
বিশ্বসাহিত্যে এমন লেখকের সংখ্যা খুব বেশি নেই, যাঁর কবিতার পঙ্ক্তি পড়ে রাষ্ট্র পুলিশ পাঠিয়েছে, পত্রিকার কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়েছে, বই বাজেয়াপ্ত করেছে, আদালতে দাঁড় করিয়েছে, কারাগারে পাঠিয়েছে। কবি কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে সাহিত্য আর রাষ্ট্রশক্তির সংঘর্ষ এতটাই প্রত্যক্ষ যে তাঁর সাহিত্যিক জীবন অনুসরণ করতে গেলে আদালতের নথি, নিষিদ্ধ গ্রন্থের তালিকা, জেলখানার দিনলিপি আর কবিতা পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়। তাঁর হাতে কলম ছিল, বিপরীতে ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দণ্ডবিধি। একদিকে কবির উচ্চারণ, অন্যদিকে রাজদ্রোহের অভিযোগ। এই অসম সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্য পেয়েছে ‘আনন্দময়ীর আগমনে’, ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’, ‘ভাঙার গান’-এর মতো রচনা; আর নজরুল হয়ে উঠেছেন ঔপনিবেশিক শাসনের সামনে মাথা না-নোয়ানো এক বিরল সাহিত্যিক চরিত্র।
১৯২২ সাল নজরুলের জীবনে বিস্ফোরণের বছর। মাত্র ২৩ বছরের এক তরুণ কবি ইতিমধ্যে ‘বিদ্রোহী’র মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতার পরিচিত স্বর ও ছন্দে প্রবল আলোড়ন তুলেছেন। সে বছরের ১২ আগস্ট প্রকাশিত হয় তাঁর সম্পাদিত অর্ধসাপ্তাহিক পত্রিকা ‘ধূমকেতু’। নামের মধ্যেই ছিল স্বভাবের পরিচয়। পত্রিকাটি সাহিত্য প্রকাশের পাশাপাশি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক চেতনারও তীব্র বাহন হয়ে ওঠে। ২৬ সেপ্টেম্বর ‘ধূমকেতু’র পূজা সংখ্যায় প্রকাশিত হলো ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। দুর্গাপূজার আবহে লেখা কবিতায় দেবীর আগমনকে নজরুল যুক্ত করলেন পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে। পৌরাণিক দেবীমূর্তি তাঁর কবিতায় রূপ নিল অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের শক্তিতে। কবিতার উচ্চারণ এত সরাসরি ছিল যে ব্রিটিশ প্রশাসন দ্রুত তার রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে পারে। ৮ নভেম্বর ‘ধূমকেতু’র সেই সংখ্যা নিষিদ্ধ করা হয়। নজরুলের বিরুদ্ধে শুরু হয় রাজদ্রোহের আইনি প্রক্রিয়া। ২৩ নভেম্বর কুমিল্লায় তাঁকে গ্রেপ্তার করে কলকাতায় নিয়ে যাওয়া হয়। একই দিনে তাঁর প্রবন্ধগ্রন্থ ‘যুগবাণী’ও বাজেয়াপ্ত করা হয়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো। ঔপনিবেশিক সরকারের দমনযন্ত্র সক্রিয় হয়েছিল একজন রাজনৈতিক সংগঠকের বক্তৃতার বিরুদ্ধে নয়, একটি কবিতার বিরুদ্ধে। কাগজে ছাপা কয়েকটি পঙ্ক্তিই তাদের এতটা আতঙ্কিত করেছিল যে পুলিশ, প্রশাসন, আদালত ও দণ্ডবিধি একযোগে সক্রিয় হয়ে উঠেছিল। কবিতার পাঠক তখন আর নিছক সাহিত্যপাঠক থাকেননি; তাঁর ভেতরে জন্ম নিতে পারে শাসন অমান্য করার আকাঙ্ক্ষা। ব্রিটিশ প্রশাসনের উদ্বেগের জায়গাটি ছিল সেখানেই।
কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে নজরুলের বিচার শুরু হয়। ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি বিচারাধীন বন্দী নজরুল আদালতে নিজের বক্তব্য পেশ করেন। পরবর্তীকালে সেই বক্তব্য বাংলা সাহিত্যে ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে স্থায়ী জায়গা অর্জন করে। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো মানুষটি নিজের মুক্তির জন্য করুণা চাননি। ক্ষমা প্রার্থনার পথেও যাননি। তাঁর বক্তব্যের ভঙ্গি ছিল একজন স্বাধীন স্রষ্টার। রাষ্ট্র তাঁকে অভিযুক্ত করেছে রাজদ্রোহে, আর তিনি নিজের লেখার দায় সম্পূর্ণ নিজের কাঁধে নিয়েছেন। আদালত যেখানে তাঁকে আসামি হিসেবে বিচার করছেন, নজরুল সেখানে ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বৈধতাকেই কবির কণ্ঠে পাল্টা বিচারের মুখে দাঁড় করান।
‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ শুধু আদালতে নিজের পক্ষে দেওয়া বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; ঔপনিবেশিক শাসন, রাষ্ট্রীয় দমন ও মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নজরুলের স্পষ্ট উচ্চারণের কারণে রচনাটি বাংলা সাহিত্যে একটি স্মরণীয় অংশ হয়ে উঠেছে। সেখানে কবির আত্মমর্যাদা, স্বাধীন চিন্তার অধিকার ও রাষ্ট্রীয় দমনের বিরুদ্ধে অস্বীকৃতি একসঙ্গে মিশেছে। একজন লেখক নিজের রচনার দায় কত দূর পর্যন্ত বহন করতে পারেন, নজরুলের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো সেই দৃশ্য তার এক দুঃসাহসী উদাহরণ। ১৯২৩ সালের ১৬ জানুয়ারি তাঁর বিরুদ্ধে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়। কবিতার জন্য কারাদণ্ড বাংলা সাহিত্যে তখন আর রূপক রইল না, কবির জীবনে তা হয়ে উঠল বাস্তব অভিজ্ঞতা।
কারাগারে ঢুকেও নজরুলের প্রতিবাদ থামেনি। বাইরের পৃথিবীতে যে মানুষটি কলম নিয়ে সাম্রাজ্যের মুখোমুখি হয়েছিলেন, জেলের ভেতরেও তিনি একই স্বভাব ধরে রাখলেন। তাঁর কাছে বন্দিত্ব মানে শুধু চলাফেরার স্বাধীনতা হারানো ছিল না; বন্দীর মর্যাদায় আঘাত, অপমানজনক আচরণ, বৈষম্যও প্রতিরোধের বিষয় হয়ে উঠেছিল। আলিপুর জেল থেকে ১৯২৩ সালের এপ্রিলে তাঁকে হুগলি জেলে স্থানান্তর করা হয়। জেল কর্তৃপক্ষের আচরণের প্রতিবাদে তিনি অনশন শুরু করেন। অনশন দীর্ঘ হতে থাকে। কবির শরীর ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ে, বাইরে উদ্বেগ ছড়িয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন তাঁর ‘বসন্ত’ গীতিনাট্য নজরুলকে উৎসর্গ করেছিলেন। নজরুলের অনশনের খবর পেয়ে রবীন্দ্রনাথ টেলিগ্রাম পাঠিয়ে অনশন ভাঙার আহ্বান জানান। সেই টেলিগ্রাম শেষ পর্যন্ত নজরুলের হাতে পৌঁছায়নি; প্রাপকের সন্ধান না পাওয়ার মন্তব্যসহ ফিরে আসে। এক মাসের বেশি সময় পর নজরুল অনশন ভাঙেন। এই অনশন তাঁর কারাজীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি। শরীরকে তিনি প্রতিবাদের শেষ অবলম্বন করে তুলেছিলেন। বাইরে তাঁর হাতে ছিল পত্রিকা ও কবিতা, জেলের ভেতরে নিজের শরীরই হয়ে উঠল প্রতিবাদের মাধ্যম।
কারাগারের অভিজ্ঞতা নজরুলের সৃষ্টিশীলতাকে থামাতে পারেনি। বন্দিত্বের কঠোর পরিবেশের মধ্যেও তাঁর কবিতা ও গানের ধারা অব্যাহত ছিল। জেলের চার দেয়াল তাঁর শরীরের চলাচল সীমিত করেছিল, কিন্তু কল্পনা, চিন্তা ও প্রতিবাদের শক্তিকে আটকে রাখতে পারেনি। কারাগারে বসেই তিনি নিজের বন্দিত্বকে বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে শুরু করেন। ফলে শিকল, কারাগার, বন্দিত্ব, মুক্তি ও বিদ্রোহ তাঁর রচনায় আরও গভীর রাজনৈতিক অর্থ নিয়ে ফিরে আসে। ব্যক্তিগত কারাবাস তাঁর কাছে ক্রমে পরাধীন ভারতবর্ষের অবস্থারই এক প্রতিরূপ হয়ে উঠেছিল। তিনি নিজে যেমন রাষ্ট্রীয় আইনের অধীনে বন্দী, তেমনি তাঁর দেশও ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনে স্বাধীনতাহীন। এই দুই অভিজ্ঞতা তাঁর লেখায় এক জায়গায় এসে মিশেছে। কারাগারের শিকল তখন একজন কবির হাতে পরানো লোহার বন্ধনেই সীমিত থাকেনি; তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি জাতির রাজনৈতিক পরাধীনতা, মানুষের স্বাধীন চিন্তার ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিবাদী কণ্ঠ দমনের অভিজ্ঞতা। একইভাবে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও তাঁর ব্যক্তিগত মুক্তির প্রত্যাশা ছাড়িয়ে দেশ ও মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বিস্তৃত হয়েছে।
এ কারণেই নজরুলের কারাজীবনের রচনাগুলো পড়লে বন্দিত্বের পাশাপাশি প্রবল মুক্তিচেতনার উপস্থিতিও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাষ্ট্র তাঁর শরীরকে কারাগারে আবদ্ধ করেছিল, অথচ সেই বন্দিত্বই তাঁর লেখায় প্রতিবাদের নতুন উপাদান এনে দেয়। যে শিকল তাঁকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল, কবিতায় সেই শিকলই অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর চিত্রকল্পে রূপ নেয়। কারাগারের দেয়ালও তাঁর রচনায় রাষ্ট্রশক্তির দৃশ্যমান সীমারেখা হয়ে ওঠে। তার বিপরীতে কবির কল্পনা বারবার সেই সীমা অতিক্রম করে স্বাধীন মানুষের পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যায়।
ফলে নজরুলের কাছে কারাগার ব্যক্তিগত দুঃখ ও নিঃসঙ্গতার স্থান হয়ে থেমে থাকেনি। সেখানে তাঁর নিজের জীবন, দেশের পরাধীনতা এবং মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাঁকে বন্দী করে তাঁর প্রতিবাদী উচ্চারণ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল; কারাজীবন শেষ পর্যন্ত তাঁর সাহিত্যকে আরও তীব্র রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। বন্দিত্বের মধ্যেও লেখা চালিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে নজরুল নিজের সৃষ্টিশীল স্বাধীনতাকে অক্ষুণ্ন রেখেছিলেন। তাঁর শরীরে শিকল পরানো সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু তাঁর কল্পনা ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে শৃঙ্খলিত করা যায়নি।
নজরুলের সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের সংঘর্ষ কারামুক্তির পরও শেষ হয়নি। তাঁর বইয়ের ওপর সরকারি নজরদারি চলতে থাকে। ঔপনিবেশিক আমলে তাঁর পাঁচটি গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হয়েছিল: ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশী’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয় শিখা’ ও ‘চন্দ্রবিন্দু’। প্রথম বাজেয়াপ্ত গ্রন্থ ‘যুগবাণী’। ১৯২৪ সালে পরপর আঘাত আসে ‘বিষের বাঁশী’ ও ‘ভাঙার গান’-এর ওপর। অক্টোবর মাসে ‘বিষের বাঁশী’, পরের মাসে ‘ভাঙার গান’ নিষিদ্ধ করা হয়। নাম দুটির মধ্যেই যেন কবির রাজনৈতিক মেজাজ ধরা আছে। বাঁশি এখানে কোমল সুরের প্রতিশ্রুতি নিয়ে আসে না, তার ভেতরে বিষ। গানও এখানে নিছক বিনোদনের সুর হয়ে আসে না, তার ভেতরে রয়েছে প্রচলিত কাঠামো ভেঙে দেওয়ার তীব্রতা।
ব্রিটিশ শাসকের দৃষ্টিতে বিপজ্জনক ছিল নজরুলের কবিতার জনসম্পৃক্ততা। তাঁর লেখা শিক্ষিত মধ্যবিত্তের পাঠাগারে আটকে থাকত না। কবিতা আবৃত্তি করা যেত, গান সমবেত কণ্ঠে গাওয়া যেত, পত্রিকা হাতে হাতে ঘুরত। শ্রমিক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী, তরুণ পাঠকের কাছে তাঁর লেখা পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা ছিল প্রবল। ফলে একটি বই বাজেয়াপ্ত করা মানে কয়েকটি মুদ্রিত কপি সরিয়ে ফেলা মাত্র ছিল না, তার পেছনে ছিল চিন্তার বিস্তার থামানোর চেষ্টা। পরে ‘প্রলয় শিখা’ আর ব্যঙ্গরচনার সংকলন ‘চন্দ্রবিন্দু’ও ঔপনিবেশিক সরকারের রোষে পড়ে। কবিতা, প্রবন্ধ, গান, ব্যঙ্গ—নজরুল সৃষ্টির যে পথেই এগিয়েছেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা সেখানে নানা ছদ্মবেশে ফিরে এসেছে। কখনো দেবীর আহ্বানে, কখনো শিকল ভাঙার গানে, কখনো ব্যঙ্গের ধারালো হাসিতে।
বই নিষিদ্ধ করার মধ্যে রাষ্ট্রের এক অদ্ভুত দ্বন্দ্ব কাজ করে। যে বইয়ের প্রচার থামাতে সরকার নিষেধাজ্ঞা জারি করে, অনেক সময় সেই নিষেধাজ্ঞাই বইটির প্রতি মানুষের কৌতূহল বাড়িয়ে দেয়। নজরুলের ক্ষেত্রেও সরকারি দমন তাঁর পরিচিতিকে মুছে দিতে পারেনি। বাজেয়াপ্ত বইয়ের নামই ক্রমে তাঁর বিদ্রোহী সাহিত্যিক পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে। আরও তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, রাজনৈতিক বক্তব্যকে নিরাপদ রাখার জন্য নজরুল তাঁর সাহিত্যিক স্বভাব পাল্টাননি। কারাদণ্ডের পর তিনি যদি সতর্ক, সংযত ও রাষ্ট্রের কাছে গ্রহণযোগ্য লেখার পথ বেছে নিতেন, ব্যক্তিজীবনে হয়তো কিছু দুর্ভোগ এড়াতে পারতেন। তাঁর পরবর্তী রচনার গতিপথ অন্য কথা বলে। নিষিদ্ধ গ্রন্থের তালিকা ক্রমে দীর্ঘ হয়েছে। অর্থাৎ দণ্ড তাঁকে নীরব করতে পারেনি। এ জায়গাতেই নজরুলের রাজদ্রোহের মামলা ও নিষিদ্ধ গ্রন্থের ইতিহাস সাহিত্যিক গুরুত্ব পায়। একজন কবির রাজনৈতিক মত কী ছিল, সেই তথ্যের চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তাঁর লেখকসত্তার স্বাধীনতা। রাষ্ট্রের অনুমোদন নিয়ে তিনি সত্য উচ্চারণ করতে চাননি। তাঁর কাছে কবিতা ছিল নিজের সময়ের সঙ্গে সংঘর্ষে প্রবেশ করার এক জীবন্ত উপায়।
‘রাজদ্রোহ’ শব্দটির ভেতরে শাসকের একটি দাবি লুকিয়ে থাকে: রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য। ঔপনিবেশিক ভারতে সেই রাষ্ট্র ছিল বিদেশি শাসকের রাষ্ট্র। ফলে নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগে এক গভীর বিদ্রূপ তৈরি হয়। পরাধীন মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে বিদেশি শাসন নিজের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। সেই অভিযোগ মাথায় নিয়েই নজরুল কবি হিসেবে নিজেকে আরও উচ্চতর আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আদালতে তাঁর অবস্থান, জেলের অনশন, একের পর এক গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত হওয়ার ঘটনা মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন তাঁর কবিতারই সম্প্রসারিত রূপ। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার প্রবল উচ্চারণ আর বাস্তব জীবনের নজরুলকে তখন আলাদা করে পড়া কঠিন। কবিতায় যে মানুষ মাথা উঁচু করেছিলেন, আদালতের কাঠগড়াতেও তাঁর মেরুদণ্ড সোজা ছিল।
১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে নজরুল কারাগার থেকে মুক্তি পান। কিন্তু ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ এখানেই শেষ হয় না। পরবর্তী সময়ে একের পর এক তাঁর বই নিষিদ্ধ হয়, লেখা বাজেয়াপ্ত করা হয়, তাঁর ওপর চলে সরকারি নজরদারি। এত দমন ও বাধার মধ্যেও নজরুলের কলম থেমে থাকে না; আরও তীব্র হয়ে ওঠে তাঁর প্রতিবাদী উচ্চারণ।
এক শতাব্দী পর রাজদ্রোহের মামলার সেই তরুণ কবির দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে অসাধারণ সাহসের পাশাপাশি সাহিত্যের শক্তির প্রতি তাঁর গভীর আস্থা। তিনি জানতেন, কবিতা সামরিক বাহিনী চালায় না, আদালতের রায় লেখে না। তবু একটি কবিতা মানুষের ভয় কাটিয়ে দিতে পারে, দীর্ঘদিনের আনুগত্যের কাঠামোয় ফাটল ধরাতে পারে, অবনত মানুষের মধ্যে আত্মমর্যাদার বোধ ও প্রতিরোধের স্পৃহা জাগিয়ে তুলতে পারে। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র সম্ভবত শব্দের সেই বিপজ্জনক শক্তিই উপলব্ধি করেছিল। ফলে কবিতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিল পুলিশ ও দণ্ডবিধি, গ্রন্থের ওপর নেমে এসেছিল নিষেধাজ্ঞা, কবির জীবনে যুক্ত হয়েছিল কারাবাস। অথচ রাষ্ট্রীয় দমন নজরুলের সৃষ্টিশীল প্রত্যয়কে স্তব্ধ করতে পারেনি। কারাগার পেরিয়ে তিনি পুনরায় কলম তুলে নিয়েছিলেন, আরও দৃঢ়তায়, আরও তীব্রতায়। ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের প্রতি তাঁর সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী প্রত্যুত্তর নিহিত ছিল সেই অবিচল সাহিত্যিক প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই।