প্রথম আলোর পুরোনো সংখ্যা অবলম্বনে গ্রাফিকস
প্রথম আলোর পুরোনো সংখ্যা অবলম্বনে গ্রাফিকস

মহাফেজখানা থেকে

পলাশী যুদ্ধের প্রহসন: জগৎশেঠ ও মির জাফর

পলাশী যুদ্ধের ২৫০ বছর উপলক্ষে প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকী ২০০৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এ লেখাটি প্রকাশ করে। এত দিন শুধু ছাপা কাগজের পাতাজুড়ে থাকা লেখাটি আজ অন্য আলোর অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।

১৭৫৭ সালের ২৩ জুন তারিখে যে যুগান্তকারী ঘটনা পলাশীর আম্রকাননে ঘটেছিল, তাতে ইংরেজ বাহিনীর প্রধান কর্নেল ক্লাইভের অধীন ছিল ৬০০ পদাতিক গোরা সৈন্য, ৫০ নৌ সৈন্যসহ ১৫০ গোলন্দাজ সৈন্য, ২ হাজার ১০০ সিপাহি, অর্থাৎ দক্ষিণ ভারতীয় তেলেঙ্গা সৈন্য, অতি অল্পসংখ্যক পর্তুগিজ সৈন্য—মোট ৩ হাজার সৈন্যের সামান্য বেশি। (‘দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার ইন ইন্ডিয়া’, এডওয়ার্ড থর্নটন, ভলিউম ১, পৃষ্ঠা ২৫৩) ক্লাইভের সঙ্গে ছিল মোট ৬টি কামান। তিনি ২২ জুন দিনগত রাত একটার দিকে পলাশীর আম্রকাননে শিবির স্থাপন করেন।

বিভিন্ন ইউরোপীয় ইতিহাসবিদ যে বর্ণনা দিয়ে গেছেন, তাতে কম করে ধরলেও মেনে নিতে হয় যে নবাব সিরাজ–উদ–দৌলার অধীন ছিল ৫০ হাজার পদাতিক সৈন্য, ১৫ হাজার সুশিক্ষিত অশ্বারোহী সৈন্য ও ৫০টি কামান।

যুদ্ধ কিছুক্ষণ চলার পরই তাঁর দলের লোকক্ষয় দেখে কর্নেল ক্লাইব হতাশ হয়ে পিছু হটতে বাধ্য হলেন এবং দুটিমাত্র কামানের সাহায্যে নবাবের বাহিনীকে কোনোমতে ঠেকিয়ে রেখে রাতের অন্ধকারে নাবাবের বাহিনীকে অতর্কিত আক্রমণ করার আশায় বাকি চারটি কামান ও সৈন্যদের নিয়ে আমবাগানের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

যদি নবাবের বাহিনী তাদের অবস্থানস্থল থেকে শুধু আক্রমণ চালিয়ে যেত, তবে দিন শেষে ক্লাইভের মুষ্টিমেয় তিন হাজার সৈন্যের মধ্যে একজনও তাঁদের পরিণতির কথা পৃথিবীকে জানানোর জন্য বেঁচে থাকতেন কি না সন্দেহ। আর তা না ঘটে প্রকৃতপক্ষে কী ঘটেছিল, তা একজন ইংরেজ লেখকের রচনাই বলে দেবে। তিনি বলেছিলেন, ‘পলাশীর রণাঙ্গনে এই স্মরণীয় বিশ্বাসঘাতকতার কাজ করা হয়। যেখানে বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলিত করা হয়, সেখানেই কয়েকজন ব্রিটিশ সৈনিক অমর সম্মান লাভ করেছিলেন বলে বলা হয়। সেই [মহৎ!] কাজটি তাঁরা করেছিলেন সেই দেশের বৈধ নৃপতির রাজত্ব ও জীবনের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত সংগ্রামের উসকানি দিয়ে এবং তাঁদের নেতাদের মৃত্যু বা রণক্ষেত্র পরিত্যাগের ফলে উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে শত্রুপক্ষের মধ্যে যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছিল, সে সুযোগে তাঁরা এ কাজ করতে পেরেছিলেন। পরে তাঁরা সমতল ভূমিতে অগণিত জনসাধারণের রক্তের ধারা প্রবাহিত করেছিলেন। সেই সব অগণিত মানুষের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, ছিল না তাঁদের মধ্যে কোনো সংহতি, আত্মবিশ্বাস বা কোনো শৃঙ্খলা এবং সেই সঙ্গে তাঁদের ছিল না প্রতিরোধ বা পলায়নের কোনো ক্ষমতা।...

শিল্পীর তুলিতে নবাব সিরাজ–উদ–দৌলা

‘এভাবেই সেই সুবিখ্যাত পলাশীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। সত্য বলে দেবে বিশ্বাসঘাতকতাই ছিল এই যুদ্ধে বিজয় লাভের কারণ এবং তা নায়কদের গৌরবের ঔজ্জ্বল্যকে ম্লান করে দেবে।’ (‘ডিসাইসিভ ব্যাটলস অব ইন্ডিয়া’, কর্নেল মেলিসন, পৃষ্ঠা ৭৩)

বাহ্যত প্রায় অসম্ভব এ ঘটনা কেমন করে ভোজবাজির মতো ঘটে গেল, সেই কারণ অনুসন্ধান করতে একটু পেছনে যেতে হবে। কুসীদজীবী ও অর্থলোভী জগৎশেঠরা চিনতেন শুধু টাকা এবং তাঁদের টাকা সংগ্রহের ব্যাপারে কেউ প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করলে তার আর রক্ষা ছিল না। নবাব মুর্শিদ কুলি খান কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বলে শেঠরা তাঁর প্রতি অনুগত ছিলেন। তাঁর জামাতা নবাব সুজা-উদ-দৌলা শেঠদের অর্থোপার্জনের পথ আরও সুগম করে দিয়েছিলেন বলে শেঠরা ছিলেন তাঁর ভক্ত। শেঠদের অত্যন্ত কাছের লোক নবাব আলিবর্দি খান শেঠদের অর্থপ্রাপ্তির পথে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করেননি। ফলে শেঠরা তাঁরও একান্ত অনুগত ছিলেন।

নবাব মুর্শিদ কুলি খান সাত কোটি টাকা গচ্ছিত রেখেছিলেন জগৎশেঠের কাছে। তাঁর দৌহিত্র ও একমাত্র ওয়ারিশ নবাব সরফরাজ খান সেই টাকা ফেরত চাইতে গিয়ে শুধু রাজ্য নয়, প্রাণও হারান। (‘মুর্শিদাবাদ–কাহিনী’, নিখিলনাথ রায়, পৃ. ৩৪ ও ১৩৭)

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা জগৎশেঠকে অপমান করেছিলেন বলে জগৎশেঠ সিরাজের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন—ইংরেজদের ভাড়াটে ইতিহাসবিদেরা যতই এ কথা বলে থাকুন না কেন, প্রামাণ্য ইতিহাসে এসব অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলেই দেখা গেছে। সিরাজের প্রতি শেঠদের বিরাগের প্রধান ও একমাত্র কারণ তিনি শেঠদের সীমাহীন অর্থোপার্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। সুদখোর শেঠদের অর্থোপার্জনের প্রধান সূত্র ছিল ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। কোম্পানিকে তাঁরা চড়া সুদে টাকা ধার দিতেন এবং সুদে-আসলে তা আদায় করতেন।

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা জগৎশেঠকে অপমান করেছিলেন বলে জগৎশেঠ সিরাজের বিরুদ্ধে গিয়েছিলেন—ইংরেজদের ভাড়াটে ইতিহাসবিদেরা যতই এ কথা বলে থাকুন না কেন, প্রামাণ্য ইতিহাসে এসব অভিযোগ পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলেই দেখা গেছে। সিরাজের প্রতি শেঠদের বিরাগের প্রধান ও একমাত্র কারণ—তিনি শেঠদের সীমাহীন অর্থোপার্জনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।

নবাব আলিবর্দি খান প্রায় এক যুগ মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে রত ছিলেন। সে সময় বাংলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। ফলে জগৎশেঠদের কোষাগারের শ্রীও দিন দিন বৃদ্ধি পেতে থাকে। তখন ইংরেজ বেনিয়ারা দুর্গ নির্মাণসহ এমন স্বাধীন আচরণ করতে থাকেন যে নবাব আলিবর্দি খানকেও ইংরেজ কোম্পানিকে দমন করার কথা গুরুত্বসহকারে চিন্তা করতে হয়। তবে সেই কঠিন কাজটি তিনি নিজে না করে সিরাজের কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে যান।

দেশপ্রেমিক, প্রখর বুদ্ধির অধিকারী সিরাজের কাছে ইংরেজ কোম্পানির সীমাহীন বাড়াবাড়ির ব্যাপারটি ১৭৫২ সালে তাঁকে যৌবরাজ্যে অধিষ্ঠিত করার সময়ই ধরা পড়েছিল। সিরাজ চাইলেন, আর সব বিদেশি কোম্পানির মতো ইংরেজরাও এ দেশের আইন মেনে তাঁদের ব্যবসা নিয়েই থাকুন; কিন্তু ইংরেজরা তা মেনে চলতে রাজি নন। সিরাজ-উদ-দৌলা ইংরেজদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হয়ে পড়েন। ইংরেজদের পরম বন্ধু জগৎশেঠ তাঁদের বললেন, ‘আমরা এমন একজনকে নবাবের মসনদে বসাব, যিনি আমাদের কথামতো চলবেন।’

স্বল্পবুদ্ধি, দেহসর্বস্ব ঘসেটি বেগম ও পুর্ণিয়ার আধপাগলা শওকত জঙ্গকে মসনদে বসাতে ব্যর্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত জগৎশেঠের দৃষ্টি পড়ল মির জাফর আলী খানের ওপর। তিনি তাঁর পিতা ও বেশ কয়েকজন ভাইসহ ইরাকের নজফ থেকে জীবিকার অন্বেষণে এ দেশে এসেছিলেন। প্রায় ৩৮ বছর কর্মহীন ছিলেন তিনি এবং অবিবাহিতও। নজফের সৈয়দ বলে পরিচিত প্রকাণ্ড দেহধারী এই লোকের সঙ্গে তদানীন্তন পাটনার নায়েব-ই-নাজিম আলিবর্দি খান তাঁর সৎবোন শাং খানমের বিয়ে দেন। সেই সঙ্গে মির জাফরকে মাসিক ১০০ টাকা বেতনে একটি চাকরিও দেন। নবাব হওয়ার পর আলিবর্দি খান তাঁকে প্রধান সেনাপতি ও প্রথম বখশির পদেও নিযুক্তি প্রদান করেন।

মির জাফরের অবস্থা হয়েছিল সরকারি খোঁয়াড়ে আবদ্ধ প্রাণীর শস্যশ্যামল মাঠের সন্ধান পাওয়ার মতো। তাঁর যেন কোনো কিছুতেই তৃপ্তি নেই। তিনি ষড়যন্ত্র করে খোদ আলিবর্দি খানকেই মসনদ থেকে সরিয়ে নিজে নবাব হতে চাইলেন। ধরা পড়ে চাকরিচ্যুত হয়েও চাকরি ফিরে পেলেন আলিবর্দির পরিবারের সদস্যদের জোর সুপারিশে। মির জাফর আলিবর্দির কাছে কোরআন স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করলেন যে তিনি সিরাজের প্রতি অনুগত থাকবেন। সেই প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করলেন ইংরেজদের সঙ্গে গোপন চুক্তি করে। কিন্তু নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার কাছে ধরা পড়ে গেলেন। আবারও তিনি কোরআন স্পর্শ করে প্রতিজ্ঞা করলেন যে সিরাজ-উদ-দৌলার প্রতি অনুগত থাকবেন। একজন সৈয়দ ও বয়োবৃদ্ধ মানুষ হয়েও সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করলেন না সর্বপ্রকার নীতিজ্ঞানহীন ও ক্লাইভের ‘গর্দভ’ নামে পরিচিত মির জাফর আলি খান।

পলাশী যুদ্ধের আগে ইংরেজরা মির জাফরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি। নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আগে ইংরেজদের দাবি, ইংরেজদের প্রতিনিধির সামনে কোরআন ও তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মিরনের মস্তক স্পর্শ করে মির জাফরকে চুক্তিপত্র সই করতে হবে। নবাবের চরদের অতিক্রম করে কোনো ইংরেজের পক্ষে মির জাফরের সান্নিধ্যে যাওয়া প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। জগৎশেঠ-উমিচাঁদের পরামর্শে কাসিমবাজার কুঠির ইংরেজ কর্মকর্তা অসমসাহসী ওয়াট্স তা–ও সম্ভব করলেন মহিলাদের জন্য ব্যবহৃত ডুলিতে চড়ে মির জাফরের অন্দরমহলে প্রবেশ করে।

পলাশী যুদ্ধের আগে ইংরেজরা মির জাফরকে পুরোপুরি বিশ্বাস করেননি। নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আগে ইংরেজদের দাবি, ইংরেজদের প্রতিনিধির সামনে কোরআন ও তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র মিরনের মস্তক স্পর্শ করে মির জাফরকে চুক্তিপত্রে সই করতে হবে।

ইংরেজদের চাহিদা অনুসারে কোরআন স্পর্শ করে ও ছেলের মাথায় হাত রেখে মির জাফর চুক্তিপত্রে সই করলেন। চুক্তির শিরোভাগে মির জাফর নিজের হাতে লিখেছিলেন, ‘আল্লাহ আর রাসুলাল্লাহর কসম জিন্দা থাকতে আমি এই করারের কোনো শর্ত খেলাপ করব না।’ (‘পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ’, রজতকান্ত রায়, পৃষ্ঠা ২২৯-৩০।) তার নিচে মুনশির হাতে নিম্নোক্ত শর্তগুলো ফারসিতে লেখা ছিল:

‘১. নবাব সিরাজ–উদ–দৌলার আহাদনামার ওক্তে যে যে ওয়াদা করা হয়েছিল, সেগুলো মেনে চলব।

২. ইংরেজ দুশমনরা আমার দুশমন, তারা ফিরিঙ্গিই হোক বা হিন্দুস্তানিই হোক।

৩. সুবাহ জিন্নাত-উল-বিলাদ বাংগালাহ বিহার আর উড়িষ্যার ফরাসিদের যত কুঠি আর মাল আছে, সব ইংরেজদের দখল হবে, আর এই তিন সুবাহে আমি তাদের আর কখনো আড্ডা গাড়তে দেব না।

৪. কলকাতা দখল আর লুটের খাতে ইংরেজ কোম্পানির যত লোকসান হয়েছে আর ফৌজ মোতায়েন করতে যত খরচ হয়েছে, সেই খাতে তাদের এক কোটি রূপাইয়া দেওয়া হবে।

৫. কলকাতার ইংরেজ বাসিন্দাদের মাল লুটের খাতে ৫০ লাখ রূপাইয়া দেওয়া হবে।

৬. কলকাতার হিন্দু, মুসলমান আর বাসিন্দাদের মাল লুটের খাতে ২০ লাখ রূপাইয়া দেওয়া হবে।

৭. কলকাতার আরমানি বাসিন্দাদের মাল লুটের খাতে সাত লাখ রূপাইয়া দেওয়া হবে। কলকাতার ইংরেজ, হিন্দু, মুসলিম আর আর বাসিন্দার পাওনা টাকা বাঁটোয়ারা করবেন অ্যাডিমরাল ওয়াটসন, কর্নেল ক্লাইব, রজার ড্রেক, উইলিয়াম ওয়াট্স্‌, জেমস কিল প্যাট্রিক ও রিচার্ড বিচার—তাঁরা যাকে দুরস্ত মনে করবেন তাঁকে দেবেন।

৮. কলকাতা ঘিরে যে গড়খাই আছে তার ভেতরে আর জমিদারের জমি আর সে ছাড়া গড়খাইয়ের বাইরে ৬০ গজ পর্যন্ত জমি ইংরেজ কোম্পানিকে দেওয়া হবে।

৯. কলকাতা দক্ষিণে কলাপি পর্যন্ত সমস্ত দেশ ইংরেজ কোম্পানির মতালক হবে, আর এই সব জায়গার মুত্সুদ্দিয়ান কোম্পানির হুকুমতের হুকুম মোতাবেক হবে। আর জমিদারের মালগুজারি মোতাবেক ইংরেজ কোম্পানি মালগুজারি দাখিল করবে।

১০. যখন যখন আমি ইংরেজদের মদত চাইব, তখন তখন আমি তাদের ফৌজের খরচ বহন করব।

১১. গঙ্গা নদীর কিনারায় হুগলি বন্দরের উজানে আমি নতুন কোনো কেল্লা বানাব না।

১২. তিন সুবাহ গদিতে বসামাত্র আমি বিশ্বস্তভাবে উপরোক্ত টাকা মিটিয়ে দেব।’

সিরাজ উদ-দৌলা

এ চুক্তিতে ১ কোটি ৭৭ লাখ টাকার বিশাল অঙ্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার বাইরে আরও ৫২ লাখ টাকা ইংরেজদের দেবেন বলে মির জাফর আরেকটি চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর দিয়েছিলেন। নবাবি লাভের জন্য ইংরেজদের ২ কোটি ২৯ লাখ টাকা দেওয়ার চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেই ক্ষান্ত হননি মহামতি মির জাফর। তিনি ইংরেজদের কথা দিয়েছিলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে নবাবের পক্ষ ত্যাগ করে ইংরেজদের পক্ষ হয়ে লড়বেন তিনি।

যুদ্ধে জয় নিশ্চিত জেনে কর্নেল ক্লাইব মাত্র তিন হাজার সৈন্য ও ছয়টি কামান নিয়ে নবাবের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অগ্রসর হলেন। পথে হুগলি, অগ্রদ্বীপ ও কাটোয়ায় নবাব প্রচুর সৈন্য ও কামান-বন্দুক মোতায়েন রেখেছিলেন। তাদের ওপর কঠিন নির্দেশ ছিল ইংরেজরা যেন এক পা–ও অগ্রসর হতে না পারেন। কিন্তু জগৎশেঠের নির্দেশে হুগলির ফৌজদার বিনা বাধায় ইংরেজ সৈন্যদের এগিয়ে যেতে দিলেন। অনুরূপভাবে অগ্রদ্বীপেও ইংরেজরা কোনো বাধার সম্মুখীন হলেন না। ভাগীরথী ও অজয় নদীর সঙ্গমস্থলে কাটোয়ার দুর্ভেদ্য দুর্গ। সেখানে আছে নবাবের অজস্র ফৌজ ও বন্দুক-কামান। নবাব ফৌজদারকে কঠিন নির্দেশ দিয়ে রেখেছেন, এলাকায় যত গাছ আর বাঁশ আছে সব এনে নদীতে ফেলে এমনভাবে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করতে হবে, যাতে ইংরেজরা এগোতে না পারে; বন্দুক কামানের সাহায্যে বাধাপ্রাপ্ত ইংরেজদের ওপর আক্রমণ চালাতে হবে।

১৭৫৭ সালের ১৯ জুন ক্লাইব কাটোয়ায় শিবির স্থাপন করলেন এবং মির জাফরের পত্র না পাওয়া পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করা সমীচীন মনে করলেন। তিন দিন আগে ১৬ জুন পথে তিনি মির জাফরের শেষ পত্র পেয়েছেন।

জগৎশেঠের ব্যবস্থায় এখানে ঘটল এক বিচিত্র ঘটনা। নদীতে কোনো প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হলো না। দুর্গে ফৌজদার নিজেদের মধ্যে একটি কৃত্রিম যুদ্ধানুষ্ঠান শেষে কয়েকটি কাঁচা ঘরে আগুন দিয়ে সব সৈন্য ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বীরদর্পে সে স্থান ছেড়ে চলে গেলেন। ক্লাইব সেখানে এতসব খাদ্যশস্য মজুত পেলেন যে ১০ হাজার সৈন্যও তা এক বছরে খেয়েও শেষ করতে পারবে না।

১৭৫৭ সালের ১৯ জুন ক্লাইব কাটোয়ায় শিবির স্থাপন করলেন এবং মির জাফরের পত্র না পাওয়া পর্যন্ত সেখানেই অপেক্ষা করা সমীচীন মনে করলেন। তিন দিন আগে ১৬ জুন পথে তিনি মির জাফরের শেষপত্র পেয়েছেন। এর মধ্যে যদি নবাব ও মির জাফরের মধ্যে গোলমাল মিটে গিয়ে থাকে আর পলাশীতে গিয়ে যদি তিনি নবাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তবে তাঁর ক্ষুদ্র বাহিনীর একটি লোকও ফিরে আসতে পারবে না বলে ইংরেজদের রচিত ইতিহাসেই পাওয়া যায়। তাই মির জাফরের কাছ থেকে নতুন পত্র না পাওয়া পর্যন্ত কাটোয়ায় অবস্থান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো সমর সভায়; ক্লাইব নিয়মভঙ্গ করে সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন। ২২ জুন অপরাহ্ণে পাওয়া গেল মির জাফরের আনুগত্যপূর্ণ পত্র। সঙ্গে সঙ্গেই ক্লাইব তাঁর বাহিনী নিয়ে মধ্যরাতের মধ্যেই সদলবলে পলাশীতে গিয়ে আস্তানা গাড়লেন।

পলাশীর যুদ্ধের মানচিত্র

পলাশী। অর্ধচন্দ্রাকারে গঠিত ব্যূহের কেন্দ্রস্থলে অবস্থান নিয়েছেন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা। তাঁর এক পাশে সেনাপতি মির মদন, দিওয়ান মোহনলাল, তাঁর জামাতা বাহাদুর হোসেন খান (তিনি মির জাফরের দলের হলেও শেষ পর্যন্ত নবাবের পক্ষে যুদ্ধ করে নিহত হন), খোওয়াজা আবদুল হাদি ও ফরাসি সেনাপতি মসিয়ঁ সিনফ্রে। তাঁরা আন্তরিকভাবে নবাবের পক্ষে ছিলেন, কিন্তু নবাবের বিশাল বাহিনীর অতি অল্পসংখ্যক সৈন্যই তাঁদের অধীন ছিল। নবাবের আর একপাশে তাঁর দুই প্রধান সেনাপতি মির জাফর ও দুর্লভ রাম (তিনি জগৎশেঠের স্নেহধন্য ও প্রধান ষড়যন্ত্রকারীদের একজন), সেনাপতি ইয়ার লতিফ খান (তিনি নবাবের অধীন মনসবদার হলেও জগৎশেঠের কাছ থেকে নিয়মিত বেতন পান), সেনাপতি সৈয়দ খাদিম হাসান খান (মির জাফরের ভাগনে ও তাঁর প্রবল সমর্থক), রাজা রাজবল্লভ (ইংরেজদের পরম বন্ধু), রাজা মানিক চাঁদ (ইংরেজদের আপনজন) এবং মির জাফরের দলের আরও অনেকে। নবাবের সেনাবাহিনীর অধিকাংশই ছিল এই সেনাপতিদের অধীন। প্রথম থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত এই বিশাল বাহিনীর প্রত্যেক লোক নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন নির্বিকার চিত্তে।

সকাল আটটার দিকে যুদ্ধ আরম্ভ হলে উভয় পক্ষেই সৈন্যরা আহত ও নিহত হতে থাকেন। নবাবের গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান মির মদনের নেতৃত্বে আক্রমণ এমন তীব্র আকার ধারণ করল যে এভাবে তাদের লোকক্ষয় হতে থাকলে ইংরেজদের সীমিতসংখ্যক সৈন্য নিয়ে গঠিত বাহিনী অচিরেই নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আত্মরক্ষার জন্য তাঁরা আম্রকাননের নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন। মাত্র দুটি কামানের সাহায্যে প্রতিপক্ষের আক্রমণ কোনো রকম ঠেকিয়ে রাখার ব্যবস্থা করে তাঁরা বাকি চারটি কামান আশ্রয়স্থলে নিয়ে যান, যাতে গভীর রাতে নবাব শিবিরে আক্রমণ করা যায়।

সেই সময়ে মির জাফর, দুর্লভ রাম, ইয়ার রতিফ খান, খাদিম হাসান খান, রাজবল্লভ প্রমুখ সেনাপতি তাঁদের অধীনস্থ সৈন্য ও কামান বন্দুকসহ পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই সময়ে মির জাফর ও তাঁর দলের সেনাপতিরা যদি একটু অগ্রসর হয়ে আক্রমণ চালাতেন, তবে ইংরেজদের যে আর রক্ষা ছিল না, সে কথা ইংরেজরাই স্বীকার করে গেছেন।

দুপুরের একটু পর পলায়মান ইংরেজদের গোলার আঘাতে বীর সেনাপতি মির মদন মারাত্মকভাবে আহত হলে তাঁকে নবাবের কাছে নিয়ে যাওয়া হলো। মৃত্যুর আগে এই বীর শুধু এটুকু বলতে পারলেন যে নবাবের বাহিনীর একাংশের আক্রমণেই ইংরেজরা আম্রকাননে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন নিছক আত্মররক্ষার জন্য। অথচ নবাবের দুই প্রধান সেনাপতি মির জাফর, দুর্লভ রাম আর তাঁদের সাঙ্গপাঙ্গরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে চলছেন। একটু বলার পরই তাঁর মৃত্যু হলো। তখনো নবাবের আর এক বিশ্বস্ত সেনাপতি রাজা মোহনলাল বীরবিক্রমে পলায়মান ইংরেজদের ওপর আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছেন।

পলাশীর যুদ্ধের শেষে মীরজাফর ও লর্ড ক্লাইভের সাক্ষাৎ, ফ্রান্সিস হেম্যান (১৭৬২)

পরের ইতিহাস নিয়ে আমাদের বিভ্রান্তির সীমা নেই। যুদ্ধে সিরাজের পরাজয় ও যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন সম্বন্ধে একমাত্র কর্নেল মেলিসনের পরোক্ষ বর্ণনা ছাড়া আর কোনো ইউরোপীয় ঐতিহাসিকের কোনো বর্ণনা নেই। আর মুসলিম ঐতিহাসিকদের মধ্যে ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন’–এর রচয়িতা ছাড়া অন্য কোনো ঐতিহাসিকের তেমন কোনো বর্ণনা নেই। সিয়ার রচয়িতার বর্ণনায় দেখা যায়: মির মদনের আকস্মিক মৃত্যুর পর হতচকিত নবাব মির জাফরকে ডেকে পাঠান। আগমনে অনিচ্ছুক মির জাফর যথেষ্ট দেরি করে নবাবের কাছে এলে নবাব মির জাফরের পায়ের ওপর তাঁর উষ্ণীষ রেখে যুদ্ধে তাঁর সাহায্য কামনা করলে মির জাফর নবাবকে যুদ্ধ বন্ধ করতে জোর পরামর্শ দেন। মোহনলালের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও নবাবের আদেশে যুদ্ধ বন্ধ হয় এবং যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে নবাব পলায়ন করতে বাধ্য হন।

ইংরেজদের বেতনভুক্ত ইতিহাসবিদ সৈয়দ গোলাম হোসেন তাঁর রচিত সুবিশাল ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন’ গ্রন্থে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সম্বন্ধে একটি ভালো কথা বলেছেন এমন দৃষ্টান্ত বিরল, নেই বললেও চলে। মিথ্যাচার, শঠতা, প্রবঞ্চনা ইত্যাদি সর্বাধিক অন্যায় আচরণের মাধ্যমে একজন বৈধ নৃপতিকে অন্যায়ভাবে অপসারিত করার পর তাঁকে অমানুষ প্রমাণ করার প্রয়োজন ছিল ইংরেজদের। তাদের ভাড়াটে ইতিহাসবিদ সৈয়দ গোলাম হোসেন সেই প্রয়োজন ভালোভাবেই মিটিয়েছিলেন। সেই প্রমাণ আমরা অন্যত্র তুলে ধরেছি (প্রবন্ধকার কর্তৃক মূল ফারসি থেকে বাংলায় অনূদিত ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন’ দ্রষ্টব্য)।

পলায়মান ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিজয় লাভে আর বেশি বিলম্ব নেই—মোহনলালের (এ কথা ‘সিয়ার-উল-মুতাখখিরিন’–এ আছে) এ উক্তির পরও নবাব কী চরম অবস্থায় পড়ে যুদ্ধ বন্ধ করতে আদেশ দিয়েছিলেন অথবা তিনি আদৌ সেই আদেশ দিয়েছিলেন কি না, সেই তথ্য আজ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি; কোনো দিন পাওয়া যাবে কি না, একমাত্র ভবিষ্যৎই বলতে পারে। তবে মির মদনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই মির জাফর যে ক্লাইবকে নবাবশিবির আক্রমণ করার জন্য পত্র প্রেরণ করেছিলেন, সেই তথ্য সমসাময়িক ইংরেজ ঐতিহাসিক ওরমি রচিত ‘ইন্দোস্থান’ গ্রন্থে আছে। তাতে আরেক ইংরেজ ইতিহাসবিদ কর্নেল মেলিসন যে রাষ্ট্রদ্রোহিতার কথা অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন, তার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, ‘হ্যাঁ! পরিণতির কথা বিবেচনা করে যত বিজয় অর্জিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে পলাশীকে সবচেয়ে বড় বলা যেতে পারে। কিন্তু আমার মতে, যুদ্ধ হিসেবে এটিকে গর্বের বিষয় বলা যেতে পারে না। প্রথমত, এটিকে কোনো ন্যায় যুদ্ধ বলা যেতে পারে না। যদি সিরাজ-উদ-দৌলার তিন প্রধান সেনাপতি তাঁদের প্রভুর প্রতি বিশ্বস্ত থাকতেন, তবে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজরা বিজয় লাভ করতে পারতেন—এ কথা কে বলতে পারেন? মির মদন খানের মৃত্যু পর্যন্ত ইংরেজরা [যুদ্ধে] কোনো অগ্রগতি লাভ করতে তো পারেনইনি, বরং তাঁরা পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছিলেন। নবাবের বিশ্বস্ত সেনারা যদি তাঁদের অবস্থানস্থলে শুধু তাঁদের অস্তিত্বকে ধরে রাখতেন, তবে ইংরেজরা কোনো সুবিধাই করতে পারতেন না। ফরাসিদের বিরুদ্ধে অগ্রসর হলে [ইংরেজদের] ডান দিকে ৪০ হাজার সৈন্যের সম্মুখীন হতে হতো। অতএব এ ধরনের অগ্রসর হওয়া ছিল অচিন্তনীয়। যখন রাষ্ট্রদ্রোহিতা তার কাজ শেষ করল, যখন রাষ্ট্রদোহিতা রণক্ষেত্র থেকে চলে যেতে বাধ্য করল [এবং] যখন রাষ্ট্রদোহিতার কারণে নবাবের সেনাবাহিনীকে তাদের কর্তৃত্বব্যঞ্জক অবস্থানস্থল ছেড়ে যেতে হলো, ঠিক তখনই সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন হওয়ার [আশঙ্কা থেকে] মুক্ত হয়ে ক্লাইব অগ্রসর হয়েছিলেন। অতএব সিদ্ধান্ত প্রদানকারী হলেও পলাশীকে কোনোমতেই মহান যুদ্ধ বলা যায় না।’ (‘ডিসাইসিভ ব্যাটলস অব ইন্ডিয়া’, পৃষ্ঠা ৭৩)