গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গ্রাফিকস: প্রথম আলো

মফিদুল হকের লেখা

জননী সাহসিকা উষারানী দেবী ও বাংলার প্রতীকী উদ্ভাসন

প্রায় ২৭ বছর আগে ১৯৯৯ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনে মফিদুল হকের এই নিবন্ধটি প্রথম ছাপা হয়েছিল। আমাদের বহু মূল্যবান লেখা শুধু মুদ্রণের পাতায় রয়ে গেছে; তেমনি একটি লেখা এই—‘জননী সাহসিকা উষারানী দেবী ও বাংলার প্রতীকী উদ্ভাসন’।

স্বাধীনতা দিবস ও মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে অনলাইনপূর্ব যুগে যত লেখা, সাক্ষাৎকার, স্মৃতিচারণ ও কবিতা ছাপা হয়েছিল, স্বাধীনতার পুরো মাসজুড়ে সেসব ধুলোঝরা পৃষ্ঠা আমরা প্রথমবারের মতো অনলাইনে তুলে আনছি।

উষারানী দেবীর জীবনকথা জানবার পর সেই জীবনসত্য অন্যের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ার তাগিদ অনুভব না করে পারা যায় না। দূর মফস্‌সলের সাধারণ এক নারী তিনি, কিন্তু সমাজের সত্য তো সাধারণের মধ্যেই পায় সহজ আশ্রয় এবং প্রাত্যহিকতার ধারা বেয়েই চলে সাধারণের অনন্য হয়ে ওঠার সাধনা। আবার এই প্রক্রিয়ার এমন এক সহজিয়া ভঙ্গি ও আড়াল থাকে যে অনেক সময় বিশিষ্ট ভূমিকা গ্রহণের মাহাত্ম্য সাদামাটা চোখে কিংবা বলা চলে জীবনের চলার পথে আহরিত ধূলিকণা দ্বারা আচ্ছন্ন দৃষ্টিতে, সাধারণের এমনি অসাধারণ হয়ে ওঠার উজ্জ্বল্য, ধরা পড়ে না। সর্বোপরি উষারানী দেবীর পরিবার ও জীবনে অনেকগুলো প্রতীকী ব্যঞ্জনার দেখা মেলে। এসব প্রতীকের মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায় ব্যক্তির গভীরে যে সমাজসত্যের অধিবাস তারই উদ্ভাসন। ক্রমান্বয়েই আমরা গ্রহণ করব এমনি প্রতীকের পরিচয়।

মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের পক্ষ থেকে উষারানী দেবীকে সংবর্ধিত করার সময় তাঁকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘বীর নারী’ হিসেবে এবং এই বীরত্বের সন্ধান মিলবে কোনো জঙ্গি ঘটনা বা সংঘর্ষতায় নয়, বরং আটপৌরে জীবনে হঠাৎ নেমে আসা হিংস্র ও ভয়াবহ সামরিক অভিঘাতের মোকাবিলায় এক সাধারণ নারীর নিত্যকার জীবনযাপনে জননী সাহসিকা হওয়ার মধ্যে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সংবর্ধনাপত্রে বলা হয়েছিল:

কিশোরগঞ্জের বীর নারী উষারানী দেবীকে সম্মান জানাবার মাধ্যমে একই সঙ্গে সম্মান ও শ্রদ্ধা নিবেদন করা হচ্ছে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে অবদান-রচনাকারী লক্ষ লক্ষ নারীর প্রতি, যাঁরা চরম দুঃখ-কষ্ট-নির্যাতন ভোগ সত্ত্বেও দেশ ও সমাজের প্রতি কর্তব্যে ছিলেন অটল এবং যাঁদের নানামুখী সাহসিক ও সংগ্রামী ভূমিকা প্রায়শ থেকে গেছে অজ্ঞাত ও অকীর্তিত। নারীসমাজের এই মহৎ ভূমিকার ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতার চমৎকার প্রকাশ ঘটেছে উষারানী দেবীর জীবনের দুঃখময় ঘটনাধারা ও সাহসিক পদক্ষেপে।

কিশোরগঞ্জের বিখ্যাত পণ্ডিত পরিবারে উষারানী দেবীর জন্ম। তাঁর ঠাকুরদা কালীকুমার পণ্ডিত কবিরাজ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ‘কালীকুমার ফকির’ নামেই তিনি অধিক পরিচিত ছিলেন। এই পরিচিতি অর্জনের পেছনে তাঁর জীবনদর্শনের বড় ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন একাধারে সিদ্ধাচার্য পুরুষ ও কোরানে হাফেজ। তান্ত্রিক দর্শনে সিদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি তিনি মইনটের ‘শাহ পরান শাহ ফকির’-এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর বসতবাড়িতে তাই যেমন ছিল পূজামণ্ডপ, তেমনি ছিল ফকিরের দরগা। সেখানে গৃহদেবতার বাৎসরিক পূজা যেমন হতো, তেমনি হতো শাহ পরানের উরস। তাঁর ইচ্ছানুযায়ী এই আচার পণ্ডিত-পরিবার আজও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে চলেছে। বাংলার উদারবাদী লোকধর্ম চেতনার ধারক এই সিদ্ধপুরুষ শতায়ু লাভ করেছিলেন এবং একাত্তরে পাকবাহিনী তাণ্ডব ও পরাজয়ের সাক্ষী হয়েছিলেন।

উষারানী দেবীকে সংবর্ধিত করার সময় তাঁকে অভিহিত করা হয়েছিল ‘বীর নারী’ হিসেবে এবং এই বীরত্বের সন্ধান মিলবে কোনো জঙ্গি ঘটনা বা সংঘর্ষতায় নয়, বরং আটপৌরে জীবনে হঠাৎ নেমে আসা হিংস্র সামরিক অভিঘাতের মোকাবিলায় এক সাধারণ নারীর নিত্যকার জীবনযাপনে জননী সাহসিকা হওয়ার মধ্যে।

সিদ্ধপুরুষ পরিচিতি লাভ করা কোনো সহজ কর্ম নয়। দেহাত্ম সাধনার অনেকগুলো স্তর অতিক্রম করেই কেউ সিদ্ধাচার্য হতে পারেন। লোকশ্রুতি রয়েছে এমনি ব্যক্তিত্বরা হয়ে থাকেন ত্রিকালদর্শী। সে হোক বা না হোক, ধর্মসাধনার দীর্ঘ পথ যে তাঁদের পাড়ি দিতে হয়েছে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। সত্যিকারভাবে ধর্মের গভীরে যাঁরা ডুব দেন, ধর্মাচারে ভিন্নতা তাঁদের দৃষ্টিতে গৌণ হয়ে পড়ে। তাই যিনি সিদ্ধাচার্য তিনি একই সঙ্গে হতে পারেন কোরানে হাফেজ, কেননা ইসলাম ধর্মের প্রতিও তাঁর গভীর শ্রদ্ধা ও অনুরাগ। আর এটাও তো বোধগম্য, কোরানে হাফেজও কেউ চাইলে চট করে হতে পারেন না, এর জন্যও সাধনার দীর্ঘ পথ পার হতে হয়। এই অনুপ্রেরণা যে শাহ পরান শাহের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন কালীকুমার পণ্ডিত, সেটাও বাংলায় ইসলাম বিস্তারের ইতিহাসে সুফি সাধকদের উদার সমন্বয়বাদী চিন্তার পরিচয় বহন করে। বাংলার লোকায়ত জীবনের এমনি বৈশিষ্ট্য খুব সহজে মুছে যাওয়ার নয়। আজকের মৌলবাদী আস্ফালনের যুগে এই সত্য আরও বড়ভাবে আমাদের অবলম্বন করতে হয়। বাংলা ভাষায় কোরান শরিফের প্রথম অনুবাদক যে মুসলিম সম্প্রদায়ের একান্ত প্রিয় অমুসলিম ভাই গিরিশচন্দ্র, সেটাও তো ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার নয়। তাই উষারানী দেবীর পারিবারিক পটভূমিকায় আমরা দেখতে পাই লোকধর্মের এক মহৎ ঐতিহ্যের প্রতীকী উদ্ভাসন।

উষারানী দেবীর পিতা জগদীশ চন্দ্র পণ্ডিত ছিলেন সফল ব্যবসায়ী এবং কিশোরগঞ্জের প্রথম বিড়ির কারখানার প্রতিষ্ঠাতা। ১৯৬৫ সালে নীরদরঞ্জন পণ্ডিতের সঙ্গে উষারানী দেবীর বিয়ে হয়। নীরদরঞ্জনের পিতা হরিচরণ পণ্ডিত পৌরোহিত্য করতেন। তাঁদের একটি পানের বরজও ছিল। মধ্যবিত্ত পরিবার-প্রধান হরিচরণ পুত্র-কন্যাদের লেখাপড়ার প্রতি বিশেষ যত্নশীল ছিলেন। জ্যেষ্ঠ পুত্র নীরদরঞ্জন বরাবরই মেধাবী ছাত্র ছিলেন। অঙ্কে তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ ও দক্ষতা। যাদবের পাটিগণিত তাঁর প্রায় মুখস্থ ছিল আর কে পি বসুর অ্যালজেব্রার সমাধান করে দিতেন প্রায় চোখ বুজেই।

১৯৬২ সালে নীরদরঞ্জন ম্যাট্রিক পাস করেন প্রথম বিভাগে। ১৯৬৪ সালে কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজ থেকে আইএসসি পরীক্ষা দিয়ে প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরীক্ষার ফি জমা দেওয়ার জন্য তাঁকে মায়ের অনন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল। এই কৃতী ছাত্রের সঙ্গে উষারানী দেবীর বিয়ে হয় ১৯৬৫ সালে। বিয়ের পর নীরদরঞ্জন পণ্ডিত ১৯৬৭ সালে উক্ত কলেজ থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় বিএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। সেই বছর থেকে স্কুলশিক্ষক হিসেবে নীরদরঞ্জন পণ্ডিত তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। প্রথমে তিনি যোগ দেন ভৈরব জয়সূত্রী বিদ্যালয়ে। পরের বছর কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সরকারি স্কুলের শিক্ষক হিসেবে তাঁকে খুলনা বদলি করা হলে তিনি চাকরিতে ইস্তফা দিতে বাধ্য হন। কেননা, বাড়িতে থেকে শিক্ষকতা করে তিনি যেমন ভাইদের পড়ার খরচ জোগাতেন, তেমনি নিজেও প্রাইভেট পরীক্ষা দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ১৯৭০ সালে তিনি অঙ্কে এমএসসি প্রিলিমিনারিতে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে অংশ নিয়েছিলেন। ইতিমধ্যে ১৯৬৭ সালে নীরদরঞ্জন ও উষারানীর বড় মেয়ে শিউলিরানী দেবী এবং ১৯৬৯ সালে দ্বিতীয় মেয়ে গৌরী রানী দেবীর জন্ম হয়।

বিখ্যাত পণ্ডিত পরিবারে উষারানী দেবীর জন্ম। তাঁর ঠাকুরদা কালীকুমার পণ্ডিত কবিরাজ হিসেবে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ‘কালীকুমার ফকির’ নামেই তিনি অধিক পরিচিত ছিলেন। এই পরিচিতির পেছনে তাঁর জীবনদর্শনের বড় ভূমিকা ছিল। তিনি ছিলেন একাধারে সিদ্ধাচার্য পুরুষ ও কোরানে হাফেজ।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকবাহিনী আকস্মিক গণহত্যাভিযান শুরু করলে ঘোষিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং সূচিত হয় জাগ্রত জনতার সশস্ত্র স্বাধীনতার সংগ্রাম। বাংলার মানুষকে চিরতরে দাসত্বের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলতে পাকবাহিনীর কালো থাবা ও হত্যালীলা ক্রমেই বিস্তৃতি অর্জন করতে থাকে প্রত্যন্ত এলাকায় এবং গোটা দেশবাসীর জীবনযাত্রা তছনছ করে দেয়। উষারানী দেবীর পিতা জগদীশচন্দ্র পণ্ডিত শত্রুদের নজরে পড়ায় শহর ছাড়তে বাধ্য হন। তিনি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে অনেককে সঙ্গে নিলেও সবাইকে নেওয়া সম্ভব হয়নি। বৃদ্ধ কালীকুমার পণ্ডিত তখন পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী। উষারানী তখন অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর স্বামীর পরিবারের সদস্যদেরও নড়বার উপায় ছিল না। এমনি সময়ে ২২ মে শুক্রবার শেষ রাতে বাড়িতে মিলিটারি হানা দেয় এবং দুই পরিবারের ১০ জন সদস্যকে ধরে মারতে মারতে ডাকবাংলোর আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে অকথ্য নির্যাতনের পর রাতে ট্রাকে করে সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাটে নিয়ে তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়। বাংলার লাখো শহীদের শোণিতধারার সঙ্গে মিশে গেল আরও আট শহীদের রক্ত।

সেই রাতে শহীদ হয়েছিলেন আটজন, কেননা ধৃত ১০ জনের মধ্যে ২ জন ছাড়া পেয়েছিলেন। এঁরা হলেন উষারানী দেবীর এক কাকা মণীন্দ্রচন্দ্র পণ্ডিত এবং আরেকজন দূরসম্পর্কের জ্যাঠতুতো ভাই রবিঠাকুর পণ্ডিত, যিনি কবিরাজি করে কায়ক্লেশে সংসার চালাতেন। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে উষারানী দেবী আপন অভিজ্ঞতার যে স্বহস্ত-লিখিত ৫০ পৃষ্ঠার বিবরণী প্রদান করেছেন সেখান থেকে এই ছাড়া পাওয়ার ঘটনার উদ্ধৃতি দেওয়া যায়:

বাবারা কাকাতো ভাই মণীন্দ্রচন্দ্র পণ্ডিতের সঙ্গে এক মুসলিম মহিলার প্রণয় ছিল। ভদ্রমহিলা ছিলেন দারুণ সাহসী। তিনি খবর পেয়ে সে রাতেই সমস্ত ভয়ভীতি-লাঞ্ছনা উপেক্ষা করে ডাকবাংলোয় গিয়ে পাকিস্তানি মেজরের সঙ্গে দেখা করে তাঁদের সবাইকে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করেন। তিনি মণীন্দ্র কাকাকে তাঁর স্বামী বলে পরিচয় দেন এবং কনভার্টেড হবে বলে আশ্বাস দেন। দুজন কুখ্যাত দালাল মোসাহেব তখন সেখানে উপস্থিত ছিল। তারাও সুপারিশ করে বলে যে যেহেতু মুসলমান হবে তাই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া যায়। আর রবিঠাকুর গরিব মানুষ, গ্রামের লোকদের চিকিৎসা করে, ও না থাকলে গ্রামের মানুষ বিনা চিকিৎসায় মারা যাবে; এই সব সুপারিশে পরে তাদের দুজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল।

উষারানী তখন অন্তঃসত্ত্বা। তাঁর স্বামীর পরিবারের সদস্যদেরও নড়বার উপায় ছিল না। এমনি সময়ে ২২ মে শুক্রবার শেষ রাতে বাড়িতে মিলিটারি হানা দেয় এবং দুই পরিবারের ১০ জন সদস্যকে ধরে ডাকবাংলোর আর্মি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। রাতে ট্রাকে করে সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ি ঘাটে নিয়ে তাঁদের গুলি করে হত্যা করা হয়।

অসমসাহসী এই মুসলিম মহিলার নাম লতা। তাঁর প্রতিও শ্রদ্ধায় আমাদের মাথা নত হয়ে আসে। তিনি ভালোবাসার টানে তাঁর প্রিয়জনকে বাঁচাতে যেমন ছুটে গিয়েছিলেন পাকিস্তানি ক্যাম্পে, তেমনি কেবল স্বার্থের কথা ভাবেননি, আটক ১০ জনকেই সাধারণ নিরীহ মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে ছাড়িয়ে আনতে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তিনি এ কাজে পুরোপুরি সফলকাম হতে পারেননি, তবে মণীন্দ্রচন্দ্র ও রবিঠাকুরকে ছাড় করাতে পেরেছিলেন। আজ এই ভদ্রমহিলা বেঁচে নেই, দুই বছর আগে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আর্মি ক্যাম্পে ধৃত ব্যক্তিদের ওপর পাকবাহিনীর অত্যাচার প্রত্যক্ষ করেছিলেন এই ভদ্রমহিলা। পরে তাঁর কাছ থেকে এসব কথা শুনেছিলেন উষারানী দেবী। আরও জেনেছিলেন মণীন্দ্র কাকা ও রবিঠাকুরের কাছে। তিনি লিখেছেন: ‘বাকি আটজনকে সারা দিন অমানুষিক নির্যাতনের পর আধমরা অবস্থায় রাত ১০টায় পাটুয়াডাম সংলগ্ন সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়ির ঘাটের কাছে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে। তাঁদের মধ্যে বড় কাকা ক্ষিতিশচন্দ্র পণ্ডিত, পিসেমশাই নগেন্দ্রচন্দ্র রায় ও আমার স্বামী শিক্ষক নীরদরঞ্জন পণ্ডিতকে বেদম প্রহার করেছে। পাকা মেঝেতে শুইয়ে দুহাত ও দুপা ছড়িয়ে হাতে পায়ে বুট দিয়ে লাথির পর লাথির আঘাতে জর্জরিত করেছে। বেত মেরে সারা শরীর ক্ষতবিক্ষত করেছে। মাথায় লাথির আঘাতে নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরেছে। শরীরের ক্ষতস্থান থেকে রক্ত ঝরেছে। তবুও মেরে চলেছে, থেমে থেমে মেরেছে সারা দিন। পিটানোর সময় নাকি জল্লাদেরা বলেছে, রবিঠাকুরের ভাষ্য অনুযায়ী, “শিক্ষিত হ্যায়? নোকরি করতে হে? পণ্ডিতকা চেলা হ্যায়? এনিমি হ্যায়? সব কো খতম করে দে গা!” বড় কাকাকে হাতে পায়ে পিঠে বন্দুক দিয়ে মেরেছে আর বলেছে, “বাতা ও ভাই কাহা গিয়া? বাতাও জগদীশ কাহা? বাতাও মুক্তি কাহা?” সারা দিন কঠোর নির্যাতনের পর রাত আটটায় তাঁদের একটি করে শুকনো রুটি আর গোমাংস খেতে দিয়েছে। পিসেমশাই আর আমার স্বামী অচৈতন্য অবস্থায় পড়ে ছিল। যারা খেতে চায়নি তাঁদের কপালে আরও মার জুটলো। পায়খানার বদনার নল দিয়ে মুখে পানি ঢেলে খেতে দিয়েছে। আর বলেছে, “পানি পিলো, আখেরী পানি পিলো।”’

এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শুরু হয় উষারানী দেবীর আরেক জীবনসংগ্রাম। অবরুদ্ধ কিশোরগঞ্জ শহরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন উষারানী দেবী। কেননা, পরিবারে আর কোনো পুরুষ-প্রধান নেই, অথচ ছোট-বড় মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা তো কম নয়। তদুপরি বৃদ্ধ ঠাকুরদার সেবাযত্নের প্রশ্ন তো বিশেষ জরুরি। নৃশংসতা ও বর্বরতায় উন্মত্ত পাকবাহিনীর করতলগত শহরে এক সাধারণ হিন্দু তরুণীর বসবাস যে সহজ ও স্বাভাবিক ছিল না সেটা অনুমান করা যায়। কতক সুহৃদ মুসলিম পরিবার যে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল সেটা মানসিক আশ্রয় জোগালেও নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা তো তাতে মেলে না। নিরাপত্তার প্রশ্নটি কড়া মূল্যও আদায় করে নিল এবং স্থানীয় দালাল ও রাজাকারের হামলা থেকে রেহাই পেতে ও শান্তি কমিটির সদস্যদের চাপে শেষ পর্যন্ত ধর্মান্তরণে বাধ্য হলেন উষারানী। এমনি নিষ্ঠুর ধর্মান্তরণ একাত্তরে অবরুদ্ধ বাংলাদেশে অনেক ঘটেছিল, যদিও এসব নিয়ে আলোচনা বিশেষ দেখা যায় না। এই ধর্মান্তরণ অর্থহীনও বটে, অন্তত ধর্মের মানবিক ভিত্তির সঙ্গে এর তো কোনো রকম যোগসূত্রই নেই। তাত্ত্বিক বিচারে গুরুত্বহীন মনে হলেও যে মানুষের জীবনে ধর্মান্তরণের এই বাধ্যবাধকতা ও উপায়হীনতা নেমে আসে, তাঁর মানসিক পীড়ন মোটেই গুরুত্বহীন নয়। দুর্গম ভাটি অঞ্চলে আত্মগোপনরত পিতা, কন্যার অসহায়ত্ব ভালোভাবেই বুঝেছিলেন। পিতা জগদীশচন্দ্র পণ্ডিত যে কালীকুমার ফকিরেরই পুত্র, সেটার পরিচয় পাওয়া যায় এই খবর শুনে তাঁর প্রেরিত পত্রে। তিনি খবরটি জেনেছিলেন বেশ কিছুদিন পরে এবং সংক্ষিপ্ত পত্রে কন্যাকে লিখেছিলেন, ‘স্নেহের উষারানী দেবী, আশীষ নিও। শুনিতে পারিলাম তুমি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়াছ। ধর্মের মধ্যে ইসলাম শ্রেষ্ঠ ধর্ম। ইহাতে আমার কোনো আপত্তি নাই। অদ্য হইতে আমি হিন্দুস্তানের পথে রওনা হইলাম। আমার স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি তুমি ভোগদখল ও বিক্রি করিতে পারিবে।’

২৮ জুলাই বিকেল ৪টায় পিতার মৃত্যুর দুমাস পর শহীদ নীরদরঞ্জন পণ্ডিতের পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। জন্মকালে ডাক্তার-নার্সের জন্য ছুটোছুটি, যথোপযুক্ত শুশ্রূষার ব্যবস্থা করা এসব দায়িত্ব বর্তেছিল পিতার দোকানের কর্মচারী পরিবারের সদস্য-সম মেস্ত্রী কাকার ওপর। কার্ফু-পীড়িত শহরে অনেক ঝুঁকি নিয়ে তিনি এসব কাজ করেছিলেন। জন্মকালে হিন্দু রীতি অনুযায়ী নবজাতককে জোকার দেওয়ার মতো কোনো ধর্মগুরু আশপাশে ছিলেন না। মেস্ত্রী কাকা তাই নবজাতককে এই পৃথিবীতে স্বাগত জানাতে তার কানে আজানের ধ্বনি দিলেন। কী প্রবল শুভকামনাই না জড়িয়ে ছিল এই আজানের ধ্বনিতে! পরে খোঁজখবর করে লোক জোগাড় করে হিন্দু রীতির ধর্মাচার পালন করা হয়েছিল। অবরুদ্ধ কিশোরগঞ্জে শহীদ নীরদরঞ্জনের পুত্র জন্ম নিল যেন মুক্তিযুদ্ধের অগ্নিপরীক্ষায় স্নাত আসন্ন নতুন বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ধর্মচেতনাকে বরণ করে। আজানের সুর ও হিন্দু ধর্মাচারের মিলনে এই মহীয়ান জন্মও তো প্রতীকী ব্যঞ্জনায় ভাস্বর।

এই নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর থেকে শুরু হয় উষারানী দেবীর আরেক জীবনসংগ্রাম। অবরুদ্ধ কিশোরগঞ্জ শহরে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন উষারানী দেবী। কেননা, পরিবারে আর কোনো পুরুষ-প্রধান নেই, অথচ ছোট-বড় মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা তো কম নয়। তদুপরি বৃদ্ধ ঠাকুরদার সেবাযত্নের প্রশ্ন তো বিশেষ জরুরি।

বড় সংসারের হাল ধরার জন্য উষারানী দেবী বিশ্রামের বিশেষ সুযোগ পান না। এক মাসের মধ্যে স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতার কাজে যোগ দেন। এই স্কুলেই হঠাৎ একদিন হাজির হলেন কুখ্যাত মেজর ইফতেখার। উপায়ান্তর না দেখে প্রিন্সিপাল নাজমলি বেগম উষারানী দেবীর পরিচয় করিয়ে দিলেন কনভার্টেড মুসলিম বলে। এর কয়েক দিন পর ডাকবাংলোর দপ্তরে তাঁকে দেখা করার জন্য খবর পাঠায় মেজর ইফতেখার। বাঙালি মহকুমা প্রশাসক গোপনে জানিয়েছিলেন, যদি না আসে তবে মেয়েটিকে যেন দূরে কোথাও পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

উষারানী দেবীর একা দূরে সরে যাওয়ার উপায় ছিল না। সংসারে তখন অনেকগুলো মুখ। তাঁর যৎসামান্য আয়ের ওপর সবাই নির্ভরশীল। শেষ পর্যন্ত সাহস করে হানাদারদের গুহায় ঢুকতে মনস্থ করলেন উষারানী দেবী। সঙ্গে নিলেন দীর্ঘদিনের পারিবারিক সহচর মেস্ত্রী কাকাকে আর তাঁর কোলে দিলেন ছোট মেয়েটিকে। ডাকবাংলোর অফিস ঘরে পাকবাহিনীর কুখ্যাত মেজরের সঙ্গে কথা বলার সময় উষারানী দেবীর মন তোলপাড় হচ্ছিল তাঁর স্বামী ও নিকটজনদের শেষ দিনগুলো কল্পনা করে। তা সত্ত্বেও হানাদারদের গুহার ভেতরে তিনি মনের স্থিরতা হারাননি। তিনি তাঁর ভাষ্যে লিখেছেন :

মেস্ত্রী কাকার সঙ্গে মেজরের কথা বলার সময় আমি চেয়ে এদিক-ওদিক দেখছিলাম কোথায় তাঁদের মারধর করেছিল। দরজা-জানালায় সব পর্দা টানা ছিল। রবিঠাকুরের বর্ণনা অনুযায়ী এটি সে ঘর নয়। কিন্তু যা চোখে পড়ল তা অমূল্য তথ্য। দেয়ালের বাঁ দিকে কিশোরগঞ্জের একটি মানচিত্র। ভৈরব থেকে শুরু করে হাওর এলাকা ব্যতীত সবগুলো স্থানের নামের আগে লাল গোল ছোপ আঁকা রয়েছে। মানচিত্রে শুধু থানাগুলোর নাম লেখা ছিল। এতে তাড়াইল, নিকলি, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম এই পাঁচটি থানার নামের আগে কোনো চিহ্ন ছিল না। বুঝতে পারলাম এগুলো হাওর এলাকা। কিন্তু চিহ্নের অর্থ কিছুই বুঝলাম না।

দেয়ালের ম্যাপ আর লাল ছোপের অর্থ বোঝার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন উষারানী দেবী। তাঁর মনে হচ্ছিল মুক্তিবাহিনীর জন্য কোনো জরুরি তথ্য কি আছে এই ম্যাপে? পাক হানাদারদের ম্যাপে তাদের যুদ্ধ-কৌশলের কোনো পরিচয় আছে কি?

ক্যাম্প থেকে বের হয়ে সন্ধ্যায় উষারানী দেবী ছুটে গেলেন মহকুমা অফিসারের বাসায়। কথা প্রসঙ্গে জানালেন লাল ছোপ চিহ্ন যেসব জায়গায় অঙ্কিত নেই সেখানে মিলিটারি এখনো যায়নি, তবে খুব শিগগিরই তারা এই অপারেশনে যাচ্ছে। অর্থাৎ মিলিটারি এখন ভাটি অঞ্চলে অবস্থান নিতে যাচ্ছে।

ঘরে ফিরে সেই রাতেই বাবাকে চিঠি পাঠালেন উষারানী দেবী। ভাটি অঞ্চল ছেড়ে ভারতে চলে যাওয়ার জন্য তাগিদ দিয়ে এই চিঠি পাঠালেন মেস্ত্রী কাকাকে দিয়ে। তার চেয়েও যা জরুরি মনে করেছিলেন সেটা হচ্ছে ভাটি এলাকায় পাকবাহিনীর আসন্ন অপারেশন সম্পর্কে সেখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের সতর্ক করে দেওয়া। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার হামিদ ভাইকে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সাংকেতিক চিঠি পাঠালেন বাবার মারফত। ধরা পড়লেও শত্রুপক্ষ যেন চিঠির কথা বুঝতে না পারে সে জন্য সাংকেতিক কোড অবলম্বন করলেন তিনি। রোমান হরফে গোপন কোডে লেখা এই সংক্ষিপ্ত চিঠির ভাষা ছিল নিম্নরূপ:

হামিদ ভাই,

ভাটি এলাকায় অপারেশন হবে তাড়াতাড়ি।
সাবধান।

উষা

দেয়ালের ম্যাপ আর লাল ছোপের অর্থ বোঝার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়েছিলেন উষারানী দেবী। তাঁর মনে হচ্ছিল মুক্তিবাহিনীর জন্য কোনো জরুরি তথ্য কি আছে এই ম্যাপে? পাক হানাদারদের ম্যাপে তাদের যুদ্ধ-কৌশলের কোনো পরিচয় আছে কি? ক্যাম্প থেকে সন্ধ্যায় উষারানী দেবী ছুটে গেলেন মহকুমা অফিসারের বাসায়।

খুব অল্প কথায় পাকবাহিনীর আসন্ন যুদ্ধ-পরিকল্পনার বিষয়ে মুক্তিবাহিনীকে অবহিত করলেন উষারানী দেবী। চিঠির এই সাংকেতিক কোডের পদ্ধতি উষারানী ছোটবেলায় বাবার কাছে শিখেছিলেন। স্বদেশী যুগের বিপ্লবীদের ব্যবহৃত কোড ছিল এটি এবং এ সম্পর্কে বাবার কাছে বিস্তারিত জেনেছিলেন উষারানী দেবী। তিনি জানতেন বাবা চিঠির পাঠ উদ্ধার করে মুক্তিবাহিনীকে জানিয়ে দিতে পারবে। এমনি করে বাংলার ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের ঐতিহ্য এসে মিশেছিল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতার সঙ্গে। এখানে এটাও উল্লেখ্য, স্বদেশি যুগের প্রখ্যাত চারণ কবি নিবারণ পণ্ডিত, পরবর্তী সময়ে যিনি ভারতে ‘পদ্মশ্রী’ উপাধি পান, তিনি ছিলেন উষারানী দেবীর জ্যাঠা। কবেকার কোন স্বদেশী আন্দোলন যে আবার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে এবং উষারানী দেবীর হস্তলিপিতে অতীত নতুন হয়ে উঠল পুনরায়, সেটারও তো রয়েছে প্রতীকী তাৎপর্য।

হাওর এলাকার গেরিলা যুদ্ধে উষারানী দেবীর প্রেরিত এই বার্তা বিশেষ কাজে লেগেছিল এবং মুক্তিবাহিনী অনেক ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে পেরেছিল। এই চিঠির প্রাপক সেদিনের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার হামিদ ভাই হচ্ছেন কিশোরগঞ্জের জনপ্রিয় আওয়ামী লীগ নেতা ও আজকের জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ।

চরম প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজের জীবনে কঠিন দুঃখভোগের মধ্যেও উষারানী দেবী মুক্তিসংগ্রামীদের সহায়তা করার প্রশ্নে দৃঢ়সংকল্প ছিলেন এবং পাকবাহিনীর ক্যাম্পে ঢুকে প্রয়োজনীয় তথ্য বের করে সতীর্থ যোদ্ধাদের জানাতে পেরেছিলেন। ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের মধ্যেও উষারানী দেবী দেশ ও জাতির মুক্তির সংগ্রামে সাহসী অবদান রচনায় যেভাবে স্থিতধী ছিলেন, তাঁর সেই ভূমিকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হয়।

উষারানী দেবী বর্তমানে কিশোরগঞ্জে এস ভি গার্লস স্কুলে শিক্ষকতা করছেন। স্বামী-পুত্র নিয়ে সুখী সংসার গড়ে তুলেছেন আবার। তাঁর স্বামী একজন উদারচেতা প্রশস্ত মনের মানুষ। উষারানী দেবীর জীবনকথা মেলে ধরতে তাঁর সহায়তা বিশেষভাবে স্মরণ করতে হয়। উষারানী দেবী তাঁর স্মৃতিকথার শেষে লিখেছেন:

বর্তমানে আমি যার আশ্রয়ে থেকে, যার খেয়ে-পরে ওদের মানুষ করার প্রয়াস পেয়েছি এবং যিনি সর্বতোভাবে সর্বব্যাপারে আমাকে স্বাধীনতা দিয়েছেন, উদার ও মহৎ হৃদয়ের পরিচয় দিয়েছেন, তিনি আমার বর্তমান স্বামী সন্তোষ কুমার দাস। এই উদারচিত্ত মহৎ ব্যক্তিত্বের কাছে আমি অপরিশোধ্য ঋণের দাবিতে আবদ্ধ। বিরাট ব্যক্তিত্ব ও সিংহ-হৃদয়ের এই মানুষটির কাছে আমি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলেও সংগ্রাম শেষ হয়নি উষারানী দেবীর। তাই আজ দীর্ঘ ২৮ বৎসর পর তিনি অনুভব করেছেন সব কথা সবার সামনে মেলে ধরার তাগিদ। অতীতের ওপর বিস্মৃতির চাদর টেনে হয়তো একভাবে গড়ে তোলা যায় নতুন জীবন, পীড়নের বেদনাগুলো একান্ত নিজের মধ্যে সংগুপ্ত রেখে সবার জীবনে সুখ এনে দিতে সচেষ্ট হওয়া যায়। দুঃসহ অতীতকে হৃদয় খুঁড়ে তুলে আনার মধ্যে অনেক জটিলতাও রয়েছে। আচার ও সংস্কারে বাধা হিন্দু সমাজে এই জটিলতার মাত্রা অনেক বেশি। এর জের তো উপচে পড়তে পারে সন্তান-সন্ততির ওপর। তবু যে উষারানী দেবী সাহসের পতাকাটি আবারও তুলে ধরলেন হাতে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য ইতিহাসের জন্য সব সত্য মেলে ধরতে চাইলেন, সেটা তাঁর অব্যাহত সংগ্রামী স্পৃহাকেই প্রকাশ করে। তিনি যে জননী সাহসিকা, মানুষের অবমাননার সব গ্লানি মুছে দেওয়ার জন্য তাঁর সাধনার তো কোনো সমাপনী রেখা নেই। এটাও কি বাংলার আরেক প্রতীক নয়!