
ইথিওপিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের ওমো ভ্যালিতে মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রামে গিয়েছিলেন লেখক। বিচ্ছিন্ন এই জনপদে এখনো টিকে আছে কৃষি, পশুপালন ও নিজস্ব সংস্কৃতিনির্ভর জীবনযাপন। মুরসিদের ঘরবাড়ি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-অলংকার, বিশ্বাস ও দৈনন্দিন জীবনের নানা অনুষঙ্গের মধ্য দিয়ে লেখকের চোখে ধরা পড়েছে এক ভিন্ন জগত।
জিনকা শহরে আমার প্রথম সকাল। রিসোর্টের ডাইনিং হলের পাশে গাছের নিচে চেয়ার–টেবিল পাতা আছে। কফি নিয়ে গাছের নিচে একটা চেয়ারে বসলাম। উঁচু উঁচু বেশ কিছু উডল্যান্ড, আকাশিয়াগাছ মাথার ওপর ছেয়ে আছে। অবশ্য পুরো এলাকাজুড়েই গাছ ছায়া দিচ্ছে৷ মনে হবে কোনো জঙ্গলে চলে এসেছি।
কিছুক্ষণ পর নাশতা এল, ইংলিশ ব্রেকফাস্ট। নাশতা শেষ করতে না করতেই আমার গাইড মেলাক এল জিপ নিয়ে। ইথিওপিয়া ভ্রমণের আগে থেকেই বলা ছিল, যেন একা কোথাও না বেরোই। অবশ্যই গাইড সঙ্গে নিয়ে বের হতে হবে। পৃথিবীর কোনো দেশেই একান্ত প্রয়োজন না পড়লে আমি গাইড নিই না। এই একান্ত প্রয়োজনের দেশ হলো ইথিওপিয়া। তবে নিজের মতো একা একা ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ আর কিছুতে হয় না।
আমি দক্ষিণ ইথিওপিয়ার ওমো ভ্যালিতে এসেছি মুরসি নৃগোষ্ঠীর জীবনযাপন দেখতে। তারা এখনো হাজার হাজার বছর আগের জীবন যাপন করছে। তাদের জীবনযাপন এখনো মূলত কৃষি, পশুপালন ও স্থানীয় সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এখানে নাকি আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। পুরো ওমো ভ্যালির জন্য ট্যুর অপারেটর কোম্পানি থেকে দেওয়া আমার গাইড মেলাক। আর মুরসি জনগোষ্ঠীর আলাদা আলাদা গ্রামে তাদের গোষ্ঠীর একজন গাইড নিতে হবে। দেখা যাক সামনে আর কত ঝক্কি পোহাতে হয়।
ইথিওপিয়ায় রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য আজকাল ট্যুরিস্ট তেমন আসে না। অন্য ট্যুরিস্ট নেই, তাই আমাকে একাই একটা জিপ ভাড়া করতে হয়েছে।
আমি ব্যাকপ্যাক নিয়ে চললাম জিপের দিকে। জিপের পেছনের সিটে ব্যাকপ্যাক রাখতে না রাখতে দেখি মেলাক গিয়ে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসেছে। আমি মেলাককে বললাম পেছনের সিটে গিয়ে বসতে। সামনের সিটে আমি বসব। মেলাক বসল পেছনে আর আমি সামনে। গাড়িটা ল্যান্ড ক্রুজার। চালকের নাম এবে।
আমরা এখন যাচ্ছি মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রাম দেখতে। মেলাক বলল, ‘মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রামে সকাল সকাল যেতে হয়।’
দুই পাশে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পথ ধরে চলতে চলতে সামনে পড়ল একঝাঁক গিনিফাউল। এরা গাড়ি দেখে সরে গেল। মেলাককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভয়ংকর কোনো প্রাণী কি এই জঙ্গলে আছে?’ মেলাক বলল, ‘একসময় সিংহ ছিল, কিন্তু এখন তেমন দেখা যায় না। এ ছাড়া লেপার্ড, চিতা, বুনো কুকুর, হায়েনা আছে।’ মেলাক যতটা না বলছে তার চেয়ে বেশি আমি গুগল করে জানার চেষ্টা করছি। মেলাক তথ্য কম জানে, না আমাকে কিছুই জানাচ্ছে না বুঝতে পারছি না।
আমি ভাবলাম পরে হয়তোবা এরা কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু মেলাক আরও অদ্ভুত কথা শোনাল। বলল, ‘এই গ্রামে দুপুরের পর সব নারী–পুরুষ স্থানীয় মদিরা পান করে টাল হয়ে থাকে। তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় পেতে হলে সকালেই যেতে হবে।’ এ কথা শোনার পর এর রেশ কাটতে অনেকটা সময় লাগল।
পথে পড়ল মাগো ন্যাশনাল পার্ক। দুই পাশে সবুজ টিলা আর মাঝখানে লাল মাটির কাঁচা রাস্তা। রাস্তায় চাকার দাগ ছাড়া বাকি অংশে ঘাস–গুল্ম জন্মেছে। আর আশপাশে প্রচুর ঝোপঝাড়ে ফুটেছে নানা রঙের ফুল। বেশির ভাগ ফুলের নাম মেলাক জানে না আর আমিও ফুলগুলো এই প্রথম দেখছি।
তবে ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে চলার সময় হঠাৎ একদল বেবুন সামনে এসে পড়ল। এরা গাড়ি দেখে তেমন ভয় পেল না।
দুই পাশে পাহাড় আর জঙ্গলের মাঝ দিয়ে পথ ধরে চলতে চলতে সামনে পড়ল একঝাঁক গিনিফাউল। এরা গাড়ি দেখে সরে গেল। মেলাককে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভয়ংকর কোনো প্রাণী কি এই জঙ্গলে আছে?’ মেলাক বলল, ‘একসময় সিংহ ছিল, কিন্তু এখন তেমন দেখা যায় না। এ ছাড়া লেপার্ড, চিতা, বুনো কুকুর, হায়েনা আছে।’ মেলাক যতটা না বলছে তার চেয়ে বেশি আমি গুগল করে জানার চেষ্টা করছি। মেলাক তথ্য কম জানে, না আমাকে কিছুই জানাচ্ছে না বুঝতে পারছি না। কাঁধসমান কোঁকড়া চুল, চোখ লাল—মেলাককে দেখে আমার একটু অস্বস্তি হচ্ছিল। আমি চুপচাপ আছি। ভালোমতো বুঝে নিই, না পোষালে ট্যুর অপারেটরকে ফোন করব। আপাতত বাইরে মাগো ন্যাশনাল পার্কের দিকে মনোযোগ দিই।
এই ন্যাশনাল পার্কে প্রচুর পাখি আছে, প্রায় ২৩০ প্রজাতির। এখন পাখি দেখা যাচ্ছে না, তবে গাছের উঁচু ডালে পাখির বাসা দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো পাখির বাসা ডাল থেকে গোল হয়ে ঝুলছে। আজকের দিনটি রৌদ্রোজ্জ্বল। বৃষ্টি হলে নাকি পথে পানি জমে যায়। তখন কাঁচা রাস্তায় জিপ নিয়ে যাওয়া বেশ কষ্টসাধ্য। এখন ইথিওপিয়ায় বর্ষাকাল, তবে এখানে গতকাল থেকে বৃষ্টি হয়নি।
গ্রামপ্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কখন আনন্দিত হয়। উত্তর এল, পশুর সংখ্যা বাড়লে সে আনন্দিত হয় এবং আরও একটা সময় আনন্দিত হয়, যখন সে কয়েকটি বিয়ে করতে পারে। বর্তমান গ্রামপ্রধানের দুজন স্ত্রী। মুরসি সমাজে পুরুষের একাধিক বিয়ে প্রচলিত বলে জানাল মেলাক।
সবুজ পাহাড়, পাখি, ফুল দেখতে দেখতে আমরা মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রামে চলে এলাম। এই গ্রামগুলোতে ঢোকার শর্ত হলো, গ্রামের প্রধানকে কিছু টাকা উপঢৌকন হিসেবে দেওয়া। আমি প্যাকেজ ট্যুরে এসেছি। উপঢৌকনের টাকা ইত্যাদি সবই আমার প্যাকেজের মধ্যে পড়ে, টাকাপয়সা ট্যুর অপারেটরকে দিয়ে এসেছি। আমার গাইড এখন এসব দেখবে।
ওমো ভ্যালির জনগোষ্ঠী এখনো যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগে বসবাস করে। এরা নিজেদের শস্য নিজেরাই উৎপাদন করে, পশুপালন করে, নিজেদের পোশাক নিজেরা তাঁতে বোনে। একসময় কেউ পোশাক পরত না। এখন নিম্নাঙ্গে পোশাক পরে।
গ্রামে প্রবেশ করতেই দেখি একদল পুরুষ চট বিছিয়ে পাশাপাশি বসে আছে। এদের নিম্নাঙ্গ এক খণ্ড কাপড় দিয়ে আবৃত। দু–একজন অবশ্য পুরোনো ময়লা শার্ট গায়ে দিয়েছে। এদের গায়ের রং সাধারণ ইথিওপিয়ানদের চেয়েও কৃষ্ণবর্ণ। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা, হাতে পুঁতির ব্রেসলেট।
এদের গ্রামপ্রধান তুলনামূলকভাবে বয়স্ক ব্যক্তি। আমি তাদের কাছে যেতে ভয় পাচ্ছিলাম, যদি তারা বিরক্ত হয়। তারা তাদের নিজস্ব জগৎ, নিজস্ব আচার-ব্যবহার নিয়ে বেশ আছে। আমরা বাইরের লোকেরা গিয়ে তাদের জীবনযাপনে ব্যাঘাত ঘটাই।
মেলাক বলার পর তাদের সঙ্গে গিয়ে বসলাম। তাদের জীবনযাপন এতটাই আলাদা যে কীভাবে কথোপকথন শুরু করব, বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মুরসি নৃগোষ্ঠীর প্রধান এই গ্রামের ছোট-বড় সিদ্ধান্ত নেয়। এদের নিজস্ব ধর্ম আছে, ঈশ্বর আছে। মূলত প্রকৃতিই এদের ঈশ্বর। ঈশ্বরের নাম তুমউই। এরা মনে করে সে আকাশে থাকে এবং মুরসি নৃগোষ্ঠীর চেয়ে শক্তিমান।
গ্রামপ্রধানকে জিজ্ঞেস করলাম, সে কখন আনন্দিত হয়। উত্তর এল, পশুর সংখ্যা বাড়লে সে আনন্দিত হয় এবং আরও একটা সময় আনন্দিত হয়, যখন সে কয়েকটি বিয়ে করতে পারে। বর্তমান গ্রামপ্রধানের দুজন স্ত্রী। মুরসি সমাজে পুরুষের একাধিক বিয়ে প্রচলিত বলে জানাল মেলাক।
গ্রামের সীমানা আকাশিয়াগাছ আর ঝোপঝাড় দিয়ে বেড়া দেওয়া। বেড়া পার হয়ে ভেতরে একটু দূরে দূরে বেশ কয়েকটা খড়ের গাদা রাখা। বাংলদেশের গ্রামে এ রকম খড়ের গাদা আমি অনেক দেখেছি। তাই অবাক হলাম না। কিন্তু আরেকটু খেয়াল করতেই দেখি নিচু খড়ের গাদার মাঝে ছোট গোলাকার একটা দরজা আছে। আসলে এই খড়ের গাদার ভিত হয়ে আছে কাঠ বা চিকন ডালের অবয়ব, যাতে ঘরটি মজবুত থাকে।
তাদের সঙ্গে কথা খুব একটা হলো না। তারা আমাদের মতো আড্ডাবাজ না। বাইরের জগতে আলাপ করার কত কিছু আছে, কতভাবেই যে রাজা–উজির গপ্পো মারা যায়, তা তারা জানে না। আর আমাদের মতো বাইরের মানুষ তারা পছন্দও করে না। মুরসি গ্রামকে অনেক ইউরোপীয় ট্যুরিস্ট ‘ভয়ংকর গ্রাম’ নাম দিয়েছে। একটা ডকুমেন্টারিতে দেখেছি ট্যুরিস্টরা নানা প্রশ্ন করে তাদের বিরক্ত করছিল। এরপর মুরসিরা তাদের আটকে রেখেছিল। আমি আগে থেকেই সতর্ক আছি। একা এসেছি, বেশি প্রশ্ন বা বেশি কৌতূহল দেখানো যাবে না।
হঠাৎ সামনে দেখি ‘হি ম্যান’—এই গ্রামের শক্তসমর্থ তরুণ। মাসাই নৃগোষ্ঠীর মতো কাঁধের এক পাশে চাদর বেঁধে ঘুরছে। চাদরের ঝুল নেমেছে হাঁটু অবধি। হাতে স্থানীয়ভাবে ট্যাটু করেছে। ট্যাটুতে ফুলদানির মতো বিমূর্ত ছবি আঁকা। ট্যাটুর জায়গাটা ফুলে গেছে। এমনিতে কালি দিয়ে ট্যাটু করা হয় কিন্তু এরা তা করেনি। চামড়ার ওপর করেছে আর ফোলাভাব এখনো যায়নি। হয়তোবা এটা স্থায়ী হয়ে গেছে। ট্যাটু করা ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়ে আছে এ গ্রামের পুলিশ ও আর্মিপ্রধান। নীল চাদর আর শর্টস পরা ছেলেটির কাঁধে একটি বন্দুক ঝুলছে। বন্দুক দেখে আমার কৌতূহল হলো—এটি তারা কী কাজে ব্যবহার করে?
মেলাকের সাহায্য নিতে হলো। জানতে পারলাম, মাঝেমধ্যে বন্য পশু তাড়ানোর জন্য তারা বন্দুক ব্যবহার করে। অন্য গ্রাম থেকে মানুষ এসে তাদের গ্রামের পশু নিয়ে যায়, তখন বন্দুক কাজে লাগে। তা ছাড়া এই প্রত্যন্ত এলাকায় বন্দুকের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
আমাকে দেখে গ্রামের কয়েকটা বাচ্চা ভেতর থেকে এসে পড়ল। ছেলেশিশুদের গায়ে কোনো পোশাক নেই। মেয়েশিশুদের নিম্নাঙ্গে শুধু এক খণ্ড কাপড় জড়ানো। বাচ্চাদের কারও কারও গলায় পুঁতির মালা।
গ্রামের সীমানা আকাশিয়াগাছ আর ঝোপঝাড় দিয়ে বেড়া দেওয়া। বেড়া পার হয়ে ভেতরে একটু দূরে দূরে বেশ কয়েকটা খড়ের গাদা রাখা। বাংলদেশের গ্রামে এ রকম খড়ের গাদা আমি অনেক দেখেছি। তাই অবাক হলাম না। কিন্তু আরেকটু খেয়াল করতেই দেখি নিচু খড়ের গাদার মাঝে ছোট গোলাকার একটা দরজা আছে। আসলে এই খড়ের গাদার ভিত হয়ে আছে কাঠ বা চিকন ডালের অবয়ব, যাতে ঘরটি মজবুত থাকে। এর আরেকটু দূরে নারকেলের পাতার মতো পাতা দিয়ে চাল বানানো, চারপাশ খোলা একটা ঘর। সেটি অবশ্য চারকোনা আর দোচালা। দেখে মনে হলো রান্নাঘর।
একজন মুরসি পুরুষ ঘর বাঁধছে। খড়ের মতো পাতা একটার পর আরেকটা সাজিয়ে গোলাকার ইগলুর মতো ঘর তৈরি করে ফেলেছে প্রায়। ঘরটিকে তাদের ভাষায় বলে দেবোয়তাস। ঘর বাঁধতে থাকা ছেলেটির বয়স হবে ২০–২১ আর তাকে ১০–১২ বছর বয়সী শিশুরা ঘিরে রেখেছে। দেখে ছেলেমেয়ে আলাদা করা যাচ্ছে না। সবার কবজিতে তামার চুড়ির মতো ব্রেসলেট শোভা পাচ্ছে। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা।
মেলাক বলল, ‘মুরসি নৃগোষ্ঠীর পুরুষেরা পশুপালন করে আর সারা দিন বসে থাকে। বাকি সব কাজ করে নারীরা। রান্না করা, বাচ্চা সামলানো ইত্যাদি। পুরুষেরা ঘরের কুটাটাও নাড়ে না।’
সব মুরসি পুরুষ অবশ্য পশুপালন করে, তা নয়। কেউ কেউ কৃষিকাজও করে। তবে পশুপালকের সংখ্যাই বেশি। এ ছাড়া আমার মতো ট্যুরিস্টরা গ্রামে প্রবেশের জন্য যে অর্থ দেয়, তা–ও এদের উপার্জনের একটি উপায়। আগে ওমো ভ্যালিতে অনেক ট্যুরিস্ট আসত। এখন কমে গেছে। আমি ছাড়া আজ আর কেউ আসেনি।
আরেকটু এগিয়ে নারীদের দেখা পেলাম। পাঁচ-ছয়জন নারী গোল হয়ে বসে মাটি দিয়ে ছোট ছোট পশুপাখি তৈরি করছেন। কয়েকটা হাতি, সিংহ তৈরি করা হয়েছে। এখন চুনাপাথর গুঁড়া করে সাদা ফোটা ফোটা রং দিচ্ছে। নারীদের প্রায় সবার ঊর্ধাঙ্গে কোনো বস্ত্র নেই। একজন শুধু বুক থেকে কাপড় বেঁধেছে। তাদের মাঝে কয়েকজন ৯-১০ বছরের শিশুর কান ছিদ্র করা হয়েছিল আমাদের মতোই। আমরা কানে দুল পরি আর ওরা সেই ছিদ্রকে প্রথমে কাঠের ছোট গোল কাঠি ঢুকিয়ে একটু বড় করে, তারপর কাঠের ছোট গোল চাকতি ঢোকায়। ছিদ্র আরেকটু বড় হলে আরেকটু বড় চাকতি ঢোকায়। শেষে প্রায় তিন ইঞ্চি ব্যাসার্ধের চাকতি ঢোকায়। আমার সামনে একটি মেয়ে সন্তান কোলে নিয়ে বসে আছে, যার কানের চাকতির আকার বেশ বড়। ব্যাসার্ধ তিন ইঞ্চির মতো হবে। এখানে ১০ বছর বয়সী একটি শিশুর কানের চাকতির ব্যাসার্ধ প্রায় এক ইঞ্চি। এই শিশুটিরই যখন ১৬–১৭ বছর বয়স হবে, তখন সে আরও বড় চাকতি পরবে।
তবে মুরসি নৃগোষ্ঠীর নারীরা বিখ্যাত এদের ঠোঁটের ভেতরে ছিদ্র করে বড় বড় চাকতি রাখার জন্য।
আরেকটু সামনে এগিয়ে দেখি একজন মুরসি পুরুষ ঘর বাঁধছে। খড়ের মতো পাতা একটার পর আরেকটা সাজিয়ে গোলাকার ইগলুর মতো ঘর তৈরি করে ফেলেছে প্রায়। ঘরটিকে তাদের ভাষায় বলে দেবোয়তাস। ঘর বাঁধতে থাকা ছেলেটির বয়স হবে ২০–২১ আর তাকে ১০–১২ বছর বয়সী শিশুরা ঘিরে রেখেছে। দেখে ছেলেমেয়ে আলাদা করা যাচ্ছে না। সবার কবজিতে তামার চুড়ির মতো ব্রেসলেট শোভা পাচ্ছে। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা।
আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার আগে মেলাক আমাকে বলল, ‘মুরসি নারীদের বৈশিষ্ট্য হলো নিচের ঠোঁটে ছিদ্র করে বড় একটা চাকতি বসিয়ে দেওয়া। চাকতিটি সাধারণত মাটির তৈরি হয়।’ আমার সামনে একজন মাঝবয়সী নারী দাঁড়িয়ে আছে নিচের ঠোঁটে বেশ বড় একটা চাকতি বসিয়ে। কাঁধ থেকে বাঁধা এক টুকরা কাপড় আর মাথায় বসিয়েছে গরুর মাথার কঙ্কাল। আর সে মাথায় বসানো আছে গোল লেবুর মতো হলুদ রঙের কয়েকটা বুনো ফল।
এখানে ঘরগুলো পাশাপাশি সাজানো।
তাদের রান্নাঘর একটু দূরে। ঘরের দরজা বেশ নিচু, গোলাকার। মেলাককে বলতে সে একটা ঘরের ভেতর দেখাতে নিয়ে গেল। ঘরের দরজা দিয়ে নিচু হয়ে ঢুকতে হয়। ভেতরে তেমন কিছুই নেই। শুধু একটা বিছানা গুটিয়ে এক কোনায় রাখা। বিছানায় কোনো তোশক বা বালিশ নেই। শুধু চাটাই আর চাদর বিছিয়ে তারা ঘুমায়।
ঘর থেকে বেরিয়ে পেছনের আঙিনায় দেখি একজন নারী শিল–পাটায় ভুট্টা গুঁড়ো করছে। এই ভুট্টা ও সোরগাম দিয়ে তৈরি পরেজের মতো একধরনের খাবার তারা নিত্যদিন খায়। সঙ্গে জঙ্গলের শাকসবজি মিশিয়ে দেয়। প্রতি পরিবারের রান্না আলাদা রান্নাঘরে হয়। রান্নাঘর বলতে আসলে কিছুই নেই। খোলা আকাশের নিচে কয়েকটা পাথর সাজিয়ে চুলা বানিয়ে মাটির পাত্রে সেদ্ধ করা হয় সোরগাম। বৃষ্টি হলে মাথার ওপর কয়েকটা কাঠের খুঁটি আর খড় দিয়ে ছাউনি বানিয়ে নেয়।
এখানে কোনো বিদ্যালয় নেই। নেই কোনো হাসপাতাল। তাই চিকিৎসা হয় জড়িবুটি, ভেষজ উপায়ে। সরকার এদিকে আসে না, তাদের খোঁজখবরও রাখে না। তাদের উন্নয়নে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। দুর্গম বলে কোনো এনজিও এদিকে আসে না। এ এক বিচ্ছিন্ন জনপদ।
অবশ্য দুপুরের পরে এরা যে মদিরা পান করে তা–ও তৈরি হয় খেতের সোরগাম দিয়ে। বইয়ে পড়েছিলাম, আরও এক ধরনের পানীয় তারা পান করে। গরুর তাজা রক্ত তারা পান করে সঙ্গে সামান্য দুধ মিশিয়ে নেয়। অবশ্য এই পানীয় উৎসবের সময়ই পান করা হয়।
আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার আগে মেলাক আমাকে বলল, ‘মুরসি নারীদের বৈশিষ্ট্য হলো নিচের ঠোঁটে ছিদ্র করে বড় একটা চাকতি বসিয়ে দেওয়া। চাকতিটি সাধারণত মাটির তৈরি হয়।’
আমার সামনে একজন মাঝবয়সী নারী দাঁড়িয়ে আছে নিচের ঠোঁটে বেশ বড় একটা চাকতি বসিয়ে। কাঁধ থেকে বাঁধা এক টুকরা কাপড় আর মাথায় বসিয়েছে গরুর মাথার কঙ্কাল। আর সে মাথায় বসানো আছে গোল লেবুর মতো হলুদ রঙের কয়েকটা বুনো ফল।
গ্রামের সবার মাথা হয় কামানো, নয় কদম ছাঁট দেওয়া। মানে এখানে কেশবিন্যাসের সুযোগ নেই। অবশ্য কোঁকড়া চুলে মাটি ঢুকে গেলে তা পরিষ্কার করা বেশ মুশকিল। এ কারণে আফ্রিকান নারী-পুরুষ অনেকেই চুল ছোট রাখে। আরেকজন নারী ঠোঁটের চাকতি ছাড়া মাথায় গরুর মাথার কঙ্কাল বসিয়ে আমার সামনে এলেন। আমি একবারের পর তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। প্রথাগত সৌন্দর্যের ধারণায় অভ্যস্ত চোখে দৃশ্যটি আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছিল।
কেন জানি না চাকতি মুখে ঝোলানো ব্যাপারটা আমার অনভ্যস্ত চোখে বীভৎস লাগল। আসলে ঠোঁটে অত বড় একটা চাকতি বসাবার কারণেই হয়তো এমন লাগছে। চাকতির ব্যাসার্ধ প্রায় তিন ইঞ্চি। চাকতি বসাবার জন্য নারীরা সামনের পাটির নিচের দুটি দাঁত ফেলে দেয়। ঠোঁটের চাকতিটি মাটির তৈরি। আমাকে একজন চাকতি হাতে নিয়ে দেখতে দিল। আমি হাতে নিয়ে দেখি বেশ ভারী। এত ভারী জিনিস ঠোঁটে নিয়ে চলাফেরা করা খুবই মুশকিল।
বলা হয়ে থাকে, মুরসি পুরুষদের শিকার বা অন্য কাজে গ্রামের বাইরে যেতে হতো। তখন যেন অন্য পুরুষ তাদের নারীর প্রতি আকৃষ্ট না হয় সে কারণে ঠোঁটে চাকতি রাখার নিয়ম চালু হয়েছে।
আবার এ–ও প্রচলিত আছে যে ঠোঁটে বসানো চাকতি সৌন্দর্যের প্রতীক। যে নারীর চাকতি যত বড়, সে নারী তত সুন্দর।
এখন কমবয়সী মুরসি নারীরা ঠোঁটে ছিদ্র করতে চায় না। যুগের সঙ্গে সঙ্গে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা বদলেছে।
আরেক দিকে গ্রামের ১০–১২ বছরের শিশুরাও মাটি দিয়ে ছোট ছোট পুতুল তৈরি করছে। এদের সবার হাতে তামার ব্রেসলেট। কারও কারও গলায় পুঁতির মালা আর কানে ছিদ্র করা, তাতে কাঠের চাকতি।
গ্রামের সবার মাথা হয় কামানো, নয় কদম ছাঁট দেওয়া। মানে এখানে কেশবিন্যাসের সুযোগ নেই। অবশ্য কোঁকড়া চুলে মাটি ঢুকে গেলে তা পরিষ্কার করা বেশ মুশকিল। এ কারণে আফ্রিকান নারী-পুরুষ অনেকেই চুল ছোট রাখে।
আরেকজন নারী ঠোঁটের চাকতি ছাড়া মাথায় গরুর মাথার কঙ্কাল বসিয়ে আমার সামনে এলেন। আমি একবারের পর তার দিকে তাকাতে পারছিলাম না। প্রথাগত সৌন্দর্যের ধারণায় অভ্যস্ত চোখে দৃশ্যটি আমার কাছে অস্বাভাবিক লাগছিল।
এ গ্রামে বেশ কয়েকজন প্রবীণ নারীর ঠোঁটে আর কানে বড় ছিদ্র দেখলাম। তাদের কেউ কেউ চাকতি পরে আছে, কেউ পরে নেই। একজন নারী খেলনা পুতুল পোড়াবার জন্য পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালালো আর আগুন উসকে দেওয়ার জন্য সোরগামের খড় ব্যবহার করল। ব্যাপারটা বেশ চমকপ্রদ। এর আগে কেনিয়ার মাসাই মারা গ্রামে এ রকমভাবে আগুন জ্বালাতে দেখেছি। তবে মাসাই নৃগোষ্ঠীরা এখন আধুনিক জগতে প্রবেশ করেছে। ট্যুরিস্টদের দেখানোর জন্য এভাবে আগুন জ্বালায়।
পুরুষেরা এখন পশু চড়াতে গিয়েছে আর অল্প কিছু পুরুষ গ্রামে ঢোকার মুখে বসে আছে। নারী ও শিশুরা গ্রামে আছে এখন। গ্রামে ৩৫টির মতো ঘর আছে। সবাই ঘরের পাশেই অস্থায়ী চুলা বসিয়ে রান্নার কাজ সারে। এখন প্রায় সব নারী বসে আছে। কেউ রান্না করছে না। কয়েকটা চুলার আগুন নিবু নিবু অবস্থায় আছে। কারণ, তারা ভোরে উঠে সোরগাম বা ভুট্টা সেদ্ধ করে ফেলে। এরপর সারা দিন আর কাজ থাকে না। দুপুরের পর সোরগাম দিয়ে বানানো মদিরা পান করে সময় কাটায়। এই প্রত্যন্ত গ্রামে বিদ্যুৎ বা পানির সুব্যবস্থা নেই। পানি এরা জেরিক্যান ভরে কাছের নদী থেকে বহন করে আনে।
আফ্রিকায় লাউয়ের খোল দিয়ে অনেক কিছু তৈরি করে। মুরসিরা তৈজসপত্র তৈরি করে কাঠ বা মাটি দিয়ে। লাউয়ের খোলের একটা পাত্রে এক মা তার তিন বছর বয়সী শিশুকে পানি খাওয়াচ্ছে। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই মায়ের রূপ এক।
তাদের রান্নার অংশ হিসেবে দু–একটা স্টিলের পাত্র জুটেছে। তাদের নিয়মিত বাজারে যাওয়া সম্ভব হয় না। কারণ, বাজার প্রায় পঞ্চাশ কিলোমিটার দূরে, সেই মাগো ন্যাশনাল পার্ক পেরিয়ে জিনকায়। কেউ যদি আসে বা মেলাকের মতো গাইড আসে তাহলে তারা এ রকম কিছু জিনিস পায়।
সোরগাম ও ভুট্টাখেতে যা চাষ হয় তা দিয়ে গ্রামের মানুষের না চললে নিজেদের পালিত পশুর বিনিময়ে তারা শস্য কেনে। অবশ্য সেটাও হয় কালেভদ্রে। সে জন্য কাউকে গ্রামে এসে খবর নিয়ে যেতে হয়। এরপর অন্য কেউ এসে শস্য দিয়ে, পশু নিয়ে চলে যায়।
তাদের বিয়েও হয় অদ্ভুত এক উপায়ে। কন্যার পিতাকে বর সামর্থ্য অনুযায়ী পশু যৌতুক দেয়। তবে তাদের সন্তানের সংখ্যা দু–তিনটির বেশি নয়। সে কারণে এখানে খাদ্য বণ্টনে সুবিধা হয়।
এ গ্রামে বেশ কয়েকজন প্রবীণ নারীর ঠোঁটে আর কানে বড় ছিদ্র দেখলাম। তাদের কেউ কেউ চাকতি পরে আছে, কেউ পরে নেই। একজন নারী খেলনা পুতুল পোড়াবার জন্য পাথরে পাথরে ঘষে আগুন জ্বালালো আর আগুন উসকে দেওয়ার জন্য সোরগামের খড় ব্যবহার করল। ব্যাপারটা বেশ চমকপ্রদ। এর আগে কেনিয়ার মাসাই মারা গ্রামে এ রকমভাবে আগুন জ্বালাতে দেখেছি। তবে মাসাই নৃগোষ্ঠীরা এখন আধুনিক জগতে প্রবেশ করেছে। ট্যুরিস্টদের দেখানোর জন্য এভাবে আগুন জ্বালায়। আদতে নিত্য ব্যবহারের জন্য জ্বালায় না। তবে মুরসি নৃগোষ্ঠী এখনো আগুন জ্বালায় প্রাকৃতিক উপায়ে। এরা এখনো যেন প্রাগৈতিহাসিক যুগেই রয়ে গেছে।
মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রাম দেখা হয়ে গেছে। আমাদের জিনকা হয়ে তারপর যেতে হবে হামার নৃগোষ্ঠীর গ্রামে। মাগো ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বাবুই পাখির বাসার মতো গোল গোল বাসা আকাশিয়াগাছে ঝুলছে দেখে থামলাম। এদেশে আকাশিয়াগাছগুলো বেশ উঁচু উঁচু। আর পাশেই আফ্রিকান শিরীষগাছ। যেমন ঝাঁকড়া তেমনি উঁচু। আর এদের পায়ের কাছে ফুটে আছে নানা রঙের নানা জাতের ফুল।
সামনে একজন নারী লাল পাথর গুঁড়ো করছেন পুতুলে রং দেবার জন্য। আরেকজন এসে আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমি সেই রং মুখে মাখতে চাই কিনা। আমি তাতে মত দিইনি।
যেকোনো ‘সংখ্যালঘু’ গোষ্ঠীর মতো করে সাজা বা তাদের পোশাক পরার ঘোর বিরোধী আমি। ‘সংখ্যালঘু’দের বেশভূষা ধারণ করাকে কালচারাল অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন (সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ) বলে। এটা সাধারণত অনেকে না বুঝে, সেই সংস্কৃতি সম্পর্কে না জেনে করে, যা নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতির জন্য হুমকিস্বরূপ। আমি কোথাও গেলে কখনোই কোনো নৃগোষ্ঠীর বেশভূষা ধারণ করি না। তাদের সাথে কয়েক বছর না থাকলে তাদের সংস্কৃতি জানা সম্ভব নয়। না জেনে শুধু পোশাক পরা তাদের সংস্কৃতিকে অসম্মান করা বলে মনে করি।
কয়েকটা ১০–১২ বছর বয়সী বাচ্চা আমাকে ঘিরে ধরল তাদের হাতের পুতুল কেনার জন্য। তারা যেখানে সারিবদ্ধভাবে পুতুল নিয়ে বসে আছে, সেখানে গিয়ে কয়েকটা পুতুল কিনলাম। একেকটা পুতুল লম্বায় পাঁচ–ছয় ইঞ্চি। লাল মাটির ওপর সাদা ফোটা ফোটা দেওয়া পুতুল। পুতুল বিক্রির টাকা চলে যাবে গ্রামপ্রধানের কাছে। তিনি পরে এখান থেকে খরচ করবেন। এদের জীবন এতই সরল যে বাড়তি কিছুই প্রয়োজন নেই। এমনকি চেহারা দেখার জন্য আয়নাও নেই।
মুরসি নৃগোষ্ঠীর গ্রাম দেখা হয়ে গেছে। আমাদের জিনকা হয়ে তারপর যেতে হবে হামার নৃগোষ্ঠীর গ্রামে।
মাগো ন্যাশনাল পার্কের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় বাবুই পাখির বাসার মতো গোল গোল বাসা আকাশিয়াগাছে ঝুলছে দেখে থামলাম। এদেশে আকাশিয়াগাছগুলো বেশ উঁচু উঁচু। আর পাশেই আফ্রিকান শিরীষগাছ। যেমন ঝাঁকড়া তেমনি উঁচু। আর এদের পায়ের কাছে ফুটে আছে নানা রঙের নানা জাতের ফুল।
এই গাছপালা আর প্রকৃতির কাছের মানুষ প্রকৃতির মাঝেই সুন্দর। আমরা শহরের মানুষ এখানে বেমানান।