অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

স্বাধীনতা দিবস সবিশেষ

জেনোসাইড অস্বীকৃতির রাজনীতি ও মনস্তত্ত্ব

কিশোরবেলা থেকে শুরু করে এই মধ্যবয়সে এসেও এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের স্থিতিশীল ও সামগ্রিক কোনো বয়ান প্রতিষ্ঠিত হতে দেখিনি। কখনো মুক্তিযুদ্ধে শহীদের প্রতিষ্ঠিত সংখ্যা ৩০ লাখ, কখনোবা তা হাজারের কোঠায় আটকে দেওয়ার দাবিও শোনা যায়। যুদ্ধকালীন অপরাধের দায়ে কখনো একটি রাজনৈতিক দলের নেতা আদালতের কাঠগড়ায় ফাঁসির আসামি, কালের পরিক্রমায় তিনিই আবার মহান সংসদে আমাদের প্রতিনিধি।

মুক্তিযুদ্ধ এবং সেই সময়ে সংঘটিত জেনোসাইডের কোন বয়ানটা আসলে সত্য? স্বাধীনতা দিবসের বর্ষপূর্তি পালনের সঙ্গে সঙ্গে জরুরি এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাও ভীষণ দরকার। আমাদের বোঝা দরকার, কেন এত বছরেও বাংলাদেশ জেনোসাইড আন্তর্জাতিক পরিসরে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ ও স্বীকৃতি লাভ করতে পারেনি? সেটা কি শুধুই জেনোসাইড অস্বীকারের ভূরাজনীতিগত কৌশলের প্রভাব, নাকি জাতিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও জেনোসাইডের ইতিহাসকে নির্মোহভাবে গবেষণা ও বিশ্লেষণে মনোযোগী না হয়ে বরং ক্রমাগত রাজনৈতিকীকরণই এর জন্য দায়ী?

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে জেনোসাইড অস্বীকারের এই রাজনীতি শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই হয়নি, পৃথিবীর ইতিহাসের দিকে তাকালে তার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন সময়ে। অনেক দেশেই অপরাধের দায়ভার স্বীকারের পরিবর্তে নির্দিষ্ট কিছু প্যাটার্নের মাধ্যমে জেনোসাইডকে অস্বীকার বা ডিনায়ালের চেষ্টা চালিয়েছে অপরাধী ও তাদের মিত্ররা। তথ্য গোপন করে, পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক তৈরি করে বা অপরাধের শিকারকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে প্রকৃত অপরাধকে জায়েজ করার অপকৌশলের প্রমাণ পাওয়া যায় এসব অস্বীকৃতির ইতিহাসে। এর মাধ্যমে শুধু ইতিহাস বিকৃতিই নয়, সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি এড়ানো, ভুক্তভোগীর কণ্ঠরোধ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—ভবিষ্যতে একই রকম সহিংসতার আশঙ্কাও তৈরি করে।

কেন এত বছরেও বাংলাদেশ জেনোসাইড আন্তর্জাতিক পরিসরে কাঙ্ক্ষিত মনোযোগ ও স্বীকৃতি লাভ করতে পারেনি? সেটা কি শুধুই জেনোসাইড অস্বীকারের ভূরাজনীতিগত কৌশলের প্রভাব, নাকি জাতিগতভাবে মুক্তিযুদ্ধ ও জেনোসাইডের ইতিহাসকে নির্মোহভাবে গবেষণা ও বিশ্লেষণে মনোযোগী না হওয়া দায়ী?

মার্কিন রাজনৈতিক বিজ্ঞানী গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন তাঁর জেনোসাইড সংজ্ঞায়নের তত্ত্বে জেনোসাইড অস্বীকারের এই প্রক্রিয়াকে জেনোসাইড সংঘটনের ১০টি ধাপের সর্বশেষ ধাপ হিসেবে দেখিয়েছেন (গ্রেগরি এইচ স্ট্যানটন, দ্য টেন স্টেজেস অব জেনোসাইড, জেনোসাইড ওয়াচ, ২০১৩)। ১৯৪৮ সালের জেনোসাইড কনভেনশনের দেওয়া আইনি সংজ্ঞায় জেনোসাইডকালে সংঘটিত অপরাধগুলোকেই কেবল আমলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্ট্যানটন জেনোসাইডকে একটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বলে মনে করেছেন। তাঁর মতে, জেনোসাইড সংঘটনের বহু আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে টার্গেট করে তাদের বর্গীকরণ, বৈষম্যের শিকার, মেরুকরণের মাধ্যমে এবং প্রস্তুতি ও সংগঠনের মতো ধাপ পার হয়েই কেবল প্রকৃত অপরাধ সংঘটন করা হয়ে থাকে। আর অপরাধ সংঘটনের সময়কালে ও পরবর্তী সময়ে তা অস্বীকার করার মাধ্যমে জেনোসাইডের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে থাকে।

অপর দিকে দক্ষিণ আফ্রিকান-ব্রিটিশ সমাজবিজ্ঞানী স্ট্যানলি কোহেন তাঁর স্টেটস অব ডিনায়াল: নোয়িং অ্যাবাউট অ্যাট্রোসিটিজ অ্যান্ড সাফারিং (২০০১) বইয়ে জেনোসাইড অস্বীকারকে একটি সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন। কোহেনের মতে, তিনটি উপায়ে অপরাধী তার কৃত জেনোসাইডকে অস্বীকার করার চেষ্টা চালায়।

এক. ‘লিটারেল ডিনায়াল’, অর্থাৎ জেনোসাইডকে আক্ষরিক অর্থে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করা; কিছুই ঘটেনি এমন অবস্থান নেওয়া। যেমন অটোমান শাসনামলে সংঘটিত আর্মেনীয় জেনোসাইডের ক্ষেত্রে তুরস্কের অস্বীকারমূলক অবস্থান।

দুই. ‘ইন্টারপ্রেটিভ ডিনায়াল’ বা ব্যাখ্যামূলক অস্বীকৃতি। অর্থাৎ একটি ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু তা জেনোসাইড নয়, বরং গৃহযুদ্ধ, দাঙ্গা বা বিদ্রোহ দমনের প্রক্রিয়ামাত্র। যেমন রোহিঙ্গা জেনোসাইডের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের অবস্থান। মিয়ানমার বলে, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) নামের একটি বিদ্রোহী সংগঠনের হামলার জবাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী অভিযান চালায়। অর্থাৎ এটি ছিল তাদের পক্ষ থেকে একটি ‘সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান’। এমনকি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিসের (আইসিজে) অধীন গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার (২০১৯) মামলায় স্বয়ং অং সান সু চি মিয়ানমারের পক্ষে যুক্তি প্রদান করেন যে রোহিঙ্গাদের ওপর কোনো জেনোসাইড সংঘটিত হয়নি, বরং একটি জটিল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনী বৈধ অভিযান চালিয়েছে।

১৯৭১ সালে বিশ্ব ছিল দ্বিমেরু–বিভাজিত। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো ছিল পাকিস্তানের পক্ষে, ঠিক তেমনি ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। তাই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ এখনো এই জেনোসাইডকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি।

তিন. ‘ইমপ্লিকেটরি ডিনায়াল’; এর অর্থ, ঘটনার সত্যতা এবং তার অর্থ পুরোপুরি স্বীকার করে নিলেও সেই ঘটনার ফলে সৃষ্ট নৈতিক, মনস্তাত্ত্বিক বা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং তার তাৎপর্যকে অস্বীকার করা বা এড়িয়ে যাওয়া। হলোকাস্টের পর অনেক নাৎসি কর্মকর্তা দাবি করেন, তাঁরা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ পালন করেছেন মাত্র, তাঁদের ব্যক্তিগত কোনো দায় নেই। রুয়ান্ডার জেনোসাইডের পর যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ সঠিক সময়ে হস্তক্ষেপ না করার দায় এড়াতে দাবি করে যে গণহত্যার ব্যাপ্তি ও প্রকৃতি সম্পর্কে তাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য ছিল না। তারা আরও বলে, সহিংস পরিস্থিতিতে তাদের পক্ষে হস্তক্ষেপ করা সম্ভবও ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন আগেই সতর্ক করেছিল, এমনকি সীমিত আকারে সামরিক হস্তক্ষেপ করারও সুযোগ ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে জাতিসংঘ দায় এড়িয়ে যায়। এভাবে অস্বীকার করার মাধ্যমে অপরাধী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অপরাধের দায় থেকে নিজেদের নৈতিকভাবে আলাদা করতে চায়। এভাবে জেনোসাইড ডিনায়াল শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ে নয়, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও ঘটে।

এবার দেখা যাক, বাংলাদেশে সংঘটিত জেনোসাইডকে কতটা ধারাবাহিক ও সংগঠিত উপায়ে পাকিস্তান এবং তাদের মিত্রদেশগুলো অস্বীকার করেছে, যে কারণে ৫৫ বছর পরেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ জেনোসাইডের স্বীকৃতি এখনো সন্তোষজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রীয় বয়ানে ১৯৭১ সালের জেনোসাইডকে সচেতনভাবে স্বীকার করা হয়নি; বরং বিভিন্ন বিকল্প আখ্যা ব্যবহার করে ঘটনাটিকে পুনর্নিমাণ (রিফ্রেম) করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি লেখক ড. তারিক রহমান একটি গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেন, পাকিস্তানি পাঠ্যপুস্তকে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের বিভাজনকে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের আধিপত্যের ফল হিসেবে না দেখিয়ে ভারতীয় নীতির প্রমাণ হিসেবে চিত্রিত করা হয়। (ল্যাঙ্গুয়েজ-টিচিং অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড ভিউ ইন উর্দু মুসলিম স্কুলস, ১৯৯৫)।

হাজারো অকাট্য প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতা–পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না পাওয়ার অন্যতম কারণ পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ধারাবাহিকভাবে জেনোসাইডকে ক্ষুদ্র কোনো সংকট হিসেবে পরিগঠন করার অপচেষ্টা, যা ওই সময়ে একদিকে জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে বাধা হিসেবে কাজ করেছে, অপর দিকে আন্তর্জাতিক আইনগত হস্তক্ষেপ এড়াতে তাদের সাহায্য করেছে। কেননা ১৯৭১ সালে বিশ্ব ছিল দ্বিমেরু–বিভাজিত। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও সৌদি আরবের মতো দেশগুলো ছিল পাকিস্তানের পক্ষে, ঠিক তেমনি ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল বাংলাদেশের পক্ষে। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে কৌশলগত মিত্র হিসেবে দেখত বলে বাংলাদেশের জেনোসাইডকে তারা প্রথম থেকেই স্বীকার করতে চায়নি।

ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান

তাই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও গবেষকেরা ১৯৭১ সালের জেনোসাইডকে ‘সিলেক্টিভ জেনোসাইড’, ‘ব্লাডবাথ’, ‘ওয়ার অব দ্য গ্রেটেস্ট হিউম্যান ট্র্যাজেডিজ’ ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে তুলে ধরলেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ এখনো এই জেনোসাইডকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। পাকিস্তান এখনো যুক্তরাষ্ট্র বা সৌদি আরবের মতো পরাক্রমশালী দেশগুলোর কৌশলগত মিত্র হয়ে থাকায় নিকট ভবিষ্যতেও তেমন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

তবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি না পেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব জেনোসাইড স্কলার্স, জেনোসাইড ওয়াচ এবং লেমকিন ইনস্টিটিউট ফর জেনোসাইড প্রিভেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ১৯৭১ সালের সহিংসতাকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে ‘জাতীয় গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। এরপর ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে জেনেভায় অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের ৫১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের তৎকালীন উপস্থায়ী প্রতিনিধি (ডেপুটি পারমানেন্ট রিপ্রেজেন্টেটিভ) পাকিস্তানের দ্বারা সংঘটিত এই জেনোসাইডের স্বীকৃতির দাবি জানান।

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি সভায়ও একাধিকবার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। গত ২০ মার্চ তেমনই একটি প্রস্তাব তোলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। প্রস্তাবটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান জানানো হয় যেন তিনি ১৯৭১ সালে সংঘটিত নৃশংসতাকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

বেসরকারিভাবেও ১৯৭১ সালের জেনোসাইডের স্বীকৃতির জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। জাতিসংঘের ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কাউন্সিল স্ট্যাটাসভুক্ত বিভিন্ন এনজিও ও সংগঠন (যেমন বিএএসইউজি, ইউরোপীয় বাংলাদেশ ফোরাম, প্রজন্ম ’৭১) মানবাধিকার পরিষদের বিভিন্ন অধিবেশনে এ বিষয়ে লিখিত বিবৃতি জমা দিয়েছে বলে জানা যায়। এ ছাড়া দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর তার নিজস্ব গ্রন্থাগার ও তথ্যভান্ডার, অডিও-ভিজ্যুয়াল সেন্টার এবং গবেষণাকেন্দ্রের মাধ্যমে নিরলসভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং সে সময়ে সংঘটিত জেনোসাইডের স্বীকৃতি বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে। এমনকি ২০২২ সালে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষ থেকে ইন্টারন্যাশনাল সাইটস অব কনশেন্স, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে বাংলাদেশের জেনোসাইডকে স্বীকৃতি দানের জন্য আবেদন করে।

মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি সভায়ও এই স্বীকৃতির জন্য একাধিকবার প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। গত ২০ মার্চ তেমনই একটি প্রস্তাব (১১৩০ নম্বর) তোলেন ডেমোক্রেটিক পার্টির কংগ্রেসম্যান গ্রেগ ল্যান্ডসম্যান। এই প্রস্তাবে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের প্রাক্কালে শুরু হওয়া ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরুর মাধ্যমে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের মিত্রদের দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতার নিন্দা জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে প্রস্তাবটিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি এই আহ্বান জানানো হয় যেন তিনি ১৯৭১ সালে সংঘটিত নৃশংসতাকে মানবতাবিরোধী অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ ও জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় গণহত্যা চালায় পাকিস্তানি বাহিনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ইকবাল হলে হত্যাযজ্ঞের শিকার শিক্ষার্থীদের মরদেহ

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির আলাপ কেবল জাতিসংঘ বা যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক না রেখে বরং একাডেমিক পরিসরে বিদ্যমান বিদ্যাচর্চার কমিউনিটিতে ঐকমত্যের ভিত্তিতে যেভাবে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ জেনোসাইড স্বীকৃতি লাভ করছে, সেটিকে আমরা কতটা কাজে লাগাচ্ছি, তা পর্যালোচনা করে দেখার প্রয়োজন আছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ জেনোসাইড–সংক্রান্ত গবেষণা, আর্কাইভ প্রকল্প এবং এ–সংক্রান্ত কনফারেন্স আয়োজন করে আমরা কতটা নিরবচ্ছিন্নভাবে আন্তর্জাতিক মনোযোগ ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছি, সেই আত্মপর্যালোচনার মধ্য দিয়ে নিজেদের প্রচেষ্টাকে যাচাই করারও দরকার আছে বলে মনে করি। জাতীয় পর্যায়েও নতুন প্রজন্মের কাছে আমরা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে কীভাবে তুলে ধরছি, সেটিও বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধ ও জেনোসাইড বিষয়ে বাংলাদেশের পাঠ্যবইয়ের রাজনৈতিকীকরণ প্রসঙ্গে পাকিস্তানি লেখক আনাম জাকারিয়া তাঁর ১৯৭১: আ পিপল’স হিস্ট্রি ফ্রম বাংলাদেশ, পাকিস্তান অ্যান্ড ইন্ডিয়া (২০১৯) বইয়ে বলেছেন, কোনো একটি জাতি যেভাবে নিজেদের ইতিহাস লিখতে চায়, তার প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে সে দেশের পাঠ্যপুস্তকে। কিন্তু বাংলাদেশের পাঠপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধ যেন হয়ে উঠেছে বিভিন্ন আমলের নিজস্ব সংস্করণের রাজনৈতিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে। স্বাধীনতার পর প্রথম দিকের পাঠ্যবইগুলোতে যেখানে ‘পূর্বতন পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শোষণ এবং জেনোসাইডের’ উল্লেখ ছিল, সেখানে শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এবং সামরিক শাসনের অধীন প্রকাশিত ৮০টি পাঠ্যবইয়ে পাকিস্তানকে শত্রু হিসেবে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। বলা হয়েছে কেবল একটি অজ্ঞাত শত্রু সেনাবাহিনীর কথা। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই তারা ১৯৭৩-৭৫ সালের সংস্করণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যপুস্তক সংশোধন করে এবং বইগুলোতে শেখ মুজিবকে মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে পুনঃস্থাপন করে। অধিকন্তু তারা আত্মসমর্পণের ঠিক আগে বুদ্ধিজীবীদের হত্যার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যোগ করে এবং এই মৃত্যুর জন্য স্পষ্টভাবে জামায়াতে ইসলামীকে দায়ী করে। ২০০১ সাল নাগাদ বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসে এবং এবার তারা জিয়াউর রহমানের আমলের সংস্করণগুলো পুনঃস্থাপন করতে শেখ মুজিবের ভূমিকা আবারও কমিয়ে আনে। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এলে পাঠ্যবইগুলো নতুন করে লেখা ও পরিমার্জন করা হয়। (ইভেত ক্লেয়ার রসার, কারিকুলাম অ্যাজ ডেসটিনি: ফর্জিং ন্যাশনাল আইডেনটিটি ইন ইন্ডিয়া, পাকিস্তান অ্যান্ড বাংলাদেশ, ২০০৩)।

এ প্রসঙ্গে অসলো বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক অধ্যাপক আরিল্ড ই রুডের মতে, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলার জন্য যে পাঠ্যবইগুলো বাংলাদেশ ব্যবহার করে, সেগুলোর আকর্ষণীয় অংশ ‘কী বলা হয়েছে তাতে নয়, বরং কী বলা হয়নি’ তাতে নিহিত। কেননা কোনো দলই যুদ্ধের একটি সামগ্রিক গল্প বলে না, বরং নিজেদের আদর্শগত উদ্দেশ্যে ইতিহাসকে ব্যবহার করে। এর ফলে এ দেশের শিশুরা ইতিহাসের বিভিন্ন সংস্করণের মধ্যে দোদুল্যমান থাকে। (আরিল্ড এঙ্গেলসন রুড, ন্যারেটিভ অব জেনোসাইড: স্কুল টেক্সট বুকস অ্যান্ড দ্য ওয়ার অব লিবারেশন ইন বাংলাদেশ, ২০১৩)

এই দোদুল্যমানতার চিত্র দেখতে পাই বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের মাঝেও। একদিকে যেমন ডাকসুর এক নেতা জুলাই অভ্যুত্থানকে ব্যাখ্যা করেন দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর শেখানো আজাদির লিগ্যাসি হিসেবে, তার বিপরীতে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের ছাত্রনেতাদের পক্ষ থেকে মুক্তিযুদ্ধ ও জেনোসাইড নিয়ে তেমন কোনো জোরালো বয়ান কি শুনতে পাই আমরা? অর্থাৎ একাত্তরের জেনোসাইডের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির গুরুত্ব থাকলেও জাতীয় পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ ও জেনোসাইডের সঠিক ইতিহাস এবং এর নির্মোহ বিশ্লেষণে সামগ্রিকভাবে আমাদের আরও বেশি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ারও। নয়তো ডিনায়াল বা অস্বীকারের রাজনীতি নতুন প্রজন্মকে আরও বিভ্রান্তই করতে থাকবে।