পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৬৯ সালের ২৫ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরদিন, অর্থাৎ ২৬ মার্চ ঘোষণা দেন যে তিনি শিগগিরই সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন। তিনি প্রথমে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ ঘোষণা করেন, পরে তা পিছিয়ে ৭ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেন এবং প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ করেন ১৭ ডিসেম্বর।
পাকিস্তানের সামরিক সরকারের কাছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো পূর্বাভাসে উল্লেখ ছিল যে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে বিজয়ী এক বা একাধিক দলকে সামরিক বাহিনীর আনুকূল্য নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে। অর্থাৎ দেশ পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর প্রাধান্য বহাল থাকবে। তবে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল গোলাম ওমরকে বলেছিলেন যে শেখ মুজিব ন্যূনতমপক্ষে ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচনে বিজয়ী হবেন।
নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দল ছিল আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ছয় দফাভিত্তিক, অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ছিল তাদের ইশতেহারের মূল প্রতিশ্রুতি। ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের সময় থেকে বাঙালি জাতীয়তাবাদের হাওয়া প্রবলভাবে বইছিল, ফলে নির্বাচনের আগেই আওয়ামী লীগ বাঙালির কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য দল হয়ে ওঠে। জাতীয় নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মোট ১৬২টি আসনের মধ্যে ১৬০টি আসনে এবং প্রাদেশিক নির্বাচনের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টি আসনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করে।
নির্বাচনের ফলাফলে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্ব হতভম্ব হয়ে পড়ে। আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয়ে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার কপালের রেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তাঁর এডিসি স্কোয়াড্রন লিডার সামি উল্লেখ করেন যে জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল বেতার ও টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া অফিসে বসেই রাত জেগে ফলাফল অনুসরণ করছিলেন। দিবাগত রাত তিনটার মধ্যে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যান যে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ প্রায় সব আসনে বিজয়ী হতে যাচ্ছে। ভোটের এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলে প্রেসিডেন্ট খুব বিপর্যস্ত ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েন। তিনি জরুরি ভিত্তিতে মেজর জেনারেল ওমরকে ফোন করেন। তিনি তাঁকে প্রশ্ন করেন, এসব কী হচ্ছে? ফলাফল সম্পর্কে মেজর জেনারেল ওমরের মূল্যায়নের কী হলো? কাইয়ুম খান, সবুর খান আর ভাসানীকে অর্থায়নের কী হলো? মেজর জেনারেল ওমর কীভাবে সবকিছু তালগোল পাকালেন?
পাকিস্তানের সামরিক সরকারের কাছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পাঠানো পূর্বাভাসে উল্লেখ ছিল যে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। ফলে বিজয়ী এক বা একাধিক দলকে সামরিক বাহিনীর আনুকূল্য নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে। অর্থাৎ দেশ পরিচালনায় সামরিক বাহিনীর প্রাধান্য বহাল থাকবে।
মেজর জেনারেল ওমর কোনো উত্তর দিচ্ছেন না দেখে প্রেসিডেন্ট তাঁকে বলেন, ‘তুমি কি লাইনে আছ? তোমার গলা কি বন্ধ হয়ে গেছে? কথা বলো! তুমি কি (কথা) বলবে?’ প্রেসিডেন্ট পরদিন সকালে মেজর জেনারেল ওমরকে তাঁর সঙ্গে দেখা করার নির্দেশ দেন। এর মধ্য দিয়ে কথোপকথনের সমাপ্তি হয়।১
মেজর জেনারেল এম আই করিম ছিলেন বাঙালি। তাঁর সূত্র দিয়ে সচিব হাসান জহির বলেছেন, নির্বাচনের ফলাফলে জ্যেষ্ঠ জেনারেলরা হতভম্ব হয়ে পড়েন। একজন কোর কমান্ডার নির্বাচনের ফলাফলকে বিরাট বিপর্যয় বলে আখ্যা দেন।২ পাকিস্তানের আইএসপিআরের প্রধান ব্রিগেডিয়ার এ আর সিদ্দিকী বলেন, সেনাবাহিনী নির্বাচনের ফলাফলে বেশ অখুশি হয়। সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দেওয়া নির্বাচনের পূর্বাভাস নিয়ে তাঁর কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।৩
পাকিস্তানের নিরাপত্তাবিষয়ক বিশ্লেষক লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামাল মতিনউদ্দিন বলেন, নির্বাচনের পর পাকিস্তানিরা সামরিক বাহিনীর প্রতি আওয়ামী লীগের মনোভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। বাঙালিরা ক্ষমতায় গেলে কর্নেল ওসমানীসহ অন্য বাঙালি কর্মকর্তারা তাঁদের প্রতি অবাঙালি অফিসারদের অবিচার ও বৈষম্যের হিসাব নিতে পারেন বলে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। ইন্টার সার্ভিস ইন্টেলিজেন্সের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আকবর নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সরাসরি ঘোষণা করেন, ‘আমরা বেজন্মাদের (বাঙালিদের) দেশ শাসন করতে দিতে পারি না।’ পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক আইন প্রশাসকের বেসামরিক-বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল ফরমান আলী বলেন, অন্তত ১২ জন জেনারেল শেখ মুজিবকে ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা করেন।৪ এ সময় থেকে পাকিস্তানিদের একটা চিন্তাই পেয়ে বসে, তা হলো কীভাবে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বঞ্চিত করে সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখা যায়। বাঙালির সম্ভাব্য উত্থান সম্পর্কে তারা মোটেও নির্বিকার বা চুপচাপ বসে থাকে না। নির্বাচনের পরপরই তারা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং বাঙালিকে ক্ষমতা হস্তান্তর না করার লক্ষ্যে সামরিক পরিকল্পনা গ্রহণ শুরু করে।
নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ১১ থেকে ১৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করেন। তিনি শেখ মুজিবের সঙ্গে পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেন। আলোচনায় বিশেষ কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফল না হলেও প্রেসিডেন্ট ঢাকা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে ফেরার প্রাক্কালে শেখ মুজিবকে ‘পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী’ বলে মন্তব্য করেন। প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্যে সামরিক বাহিনীসহ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। তারা মনে করে, বাঙালি কেউ প্রধানমন্ত্রী হলে সামরিক বাহিনীকে দুর্বল করে ফেলবে বা ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাবে।৫
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঢাকা থেকে ফিরে ১৭ জানুয়ারি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর আমন্ত্রণে সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় ভুট্টোর পৈতৃক নিবাস ‘আল-মুর্তুজা’ যান। সে সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আবদুল হামিদ, প্রেসিডেন্টের পিএসও লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস জি এম এম পীরজাদা, মেজর জেনারেল ওমর, কমোডর (পরে রিয়ার অ্যাডমিরাল) ইউ এ সাইদ প্রমুখ। এ ছাড়া ভুট্টোর রাজনৈতিক দল থেকে গোলাম মোস্তফা খার ও মমতাজ আলী ভুট্টো উপস্থিত ছিলেন। প্রচার করা হয় যে প্রেসিডেন্ট সেখানে পাখি শিকারে গেছেন। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত ৯ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল শওকত রাজা বলেন, ‘এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল প্রেসিডেন্টের বিশ্রাম ও শিকার।’৬
এই মন্তব্যের বিপরীতে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান ও রাজনীতিবিধ এয়ার ভাইস মার্শাল মুহাম্মদ আসগার খান বলেছেন, ‘সফরের একমাত্র উদ্দেশ্য যদি অবকাশ আর চিত্তবিনোদন হতো, তবে হয়তো এর ফলাফল পাকিস্তানের জন্য এত সর্বনাশা হতো না, যা শেষ পরিণতিতে (পাকিস্তানের জন্য) দুর্ভাগ্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখানে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় এবং নীতিগতভাবে (তারা) একমত হয় যে শেখ মুজিব যদি তাঁর মনোভাব পরিবর্তন না করেন, তবে পূর্ব পাকিস্তানে শক্তি প্রয়োগ করা হবে।’৭
রাজনৈতিক নেতা ও জেনারেলদের সেই প্রীতিসম্মিলনে সভাপতিত্ব করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া। সেখানে ভুট্টো ও জেনারেলরা বাঙালির বিরুদ্ধে ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ করেন। এই সভা সম্পর্কে ১৪ ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল খাদিম উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট লারকানায় পৌঁছার পরবর্তী দুই দিনে দেশের ভাগ্যনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।৮ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার এই লারকানা সফর পাকিস্তানের ইতিহাসে ‘লারকানা ষড়যন্ত্র’ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করে এবং পাকিস্তানের ইতিহাস পাল্টে দেয়।
ইয়াহিয়া চাইছিলেন, যেভাবেই হোক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত এই দুই নেতাকে আলাদা করতে। ভুট্টো যদি ইয়াহিয়ার পক্ষে থাকেন, তবে মুজিব পাকিস্তানের নতুন সংবিধান রচনায় হয় পাঞ্জাব তথা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্তমান প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখবেন, নয়তো দেশদ্রোহী হিসেবে বন্দুকের নলের সম্মুখীন হবেন।
লারকানার সভায় কী আলোচনা হয়েছিল, তা কোনো সূত্র থেকেই স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। তবে সে সময়ে পাকিস্তান বিমানবাহিনীতে কর্মরত বাঙালি কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মাহবুব তাঁর বন্ধুর কাছ থেকে এ বিষয়ে কিছুটা জানতে পারেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘থার্টিস্থ ফেব্রুয়ারি সেভেন্টি ওয়ান (আসলে ১৭ জানুয়ারি) ইয়াহিয়া খান তাগিদ দেন ইস্ট পাকিস্তান থেকে ফেরার পর ভুট্টোর বাড়িতে একটা মিটিং হলো, সেখানে শিকার পার্টিতে গেল জেনারেল হামিদ অ্যান্ড অল টপস। ওইখানে আমার বন্ধু গ্রুপ ক্যাপ্টেন মোবারকও অবাঙালি ছিল। মোবারক... শিকার করে এসে পরদিন আমাকে ডেকে ইন কনফিডেন্স ভেরি সিরিয়াসলি বলে, কাউকে বোলো না। উনি বললেন যে দেখো, ইস্ট পাকিস্তান খতম হো গিয়া। পাকিস্তান টুট গিয়া। সে বলল যে তারা টাস্ক ঢিলেঢালা করেছে। দে আর বিল্ডিং আপ দ্য ফোর্স ইন ইস্ট পাকিস্তান। সময় বুঝে দে উইল ক্র্যাক ডাউন।৯
সভায় স্কোয়াড্রন লিডার সামিও উপস্থিত ছিলেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, ‘পৌঁছানোর দিন রাতে ব্যয়বহুল নৈশভোজে ভুট্টো সংবাদপত্রে প্রকাশিত মুজিব ও আওয়ামী লীগের অতিমাত্রায় অনড় অবস্থান সম্পর্কে খোলামেলাভাবে ইয়াহিয়ার সিদ্ধান্ত জানতে চান। ইয়াহিয়ার উত্তর ছিল, “দুইটা”। প্রথমটি হচ্ছে সংসদ আহ্বান করা এবং রাজনীতিবিদেরা তাদের তৈরি বিশৃঙ্খলা তারাই মিটিয়ে নেবে এবং দ্বিতীয় মত হচ্ছে পাকিস্তানকে টুকরো টুকরো করার অভিসন্ধিকে প্রশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে মুজিবের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো।’ স্কোয়াড্রন লিডার সামি সবচেয়ে উল্লেখ করেন যে ইয়াহিয়ার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ থেকে বোঝা যাচ্ছিল, (ভুট্টোর সঙ্গে আলোচনায়) তিনি আশ্বস্ত হয়েছেন যে যদি আওয়ামী লীগ আর শেখ মুজিবের ওপর সামরিক অভিযান চালানো হয়, তবে তিনি ভুট্টোর রাজনৈতিক সমর্থন পাবেন।১০
লারকানা ষড়যন্ত্রের বিষয়ে সেই সময়ে জেনারেল হেডকোয়ার্টারে (জিএইচকিউ) কর্মরত লেফটেন্যান্ট কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) মুহাম্মদ খলিলুর রহমান (বাঙালি) মন্তব্য করেন, ‘লারকানায় শিকারপর্বে, “লারকানা ষড়যন্ত্র” নামে কুখ্যাত এই চক্রান্তে ভুট্টো ইয়াহিয়াকে সফলভাবে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে বাঙালির হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করলে পাকিস্তান থাকবে না। ভুট্টো এ-ও বোঝালেন যে যদিও ভুট্টো নিজে একজন গণতন্ত্রে বিশ্বাসী রাজনীতিক, তবু তাঁর পক্ষে দেশের এত বড় ক্ষতি হতে দেওয়ার চেয়ে সামরিক শাসনই অনেক ভালো ও গ্রহণযোগ্য। অতএব ভুট্টো ইয়াহিয়ার সামরিক শাসনকে সমর্থন দেবেন, মুজিবকে নয়। মুজিব এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছেন। তাতে কী? পশ্চিম পাকিস্তানে তো মুজিব একটি আসনও পাননি। পশ্চিম পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা ভুট্টো। বিশেষ করে, গুরুত্বপূর্ণ দুই প্রদেশেই (ভুট্টো পাঞ্জাবকে অভিহিত করতেন ‘পাকিস্তানের তরবারি-ধরা হাত’)। অতএব পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ তাঁর কথাতেই উঠবে-বসবে এবং সামরিক শাসন মেনে নেবে। বলা বাহুল্য, এই কথাগুলো ইয়াহিয়াকে বোঝানোর প্রয়োজন ছিল না। তিনি নিজেই চাইছিলেন, যেভাবেই হোক সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে নির্বাচিত এই দুই নেতাকে আলাদা করতে। ভুট্টো যদি ইয়াহিয়ার পক্ষে থাকেন, তবে মুজিব পাকিস্তানের নতুন সংবিধান রচনায় হয় পাঞ্জাব তথা পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বর্তমান প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখবেন, নয়তো দেশদ্রোহী হিসেবে বন্দুকের নলের সম্মুখীন হবেন। হ্যাঁ, হতে পারে বাঙালিরা মুজিবের আদেশে আন্দোলনে নামবেন। কিন্তু কঠোরভাবে, রক্তপাতের মাধ্যমে তা দমন করলে বাঙালি এবার কেন, আগামী দু-তিন প্রজন্ম পর্যন্ত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।’১১
ব্রিগেডিয়ার এ আর সিদ্দিকী বলেন, ‘এভাবেই লারকানা পাকিস্তানের রাজনীতিতে সন্ধিক্ষণ হয়ে দাঁড়াল। এখানে সামরিক আইন প্রশাসন রাজনীতিতে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ল। আর তাদের পছন্দের দলের বিষয়ে কোনো সন্দেহ থাকল না। ভুট্টো তাঁর মেহমানদের ইচ্ছাপূরণ আর বিনোদনে কোনো ঘাটতি রাখলেন না।’১২ পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা জি ডব্লিউ চৌধুরী উল্লেখ করেন, ‘লারকানায় ইয়াহিয়া এবং সামরিক জান্তার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সদস্য জেনারেল হামিদ—মুজিবের প্রতি যার ঘৃণা ছিল সর্বজনবিদিত এবং জেনারেল পীরজাদা—সামরিক জান্তার মাঝে ভুট্টোর ঘনিষ্ঠতম বন্ধু, ভুট্টোর আতিথেয়তা উপভোগ করেন এবং এক বর্ণাঢ্য সামাজিক সন্ধ্যায় এক নব এবং সবচেয়ে অশুভ মৈত্রী জন্ম নেয় ভুট্টো ও সামরিক জান্তার মাঝে, যদিও ইয়াহিয়া কোনো সময়েই ভুট্টোকে বিশ্বাস করতেন না।’১৩
পাকিস্তানি জেনারেলরা লারকানা থেকে ফিরে ২০ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের মধ্যে ঘরোয়া আলোচনায় বসেন। তাঁরা নির্বাচনের ফলাফল অগ্রহণযোগ্য বলে মতপ্রকাশ করেন। এই সভার সূত্র ধরে জিএইচকিউ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের পাঁচটি স্টেশন সদর দপ্তরের অধিনায়ককে একটি অতি গোপনীয় বা টপ সিক্রেট চিঠি পাঠানো হয়। চিঠির উপসংহারে উল্লেখ ছিল, যেকোনো মূল্যে শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর ঠেকানো হবে। পাঁচজন স্টেশন অধিনায়কের মধ্যে চট্টগ্রামের স্টেশন অধিনায়ক ছিলেন ব্রিগেডিয়ার মাহমুদুর রহমান মজুমদার। বাঙালি হিসেবে এই অতি গোপনীয় চিঠি তাঁর কাছে পৌঁছার কথা নয়। সম্ভবত বিষয়টি জিএইচকিউর কাছে অজানা থাকায় চিঠিটি তাঁকে পাঠানো হয়। এই চিঠির বিষয়ে ব্রিগেডিয়ার মজুমদার বলেন, ‘অফিসে গিয়ে একখানি টপ সিক্রেট চিঠি পাই। জিএইচকিউ থেকে লেখা দীর্ঘ দুই পৃষ্ঠার চিঠি, মর্মাহত হলাম। চিঠিটি আবার পড়লাম। চিঠির মধ্যে আওয়ামী লীগের ছয় দফার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রোপোরশনেটলি রিপ্রেজেন্টেশন করার পরিণতিতে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক স্থাপনার বিলুপ্তি বা পূর্ব পাকিস্তানে স্থানান্তর এবং হাজার হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক কর্মচারীর বাধ্যতামূলক অবসরের ফলে বিশ্বের একটি প্রথম শ্রেণির আর্মি বাঙালিপ্রধান তৃতীয় শ্রেণির আর্মিতে পরিণত হবে। এসব তুলে ধরে উপসংহারে লেখা হয়েছে, এমতাবস্থায় শেখ মুজিবকে কিছুতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া যায় না।’১৪
লারকানায় গৃহীত সিদ্ধান্ত হালনাগাদ করা ও পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করার জন্য প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণের উদ্দেশ্যে জিএইচকিউতে তৎপরতা বেড়ে যায়। সাংবাদিক ও লেখক বি জেদ খসরু উল্লেখ করেন, ১১ ফেব্রুয়ারি জিএইচকিউতে জেনারেল হামিদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান, চতুর্থ কোরের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান, মেজর জেনারেল ওমর এবং মেজর জেনারেল আকবরের উপস্থিতিতে পূর্ব পাকিস্তানে শক্তি প্রয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সভায় পাকিস্তান গোয়েন্দা বিভাগের উপপ্রধান এস এ সাদও উপস্থিত ছিলেন। তিনি বিষয়টি তাঁর অধীন এক পদস্থ বাঙালি সহকারীকে অবহিত করেন। সেই বাঙালি অফিসার বিষয়টি শেখ মুজিবকে অবহিত করেন।১৫
জি ডব্লিউ চৌধুরী সুনির্দিষ্ট তারিখ উল্লেখ না করে এই সভা সম্পর্কে বলেন যে ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি জেনারেলরা জিএইচকিউতে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে আলোচনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে একত্র হন। এ সভাতেই তাঁরা সিদ্ধান্ত নেন যে শেখ মুজিব যদি তাঁর অবস্থান অপরিবর্তিত রাখেন, তবে তাঁরা তাঁর বিরোধিতা করবেন বা তাঁকে প্রতিহত করবেন। মজার বিষয়, সভায় তাঁরা ভুট্টোর বিষয়ে আলোচনা এড়িয়ে যান।১৬ এয়ার ভাইস মার্শাল আসগারও বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে মধ্য ফেব্রুয়ারিতে রাওয়ালপিন্ডিতে আরও প্রতিনিধিত্বমূলক এক সভায় এটিকে (লারকানায় নেওয়া পূর্ব পাকিস্তানের ওপর সামরিক অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত) আরও উন্নত করা হয়।১৭
হাজার হাজার পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক কর্মচারীর বাধ্যতামূলক অবসরের ফলে বিশ্বের একটি প্রথম শ্রেণির আর্মি বাঙালিপ্রধান তৃতীয় শ্রেণির আর্মিতে পরিণত হবে। এসব তুলে ধরে উপসংহারে লেখা হয়েছে, এমতাবস্থায় শেখ মুজিবকে কিছুতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে দেওয়া যায় না।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল খলিল জিএইচকিউতে চাকরি করার সুবাদে এই সভা সম্পর্কে জানতে পারেন। তিনি বিষয়টি চাকরিরত সর্বজ্যেষ্ঠ বাঙালি অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল খাজা ওয়াসিউদ্দীনকে অবহিত করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল ওয়াসিউদ্দীন সঙ্গে সঙ্গে বিষয়টি শেখ মুজিবকে অবহিত করেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল খলিল উল্লেখ করেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি জেনারেল ওয়াসি তাঁর ব্যক্তিগত সহকারীকে নিজের উদ্যোগে পাঠিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর কাছে খবর দিয়ে যে ১০ ফেব্রুয়ারি (১১ ফেব্রুয়ারি হবে) কনফারেন্সে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, দেশের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতা শেখ মুজিবের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে না। বরং পূর্ব পাকিস্তানে সশস্ত্র হামলা দ্বারা উদ্ভূত সমস্যার সমাধান করা হবে। “মার্শাল ল” অব্যাহত থাকবে। শিগগিরই পাকিস্তান থেকে অতিরিক্ত সৈন্য ও সামরিক সরঞ্জাম পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো শুরু হবে। সামরিক জান্তার প্রত্যাশা ছিল সামরিক শক্তি বৃদ্ধি মার্চ মাসের মাঝামাঝি শেষ হবে এবং তখনই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ওপর সামরিক আঘাত হানা হবে।১৮ ধারণা করা যায় শেখ মুজিব বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া পূর্ব পাকিস্তানে সেনাসমাবেশের সংবাদে চিন্তিত হয়ে পড়েন। পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত এসো (ইএসএসও) কোম্পানির জেনারেল ম্যানেজার আলমগীর রহমান শেখ মুজিব ও যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাডের মধ্যে যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতেন। আর্চার ব্লাড উল্লেখ করেন যে ১৯ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিব আলমগীরের কাছে সেনাবাহিনীতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন।১৯
পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক আইন প্রশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল সাহেবজাদা মুহাম্মদ ইয়াকুব খানও পূর্ব পাকিস্তানের সমস্যা সামরিকভাবে সমাধানের সংবাদ পান। ১৯ ফেব্রুয়ারি তিনি পূর্ব পাকিস্তানে আইএসপিআরের প্রধান মেজর (পরে ব্রিগেডিয়ার) সিদ্দিক সালিককে বলেন, রাজনৈতিক অচলাবস্থা একই রকম চলতে থাকলে কর্তৃপক্ষ সামরিক সমাধানের পথে যাবে। তাতে সর্বনাশা পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে।২০ ১৯ ফেব্রুয়ারি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা করেন। মেজর জেনারেল ফরমান বলেন, ‘আমরা বসার সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট বলে উঠলেন, আমি ওই বাস্টার্ডকে (শেখ মুজিব) শায়েস্তা করতে যাচ্ছি।’২১
১৭ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া বেসামরিক মন্ত্রিসভা ভেঙে দেন এবং ২২ ফেব্রুয়ারি দেশের পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও পরবর্তী কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য সব গভর্নর ও প্রাদেশিক সামরিক আইন প্রশাসক নিয়ে প্রেসিডেন্ট হাউসে সভা করেন। জ্যেষ্ঠ সামরিক অফিসার এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধানেরাও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল, মেজর জেনারেল আকবর, মেজর জেনারেল ওমর, নাসির রিজভী (পরিচালক, ইন্টেলিজেন্স ব্যুরো), আগা (মহাপরিদর্শক, পুলিশ)।২২ সেখানে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে অ্যাডমিরাল এস এম আহসান উপস্থিত ছিলেন। সভায় আলোচনার ধরন দেখে তিনি বুঝতে পারেন যে সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সংকট সমাধানের আবহ সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর ধারণা হয়, লারকানা বৈঠকের পর থেকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার চিন্তায় পরিবর্তন এসেছে। ভুট্টো ও যুদ্ধবাজ জেনারেলদের চাপ এবং শেখ মুজিবের প্রবল গণ-আন্দোলন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে আবারও সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে আইনশৃঙ্খল নিয়ন্ত্রণের ভাবনা পেয়ে বসেছে।২৩ লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামাল এই সভা সম্পর্কে বলেন, ‘সভা চিরাচরিতভাবে মদিরা দিয়ে শুরু হয়, তারপর আলোচনা শুরু হয়, যা উপমহাদেশের মানচিত্র আরেক দফা বদলে দেয়। সেই সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টের বৈঠকখানায় পাকিস্তানের ভেতর থেকে নতুন একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি খোদাই হয়ে যায়।’২৪
সভা চলাকালে মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী রাওয়ালপিন্ডিতে ছিলেন। তিনি সভার পর গভর্নর আহসান ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুবের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি বলেন, ‘এমএলএদের (সামরিক আইন প্রশাসক) সভার পরদিন, ২৩ ফেব্রুয়ারি খুব সকালে আহসান ও ইয়াকুব আমাকে ডেকে পাঠালেন। দুজনকেই সম্ভবত সারা রাত জাগিয়ে রাখা হয়েছিল। তাঁরা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। সভার সংক্ষিপ্ত বিবরণীসহ আমাকে জানানো হলো যে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমার আশু প্রতিক্রিয়া ছিল, “তার অর্থ মিলিটারি অ্যাকশন”। আমি যা অনুমান করেছিলাম, ইয়াকুব তার সঙ্গেই একমত হলেন।২৫
পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ১ মার্চের মধ্যে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিমানযোগে ২২ বালুচ ও ১৩ এফএফ ব্যাটালিয়ন ঢাকায় আনা হয়।২৬ ব্যাটালিয়ন দুটিকে পিলখানায় জায়গা দেওয়া হয়। পরিকল্পনা থাকলেও লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুবের বিরোধিতার কারণে ওই সময় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আরও ব্যাটালিয়ন আনা সম্ভব হয়নি।২৭
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনার বিষয়ে আর্চার ব্লাডও অবহিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আমি নিজেও লক্ষ্য করেছি যে শতাধিক তরুণ পিআইএর বিমান থেকে নেমে আসছে। তাদের পরণে ছিল একই ধরনের হাফহাতা সাদা শার্ট আর খাকি রঙের প্যান্ট। বিমান থেকে নেমে তারা সারিবদ্ধ হয়ে স্মার্টলি মার্চ করে চলে যাচ্ছে। মার্চ মাস যত এগিয়ে আসছিল, ফ্লাইটের সংখ্যা লক্ষণীয়ভাবে ততই বাড়াতে থাকে।’২৮ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনার বিষয়ে ২ মার্চ শেখ মুজিব মন্তব্য করেন, ‘ইহা মর্মান্তিক যে, পশ্চিম পাকিস্তান হইতে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বহনের জন্য যে বিমানগুলি ব্যবহৃত হইতে পারিত, তাহা এখন সামরিক অফিসার ও সেনাবাহিনীর লোকদের ও অস্ত্রশস্ত্র বহন কাজে ব্যাপৃত রহিয়াছে।’২৯
২৭ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘এমভি সোয়াত’ প্রায় নয় হাজার টন ভারী অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে করাচি থেকে রওনা হয়ে ৩ মার্চ চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছায়।
পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সৈন্য আনার বিষয়ে আর্চার ব্লাডও অবহিত ছিলেন। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় আমি নিজেও লক্ষ্য করেছি যে শতাধিক তরুণ পিআইএর বিমান থেকে নেমে আসছে। তাদের পরণে ছিল একই ধরনের হাফহাতা সাদা শার্ট আর খাকি রঙের প্যান্ট।
১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে পূর্ব পাকিস্তানে তিনটি ব্রিগেডসহ একটি ডিভিশনের আওতায় প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ সৈনিক ছিল। ডিভিশনে ছিল মাত্র ৬টি ট্যাঙ্ক ও একটি কমান্ডো ব্যাটালিয়ন। বিমানবাহিনীতে ছিল একটিমাত্র ফাইটার স্কোয়াড্রন এবং নৌবাহিনীতে ছিল দু-তিনটি প্যাট্রোল বোট ও এক বা দুটি সাপোর্ট শিপ। ১৯৭০ সালের শুরুতে পূর্ব পাকিস্তানে নতুন একটি ব্রিগেড গ্রুপ আনা হয়। শক্তি ও জনবল বৃদ্ধির ফলে একটি কোর সদর দপ্তর এবং সমরসত্তার ব্যবস্থাপনার জন্য একটি লজিস্টিক এরিয়া সদর দপ্তর গঠন করা হয়। এরপর ট্যাঙ্কের সংখ্যা বাড়িয়ে একটি সাঁজোয়া ব্যাটালিয়ন গঠন করা হয়। এ ছাড়া ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে আরও দুটি অবাঙালি পদাতিক ইউনিট ও দুটি গোলন্দাজ ইউনিট ঢাকায় আনা হয়। এসবের সমন্বয়ে ১ মার্চে সৈন্যসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৫ হাজার। এর মধ্যে বাঙালি পদাতিক ব্যাটালিয়ন ছিল পাঁচটি। সবকিছু হিসাবে নিলে পূর্ব পাকিস্তানের শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ সৈনিক ছিল বাঙালি। এর অতিরিক্ত ইপিআর ও পুলিশে বাঙালি সৈনিকের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১৬ হাজার ও ৪৫ হাজার।৩০ ২ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সি ১৩০ এবং পিআইএর বেসামরিক বিমানযোগে এসে পৌঁছায় আরও প্রায় ১২ হাজার পাকিস্তানি সৈনিক।
জাতীয় নির্বাচনের আগে সামরিক কর্তৃপক্ষ পূর্ব পাকিস্তানে নির্বাচনের ফল আশানুরূপ না হলে বা রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামরিক শাসনের অনুকূলে না থাকলে সীমিত আকারে বলপ্রয়োগের পরিকল্পনা করেছিল। নির্বাচনের আগে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব জিএইচকিউতে ডাইরেক্টর মিলিটারি অপারেশন (ডিএমও) ব্রিগেডিয়ার এম এ মজিদের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনাটির নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন ব্লিৎস’। পরিকল্পনাটি জিএইচকিউ থেকে অনুমোদন করা হয়। পরিকল্পনায় ন্যূনতম বলপ্রয়োগের কথা উল্লেখ ছিল। অভিযানের মূল বিষয়বস্তু ছিল: পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বা জনগণ সামরিক শাসন অমান্য করা শুরু করলে ১৪৪ ধারা জারি করা হবে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্থগিত করা হবে, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের আটক করা হবে এবং সংবাদপত্রের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হবে। ১৯৭০ সালের ১১ ডিসেম্বর লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব এই অভিযানের ছয় কপি নির্দেশিকা তৈরি করেন। তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, মেজর জেনারেল খাদিম, মেজর জেনারেল ফরমান, পূর্বাঞ্চল কমান্ডের চিফ অব স্টাফ ব্রিগেডিয়ার আলী এল এড্রুস এবং ব্রিগেডিয়ার মজিদকে একটি করে কপি বিতরণ করেন। অবশিষ্ট কপিটি তিনি নিজের কাছে রেখে দেন।৩১
এ পরিকল্পনা গ্রহণের পরবর্তী তিন মাসে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়লাভ, ক্ষমতা হস্তান্তরে গড়িমসি, অসহযোগ আন্দোলন ইত্যাদি কারণে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা শক্তি দিয়ে সমাধানের বাইরে চলে যায়। তারপরও ২২ ফেব্রুয়ারি প্রেসিডেন্ট হাউসের সভার পর জিএইচকিউ অপারেশন ব্লিৎস কার্যকর করার প্রস্তুতি শুরু করে। মেজর জেনারেল খাদিম নিজ নিজ এলাকায় আদেশ কার্যকর করার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য তাঁর ব্রিগেড কমান্ডারের আদেশনামাটি পাঠিয়ে দেন।৩২ ২৬ ফেব্রুয়ারির আগে অপারেশন ব্লিৎস শুরু করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসন জিএইচকিউর অনুমতি প্রার্থনা করে বেতারবার্তা পাঠায়। সেদিনই জিএইচকিউ শর্ত সাপেক্ষে অভিযান পরিচালনার অনুমোদন দেয়।৩৩ ২৭ ফেব্রুয়ারি অপারেশন ব্লিৎস স্বল্প সময়ে কার্যকর করার প্রস্তুতি হিসেবে খুলনা, ফরিদপুর, বরিশাল, বগুড়া, পাবনা, ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইলে সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়।৩৪
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রশ্নে সামরিক শাসকদের সঙ্গে মতের অমিল হওয়ায় ১ মার্চ অ্যাডমিরাল আহসান গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং ৪-৫ মার্চ রাতে ঢাকা ত্যাগ করেন। পরবর্তী জ্যেষ্ঠ অফিসার হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব গভর্নরের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি দায়িত্ব নেওয়ার দিনেই, অর্থাৎ ৫ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি বদলে যাওয়ার কারণে তাঁর রচিত ‘অপারেশন ব্লিৎস’ বাতিল করে প্রেসিডেন্টকে তারবার্তা পাঠান। তিনি প্রেসিডেন্টকে জানান যে পূর্ব পাকিস্তানের বর্তমান সমস্যা সমাধান করতে হবে সামরিকভাবে নয়, রাজনৈতিকভাবে। উপরন্তু অপারেশন ব্লিৎস কার্যকর করতে হলে আরও সৈনিক ও সময়ের প্রয়োজন হবে। এতে প্রচুর বেসামরিক ব্যক্তির প্রাণহানি হবে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুবের বার্তায় প্রেসিডেন্ট এতটাই ক্ষুব্ধ হন যে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুবকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেন। ৭ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ঢাকা পৌঁছালে ৮ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনারেল ইয়াকুব ঢাকা ত্যাগ করেন। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে শুরুর আগেই অপারেশন ব্লিৎসের অপমৃত্যু ঘটে।
মার্চ মাসে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলনে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের কারণে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শাসকদের ক্ষমতা বা কর্তৃত্ব ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে তা সেনানিবাসের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়ে। সামরিক শাসকেরা মার্চের শুরু থেকে আন্দোলন দমনের নামে এলোমেলোভাবে জনগণের ওপর গুলি চালায় এবং হত্যা শুরু করে, এর বিরুদ্ধে জনসাধারণের প্রতিবাদ আরও বাড়তে থাকে। এ সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের দু-একটি সরকারি ভবন ছাড়া সব সরকারি ও বেসরকারি ভবনে পাকিস্তানি পতাকার বদলে উড়তে থাকে শোকের প্রতীক কালো পতাকা অথবা লাল, সবুজ আর সোনালি রঙের তৈরি বাংলাদেশের নতুন পতাকা। সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে সব রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হতে শুরু করলে একটি পথই খোলা থাকে, তা হলো সংঘাত। পাকিস্তানের সামরিক শাসকেরা এটাই চাইছিলেন।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা ঢাকা পৌঁছে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে সিদ্ধান্ত নেন যে রাজনৈতিক আলোচনার চেয়ে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছা সহজ হবে। তিনি মনে করেন, আগের দুই গভর্নর/সামরিক আইন প্রশাসক পরিস্থিতি শক্ত হাতে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হওয়ায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে; তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি শক্ত সামরিক পরিকল্পনার প্রয়োজন। এ বিবেচনায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা ১৫ মার্চ মেজর জেনারেল খাদিমকে সামরিক অভিযানের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেন। এই নির্দেশের মধ্য দিয়ে বাঙালির বিরুদ্ধে ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও ধ্বংসাত্মক সামরিক অভিযান ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর পরিকল্পনা শুরু হয়। পাকিস্তানি সামরিক শাসকেরা এই অভিযানের মাধ্যমে বাঙালির ন্যায়সঙ্গত আন্দোলন নস্যাৎ করা এবং সামরিক কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেয়।
বাঙালি জাতির স্বাধিকারস্পৃহা দমনের উদ্দেশ্যে ১৭ জানুয়ারি লারকানায় যে ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করেছিল, ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বাঙালির ওপর প্রবল ও ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালানোর মধ্য দিয়ে তা কার্যকর করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ষড়যন্ত্র যত ভয়ংকরই হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে তা ব্যর্থ হয়।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে ১৫ মার্চ ঢাকা আসেন। কিন্তু তিনি ঢাকা পৌঁছেই আলোচনায় বসেন শেখ মুজিবের সঙ্গে নয়, পাকিস্তানি সামরিক জেনারেলদের সঙ্গে। সেদিনই সন্ধ্যায় রমনার প্রেসিডেন্ট হাউসে (বর্তমানে সুগন্ধা) তিনি যাঁদের নিয়ে আলোচনায় বসেন, তাঁদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল হামিদ, লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা, লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা, মেজর জেনারেল আকবর, সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল মেজর জেনারেল এ ও মিঠঠা, মেজর জেনারেল খাদিম, মেজর জেনারেল রাও ফরমান, পূর্বাঞ্চলীয় বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার কমোডর মুহাম্মদ জাফর মাসুদ প্রমুখ। সভায় প্রেসিডেন্ট পরিস্থিতি সম্পর্কে সবার মতামত আহ্বান করলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পীরজাদা ও মেজর জেনারেল আকবর সামরিক সমাধানের পক্ষে মত দেন। লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা সরাসরি কিছু না বলে মন্তব্য করেন যে আগে পরিস্থিতির গুরুত্ব সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। মেজর জেনারেল খাদিম ও এয়ার কমোডর মাসুদ সামরিক অভিযানের বিস্তারিত পরিকল্পনা করেন। মেজর জেনারেল ফরমান অপারেশনের পরিধি, সাফল্যের শর্ত ইত্যাদি আর মেজর জেনারেল খাদিম বিভিন্ন ব্রিগেড ও ইউনিটের দায়িত্ব ও করণীয় নির্ধারণ করেন। পাঁচ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনায় মোট ১৬টি অনুচ্ছেদ ছিল। অভিযানের নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন সার্চলাইট’। অভিযানের মৌলিক বিষয়গুলি ছিল:
ক. সব গুরুত্বপূর্ণ শহরে একই সময়ে আক্রমণ পরিচালনা করা হবে। যেকোনো দিন রাত একটায় আক্রমণ পরিচালনা করা হবে। যেহেতু পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থিত সৈনিকদের প্রায় ৬০ শতাংশ বাঙালি, তাই অপারেশনের বিষয়টি যত দূর সম্ভব শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখা হবে।
খ. পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে বহির্বিশ্বের সব ধরনের যোগাযোগ (আকাশপথ, নৌপথসহ) বিচ্ছিন্ন করা হবে।
গ. বেতারব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করা হবে এবং সব অনুষ্ঠান সামরিক আইন কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করবে।
ঘ. আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের গ্রেপ্তার করা হবে। তাঁদের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার নামে বৈঠকে এনে সেখান থেকে গ্রেপ্তার করা হবে। [পরিকল্পনার ক্রোড়পত্রে শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, কর্নেল এম এ জি ওসমানী, সিরাজুল আলম খান, মান্নান, আতাউর রহমান খান, প্রফেসর মোজাফফর আহমদ, অলি আহাদ, মতিয়া চৌধুরী, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, শেখ ফজলুল হক মনি, তোফায়েল আহমেদ, নূরে আলম সিদ্দিকী, আ স ম আবদুর রব, আবদুল কুদ্দুস মাখন এই ১৬ জন নেতার নাম উল্লেখ করা হয়, যাঁদের গ্রেপ্তার করতে হবে।]
ঙ. দুষ্কৃতকারী ও অস্ত্রের সন্ধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসগুলোয় তল্লাশি চালানো হবে।
চ. পূর্ব পাকিস্তানে সব বেসামরিক প্রশাসন অচল ও অস্তিত্বশূন্য হয়ে পড়ায় সামরিক অপারেশনগুলো পরিচালনায় বেসামরিক প্রশাসনের সহযোগিতা নেওয়া হবে না, বরং বিদ্যমান পরিস্থিতিকে গৃহযুদ্ধ বিবেচনা করে সামরিক অপারেশনগুলো পরিচালনা করা হবে সরাসরি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে।
ছ. বিভিন্ন সেনানিবাসে অবস্থিত বাঙালি সৈনিকদের নিরস্ত্র করা হবে।৩৬
১৯ মার্চ লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা অপারেশন সার্চলাইট অনুমোদন করেন। ২০ মার্চ বিকেলে জেনারেল হামিদ মেজর জেনারেল খাদিমের বাসায় বসে অপারেশন সার্চলাইটের পরিকল্পনা অনুমোদন করেন। তিনি বাঙালি সামরিক ইউনিটগুলোকে নিরস্ত্র করতে নিষেধ করেন, তবে ইপিআর, পুলিশ, মুজাহিদ ইত্যাদি বাহিনীকে নিরস্ত্র করার অনুমোদন দেন। এরপর পরিকল্পনাটি প্রেসিডেন্টকে জানানো হলে তিনি রাজনীতিবিদদের তাঁর সঙ্গে বৈঠকরত অবস্থায় গ্রেপ্তার করা ছাড়া বাকি সব বিষয়ে অনুমোদন দেন। সংশোধিত পরিকল্পনা প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধানের অনুমোদনের পর অপারেশন সার্চলাইটের অপারেশনাল অর্ডার তৈরি হয়। এ সময় এই অভিযান কার্যকর করার চূড়ান্ত তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি।
২৩ মার্চ বিকেলে ঢাকা সেনানিবাসের অফিসার্স মেসে জেনারেল হামিদকে অপারেশন সার্চলাইটের সংশোধিত ও চূড়ান্ত অপারেশনাল অর্ডার দেখানো হয়, তিনি তা অনুমোদন করেন। ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া নিশ্চিত হন যে পরিস্থিতি রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না। তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা ও মেজর জেনারেল ফরমানকে ডেকে অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করার চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
পাকিস্তানের সিনিয়ার অফিসাররা সবাই বাঙালির বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনার বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত ছিলেন, কিন্তু সঠিক তারিখ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা ছিল না। ২৪ মার্চ বিষয়টি তাঁদের কাছে পরিষ্কার করা হয়। ১৪ ডিভিশনের সিনিয়ার স্টাফ অফিসার কর্নেল (পরে ব্রিগেডিয়ার) সাদুল্লাহ খান বলেন, ‘২৪ মার্চ জিওসি জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা আমাকে পুরোপুরি আস্থায় নিলেন। এত দিন পর্যন্ত বিষয়টি শুধুই অনুমান আর ধারণার মধ্যে ছিল। (জেনারেল টিক্কা বলেন,) “আমরা ২৫-২৬ মার্চ রাতে আঘাত হানব।”’৩৭
২৪ মার্চ সকালে মেজর জেনারেল ফরমান যশোর সেনানিবাসে, মেজর জেনারেল খাদিম কুমিল্লা ও চট্টগ্রাম সেনানিবাসে এবং কর্নেল সাদুল্লাহ রংপুর, রাজশাহী ও সিলেট সেনানিবাসে হেলিকপ্টারযোগে গমন করেন এবং উপস্থিত অবাঙালি কমান্ডারদের কাছে এই অপারেশন অর্ডার মৌখিকভাবে পৌঁছে দেন, আদেশের কোনো লিখিত কপি কাউকে দেওয়া হয়নি। সব স্তরের কমান্ডারদের জানিয়ে দেওয়া হয় যে অভিযান শুরু হবে রাত একটায়।
রাতে অপারেশন সার্চলাইট কার্যকর হবে বিবেচনায় ২৫ মার্চ সারা দিন ধরে ঢাকা সেনানিবাসে অভিযান বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চলে। সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়া হয়; প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও যানবাহন বরাদ্দ করা হয়। সন্ধ্যা সাতটায় প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া গোপনে ঢাকা ত্যাগ করেন। রাত ১০টায় তাঁর বিমান পাকিস্তানের সীমানায় পৌঁছে গেলে অভিযান শুরুর সময় এগিয়ে রাত ১২টায় পুনর্নির্ধারণ করা হয়। রাত ১১টা থেকে ট্যাঙ্ক ও সামরিক যানবাহন সেনানিবাস থেকে বেরিয়ে সামরিক অভিযানের লক্ষ্যস্থলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।
পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালি জাতির স্বাধিকারস্পৃহা দমনের উদ্দেশ্যে ১৭ জানুয়ারি লারকানায় যে ষড়যন্ত্রের বীজ বপন করেছিল, ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে বাঙালির ওপর প্রবল ও ধ্বংসাত্মক আক্রমণ চালানোর মধ্য দিয়ে তা কার্যকর করার চেষ্টা করে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ষড়যন্ত্র যত ভয়ংকরই হোক না কেন, চূড়ান্ত বিচারে তা ব্যর্থ হয়। লারকানা ষড়যন্ত্রও এর ব্যতিক্রম নয়। এই ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাঙালিকে পরাধীন রাখা তো দূরের কথা, বছর না ঘুরতেই খোদ পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভেঙে দুই টুকরো হয়ে যায়, জন্ম লাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
১. থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড অ্যান এইড; আরসাদ সামি খান; পেন্টাগন প্রেস, ভারত, ২০০৮; পৃ. ১৩০ ও ১৩১
২. দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান; হাসান জহির; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ১৯৯৪; পৃ. ১৩০
৩. ইস্ট পাকিস্তান দ্য এন্ড গেম; এ আর সিদ্দিকি, ব্রিগেডিয়ার; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০০৪; পৃ. ৫০
৪. ট্র্যাজেডি অব এররস; কামাল মতিন উদ্দিন, লে. জেনারেল, পৃ. ১৪৬
৫. ইস্ট পাকিস্তান : দ্য এন্ড গেম; এ আর সিদ্দিকি, ব্রিগেডিয়ার; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০০৪; পৃ. ৫৬
৬. দ্য পাকিস্তান আর্মি: ১৯৬৬-৭১; শওকত রাজা, মেজর জেনারেল; সার্ভিসেস বুক ক্লাব, পাকিস্তান, ১৯৯০; পৃ. ৪৭
৭. জেনারেল ইন পলিটিকস; মুহাম্মদ আসগর খান, এয়ার ভাইস মার্শাল; ইউপিএল, বাংলাদেশ, ১৯৮৩; পৃ. ২৮
৮. আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি; খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০১২; পৃ. ১৪
৯. সাক্ষাৎকার : মাহবুবুর রহমান, এয়ার কমোডর; সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : এ এফ সালাউদ্দীন আহমদ; জাতীয় জাদুঘর, বাংলাদেশ, ৩০ মে ১৯৮৬; পৃ. ২০
১০. থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড অ্যান এইড; আরসাদ সামি খান; পেন্টাগন প্রেস, ভারত, ২০০৮; পৃ. ১৪৮-১৫২)
১১. পূর্বাপর ১৯৭১ : পাকিস্তান সেনাগহ্বর থেকে দেখা; মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, মেজর জেনারেল; সাহিত্য প্রকাশ, বাংলাদেশ, ২০০৫; পৃ. ২২
১২. ইস্ট পাকিস্তান : দ্য এন্ড গেম; এ আর সিদ্দিকি, ব্রিগেডিয়ার; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০০৪; পৃ. ৫৫)
১৩. দ্য লাস্ট ডেজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান; জি ডব্লিউ চৌধুরী; জি ইস্ট ৪ কোম্পানি, লন্ডন, ১৯৭৪; পৃ. ১৪৭
১৪. সাক্ষাৎকার : ব্রিগেডিয়ার এম আর মজুমদার; সাক্ষাৎকারগ্রহীতা : মুহাম্মদ লুৎফুল হক; ২০১১ সাল
১৫. মিথস অ্যান্ড ফ্যাক্টস : বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার; বি জেদ খসরু; রূপা অ্যান্ড কো. ভারত, ২০১০
১৬. দ্য লাস্ট ডেজ অব ইউনাইটেড পাকিস্তান; জি ডব্লিউ চৌধুরী; জি ইস্ট ৪ কোম্পানি, লন্ডন, ১৯৭৪; পৃ. ১৫৪
১৭. জেনারেল ইন পলিটিকস; মুহাম্মদ আসগর খান, এয়ার ভাইস মার্শাল; ইউপিএল, বাংলাদেশ, ১৯৮৩; পৃ. ২৮
১৮. পূর্বাপর ১৯৭১: পাকিস্তান সেনাগহ্বর থেকে দেখা; মুহাম্মদ খলিলুর রহমান, মেজর জেনারেল; সাহিত্য প্রকাশ, বাংলাদেশ, ২০০৫; পৃ. ২৫
১৯. দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ; আর্চার কে ব্লাড, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, বাংলাদেশ, ২০০৬; পৃ. ১৪৯
২০. উইটনেস টু সারেন্ডার; সিদ্দিক সালিক, মেজর; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ১৯৭৮; পৃ. ৩৯
২১. হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড; রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল; ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, পাকিস্তান, ২০০৭; পৃ. ৫৫
২২. ট্র্যাজেডি অব এররস; কামাল মতিন উদ্দিন, লে. জেনারেল, পৃ. ১৬১
২৩. দ্য সেপারেশন অব ইস্ট পাকিস্তান; হাসান জহির; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ১৯৯৪; পৃ. ১৪৩
২৪. ট্র্যাজেডি অব এররস; কামাল মতিন উদ্দিন, লে. জেনারেল, পৃ. ১৬১
২৫. হাউ পাকিস্তান গট ডিভাইডেড; রাও ফরমান আলী, মেজর জেনারেল; ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, পাকিস্তান, ২০০৭; পৃ. ৫৯
২৬. উইটনেস টু সারেন্ডার; সিদ্দিক সালিক, মেজর; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ১৯৭৮; পৃ. ৪০
২৭. দ্য ওয়ে ইট ওয়াজ; জেড এ খান, ব্রিগেডিয়ার; দিনাভিস লিমিটেড, পাকিস্তান, ১৯৯৮; পৃ. ২৫৯
২৮. দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ; আর্চার কে ব্লাড, দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, বাংলাদেশ, ২০০৬; পৃ. ১৭৯
২৯. দৈনিক আজাদ, ৩ মার্চ ১৯৭১
৩০. ট্র্যাজেডি অব এররস; কামাল মতিন উদ্দিন, লে. জেনারেল, পৃ. ২১২ ও ২১৩
৩১. ক্রস সোর্ড; সূজা নাওয়াজ; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০০৮; পৃ. ২৬৫
৩২. আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি; খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০১২; পৃ. ৪২
৩৩. ট্র্যাজেডি অব এররস; কামাল মতিন উদ্দিন, লে. জেনারেল, পৃ. ১৬৬
৩৪. আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি; খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০১২; পৃ. ৪৩
৩৫. আনলাইক বিগিনিং; এ ও মিঠঠা, মেজর জেনারেল; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, লন্ডন, ২০০৩; পৃ. ৩৩৩ ও ৩৩৫
৩৬. আ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওন কান্ট্রি; খাদিম হোসেন রাজা, মেজর জেনারেল; অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, পাকিস্তান, ২০১২; পৃ. ১১৪-১২২
৩৭. ইস্ট পাকিস্তান টু বাংলাদেশ; সাদুল্লাহ খান, ব্রিগেডিয়ার; লাহোর ল টাইমস পাবলিকেশনস, পাকিস্তান; পৃ. ১৯
প্রথম আলোর ‘ঈদসংখ্যা ২০২৪’ থেকে উদ্ধৃত