘পৃথ্বী খায় না...খায় না...’ কিছুটা ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে যায় উর্বি। ‘আল্লাহ! আমি এগুলো এত কষ্ট করে গোছালাম আর তুমি খেয়ে ফেলেছ? এখন কী করি?’ মাথায় হাত, আর চোখ কপালে নয় বছরের উর্বির। ‘আন্টি দেখ না পৃথ্বী আমার সব খাবার খেয়ে ফেলেছে।’ আড়াই বছরের পৃথ্বী। যাকে কি না কোনো খাবার খাওয়ানো মায়ের জন্য খুবই কষ্টকর, সে যদি কিছু খেয়েই ফেলে; মায়ের কাছে এর চেয়ে সুখের তো আর কিছুই হয় না। কাছে গিয়ে ঘটনাটা কী ঘটেছে দেখার চেষ্টা করেন তিনি। কাগজ কেটে কুটিকুটি করা। সেই সঙ্গে গাছের পাতা। কুটি করা কাগজ হলো ভাত। আর বিভিন্ন রকমের গাছের পাতা দিয়ে তারা রান্না করেছে শাক। পেনসিল মোছার রাবার হয়ে গেল গরুর মাংস। কী যেন একটা দিয়ে ওরা তৈরি করেছে মুরগির রোস্ট। এত লোভনীয় খাবার, পৃথ্বী কি না খেয়ে পারে? মা কী রাঁধেন না রাঁধেন—পৃথ্বীর তো তা মোটেই ভালো লাগে না। সেই সুজি..সেই খিচুড়ি...সেই রুটি...। নুডুলসটা যা-ও একটু খাওয়া যায়। মাঝেমধ্যে প্যাঁচানো প্যাঁচানো...নানা কসরত করে খেতে হয় এই যে খাবারটি, এটা যিনি আবিষ্কার করেছেন, তাঁকে কোনো রকমে একটা ধন্যবাদ দিয়ে আসতে ইচ্ছে হয়। কেননা খাবারটা মুখে দেওয়ার আগে কী রকম করে ঝুলে থাকে! সেটাকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে কী সুন্দর করে আবার মুখের ভেতরে দিয়ে দেওয়া যায়! এই মাথা ঘোরানোটাতেই মা খুব বিরক্ত হন। খেতে গিয়ে এত খেলাধুলা আর ভালো লাগে না—প্রায়ই মা তাঁর ছোট্টমণিকে এ কথা বলেন। কিন্তু কী করবেন, পৃথ্বীর তো এই খেলাটাই মজা লাগে। নয়তো নুডলস কি এত পছন্দ করে খায় সে। একটু খেলতে না পারলে তো এটাকেও অন্য খাবারের মতো অপছন্দের তালিকায় ফেলে দিয়ে অনশন করে ফেলত। তার এই নুডলস নিয়ে খেলাটাকে মায়ের অবশ্যই বাহবা দেওয়া উচিত।
আরেকটা খাবার পৃথ্বীর খুব পছন্দের। আট মাস বয়সে বড় মা যখন বললেন, ‘ওর চারপাশে একটু মুড়ি ছিটিয়ে রাখতে পারিস না? টুকিয়ে টুকিয়ে খাবে। এভাবেই তো ও খাওয়া শিখবে।’ বড় মায়ের কথা শুনে মোটু-পাতলুর একটা বাটিতে করে মা প্রথম দিয়েছিলেন মুড়ি। ভাতের মতোই। শক্ত। কিন্তু মুচমুচে। খেতে খুব ভালো লেগেছিল। মুড়ি খাওয়ার কয়েক দিনের মাথায় একদিন মা যখন গোসলে, তখন বাসার পরিচারিকা ময়না ১০-১২টা মুড়ি তার দুই ঠোঁটের মাঝখানে রেখে ভূত সেজেছিল। সেটা যে কী মজার! হাসতে হাসতে খিল ধরে যায় পেটে। কিন্তু নুডলস নিয়ে খেলার জন্য মা পৃথ্বীর ওপর যেমন বিরক্ত হন, তেমনি মুড়ি নিয়ে এ রকম করায় রাগ করেন ময়নার সঙ্গেও। ময়না তো চরম দুষ্টু। যখনই মা না থাকেন, সে মুড়ি দিয়ে ও রকম অদ্ভুত সাজ সাজবেই। এমনকি এখন সে পৃথ্বীকেও ও রকম করে সাজিয়ে দেয়। সাজানো শেষে কুট্টুস করে মুড়িগুলো খেয়ে ফেলে সে। ময়নার কসরত করে দেওয়া এই খাবার আর উর্বি আপুর হাতের রান্না যে কী মজার! মা তো তা বোঝেন না। বড় মানুষ তো। কী আর করা!
সকাল থেকে খেলছে ওরা। টুকুন বাজার করে নিয়ে আসছে। উর্বি-ময়না মিলে রান্নাবান্না করেছে। পৃথ্বী দুধ-ভাত। রান্না শেষে সবাই গিয়েছে গোসলে। এই ফাঁকে মজার মজার খাবারগুলো সব খেয়ে নিচ্ছে সে। উর্বি আপু রাবার দিয়ে এই মাংসটা এত মজা করে রান্না করেছে না! আর ম্যাচের খোল দিয়ে চিংড়ি মাছের এই তরকারিটা তো অসাধারণ। হাপুস-হুপুস করে খাচ্ছে পৃথ্বী। ঠোঁট আর জিহ্বা দিয়ে অভিনব সেই খাওয়ার শব্দ আর পরিতৃপ্তির ভান মাকে বুঝিয়ে দিল, উর্বি আপুর রান্নার হাত আছে বটে!