যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশভিল শহরের কয়েকটি দৃশ্যের ছবি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনার অ্যাশভিল শহরের কয়েকটি দৃশ্যের ছবি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

ভ্রমণসাহিত্য

মেঘের ভেতর দাঁড়িয়ে

এবারে যুক্তরাষ্ট্রে আসার পর প্রবাসী বন্ধু আমজাদ আমাকে কোনো একটা পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার কথা বলছিলেন। নাম জানতে চাইলে বলতেন—সেটা পাহাড়ের মতো রহস্যময় থাক। কিছু জায়গাকে শুধু নাম দিয়ে চেনা যায় না। তাদের কাছে যেতে হয়, তাদের বাতাসে দাঁড়াতে হয়, সেখানে আকাশের নিচে কিছুক্ষণ নীরব থাকতে হয়। তারপর অনুভব করতে হয়।

ঠাট্টা করে বলেছিলাম, দার্শনিকতা ছাড়েন। এ রকম কত পাহাড়ের চূড়ায় উঠে চোখের সামনে সবুজের ঢেউ দেখে বহুবার নীরব থেকেছি। বান্দরবানের নীলাচল, চিম্বুক, কেওক্রাডং, তাজিংডং, খাগড়াছড়ির আলুটিলা, সাজেকের কংলাক, ভারতের মেঘালয়ের পথে যেতে যেতে মেঘের স্তূপের বহু ওপরে উঠে গেছি। দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর সূর্যের প্রথম আলো পড়ার দৃশ্য দেখেছি। দেখেছি বরফঢাকা পর্বতশৃঙ্গের রং কীভাবে ধীরে ধীরে বদলে যায়। পাহাড় আর কত দেখব?

আমার কথার আপত্তি জানিয়ে আমজাদ বলেছিলেন, ‘প্রতিটি পাহাড়ের আলাদা আলাদা বিস্ময় আছে। পাহাড় যদি সব এক হতো, তাহলে আপনি এত পাহাড় কেন ঘুরলেন?’

নিজের কথায় নিজেই আটকে গেলাম। তাই তো! সব পাহাড় আপাতদৃষ্টিতে হয়তো একই রকম, কিন্তু কোথায় যেন প্রতিটি পাহাড় তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকে।

আমজাদের সঙ্গে কথায় পারিনি। কিন্তু দুজনের সময় এক বিন্দুতে এসে মেলেনি। তাঁর সঙ্গে পাহাড়ে যাওয়া হলো না।

৭ আগস্ট অফিস থেকে কন্যা অনন্যা বাসায় ফিরে বলল, ‘বাবা, পাহাড়ে বেড়াতে যাব। এখান থেকে গাড়িতে দুই ঘণ্টার পথ, অ্যাশভিল। তুমি মুগ্ধ হবেই, অনেক কবিতা লিখতে পারবে। ওখানে দুটো দিন থাকব, ঘুরব, বেড়াব।’

মেয়েটি সারা সপ্তাহ অফিস করে ছুটির দুটো দিন আমাকে বেড়াতে নিতে চাইছে। আমি ফোন করলাম আমজাদকে। বললাম, আমরা অ্যাশভিল যাচ্ছি। আপনি কোথায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন?

ফোনের ওপার থেকে উচ্চ স্বরে হাসতে হাসতে জবাব দিলেন, ‘আমিও অ্যাশভিলে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। ওখানে আমি গিয়েছিলাম। ব্লু রিজ পর্বতমালার স্মৃতিটাকে ঝালিয়ে নিতে আপনার সঙ্গে আবার যেতে চেয়েছিলাম।’

ফোন রাখার আগে আমজাদ একটা মজার টিপস দিলেন, আমি যেন যেতে যেতে গাড়িতে জন ডেনভারের বিখ্যাত গান ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস’ শুনি।

৮ আগস্ট। দুপুরে খাবার খেয়ে আমরা বেরিয়েছিলাম অ্যাশভিলের দিকে। উত্তর ক্যারোলিনার এই শহরটির নাম আগে শুনেছি, কিন্তু কখনো যাইনি। অনন্যারা যেখানে থাকে, সেই বেলমন্ট নিজেই পাহাড় আর হ্রদের জায়গা। বেলমন্ট থেকে রওনা দিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা পাহাড়ি পথে, দুপাশের নিবিড় বনের গাছপালাগুলোকে পেছনে ফেলে যখন আমরা অ্যাশভিল শহরে পৌঁছালাম, তখন বেলা প্রায় তিনটা।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনায় পাহাড়ঘেরা অ্যাশভিল শহরের একটি দৃশ্য
ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে উঠতে আমরা পৌঁছালাম ২ হাজার ৯১৫ ফুট উচ্চতার ওয়ালনাট কোভ ওভারলুকে। তখন বেলা চারটা। নর্থ ক্যারোলিনার জন্য এটা বিকেল নয়, মধ্যাহ্নের মতো। কারণ, সন্ধ্যা হতে হতে আরও কমপক্ষে সাড়ে চার ঘণ্টা বাকি। কিন্তু চারপাশ অন্ধকার। অনন্যার বর শুভ সেখানে গাড়ি থামিয়ে বলল, বাবা, আমরা এখন মেঘের ভেতর।

অ্যাশভিলের বিল্টমোর এলাকায় হ্যাম্পটন ইন বাই হিলটনে আমাদের আগে থেকেই বুকিং করা ছিল। অভ্যর্থনা ডেস্কে অনন্যা অনুরোধ করল, যাতে আমাদের পাহাড় দেখা যায় এমন একটি রুম দেওয়া হয়। ছয়তলায় গিয়ে রুমে ঢুকতেই বুঝে গেলাম, অ্যাশভিল কেন সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে এত জনপ্রিয়। বড় জানালার পর্দা সরাতেই অনুভব করলাম, আমরা আসলে সমতল থেকে কত ওপরে। বাইরে মেঘ ভাসছে। কাচের জানালা ভেদ করে মেঘগুলো রুমে প্রবেশের চেষ্টা করছে যেন। একটু দূরে প্রশস্ত মহাসড়ক। তারপর নিবিড় গাছপালা। তারপর পাহাড়। তারপর আরও পাহাড়, আরও আরও পাহাড়—আর মেঘ, শুধু মেঘ।

নিজের অজান্তে উচ্চারণ করলাম বোদলেয়ারের সেই বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি—আমি ভালোবাসি মেঘ, ওই উঁচুতে আশ্চর্য মেঘদল। কিন্তু মেঘ এখন আর উঁচুতে নয়, আমার নিশ্বাসের ভেতর যেন মেঘ ঢুকে যাচ্ছে।

হোটেলে ব্যাগ আর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রেখে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। অ্যাশভিল শহর থেকে যখন ব্লু রিজ মাউন্টেনসের দিকে উঠতে শুরু করলাম, ধীরে ধীরে চারপাশের দৃশ্য বদলে যেতে লাগল। এই সড়কের নাম ব্লু রিজ পার্কওয়ে।

সড়ক তো নয়, যেন পাহাড়ের বুক চিরে তৈরি করা এক সুবিশাল গ্যালারি, যার ভেতর দিয়ে প্রকৃতির তৈরি অপূর্ব সব ছবির প্রদর্শনী চলছে। কোথাও রাস্তার পাশে গভীর খাদ, কোথাও গাছের ঘন অরণ্য, আবার কোথাও হঠাৎ করে বন সরে গিয়ে চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে বিশাল পাহাড়ের দিগন্ত।

৪৬৯ মাইল দীর্ঘ এই সড়কটি যেন ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে উঠতে মেঘের সীমানা ছাড়িয়ে কোনো অজানা মহাশূন্যের দিকে চলে গেছে। কোথাও কোথাও সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ছয় হাজার ফুটেরও বেশি ওপরে উঠে গেছে, রিচল্যান্ড ব্যালসাম নামে একটা জায়গায় পার্কওয়ে সড়কটি ছয় হাজারের বেশি উচ্চতায় পৌঁছেছে।

আর এ পথেই রয়েছে দুই শতাধিক ওভারলুক (ওপর থেকে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখার স্থান)। এসব ওভারলুক থেকে পর্যটকেরা গাড়ি থামিয়ে পাহাড়, উপত্যকা আর অরণ্যের দৃশ্য দেখার সুযোগ পায়।

রাস্তা ক্রমশ ওপরের দিকে উঠছে তো উঠছেই। দুপাশে ঘন সবুজ বন। তার ফাঁকে ফাঁকে পাহাড়ের শরীর, একটার পর একটা সারিবদ্ধভাবে সাজানো। ব্লু রিজ মাউন্টেনস অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার একটি অংশ। অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালা পৃথিবীর প্রাচীনতম পর্বতশ্রেণিগুলোর একটি আর ব্লু রিজ পার্কওয়ে অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালার বিভিন্ন পর্বতশ্রেণির মধ্য দিয়ে চলে গেছে। দূর থেকে পাহাড়গুলো নীলাভ দেখায় বলেই নাম ব্লু রিজ। তবে সেদিন আমার চোখে সে রকম নীল কিছু ধরা পড়েনি। বৃষ্টিপ্রবণ দিনটিতে মেঘের দাপট ছিল বেশি। প্রকৃতি সেদিন পাহাড়কে সাজিয়েছিল মেঘে মেঘে।

ক্রমশ ওপরের দিকে উঠতে উঠতে আমরা পৌঁছালাম ২ হাজার ৯১৫ ফুট উচ্চতার ওয়ালনাট কোভ ওভারলুকে। তখন বেলা চারটা। নর্থ ক্যারোলিনার জন্য এটা বিকেল নয়, মধ্যাহ্নের মতো। কারণ, সন্ধ্যা হতে হতে আরও কমপক্ষে সাড়ে চার ঘণ্টা বাকি। কিন্তু চারপাশ অন্ধকার। অনন্যার বর শুভ সেখানে গাড়ি থামিয়ে বলল, বাবা, আমরা এখন মেঘের ভেতর।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনায় পাহাড়ঘেরা অ্যাশভিল শহরের একটি দৃশ্য
আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন হঠাৎ খুব নীরব হয়ে গেছে। সেই নীরবতার মধ্যে কয়েক বছর আগের একটি স্মৃতি ফিরে এল—দার্জিলিং। দার্জিলিংয়ের পাহাড়েও এ রকম মেঘের মধ্যে হাঁটার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে কখনো মেঘ এসে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে, মানুষকে ছুঁয়ে চলে যায়, কখনো পাহাড়, বাড়িঘর, গাছপালা—সবকিছুকে এক মুহূর্তে অদৃশ্য করে দেয়।

গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম। মেঘের ভেতরে পাহাড়ের মাটিতে পা রাখলাম। মেঘগুলো শীতল ধোঁয়ার মতো আমাদের ঘিরে ধরেছে। একদিকে বিশাল বিশাল কালো পাথরের শরীর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। এতটা খাড়া যে ওপরের দিকে তাকানো যায় না। আরেক দিকে অতল খাদ। সেই খাদের ভেতর থেকে মাথা তুলে উঠে এসেছে বৃক্ষরাজি। আকৃতি আর বিস্তার দেখেই বোঝা যায়, শত শত বছর ধরে এসব গাছপালা এখানে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

শুভ বলল, ‘মেঘ সরে যাওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। মেঘ না থাকলে এখান থেকে দাঁড়িয়ে উপত্যকার বিস্তৃত দৃশ্য দেখা যায়। এখান থেকে দূরের পাহাড়গুলো দেখে মনে হয় যেন কেউ পাহাড়গুলো ভাঁজ করে সাজিয়ে রেখেছে।’

আমি বললাম, মেঘ সরে গেলে ভালো, না সরে গেলে আরও ভালো। মেঘে শরীর ভিজে যাচ্ছে যাক।

সেই ছোটবেলা থেকে আকাশের দিকে কত সহস্রবার এই মেঘের দিকে তাকিয়েছি। কতবার স্বপ্নে দেখেছি, আমি মেঘের সঙ্গে ভাসছি। সেই অধরা মেঘ, সেই স্বপ্নের মেঘের ভেতর আছি—এটা আমার কাছে স্বপ্নই মনে হচ্ছে। মেঘগুলোকে থাকতে দাও। ওরা থাকুক।

এরই মধ্যে চলছে আমাদের ছবি তোলার প্রতিযোগিতা। আমার নাতনি নোরা সবচেয়ে বেশি মজা পাচ্ছে। কখনো মনে হচ্ছিল, মেঘ পাহাড়ের নিচে নেমে যাচ্ছে। কখনো মনে হচ্ছিল, পাহাড় উঠে গেছে মেঘের ভেতর। দূরের কোনো পাহাড় দেখা যাচ্ছে, পরক্ষণেই মেঘ এসে তাকে ঢেকে দিচ্ছে। আবার একটু পর মেঘ সরে গেলে পাহাড়ের কোনো একটি অংশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

সেই নীরব, নিস্তব্ধ জায়গায় শুধু আমাদের ছয়জনের দলটিই ছিল না। আরও কয়েকটি গাড়ি ছিল। তারা যার যার গাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে অথবা বসে অনেকটা মূর্তির মতো বোবা ও অনড় হয়ে উপভোগ করছিল প্রকৃতি।

আমাদের বাঙালিয়ানার মুখরতায় তারা একটু হতচকিত। অনন্যা আর শুভ সতর্ক করে দিচ্ছিল, আমাদের মুগ্ধতা আর উচ্ছ্বাস যেন খুব সরব না হয়ে ওঠে।

একটি ক্যারাভানও দেখলাম। ওই চলন্ত বাসাবাড়ির মতো যানটি নিয়ে কিছু মানুষ এখানে সারা রাত পাহাড়ের ভয়ানক নীরবতা আর সৌন্দর্যের ভেতর কাটাবে।

আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা যেন হঠাৎ খুব নীরব হয়ে গেছে। সেই নীরবতার মধ্যে কয়েক বছর আগের একটি স্মৃতি ফিরে এল—দার্জিলিং।

দার্জিলিংয়ের পাহাড়েও এ রকম মেঘের মধ্যে হাঁটার অভিজ্ঞতা হয়েছিল। সেখানে কখনো মেঘ এসে রাস্তায় ঘোরাঘুরি করে, মানুষকে ছুঁয়ে চলে যায়, কখনো পাহাড়, বাড়িঘর, গাছপালা—সবকিছুকে এক মুহূর্তে অদৃশ্য করে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ক্যারোলিনায় পাহাড়ঘেরা অ্যাশভিল শহরের একটি দৃশ্য
পথের প্রতি পথিকের প্রার্থনা—আমাকে ঘরে ফিরিয়ে নাও। এই গানের সুরের ভেতর ঘরে ফেরার স্মৃতি, আপন জায়গার টান, হারিয়ে যাওয়া দিনের ডাক। দূর দেশের একটি গান হঠাৎ যেন নিজের কথা বলল। পাহাড়ের কাছে গেলে পৃথিবীর সব মানুষের স্মৃতিই যেন এক জায়গায় এসে মিশে যায়—কেউ বাড়ি ফিরতে চায়, কেউ শৈশবে, কেউ কোনো পুরোনো প্রিয় মানুষের কাছে। আর আমি সেদিন মেঘের ভেতর দাঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম আমার নিজের বহু পুরোনো স্মৃতির কাছে।

ওয়ালনাট কোভ ওভারলুকে দাঁড়িয়ে সেই অনুভূতিটাই আবার ফিরে পেলাম। তবে জায়গা দুটি এক নয়। দার্জিলিং আর ব্লু রিজ মাউন্টেনসের মধ্যে হাজার হাজার মাইলের দূরত্ব। একটির ভূগোল ভারতের হিমালয়, অন্যটির ভূগোল আমেরিকার অ্যাপালাচিয়ান পর্বতমালা। তবু মেঘের কোনো দেশ নেই, কোনো সীমান্ত নেই। পাহাড়ের গায়ে মেঘ নামলে পৃথিবীর দুই প্রান্তের মানুষ একই বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে। সেদিন আমার কাছে পাহাড়ের সৌন্দর্যের চেয়ে মেঘের সৌন্দর্যই বেশি বড় হয়ে উঠেছিল।

রোদেলা দিনে পাহাড় দেখা যায়, তার উচ্চতা বোঝা যায় আর বিস্তার মাপা যায়। কিন্তু যখন এটি মেঘের ঘোমটা পরে, তাকে দেখা যায় না। শুধু অনুভব করি। দৃশ্যের অনুপস্থিতিতে কল্পনা সক্রিয় হয়। ভাবি, কী আছে মেঘের ওপারে? আরও পাহাড়? আর সুউচ্চ উপত্যকা, গভীর গভীরতর খাদ? নাকি অনন্ত নীলের আকাশ? এর উত্তর হয়তো জানি, হয়তো জানি না। প্রকৃতির কত কিছুই তো আমরা জানি না। আমাদের জ্ঞানের অতীতে কত রহস্য যে লুকিয়ে আছে! ব্লু রিজ মাউন্টেন যেন সেই রহস্যের সামনেই আমাকে দাঁড় করিয়ে দিল।

অ্যাশভিলের চারপাশের এই পাহাড়ি অঞ্চলে বন, ঝরনা, বহু বিচিত্র গাছপালা মিলে সৃষ্টি হয়েছে অনন্য প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। ঋতু বদলের সঙ্গে বদলে যায় এর রং। বসন্তে নতুন পাতার কোমল সবুজ, গ্রীষ্মে ঘন অরণ্য, শরতে লাল-হলুদ-কমলার বিস্ময়, আর কখনো এমন মেঘলা দিনে পাহাড়ের ওপর নেমে আসে রহস্যের সাদা চাদর।

আর কিছু সৌন্দর্য বহু বছর পরেও হঠাৎ কোনো কোনো মুহূর্তে ফিরে আসে—যেমন সেদিন ওভারলুকে দাঁড়িয়ে আমার কাছে ফিরে এসেছিল দার্জিলিং। বিশ্বজিৎ চৌধুরী, শুভ্রা বিশ্বাস, ডেইজি মউদুদ, কামরুল হাসান বাদল, সুস্মিতা চৌধুরী, রোখসানা বন্যাদের নিয়ে কী অসামান্য দিন কাটিয়েছিলাম! কত যে কবিতা এসেছিল বুকের গহিন থেকে। সেই ভ্রমণ নিয়ে ‘লাচুংয়ের রাত’ নামে একটি কবিতার বই হয়ে গেল।

আরও মনে পড়ে গেল প্রথম আলোর চট্টগ্রাম অফিসের একটি দল নিয়ে পিকনিকে গিয়েছিলাম সাজেকে। সারা রাত পাহাড়ের নির্জনতাকে ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল আমাদের দলের কোরাস গান।

পাহাড়ের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়, আমরা আসলে বেড়াতে আসি না। মনে হয়, নিজেদের ভেতরের পুরোনো কোনো জানালা খুলে দিতেই বেড়াতে আসি।

দার্জিলিংয়ের সেই মেঘ বহু বছর ধরে আমার স্মৃতির কোথাও ছিল। ৮ আগস্ট অ্যাশভিলের ব্লু রিজের মেঘ এসে যেন সেটি জানালায় উঁকি দিল।

ফেরার পথে ইউটিউবে সন্ধান করে বাজিয়ে দিলাম জন ডেনভারের সেই গান, যেটির কথা আমজাদ বলেছিল—জন ডেনভারের ‘টেক মি হোম, কান্ট্রি রোডস।’ অর্ধশতাব্দীর বেশি পুরোনো এই গানে ব্লু রিজ মাউন্টেনসের কথা উল্লেখ আছে। এর কথাগুলোতে পাহাড় আর নদীর প্রাকৃতিক দৃশ্যকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে ঘরে ফেরার আকুতি। পথের প্রতি পথিকের প্রার্থনা—আমাকে ঘরে ফিরিয়ে নাও। এই গানের সুরের ভেতর ঘরে ফেরার স্মৃতি, আপন জায়গার টান, হারিয়ে যাওয়া দিনের ডাক। দূর দেশের একটি গান হঠাৎ যেন নিজের কথা বলল। পাহাড়ের কাছে গেলে পৃথিবীর সব মানুষের স্মৃতিই যেন এক জায়গায় এসে মিশে যায়—কেউ বাড়ি ফিরতে চায়, কেউ শৈশবে, কেউ কোনো পুরোনো প্রিয় মানুষের কাছে। আর আমি সেদিন মেঘের ভেতর দাঁড়িয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম আমার নিজের বহু পুরোনো স্মৃতির কাছে।