অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

ভয় যখন দৃশ্যমান নয়, কিন্তু সর্বত্র

স্বনিয়ন্ত্রণ ও নীরবতার রাজনীতি ও দর্শন

আমাদের মনে প্রতিদিনই তো কত কথার আনাগোনা হয়। সমাজ নিয়ে, রাষ্ট্র নিয়ে, প্রশাসনের অবস্থান নিয়ে। সব কি আমরা লিখতে পারি? কোনো কারণে লিখলেও এডিট করে ফেলছি, ভাষা বেশি কড়া হয়ে উঠলে মোলায়েম করছি। কিছু পোস্ট আমরা পাবলিক করি, কিছু অনলি ফর ফ্রেন্ডস, কিছু অনলি ফর মি, কিছু ডিলেটই করে ফেলছি। ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন বাতিল হওয়ার পরও আমাদের ব্যালেন্স করে চলতে হয়। সাম্প্রতিক অভ্যুত্থানের চেতনা কী বলে? প্রশ্ন এবং চিন্তাকে কি আমরা রোধ করতে পারি?

অতীতে আমরা এমনও দিন দেখেছি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস হঠাৎ অস্বাভাবিক শান্ত, ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা আড্ডা না দিয়ে সোজা হলে বা বাসায় চলে যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষের তর্ক নেই, কয়েকজন এক সাথে চা খেলেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখছে। কোভিডের পরও এই নিরাপদ দূরত্বকেই বেছে নিচ্ছিল মানুষ। অনেক দিন ধরেই ছিল না কোনো হরতাল বা অবরোধের ঘোষণা। সারা দেশের মানুষ যেন রাজনীতি নিয়ে নির্লিপ্ত। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, রাষ্ট্র বুঝি স্থিতিশীলতার এক স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।

এই নীরবতার ভেতরে মাঝেমধ্যে ভেসে আসত দুয়েকটা গুম–খুনের খবর। পরদিন হয়তো চাখানায় কিংবা গলির ভেতরে মানুষের অস্পষ্ট গুঞ্জন বা ফিসফিস—‘লোকটা ভালোই ছিল, কিন্তু এত কথা বলার দরকার কী ছিল তার!’

বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য! ‘এত কথা বলার দরকার কী’—এই বাক্যটিই আজও এ দেশের রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাবক। কারও হয়তো প্রশ্ন করতে মন চাইছে, কিন্তু সব প্রশ্ন কি করতে পারছে?

আমরা দেখেছি, ঢাবিতেই নারী শিক্ষার্থী হেনস্তার পুরস্কার হিসেবে নিপীড়কের গলায় উঠেছে ফুলের মালা। লঞ্চঘাটের সেই বেত্রাঘাতের ঘটনার পর অনেক তরুণী এখন ভয়ে বোরকা পরে বের হয়। ইচ্ছেমতো পোশাক পরতে পারে না। গত সরকারের সময় যেমন অনেক তরুণী ইচ্ছা থাকলেও বোরকা পরত না ভয়ে! কী ভয়ের সংস্কৃতিতে আমরা ছিলাম, আছি।

গ্রামসি আমাদের দেখান কীভাবে মানুষ শাসনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, ফুকো দেখান কীভাবে ভয় অদৃশ্য হয়েও সর্বত্র থাকে, আর হান্না আরেন্ট মনে করিয়ে দেন—যেখানে মানুষ একসঙ্গে কথা বলতে পারে না, সেখানে রাজনীতির মৃত্যু ঘটে।

গত কয়েকটা নির্বাচন রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করেনি। এবার উত্তেজনা আছে। কিন্তু এত উত্তেজনা যে একজন আরেকজনের ভয়ে কথা বলা কমিয়ে দিচ্ছে। সম্প্রতি প্রার্থী গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মব সন্ত্রাস, পত্রিকা অফিসে আগুন—এসব দেখে আরও নীরব হয়ে যাচ্ছেন অনেকে।

আমরা সাধারণত রাজনৈতিক ফেনোমেনা বলতে বুঝি—নির্বাচন, আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার, গুম-খুন ইত্যাদি; কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনাটি হয়তো, নীরবতা। কেউ প্রশ্ন তুলতে গেলে আশপাশ থেকে আসে, ‘পরিবার আছে ভাই’, ‘চাকরিটা তো বাঁচাই’, ‘এত ঝামেলা কেন ডাকব’—এগুলো রাজনৈতিক যুক্তি নয়, বরং রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপসর্গ। কারণ, প্রশ্নের ভেতর থাকে সন্দেহ: কেউ কি শুনছে? কেউ কি ধরবে? এই সন্দেহ রাষ্ট্রীয়ভাবে তৈরি—এটা কোনো ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এক উৎপাদিত ফেনোমেনা, যেখানে মানুষকে কথা বলার আগে নিজেকেই থামতে শেখানো হয়েছে। এই লেখায় আমরা নীরবতার পেছনের রাজনীতিকে দার্শনিক জায়গা থেকে বোঝার চেষ্টা করব।

আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর ‘প্রিজন নোটবুক’–এ বারবার দেখিয়েছেন, শাসন কখনোই এককভাবে বলপ্রয়োগের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। শাসনের টেকসই রূপ তৈরি হয় তখনই, যখন একটি সামাজিক গোষ্ঠী নিজেকে ‘নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বে’র আসনে বসাতে পারে। গ্রামসির ভাষায়, আধিপত্য মানে শুধু দমন নয়—সম্মতি উৎপাদনের এক দীর্ঘ সাংস্কৃতিক প্রক্রিয়াও। দীর্ঘদিন বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় উন্নয়ন, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার ভাষা সেই সম্মতির কাঠামো হিসেবেই কাজ করেছে।

মিশেল ফুকো এই সম্মতির ভেতরের শাসনপ্রযুক্তি ব্যাখ্যা করেন ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ বইয়ে। সেখানে তিনি তার প্যানঅপটিকনের ধারণা তুলে ধরেন—একটি নজরদারি কাঠামো, যেখানে ক্ষমতা দৃশ্যমান না হয়েও সর্বত্র উপস্থিত থাকে। ফুকো পরে ‘দ্য হিস্টোরি অব সেক্সুয়ালিটি’তে লিখেছেন, ক্ষমতা সর্বত্র ছড়িয়ে আছে, কারণ তা কোনো একক কেন্দ্র থেকে আসে না; বরং দৈনন্দিন আচরণ, ভাষা ও অভ্যাসের মধ্য দিয়েই কাজ করে। বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিসরে এই ক্ষমতা আইন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং অনিশ্চিত ভয়ের মধ্য দিয়ে মানুষের শরীর ও মনে ঢুকে পড়েছে।

আমরা সাধারণত রাজনৈতিক ফেনোমেনা বলতে বুঝি—নির্বাচন, আন্দোলন, মামলা, গ্রেপ্তার, গুম-খুন ইত্যাদি; কিন্তু সাম্প্রতিক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনাটি হয়তো, নীরবতা।

এই প্রক্রিয়ার রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে হান্না আরেন্ট সবচেয়ে কঠোর ভাষায় সতর্ক করেন। ‘দ্য হিউম্যান কন্ডিশন’ গ্রন্থে তিনি রাজনীতিকে সংজ্ঞা দেন মানুষের একসঙ্গে কথা বলা ও কাজ করার ক্ষমতা হিসেবে। আরেন্টের মতে, যখন মানুষ জনপরিসর ছেড়ে দেয়, তখন রাজনীতি আর নাগরিক কর্মকাণ্ড থাকে না—তা প্রশাসনিক নিয়ম কিংবা নিঃশব্দ নিয়ন্ত্রণে পরিণত হয়। ‘অন ভায়োলেন্স’–এ তিনি বলেন, যেখানে সম্মিলিত রাজনৈতিক শক্তি ভেঙে পড়ে, সেখানে ক্ষমতার জায়গা দখল করে নেয় ভয় ও সহিংসতা।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতা এই তিনটি তাত্ত্বিক সতর্কতার মাঝখানেই দাঁড়িয়ে আছে। গ্রামসি যাকে বলেছেন সম্মতির শাসন, ফুকো যাকে দেখেছেন অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ হিসেবে, আর আরেন্ট যাকে চিহ্নিত করেছেন জনপরিসরের মৃত্যু—সব কটিই এখানে আলাদা নয়, বরং একই রাজনৈতিক বাস্তবতার ভিন্ন মুখ।

প্যানঅপটিকন: ভয় যখন দৃশ্যমান নয়, কিন্তু সর্বত্র

মিশেল ফুকো (১৯২৬—১৯৮৪)

মিশেল ফুকো ‘ডিসিপ্লিন অ্যান্ড পানিশ’ (১৯৭৫) বইয়ে প্যানঅপটিকনকে দেখেছেন একধরনের অদৃশ্য জেল হিসেবে—যেখানে বন্দী জানে তাকে দেখা হচ্ছে, কিন্তু জানে না কখন, কোথা থেকে, কে দেখছে। ফলে বন্দীর মনস্তত্ত্বে একটা অনিবার্য ‘দেখা হচ্ছে বা সিসি ক্যামেরা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত’—এই অনুভূতি স্থাপন হয়।

ফুকো বলেন, প্যানঅপটিকন এমন এক ব্যবস্থা, যেখানে ক্ষমতা আর শরীরের ওপর লাঠি নয়, বরং মন ও আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

প্যানঅপটিকনের সবচেয়ে শক্তিশালী দিকটি হলো এখানে দণ্ড দেওয়ার জন্য কারও দরকার নেই। কারণ, বন্দী নিজেই নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নীরবতা ঠিক এইভাবে কাজ করে। কেউ সরাসরি বলে না—‘এটা বলা যাবে না।’ কিন্তু সবাই জানে কিছু কথা বলা নিরাপদ নয়।

এ কোনো রোমান্টিক আতঙ্ক নয়; বরং এটি একধরনের সমাজব্যাপী শৃঙ্খলা, যেখানে ‘কিছু বলা’ মানেই নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলা। এই ‘অনিশ্চয়তা’ই সবচেয়ে বড় নিয়ন্ত্রণ। তাই মানুষ আগে থেকেই শব্দ কাটে:

—‘এই শব্দটা বাদ দিই’

—‘এই নামটা না লিখি’

—‘পোস্টটা পরে দিই’

—‘না থাক, ডিলিটই করি’

এটা শুধু ‘ভয়’ নয়—এক স্বনিয়ন্ত্রণ বা ডিসিপ্লিনারি পাওয়ার।

ফেসবুক স্ট্যাটাসের নিচে ‘ইনবক্সে আসো’ ধরনের মন্তব্যগুলোই বলে দেয় আমরা কতটা স্বনিয়ন্ত্রিত। এখানে প্যানঅপটিকন শুধু একটি তাত্ত্বিক ধারণা নয়; বাস্তবে পরিণত।

গ্রামসি: উন্নয়ন কীভাবে রাজনীতির জায়গা দখল করে নেয়

আন্তোনিও গ্রামসি (১৮৯১—১৯৩৭)

আন্তোনিও গ্রামসি বলেছিলেন, শাসন টিকে থাকে শুধু জোরে নয়, মানুষের সম্মতির ওপর ভর করে। তিনি এই সম্মতিকে ‘হেজেমনি’ বলেছিলেন—একটা সামাজিক বাস্তবতা যেখানে মানুষ নিজে নিজে শাসনের ‘স্বাভাবিকতা’ মেনে নেয়। গ্রামসি লিখেছেন, ‘দ্য সুপ্রিমেসি অব দ্য ডমিন্যান্ট সোশ্যাল গ্রুপ ইজ সিকিউরড নট অনলি বাই কোয়ার্সন বাট বাই কনসেন্ট’। দীর্ঘদিন বাংলাদেশে এই সম্মতি তৈরির সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা ছিল উন্নয়ন।

রাস্তা হয়েছে, সেতু হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে—এসব বাস্তব সত্য। কিন্তু ধীরে ধীরে এই সত্যগুলো এমনভাবে হাজির করা হয়েছিল যেন এগুলোর বিনিময়ে আর কোনো প্রশ্ন করা চলে না। কোন উন্নয়ন কার জন্য হচ্ছে, আমাদের যেন প্রশ্ন করার অধিকার নেই। অথচ মাথাপিছু ঋণ বাড়ছে আমার–আপনার নামে, ট্যাক্স দিচ্ছি আমরা। বর্তমানে রাষ্ট্র সংস্কার চলছে। কিন্তু প্রাথমিকভাবে কতটুকু সংস্কার হয়েছে? যতটুকু হওয়া উচিত ছিল ততটুকু হয়েছে কি? এই প্রশ্ন কি আমরা করতে পারছি?

কেউ প্রশ্ন করলেও উত্তর আসে না, কারণ, উত্তরের দরকারই নেই বলে মনে করে রাষ্ট্র। কারণ ‘ফ্যাসিবাদ তো গিয়েছে’—এই বাক্যটি একধরনের সামাজিক ‘ক্যাপশনে’ পরিণত হয়ে গেছে। প্রশ্ন করা যাবে না—‘আরেকটা ফ্যাসিবাদ কি আসে নাই?’

গ্রামসির ভাষায় এটিই হেজেমনি: মানুষ নিজেই ভাবতে শেখে—এই প্রশ্নগুলো অপ্রয়োজনীয়, অযথা, এমনকি বিপজ্জনকও হতে পারে।

মিডিয়া, পাঠ্যবই, টক শো—সব মিলিয়ে একটি নতুন কমন সেন্স তৈরি হয়—গণতন্ত্র মানে স্থিতিশীলতা, স্থিতিশীলতা মানে নীরবতা।

যখন একদিকে হেজেমনি বা মনস্তাত্ত্বিক শাসন, অন্যদিকে প্যানঅপটিকনের ভয় থাকে তখন মানুষ শুধু ভয় পায় না—সে বিশ্বাসও করতে শেখে যে চুপ থাকা যুক্তিসংগত। কারণ, ‘চুপ থাকা’ একধরনের সামাজিক শৃঙ্খলা এবং শৃঙ্খলা মানে উন্নয়ন কিংবা সংস্কার।

হান্না আরেন্ট: জনপরিসর হারালে রাজনীতির কী থাকে

হান্না আরেন্ট (১৯০৬—১৯৭৫)

হান্না আরেন্ট রাজনীতিকে সংজ্ঞা দিয়েছিলেন মানুষের একসঙ্গে কথা বলা ও কাজ করার জায়গা হিসেবে। তাঁর ভাষায়, রাজনীতি মূলত ‘পাবলিক স্পেস’—যেখানে মানুষ একত্রে উপস্থিত হয়ে আলোচনা করে, সমালোচনা করে এবং নিজেদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়। হুবহু তাঁর ভাষায় যদি বলি, ‘দ্য পাবলিক রেম ইজ দ্য স্পেস অব অ্যাপিয়ারেন্স।’

বাংলাদেশে এই ‘প্রকাশের স্থান’ ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়, টক শো, সামাজিক মাধ্যম—সবখানে অতিরিক্ত সতর্কতা। এগুলো সবই এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে, যেখানে মানুষ চিন্তা করে, কিন্তু একসঙ্গে কথা বলে না।

আরেন্টের ধারণা অনুযায়ী, ভয়ভিত্তিক শাসনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মানুষকে রাজনৈতিক নাগরিক থেকে ‘বাঁচার হিসাব করা ব্যক্তি’ হিসেবে রূপান্তর করা। মানুষ যখন ‘রাজনৈতিক’ থেকে ‘ব্যক্তিগত’ জগতে সরে যায়, তখন রাজনীতি মারা যায়—কারণ রাজনীতি তার অস্তিত্ব ধরে রাখে মানুষের একত্রকৃত উপস্থিতি ও আলোচনা দিয়ে।

এখানে আরেন্টের বিখ্যাত কথা মনে রাখা জরুরি: ‘হোয়্যারএভার পাওয়ার ইজ, ইট ইজ নেভার হোয়্যার উই থিংক ইট ইজ।’ রাজনীতি তখনই মৃত হয়, যখন মানুষ মনে করে রাজনীতি এখন ‘কিছু বড় মানুষ’ বা ‘কিছু বড় ঘটনার’ বিষয়, আমার ব্যক্তিগত জীবনের বিষয় নয়।

এমন পরিস্থিতিতে দমন আর দৃশ্যমান থাকে না; নীরবতাই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এবং এই নীরবতা শুধু ‘চুপ থাকা’ নয়—এটা একধরনের রাজনৈতিক আত্মপরিচয় হারানো। একজন নাগরিক রাজনৈতিক হতে পারে শুধু তখনই, যখন সে জনপরিসরে উপস্থিত হয়, প্রশ্ন করে, আলোচনায় অংশ নেয়। কিন্তু যখন জনপরিসর ভেঙে যায়, মানুষের সামনে ‘একসঙ্গে কথা বলার’ জায়গা থাকে না, তখন রাজনীতি বেঁচে থাকার মতো জায়গাই পায় না।

এটা হান্না আরেন্টের ভাষায় রাজনীতির অবসান। মানুষ জনপরিসর ছেড়ে নিরাপদ ব্যক্তিগত জীবনে সরে যায়। গত কয়েক বছর যাবৎ তা–ই হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কথা বলছে, কিন্তু নিজের মতামতটা ব্যক্ত করতে পারছে না। যা আরও ভয়ংকর। কারণ, আমরা সবাই মনে করছি, রাজনৈতিক আলাপ তো চলছেই, তার মানে আমাদের কথা বলার স্বাধীনতা আছে। আমরা মত প্রকাশের সুযোগ পাই এখন, কিন্তু দ্বিমত প্রকাশের অধিকার কি আছে?

নীরবতাও নির্দোষ নয়

এই লেখা কোনো অভিযোগপত্র নয়। এটি একটি পর্যবেক্ষণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ফেনোমেনা আজ এমন জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেখানে রাজনীতি আর শুধু দল বা নির্বাচন নয়; এটি মানুষের প্রশ্ন করার সাহস, কথা বলার ক্ষমতা এবং একসঙ্গে দাঁড়ানোর ইচ্ছার প্রশ্ন।

গ্রামসি আমাদের দেখান কীভাবে মানুষ শাসনকে স্বাভাবিক বলে মেনে নেয়, ফুকো দেখান কীভাবে ভয় অদৃশ্য হয়েও সর্বত্র থাকে, আর হান্না আরেন্ট মনে করিয়ে দেন—যেখানে মানুষ একসঙ্গে কথা বলতে পারে না, সেখানে রাজনীতির মৃত্যু ঘটে।

আজকের এই সরব রাজনীতির মধ্যে আপনি কোনো বিষয়ে নীরব আছেন কি? আমি মনে করছি, অধিকাংশেরই উত্তর হবে ‘হ্যাঁ’। বাংলাদেশের শহরগুলোতে আজ একধরনের বিমূর্ত নীরবতা চলছে। এ রকম একটি রক্তক্ষয়ী গণ–অভ্যুত্থানের পরেও এটি একটি গভীর, সংগঠিত এবং বিপজ্জনক রাজনৈতিক বাস্তবতা।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)