গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

জন্মদিনে স্মরণ

সেলিম আল দীন: শিল্পী জীবন ও ব্যক্তি অভিজ্ঞতা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেলিম আল দীনের শিল্পগুরু—শিল্পসাহিত্যবিষয়ক যেকোনো প্রশ্নে, বিতর্কে, জীবনসংকটের চরমতম মুহূর্তে তিনি রবীন্দ্রনাথের কবিতার অংশবিশেষ শুনিয়ে দিতেন অক্লেশে, নয়তো গানের পর গান। হোমার অপেক্ষা ভার্জিল তাঁর প্রিয়। গ্যেটে-তলস্তয়কে সমান শ্রদ্ধায় স্মরণ করেন। শেক্‌সপিয়ার মানুষের ধনাত্মক জীবন–ভাবনাকে কালের মাত্রায় বিচারপূর্বক ঋণাত্মক দিক থেকে তাকে উপস্থাপন করেন—ম্যাকবেথ, কিং লিয়ার, ওথেলোতে। তারা প্রত্যেকেই একটি বিনষ্ট সময়ের পতনের যে চিত্র উপস্থাপন করে সেলিম আল দীন অনুরূপ পতনোন্মুখ জীবনচিন্তার বিপরীতে অবস্থান করেন, শেক্‌সপিয়ার সে জন্যই তাঁকে আপ্লুত করে না বলেই জানি। সম্ভবত এর অভ্যন্তরীণ কারণ মানুষকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে বিবেচনা, প্রকৃতির অভ্যন্তরে মানুষের বিচরণ এবং দুইয়ের মধ্যকার ঐক্য স্থাপন প্রয়াস। সারকথায় বোধ হয় তাকে বলা চলে বিশ্বাত্মবোধ। তারায় তারায় দীপ্ত শিখায় অগ্নি প্রজ্বলনের সঙ্গে ধরণির নিবিড় গভীর ও আত্মিক সম্পর্ক তাঁর অগাধ বিশ্বাসপ্রসূত সত্য। সে বিশ্বাস গুরুপ্রদত্ত। অনুরূপ বিশ্বাসের মূলীভূত কারণ বিশ্বস্রষ্টা, সৃষ্টির রহস্যবিষয়ক গভীর জিজ্ঞাসা এবং রহস্যভেদ করতে না পারার মানবসুলভ অক্ষমতা। অবশ্য এর স্পষ্ট দুটি ফল সেলিম আল দীনের সৃজিত শিল্পে অত্যন্ত অনায়াসলভ্য।

প্রথমত, খণ্ডিত বাস্তব জীবন, এর সংকট, সমস্যা তাঁর শিল্পকর্মে দেশকালাতীত চিরন্তন মানবিক আবেগ অনুভূতি ও বাস্তবতায় উদ্ভাসিত। অর্থাৎ শিল্পীর অনুভাবনায় বিষয়টির ব্যাখ্যা এরূপ অনুমেয়; জীবনের বস্তুগত মৌলিক মানবিক অধিকার এবং সমস্যার প্রকৃতি (Nature) বিশ্বময় অভিন্ন। অধিকারবঞ্চিত মানুষের গাত্রবর্ণ, আকৃতিগত ভিন্নতা কিংবা ধর্মবিশ্বাস কখনো তার অত্যাচারিত, নিপীড়িত অবস্থার জন্য সর্বাংশে দায়ী নয়। দায়ী, মানুষকে পীড়ন করে আত্মপ্রসাদ লাভের মানবিক প্রত্নরূপ বা বৈশিষ্ট্য মানুষের অপরিমেয় স্বার্থবুদ্ধি। পৃথিবীর মানচিত্রে বিদ্যমান অত্যাচার পীড়নের যে দৃষ্টান্ত লক্ষণীয়, তার অন্যবিধ ব্যাখ্যা হয়তো রয়েছে, কিন্তু আমাদের বক্তব্যটিও সহানুভূতি পাওয়ার যোগ্য। কারণ, কখনো সেই অত্যাচার পীড়ন অর্থনৈতিক শ্রেণিবৈষম্যের রূপ ধরে, কখনো বর্ণ-ধর্ম-সম্প্রদায় ইত্যাকাররূপে মুখ ব্যাদান করে ‘অত্যাচারী’ এই সাধারণ পরিচয়ের আড়ালে একজন সাধারণ মানুষকেই তার ক্রিয়াদিসমেত উপস্থাপন করে। পৃথিবীর শিল্প–সাহিত্যে নানান নাম পরিচয়ে তারা চিহ্নিত। 

পূর্বোক্ত বক্তব্যের অনুষঙ্গে বলা যায়, নিরন্নের আর্তচিৎকার, অত্যাচারিতের মর্মবেদনার ভাষা বিশ্বময় অভিন্ন অভিন্ন প্রেমের আবেগ প্রকাশের, প্রতারণার নাড়িছেঁড়া যন্ত্রণার, বাঞ্ছিতজনকে পাবার আকাঙ্ক্ষার ভাষা। বস্তুত সেলিম আল দীন সৃষ্ট শিল্পকর্ম এবং তাতে উপস্থিত মানব ও তাদের জীবন সমস্যাকে আলোচ্য পটভূমিতে বিবেচনা করাই যৌক্তিক। 

সেলিম আল দীন রচিত নাটকে সামগ্রিক অর্থে প্লটকে ছাপিয়ে চরিত্র পাঠক দর্শকচিত্তে প্রগাঢ় অবস্থান গ্রহণ করে না, দু-একটি ক্ষেত্রে অবশ্য এর ব্যতিক্রমও লক্ষণীয়। উপলব্ধি করলে দেখা যাবে সেখানেও উপাখ্যানের গড়নটাই চরিত্রকে উল্লেখযোগ্য উচ্চতা দান করেছে।

দ্বিতীয়ত, প্রাচীন সাহিত্যে বিশেষত ধ্রুপদি গ্রিক, রোমান ও সংস্কৃত সাহিত্যের পঠন-পাঠন, অলংকারশাস্ত্রের নিয়মরীতি সেলিম আল দীনের মানসগঠনে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। অ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্বের (Poetics) সূত্রাবলি, বিশেষত ট্র্যাজেডির ষড়ঙ্গ তাঁর রচনায় বস্তুগতভাবেই অনুপস্থিত। কিন্তু অ্যারিস্টটলপন্থী কেউ যদি বলেন চরিত্র (Character) অপেক্ষা কাহিনিকে (Plot) অধিকতর প্রাধান্য দান সেলিম আল দীনের রচনার অন্যতম প্রধান গুণ এবং এই ক্ষেত্রটিতে তিনি গ্রিক পণ্ডিত অ্যারিস্টটলকে আদর্শ বিবেচনা করেছেন তবে সে ক্ষেত্রে জোর প্রতিবাদের অবকাশ নেই। প্রকৃত প্রস্তাবে কারণ যা–ই থাক সেলিম আল দীন রচিত নাটকে সামগ্রিক অর্থে প্লটকে ছাপিয়ে চরিত্র পাঠক দর্শকচিত্তে প্রগাঢ় অবস্থান গ্রহণ করে না, দু-একটি ক্ষেত্রে অবশ্য এর ব্যতিক্রমও লক্ষণীয়। উপলব্ধি করলে দেখা যাবে সেখানেও উপাখ্যানের গড়নটাই চরিত্রকে উল্লেখযোগ্য উচ্চতা দান করেছে। যেমন ‘মুনতাসীর’ (মুনতাসীর ফ্যান্টাসি) নাটকে ফ্যান্টাসির অভ্যন্তরে চরিত্র হিসেবে সর্বগ্রাসী বুর্জোয়ার প্রতিনিধি মুনতাসীর সর্বাংশে প্রশংসনীয়, কিন্তু নাটকের পরিণতিতে নাটকের ক্রিয়াকলাপ ও আচার–আচরণের মধ্য দিয়ে যে ব্যক্তিটি গড়ে ওঠে, তা কোনোক্রমেই কাহিনির বিস্তৃতি এবং দার্ঢ্য অতিক্রম করে নিজেকে স্বতন্ত্র একক চরিত্ররূপে প্রতিষ্ঠিত করে না। বরং একটি বিশেষ সামাজিক শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে ওই শ্রেণির ক্রিয়াকর্মই পাঠক-দর্শকচিত্তকে তন্বিষ্ট করে। তাঁরা একটি Social Type-এর সাক্ষাৎলাভে সক্ষম হয়।

স্বর্গীয় স্বার্থান্ধতা ও ষড়যন্ত্রের নির্দোষ শিকার শকুন্তলা। আত্মযন্ত্রণার তীব্রতা ও মর্ত্যভূমির ক্লেদাক্ত জীবন থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় ক্ষতবিক্ষত অবস্থায় সে সর্ব মানবের সহানুভূতি কাড়ে অনায়াসেই। স্বর্গীয় ষড়যন্ত্রে মর্ত্যজীবনের অনুরূপতা ছাড়াও পুরাণের নব ব্যাখ্যা মেনকার গর্ভজাত এই অভিশপ্ত সন্তানটিকে সামন্ততান্ত্রিক সমাজসৃষ্ট পৌরাণিক নির্মোক ছিন্ন করে আধুনিক বিচারে অবাঞ্ছিত মানব সন্তানরূপে সবার সুগভীর সহানুভূতির মর্মে পৌঁছে দেয়। জন্ম অভিশপ্ত অথচ অধিকারবঞ্চিত আত্মসচেতন এই মানবীর চরিত্র মাধুর্য মুগ্ধ ও হৃদয় স্পর্শ করে, বিশ্বামিত্রের অপত্য স্নেহে লালিত কন্যারূপে তাকে প্রত্যক্ষ করার আত্যন্তিক আগ্রহ অনায়াসেই ছাপিয়ে নিজের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয় না। কারণ, উপাখ্যানের কেন্দ্রীয় চরিত্র শকুন্তলার মাঝে এসে অভ্রভেদী প্রাচীর তোলে দেব-মানবের শক্তির দ্বন্দ্ব, অমরত্বের বাসনাপ্রসূত উপাখ্যান, মর্ত্য এবং স্বর্গের অভ্যন্তরীণ বিরোধ। অর্থাৎ শকুন্তলা নাটকে শেষাবধি উপাখ্যানের জিয়নরসই মুখ্য-ব্যক্তিসত্তা উপাখ্যানেরই অংশমাত্র।

২.

অধরা শিল্পের নিত্যপূজায় ধ্যানমগ্ন শিল্পীর চৈতন্যে অণুক্ষণ এক সুর খেলে। অস্তিত্বের বীণা তারে বাণীর দেবী ঝংকার তোলেন নবরূপে বিচিত্র ভঙ্গিমায়। মূর্ত-বিমূর্তের জগৎ তাঁর সার্বক্ষণিক বিচরণ ভূমি। শিল্পের সৃজনকর্ম সে জন্যই সাধন সত্য। প্রকৃত শিল্পী তাঁর নন্দনবিশ্বে মগ্নচিত্ত সাধক। সেলিম আল দীন সাধক শিল্পী-শিল্পের ব্রতচারী অন্তত আমার বিবেচনায়। একনিষ্ঠ সাধকের প্রাত্যহিক কৃত্যের অপরিহার্যতার তুল্য তাঁর শিল্প সৃজন কৃত্য। আমৃত্যু তিনি এই কৃত্যটি পালন করেছেন একাগ্রতা এবং শিল্পের প্রতি সশ্রদ্ধ সততায়। শিল্পের ধ্রুপদি ক্যানভাসে তিনি আধুনিক জীবনদর্শন এবং সমাজ সম্পর্ক উপস্থাপন প্রয়াসী। শুদ্ধ শিল্প বরাবর জীবন ও সৌন্দর্যের সুসমন্বয়ের প্রযত্নে রূপবান। চেতনাগতভাবে সেলিম আল দীন শুদ্ধশিল্পের মৌল গুণাবলির সুষ্ঠু প্রকাশের নিমিত্তে নিরন্তর শিল্পভাবনার গতিপ্রকৃতির নানা প্রান্তে দাঁড়িয়েছেন। সাধনার নানা স্তরে তিনি বুনন অলংকরণে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় প্রতিভার স্ফুরণ ঘটান। জগৎবোধ, জীবনচিন্তা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা, শিল্পীর মানবিক ও সুজনবিষয়ক দায়বোধ তাঁর মর্মপ্রসূত। স্রষ্টার শাসনযোগ্যতা সেলিম আল দীনের সৃষ্টির অন্তর-বাহিরজুড়ে হীরকৌজ্জ্বল্যে ভাস্বর। স্তাবকতা নয়—দীর্ঘ আটান্ন বছরের বৃত্তপূরণ মুহূর্তে অন্তত ওইটুকু আত্মশ্লাঘা অনুভব করার অধিকার তিনি অবশ্যই সংরক্ষণ করেন।

পাণ্ডিত্য আঙ্গিক সচেতনতা, নিত্যনব নিরীক্ষা, অনন্য এক ভাষারীতির আশ্রয়ে জীবনকে উপস্থাপনের স্বোদ্ভাবিত কৌশল, জীবনবোধের গভীরতা, প্রখর ঐতিহ্যানুগত্য প্রতিটি সৃষ্টির অভ্যন্তরে বিদ্যমান ক্রমাগ্রসরতার প্রবাহ সেই উৎকর্ষের কেন্দ্রস্থল।

স্বাধীনতা–উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গ্রন্থ—সর্ববিষয়ক গল্প ও অন্যান্য নাটক। শিল্পসাধনার একনিষ্ঠতা ও সৃজন–ক্ষমতার নিদর্শনস্বরূপ অতঃপর ক্রমিক নিয়মে তাঁর রচিত, প্রকাশিত, প্রদর্শিত ও প্রচারিত রচনার তালিকা নিম্নে সন্নিবেশিত হলো:

মঞ্চনাটক: মহাকবি আলাওল, বিশু কুমারের পুতুলনাচ, অনিকেত অন্বেষণ (১৯৭০), এক্সপ্লোসিভ ও মূল সমস্যা (১৯৭২), জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন (১৯৭২), করিম বাউয়ালীর শত্রু অথবা মূল মুখ দেখা(১৯৭৩), সংবাদ কার্টুন (১৯৭৩), সঙ্গ বিষয়ক গল্প (১৯৭৩), মুনতাসীর (১৯৭৪-৭৫), আতর আলীদের নীলাভ পাট (১৯৭৫), চর কাঁকড়ার ডকুমেন্টারি (১ম, পথনাটক ১৯৭৬), শকুন্তলা (১৯৭৭), কিত্তনখোলা(১৯৭৮-৮০), আততায়ী (১৯৮৩), সয়ফুলমূলক বদিউজ্জামাল (১৯৮৩), বাসন (১৯৮৪), কেরামত মঙ্গল (১৯৮৪-৮৫), হাত হদাই (১৯৮৮), চাকা (১৯৯০), যৈবতী কন্যার মন (১৯৯২), হরগজ (১৯৯২)।

গবেষণাগার নাট্য: একটি মারমা রূপকথা’ (১৯৯৫)। বনপাংশুল (১৯৯৭), প্রাচ্য (১৯৯৭), ধাবমান (২০০৫-০৬), স্বর্ণ বোয়াল (২০০৬), স্বপ্ন রমণীগণ (নৃত্যনাট্য) ২০০৬, নিমজ্জন (২০০৬-২০০৭), পুত্র (২০০৭)।

দেশে–বিদেশে রেডিও ও টেলিভিশনে প্রযোজিত উল্লেখযোগ্য নাটকসমূহ: বিপরীত তমসায়, ঘুম নেই, রক্তের আঙ্গুরলতা, শেকড় কাঁদে জলকণার জন্য, মশারী ’৭৩, একদিন একরাত্রি, শ্যামল ছায়ায়, মাছি, শয্যা, মাঠের পর মাঠ, নীল নীল যন্ত্রণা, অশ্রুত গান্ধার (বাংলাদেশ টেলিভিশন, ১৯৭৬), শেষ বংশধর (বিটিভি, ১৯৭৯), ওহ দেবদূত (বিটিভি, ১৯৭৯), আততায়ী (মঞ্চনাটক) বিটিভি, ১৯৮৩, কিত্তনখোলা (আকাশবাণী, কলকাতা, ১৯৯৫), ভাঙনের শব্দ শুনি (আয়না সিরিজ) বিটিভি (১৯৮১-৮২), লালমাটি কালো ধোঁয়া (আয়না সিরিজ) বিটিভি (১৯৮২-৮৩), মাঠের পর মাঠ (বিটিভি, ১৯৮২), প্রজাপতি (বিটিভি, ১৯৮২-৮৩), গ্রন্থিকগণ কহে (আট পর্বের ধারাবাহিক, বিটিভি, ১৯৯০-৯১), অনূত রাত্রি (বিটিভি, ১৯৯৩), ছায়া শিকারী (নয় পর্বের ধারাবাহিক) বিটিভি, ১৯৯৪-৯৫, হিতঙ্কর (বিটিভি, ১৯৯৯), হলুদ পাতার গান (১৯৭৭), ইচ্ছা পূরণ (একুশে টিভি, ২০০০), নকশি পাড়ের মানুষ (একুশে টিভি, ২০০২), ক্ষমা (এনটিভি, ২০০৩), বসবাস (চ্যানেল আই, ২০০৪), রঙের মানুষ (এনটিভি, ২০০৩), ধার উধার।

কাব্যগ্রন্থ: কবি ও তিমি (১৯৯০)।

অনুবাদ সম্পাদনা: নন্দিকেশ্বরের অভিনয় দর্পণ।

গবেষণাগ্রন্থ: মধ্যযুগের বাংলা নাট্য (১৯৯৫); বাংলা নাট্যকোষ (১৯৯৮)।

উপন্যাস: অমৃত উপাখ্যান (১৯৮৯);

গবেষণামূলক প্রবন্ধ: মহাকবির নাট্য রচনা বিষয়ে—The Jahangirnagar Review Part-C (১৯৯১)। ‘শ্রী চৈতন্যভাগবতে’ নাট্যপ্রসঙ্গ—থিয়েটার স্টাডিজ, ১ম সংখ্যা (১৯৯২)। ‘বাঙলা দ্বৈতাদ্বৈতবাদী শিল্পতত্ত্বের পূর্বাপর’ থিয়েটার স্টাডিজ, ৩য় সংখ্যা (১৯৯৫)। ‘নাট্য গবেষণা পদ্ধতি ও ব্যবহারিক প্রসঙ্গ’— থিয়েটার স্টাডিজ, ৫ম সংখ্যা (১৯৯৮)।

রবীন্দ্রনাটকে মানুষ, বাংলা একাডেমি সেমিনারে পঠিত, ২৫শে বৈশাখ, ১৪০৭ বাংলা। নজরুলের নন্দন চিন্তা ও তাঁর দুটি পদ—জ্যৈষ্ঠ মাস, ১৪০৫, আজকের কাগজ। মান্দাই নৃ-গোষ্ঠী (ছয় পর্ব), দৈনিক বাংলা।

চলচ্চিত্র: ‘চাকা’ নাটকের চলচ্চিত্রায়ণ, পরিচালক: মোরশেদুল ইসলাম, ১৯৯৪। ‘একাত্তরের যীশু’ চলচ্চিত্রের সংলাপ রচনা, পরিচালক নাসির উদ্দীন ইউসুফ, ১৯৯৪। ‘কিত্তনখোলা’ নাটকের চলচ্চিত্রায়ণ, পরিচালক: আবু সাইয়িদ, ২০০০।

সৃজনশীল প্রবন্ধ: আমেরিকার কালোদের সাহিত্য: লোকসঙ্গীত, রচনা প্রকাশ: ১৯৬৮ খ্রি. আমেরিকার কালোদের সাহিত্য: কাব্যধারা, রচনাকাল ১৯৬৮ খ্রি.। মোরাভিয়া; তিনটি দ্বন্দ্বমান চরিত্র, রচনাকাল: ১৯৬৮ সাল, ও নীলের একটি নাটক, রুবি বিষয়ক, রচনাকাল: ১৯৬৯ সাল, ভাষা আন্দোলন ও নাটক, রচনাকাল ১৯৭২ সাল, সমকালীন নাট্যচর্চা বিষয়ে, রচনাকাল ১৯৭৩-৭৪ সাল, বাঘ পাহাড়ের যুদ্ধ: চীনা অপেরা, রচনাকাল আনুমানিক ১৯৭৫ সাল, আমাদের নাট্যচর্চা, মৌখিক ভাষণ ১৯৭৭ সাল, একটি কাব্যপাঠের গল্প, রচনাকাল ১৯৭৭ সাল, হাসতে হাসতে দেয়াল ভাঙ—দাদা ঠাকুর, প্রকাশকাল ১৯৭৯-৮০ সাল, কিত্তনখোলা নাটক ও প্রযোজনা প্রসঙ্গে, প্রকাশকাল: ১৯৮৫ সাল, মিউজিক্যাল কমেডি ও মুনতাসীর, নাট্যোৎসব রচনাকাল ১৯৭৭, কিত্তনখোলা ও ঢাকা থিয়েটার ‘জিজ্ঞাসা’ সংকলন (শিবনারায়ণ রায় সম্পাদিত, ১৯৯২), সম্পাদক আহসান হাবীব ও এক তরুণ শিক্ষাব্রতী, আজকের কাগজ, ১৮ আষাঢ় ১৪০৫, এবারের একুশ ও অখণ্ড রবীন্দ্রনাথ, আজকের কাগজ, ৯ ফাল্গুন ১৪০৪। 

নির্দেশনা: মহুয়া (১৯৯০), দেওয়ানা মদিনা (১৯৯২), একটি মারমা রূপকথা (১৯৯৩), সধবার একাদশী, বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ, মেঘনাদবধ (১৯৯৯-২০০০), কাঁদো নদী কাঁদো (২০০১-২০০২), ম্যাকবেথ।

নাট্যকার সেলিম আল দীন প্রায় চার দশকের সাধনায় পূর্বোক্ত শিল্প সৃষ্টি করেন শ্রম ও নিষ্ঠার পরম পরাকাষ্ঠায়। অবশ্য স্মর্তব্য, তালিকায় উল্লিখিত সেলিম আল দীনের রচনাই তাঁর সৃষ্টির পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত খতিয়ান নয়, এর বাইরেও তাঁর নাটক ও প্রবন্ধের একটা বড় অংশ অস্তিমান। তাঁর শিল্পীসত্তার স্বরূপ অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিশ্চয়ই এটা প্রমাণ করা সম্ভব যে, শিল্প সৃজনকর্ম সেলিম আল দীনের নিকট ছিল কৃত্য বিশেষ (One Kind of Ritual)। ঈর্ষণীয় রচনার তালিকাই তার প্রামাণ্য। 

শিল্পোৎকর্ষের বিচারে বেশ কিছু সফল নাটকের রচয়িতা নাট্যকার সেলিম আল দীন। পাণ্ডিত্য আঙ্গিক সচেতনতা, নিত্যনব নিরীক্ষা, অনন্য এক ভাষারীতির আশ্রয়ে জীবনকে উপস্থাপনের স্বোদ্ভাবিত কৌশল, জীবনবোধের গভীরতা, প্রখর ঐতিহ্যানুগত্য প্রতিটি সৃষ্টির অভ্যন্তরে বিদ্যমান ক্রমাগ্রসরতার প্রবাহ সেই উৎকর্ষের কেন্দ্রস্থল। সব্যসাচী লেখক অভিধাপ্রাপ্ত সৈয়দ শামসুল হক সেলিম আল দীনকে বাংলা নাটকের প্রধান পুরুষ বলে আখ্যায়িত করেন। অধ্যাপক অরুণ সেনের মতে, সেলিম আল দীন দুই বাংলার সেই সময়ের শ্রেষ্ঠ নাট্যকার। এবংবিদ নানা মন্তব্য হয়তো অন্যত্রও দুর্লভ নয়। সন্দেহাতীতভাবে এ কথা সত্য, সেলিম আল দীন পাঠকনন্দিত শিল্পী নন। জনপ্রিয়তার সস্তা আবেগ ও বিষয় তাঁর সৃষ্টির উদ্দেশ্য নয়।