নতুন ধারার চিন্তকের জন্য সামাজিক হুমকি সৃষ্টি করার ফলেই কি বাংলাদেশের বিভিন্ন স্তরে বাড়ছে রক্ষণশীলতা?

বিশ শতকের শুরুতে পৃথিবীর বহু ভূখণ্ডের মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম সম্ভাবনাময় ভারতীয় উপমহাদেশ। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার মানুষের মধ্যে আধুনিক সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি নিয়ে চিন্তা-চেতনার অগ্রগতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। যখন পৃথিবীর নানা প্রান্তের মানুষ মানবিক অধিকার, মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও ঐক্য নিয়ে ভাবছে, প্রথাগত ও প্রচলিত চিন্তার বাইরে নতুন চিন্তা ও চিন্তককে স্বাগত জানাচ্ছে, তখন ভারতবর্ষের মানুষেরা ভাবছে কীভাবে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে রাষ্ট্র গঠন করা যায়। ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ করে রাষ্ট্রগঠনের চিন্তা ভারতবর্ষের জন্য অযৌক্তিক তো বটেই, পূর্ব বাংলার জন্য ছিল আরও অযৌক্তিক। কারণ, এই ভূখণ্ড ছিল বহু ধর্মের ও বহু সংস্কৃতির, যা বর্তমানের জন্যও সত্য।
গত শতকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতভাগ, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, উনসত্তরের গণ–অভ্যুত্থান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ, নব্বইয়ের গণ–অভ্যুত্থান ইত্যাদির মতো বৈপ্লবিক ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত এই ভূখণ্ডে নির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশে প্রচলিত চিন্তার বাইরে নতুন বা ভিন্ন চিন্তাকে গ্রহণ করা হয় না। বরং প্রথাগত ও প্রচলিত ধারার বাইরের চিন্তা ও চিন্তককে বর্জন করা হয়, প্রতিরোধ করার চেষ্টা করা হয়, সঙ্গে নতুন ধারার চিন্তকের জন্য থাকে সামাজিক নিন্দা ও লাঞ্ছনা। কারণ, মানুষ এখনো প্রথাগত ধারার বাইরে ভাবতে পারে না বা ভাবতে ভয় পায়।
নতুন চিন্তা-চেতনা ও চিন্তককে গ্রহণ না করা, বিশেষ করে নতুন ধারার চিন্তকের জন্য সামাজিক হুমকি সৃষ্টি করা এবং এত বছর পরও বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ না হওয়া—বাংলাদেশের বর্তমান সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সামাজিক সংকটগুলোর অন্যতম।
বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের জন্য প্রয়োজন বিস্তৃত ও বিবিধ বিষয়ে জ্ঞানচর্চা। তাই, জ্ঞানচর্চা ও বুদ্ধির চর্চা হতে হবে মুক্ত। কারণ, নতুন চিন্তার সূচনা কখনোই বদ্ধ চেতনা থেকে সৃষ্টি হতে পারে না। তবে পূর্ব বাংলা বা বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে মুক্ত জ্ঞানচর্চা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চা একদমই হয়নি, এমনটা বললে ভুল হবে।
ভারতভাগের আগে ১৯২৬ সালে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক আবুল হুসেনের নেতৃত্বে ও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে ঢাকায় গড়ে উঠেছিল ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’। তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল মানুষের বুদ্ধির মুক্তি, তাই তাদের কর্মকাণ্ড ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ নামে পরিচিত। মুসলিম সাহিত্য সমাজের কাজগুলো ছিল মূলত অন্ধ সংস্কার ও শাস্ত্রানুগত্য থেকে মানুষের বিচার–বুদ্ধিকে মুক্ত করা, চিন্তাচর্চা ও জ্ঞানের জন্য আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি এবং সমকালীন চিন্তা ও জ্ঞানের চর্চা করা। এ কথাও উল্লেখ্য যে পৃথিবীর সব প্রান্তে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের মূল হাতিয়ার ছিল সাহিত্য ও শিল্পচর্চা এবং এর বিস্তারের মাধ্যমেই মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ হয়েছিল।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকেও সেই রক্ষণশীলতাকেই সমর্থন ও সহযোগিতা করতে দেখা যায় এবং রাষ্ট্র নিজেও ক্রমেই রক্ষণশীল হয়ে পড়েছে। নতুন চিন্তার চিন্তকদের এখন কেবল সামাজিক হুমকি নয়, রাষ্ট্রীয় হুমকিরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং উপহার পেতে হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো অযৌক্তিক আইন–কানুন।
একটি রক্ষণশীল সমাজে বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ ঘটানো মোটেই কোনো সহজ কাজ নয়, কেননা প্রতিটি রক্ষণশীল সমাজ ধর্মীয় অনুভূতি দ্বারা পরিচালিত, যা মানুষের মধ্যে সৃষ্টি করে রক্ষণশীল চেতনা। রক্ষণশীল চিন্তা কখনোই নতুন চিন্তাকে স্বাগতম জানায় না, বরং বর্জন করে। রক্ষণশীল সমাজে নতুন চিন্তাকে বিপথগামী চিন্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং ধর্মীয় রীতি–নীতি দ্বারা সৃষ্ট পবিত্র প্রথার বিরুদ্ধে অপশক্তি হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়।
এমন রক্ষণশীল সমাজের চাপেই ১৯৩৮ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের সক্রিয় সাংগঠনিক কার্যকলাপ বন্ধ হয়ে যায়। তবু বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের প্রভাব রয়ে গিয়েছিল এই ভূখণ্ডের জ্ঞানপিপাসু মানুষের মধ্যে। তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে আবু মহামেদ হবিবুল্লাহ, আবু জাফর শামসুদ্দীন, আবদুল হক, বদরুদ্দীন উমর, আহমদ শরীফ, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, হুমায়ুন আজাদ প্রমুখ বুদ্ধিজীবীদের হাতে গড়ে উঠেছিল শক্তিশালী প্রথাবিরোধী সাহিত্যচর্চা। সেই চর্চার প্রভাব এখনো সাহিত্যে ও সমাজে থাকলেও, প্রথাবিরোধীরা তাদের সক্রিয় স্বকীয়তা হারিয়ে ফেলে ২০০৪ সালে হুমায়ুন আজাদের ওপর উগ্র গোষ্ঠিদের হামলার পর থেকে।
সবশেষে একটি প্রশ্ন তৈরি হয়—মুসলিম সাহিত্য সমাজ বা প্রথাবিরোধীরা কি কখনো ধর্মের বা ধর্মীয় চর্চার বিরোধিতা করেছেন? না, তাঁদের লেখায় বা সাক্ষাৎকারে তাঁরা কখনোই কোনো ধর্মীয় রীতি–নীতি বা সংস্কৃতির বিরোধিতা করেননি। তাঁরা মূলত মানুষের ধর্মীয় চিন্তা থেকে রাষ্ট্র ও রাজনীতিকে পৃথক করতে চেয়েছিলেন এবং ধর্মীয় চিন্তার সঙ্গে সামাজিক, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক চিন্তার মিশ্রণে সমাজে ও রাষ্ট্রে যে নিয়ন্ত্রণহীন উগ্রতার জন্ম হয়, তার সমাপ্তি ঘটাতে চেয়েছিলেন।
ধর্ম, সমাজ, রাষ্ট্র ও রাজনীতি যখন বহির্বিশ্বে পৃথক, তখন বাংলাদেশে তা একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অর্থাৎ আধুনিক রাষ্ট্রে যা প্রচলিত, তা বাংলাদেশে নতুন ও প্রথাবিরোধী এবং বাংলাদেশের মানুষের রক্ষণশীলতা নতুন ও আধুনিক চিন্তার বিস্তারের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং নতুন ধারার চিন্তকের জন্য সৃষ্টি করছে সামাজিক হুমকি।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রকেও সেই রক্ষণশীলতাকেই সমর্থন ও সহযোগিতা করতে দেখা যায় এবং রাষ্ট্র নিজেও ক্রমেই রক্ষণশীল হয়ে পড়েছে। নতুন চিন্তার চিন্তকদের এখন কেবল সামাজিক হুমকি নয়, রাষ্ট্রীয় হুমকিরও মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং উপহার পেতে হচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মতো অযৌক্তিক আইন–কানুন।
তাই বাংলাদেশে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতির সংকট নিয়ে লেখা প্রবন্ধ, নিবন্ধ, সাহিত্য, যা মানুষকে তাদের বাস্তবিক পরিস্থিতির ব্যাপারে সচেতন করে, তার চর্চা কমে গেছে। শুধু তা–ই নয়, এমন সাহিত্যের পাঠকও বর্তমানে খুবই কম। এখন বাংলাদেশে রোমান্টিক ও জনপ্রিয় সাহিত্যের পাঠক ক্রমেই বাড়ছে, যা মানুষকে বাস্তবতা থেকে পৃথক করে কাল্পনিক জগতের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বাস্তবতা সম্বন্ধে অন্ধত্বের সৃষ্টি করছে।
বর্তমানে রাষ্ট্রও প্রায় সব রোমান্টিক ও জনপ্রিয় লেখকদের আপন করে নিচ্ছে। কারণ, সব রাষ্ট্রব্যবস্থাই তাদের জনগণকে রাষ্ট্রিক ও সামাজিক বাস্তবতার ক্ষেত্রে অন্ধ করে রাখতে চায়। অন্যদিকে বর্তমান সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে সাহিত্যের চর্চা করা প্রায় সব লেখককেই রাষ্ট্র বর্জন করছে। সব সময়ই সব রাষ্ট্রের পরিচালকেরা চেয়েছেন, সেই রাষ্ট্রের লেখকরা সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও রাজনৈতিক ব্যাপারে নীরব থাকুক।
এই যুগে এসে মানুষকে কল্পনা ও অন্ধত্বের জগৎ থেকে মুক্ত করে সামাজিক, রাষ্ট্রিক, রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া একান্তই প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছে। এটা ছাড়া বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে আধুনিক চিন্তার ধারা কখনোই সূচিত হবে না এবং চিন্তাবিদ ও বুদ্ধিজীবীরাই এই সামাজিক সংকটের সমাপ্তি ঘটাতে পারেন; তবে মেরুদণ্ডহীন বুদ্ধিজীবীরা নয়।
ভিন্ন ও নতুন চিন্তার সাহিত্য যত দিন মানুষ ধারণ করতে না শিখবে, তত দিন বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণের সূচনাও হবে না এ দেশে।