অলংকরণ: প্রথম আলো
অলংকরণ: প্রথম আলো

আজাদি ইনকিলাব ইনসাফ

ভাষার বহু স্বর ও রাজনীতির ছায়া প্রসঙ্গ

১৯৪৭ সালের দেশভাগ কেবল একটি ভৌগোলিক বিভাজন ছিল না, এটি ছিল চেতনার, ইতিহাসের ও ভাষাগত অভ্যাসের গভীরে নেমে যাওয়া এক দীর্ঘস্থায়ী অভিঘাত। ধর্মকে রাষ্ট্রগঠনের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার যে রাজনৈতিক প্রকল্প, তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব পড়েছিল বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর। অথচ এই ভাষার জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, বিভাজন নয়, সমন্বয়ই তার প্রকৃত স্বরূপ। বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান বহু শতাব্দী পাশাপাশি বসবাস করতে করতে যে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অভিন্ন ভুবন নির্মাণ করেছিল, তা ধর্মীয় পরিচয়ের গণ্ডি অতিক্রম করে এক মানবিক ও নান্দনিক ঐক্যে পৌঁছেছিল। সেই ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘মজলুম’, ‘জালিম’, ‘মুলুক’, ‘কওম’, ‘নয়া বন্দোবস্ত’ প্রভৃতি শব্দের সাম্প্রতিক ব্যবহারকে মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের বদলে ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ন্যায়বোধের দৃষ্টিতে বিচার করা প্রয়োজন।

বাংলা ভাষার ইতিহাসের দিকে তাকালে প্রথমেই চোখে পড়ে তার বহুস্রোতসংগম চরিত্র। প্রাকৃত-আপভ্রংশের ধারায় গড়ে ওঠা এই ভাষা পাল ও সেন যুগের পর মুসলিম শাসনামলে এক নতুন পরিসরে প্রবেশ করে। আরবি-ফারসি প্রশাসনিক পরিভাষা, দরবারি রীতিনীতি, সুফি ভাবধারা ও পুঁথি সাহিত্য বাংলা ভাষার শব্দভান্ডার ও ভাবপ্রকাশে নতুন মাত্রা যোগ করে। মুসলিম শাসকগণের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্য কেবল টিকে থাকেনি; বরং বিস্তার লাভ করেছে। ইলিয়াস শাহী আমলে বাংলা ভাষার প্রতি যে সদর্থক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হয়, তা পরবর্তী কালে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষায় উন্নীত করতে সহায়তা করে। দেববন্দনার পাশাপাশি মানববন্দনার যে কাব্যরীতি মুসলিম কবিদের হাতে গড়ে ওঠে, তা বাংলা ভাষাকে সাম্প্রদায়িক সীমারেখা অতিক্রম করতে সাহায্য করে।

‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’, ‘মজলুম’, ‘জালিম’, ‘মুলুক’, ‘কওম’, ‘নয়া বন্দোবস্ত’ প্রভৃতি শব্দের সাম্প্রতিক ব্যবহারকে মূল্যায়ন করতে হলে আবেগের বদলে ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব ও সাংস্কৃতিক ন্যায়বোধের দৃষ্টিতে বিচার করা প্রয়োজন।

উনিশ শতকে নবজাগরণের প্রভাবে বাংলা ভাষা আরও এক নতুন বাঁকে পৌঁছায়। রাজা রামমোহন রায় আধুনিক চিন্তার আলোয় ধর্মীয় সংস্কার ও মানবতাবাদের যে বীজ বপন করেন, তা ভাষার যুক্তিবাদী ব্যবহারের পথ প্রশস্ত করে। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উপন্যাসের ভাষায় সংস্কৃতঘেঁষা শব্দভান্ডারকে নতুন জীবন দেন, আবার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গদ্যের প্রমিত রূপ নির্মাণে যুক্তিসংগত ও সংযত শব্দচয়নের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মাইকেল মধুসূদন দত্ত পাশ্চাত্য ছন্দ ও কাব্যরীতিকে বাংলায় আত্মীকরণ করে ভাষার সম্ভাবনাকে প্রসারিত করেন। একই সঙ্গে মীর মশাররফ হোসেন তাঁর রচনায় আরবি-ফারসি শব্দভান্ডারকে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ব্যবহার করে দেখান যে বাংলা ভাষা বহুস্বরিক হয়েই পরিপূর্ণ। লালনের গানে ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে মানবধর্মের যে উচ্চারণ, তা শব্দচয়নের ক্ষেত্রেও এক মুক্ত ভুবন নির্মাণ করে। কাঙাল হরিনাথ মজুমদার গ্রামীণ জীবনের ভাষাকে সাহিত্যে স্থান দেন। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাবজগৎ ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিতে বাংলা ভাষা এক বিশ্বমানবিক ব্যঞ্জনা অর্জন করে। আর কাজী নজরুল ইসলাম আরবি-ফারসি-সংস্কৃত-দেশজ শব্দকে একসঙ্গে মিশিয়ে যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেন, তা প্রমাণ করে শব্দের কোনো ধর্ম নেই, আছে কেবল তার সুর, শক্তি ও প্রয়োগের প্রাসঙ্গিকতা।

দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে রাষ্ট্রভাষা নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়, তা ভাষাকে সরাসরি রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। বাংলা ভাষা সেখানে কেবল সাহিত্যিক বা সাংস্কৃতিক মাধ্যম নয়, আত্মপরিচয় ও অধিকার রক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই সময়ে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বাংলা ভাষার স্বাতন্ত্র্য ও ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। মাওলানা আকরাম খাঁ ধর্মীয় পরিচয়কে অতিক্রম করে বাংলা ভাষার মর্যাদার প্রশ্নে সোচ্চার হন। ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করে ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এনামুল হক, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ বুদ্ধিজীবী ভাষার প্রমিত রূপ নির্মাণে অসাম্প্রদায়িক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির চর্চা করেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় বাংলা ভাষা আরবি-ফারসি-সংস্কৃত-ইংরেজি-দেশজ নানা উৎস থেকে আগত শব্দকে স্বাভাবিকীকরণ করে এক বিস্তৃত শব্দভান্ডারের অধিকারী হয়।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ‘আজাদি’, ‘ইনকিলাব’, ‘ইনসাফ’ ইত্যাদি শব্দগুলোর প্রশ্নটি মূলত ভাষাতাত্ত্বিক নয়; বরং রাজনৈতিক ও মানসিক। ভাষাতত্ত্বের বিচারে শব্দের উৎস তার গ্রহণযোগ্যতার একমাত্র মানদণ্ড হতে পারে না। বাংলা ভাষায় হাজারো আরবি-ফারসি শব্দ এমনভাবে মিশে গেছে যে তাদের উৎস নিয়ে সচরাচর ভাবা হয় না—দুনিয়া, হিসাব, দরকার, আদালত, খবর, সাহস, সময়; এসব শব্দ আজ সম্পূর্ণ বাঙালি শব্দ। তাহলে ‘ইনসাফ’ বা ‘মজলুম’ কেন অস্বাভাবিক হবে? আবার ‘ইনকিলাব’ শব্দটি কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়, তা বিদ্রোহ, নবজাগরণ ও পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। ‘আজাদি’ স্বাধীনতার আরেক রূপ, যার ধ্বনিগত ও আবেগগত আবেদন ভিন্ন হলেও তা পরাধীনতার বিরুদ্ধে মানুষের চিরন্তন আকাঙ্ক্ষাকেই ব্যক্ত করে।

বাংলা ভাষায় হাজারো আরবি-ফারসি শব্দ এমনভাবে মিশে গেছে যে তাদের উৎস নিয়ে সচরাচর ভাবা হয় না—দুনিয়া, হিসাব, খবর, সাহস, সময়; এসব শব্দ আজ সম্পূর্ণ বাঙালি শব্দ। তাহলে ‘ইনসাফ’ বা ‘মজলুম’ কেন অস্বাভাবিক হবে?

তবে সমস্যাটি অন্যত্র। কোনো শব্দ যদি সচেতনভাবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক পরিচয় জাহির করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা ভাষার স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার নতুন নয়, ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ভাষাকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছে। পূর্ব পাকিস্তানে উর্দুকে প্রাধান্য দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল তেমনই এক রাজনৈতিক প্রকল্প। ফলে আরবি-ফারসি-উর্দু উৎসের শব্দ নিয়ে স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই সংবেদনশীলতা যদি ভাষার বহুত্ববাদী ঐতিহ্য অস্বীকার করে, তবে তা ইতিহাসবিরোধী হবে।

বাংলা ভাষার শক্তি তার অভিযোজন ক্ষমতায়। এই ভাষা সংস্কৃত তৎসম শব্দ যেমন গ্রহণ করেছে, তেমনি তদ্ভব, দেশজ, আরবি-ফারসি, পর্তুগিজ, ইংরেজি, এমনকি অস্ট্রিক ও দ্রাবিড় উৎসের শব্দও আত্মীকরণ করেছে। ‘নয়া বন্দোবস্ত’ শব্দবন্ধটির দিকে তাকালেই বোঝা যায় ‘নয়া’ ফারসি, ‘বন্দোবস্ত’ ফারসি-উর্দু; কিন্তু এর ব্যবহার বাংলায় দীর্ঘদিনের। ভাষা যখন কোনো শব্দকে গ্রহণ করে, তখন তাকে ধ্বনিগত ও ব্যাকরণগতভাবে নিজের ছাঁচে ঢেলে নেয়। ফলে শব্দটি আর বহিরাগত থাকে না, হয়ে ওঠে স্বদেশি।

এখানে একটি নান্দনিক প্রশ্নও আছে। সাহিত্যিক বা বাগ্মিতার ক্ষেত্রে শব্দের নির্বাচন নির্ভর করে তার ব্যঞ্জনা, সুর ও প্রাসঙ্গিকতার ওপর। ‘ইনসাফ’ শব্দটি যে আবেগময় ন্যয়বোধ জাগায়, ‘ন্যয়বিচার’ শব্দটি তার তুলনায় অধিক আনুষ্ঠানিক। আবার ‘মজলুম’ শব্দে যে আর্তি ও বঞ্চনার সুর, ‘নিপীড়িত’ শব্দে তা ভিন্নরূপে প্রকাশিত হয়। সাহিত্যিক স্বাধীনতা এই বৈচিত্র্যকে স্বাগত জানান। কবি বা লেখক শব্দের উৎস নয়, তার শক্তি ও প্রয়োগের সম্ভাবনাকে বিবেচনা করেন। নজরুল যেমন ‘ইনকিলাব’ উচ্চারণে বিদ্রোহের আগুন জ্বালিয়েছেন, তেমনি রবীন্দ্রনাথ সংস্কৃতঘেঁষা শব্দে মানবতাবাদী চেতনা প্রকাশ করেছেন। উভয়ই বাংলা ভাষার সম্পদ।

‘ইনসাফ’ শব্দটি যে আবেগময় ন্যয়বোধ জাগায়, ‘ন্যয়বিচার’ শব্দটি তার তুলনায় অধিক আনুষ্ঠানিক। আবার ‘মজলুম’ শব্দে যে আর্তি ও বঞ্চনার সুর, ‘নিপীড়িত’ শব্দে তা ভিন্নরূপে প্রকাশিত হয়।

অতএব, উল্লিখিত শব্দগুলোর ব্যবহারকে অস্বাভাবিক বলা যায় না, যদি তা স্বাভাবিক ভাষাচর্চার অংশ হয় এবং কোনো সম্প্রদায়গত আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে না হয়। রাজনৈতিক আগ্রাসন তখনই ঘটে, যখন ভাষাকে একমুখী করা হয়—কখনো সংস্কৃতায়নের মাধ্যমে, কখনো উর্দুকরণের মাধ্যমে। সমাধান নিহিত আছে বহুত্ববাদী চর্চায়। বাংলা ভাষার প্রমিত রূপকে এমনভাবে লালন করতে হবে, যাতে সব উৎসের শব্দ প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তিতে স্থান পায়। শিক্ষা, সাহিত্য ও গণমাধ্যমে শব্দের ব্যবহার হওয়া উচিত অর্থবহ ও সংযত, উৎসের ভিত্তিতে বর্জন বা প্রাধান্য দেওয়া নয়।

ভাষা কোনো স্থির সত্তা নয়, তা চলমান, পরিবর্তনশীল এবং সমাজ-ইতিহাসের প্রতিফলন। আজকের তরুণ প্রজন্ম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে ভাষা ব্যবহার করছে, সেখানে দেশি-বিদেশি শব্দের এক মিশ্র রূপ দেখা যায়। এই প্রবণতাকে ভয় না পেয়ে তার ভেতর থেকে সৃজনশীল শক্তিকে আহরণ করতে হবে। ভাষার স্বাভাবিক বিবর্তনকে স্বীকার করেই তার নান্দনিক ও ব্যাকরণগত শৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে।

সবশেষে বলা যায়, আজাদি, ইনকিলাব, ইনসাফ, মজলুম, জালিম, মুলুক, কওম, নয়া বন্দোবস্ত—শব্দগুলো বাংলা ভাষায় ব্যবহার করা যৌক্তিক কি না—এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। যদি এগুলো ভাষার ঐতিহাসিক বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায়, প্রাসঙ্গিক ও নান্দনিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে তা স্বাভাবিক এবং সমৃদ্ধিকর। কিন্তু যদি সেগুলো বিভাজনের রাজনীতিকে উসকে দিতে ব্যবহৃত হয়, তবে তা ভাষার নয়, মানসিকতার সংকটের লক্ষণ। সমাধান তাই নিষেধাজ্ঞায় নয়, চর্চায়, বর্জনে নয়, সমন্বয়ে। বাংলা ভাষার আত্মা যে মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক ঐক্যে গঠিত, তাকে ধারণ করেই আমাদের শব্দচয়ন ও ভাষাবোধকে এগিয়ে নিতে হবে। তাহলেই ভাষা আবারও প্রমাণ করবে—তার কোনো ধর্ম নেই, আছে কেবল মানুষের মুক্ত চিন্তা ও হৃদয়ের স্পন্দন।