
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা কেবল মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয় না, ছিন্নভিন্ন করে দেয় বহু প্রজন্মের স্মৃতি, শিকড়, পরিচয় ও সহাবস্থানের দীর্ঘ পরিক্রমা। দাঙ্গায় উদ্বাস্তু হওয়া মানে শুধু স্থানচ্যুতি নয়, নিজের অস্তিত্ব, ভাষা, স্মৃতি ও মানবিক মর্যাদা ও সংস্কৃতির এক গভীর সংকটের ভেতর নিক্ষিপ্ত হওয়া। কালে কালে কত মানুষ যে এই উন্মত্ততার আগুনে নিঃস্ব হয়েছে, গৃহহারা হয়েছে, স্বজন ও বন্ধু হারিয়েছে, তা উদ্বাস্তু মানুষের চোখের ভেতর, তার জর্জরিত উঠানের ধুলায়; আর পরিত্যক্ত জনপদের নীরবতায় না দাঁড়ালে বোঝা মুশকিল। বারবার ইতিহাসের পালাবদলে মানুষ বাঁচার তাগিদে এক দেশ থেকে আরেক দেশে, এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে আশ্রয় খুঁজেছে—শুধু নির্ভয়ে, নিশ্চিন্তে থাকার আশায়। একসময় হয়তো সীমান্ত পেরিয়ে চলে যাওয়া বা আসা সম্ভব ছিল; কিন্তু আজ কাঁটাতারময় পৃথিবী আরও সংকীর্ণ, আরও কঠোর। মানুষের সামনে কেবল ভূগোলের সীমান্ত।
ইংরেজ আমলে রংপুর অঞ্চলে বেশ কিছু জমিদার ও রাজপরিবার এসে আবাস গড়ে তুলেছিল এবং নিজেদের রাজত্ব ও জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিল। তার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি রাজবংশ হলো তাজহাট রাজবংশ, ডিমলা রাজবংশ এবং কাকিনা রাজবংশ। অন্যদিকে জমিদার বংশগুলোর মধ্যে ভিতরবন্ধ জমিদার বংশ ও কুণ্ডি জমিদার বংশ বিশেষভাবে পরিচিত। এ ছাড়া ইটাকুমারী জমিদার, মন্থনা জমিদার, তুষভান্ডার জমিদার এবং মহিপুর জমিদারদের নামও উল্লেখযোগ্য।
এই রাজা ও জমিদারদের কেউই রংপুর অঞ্চলের প্রাকৃতজন বা ভূমিপুত্র ছিলেন না। তাঁরা বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এসে এখানে নিজেদের রাজত্ব বা জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
তাঁদের মধ্যে তাজহাট জমিদারবাড়ি কালের সাক্ষী হিসেবে আজও স্মৃতি বহন করছে তাজহাট রাজবংশের। যদিও তাজহাট জমিদার হিসেবে অধিক পরিচিত, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা রাজা এবং পরে মহারাজা উপাধিধারী ছিলেন। তাজহাটের রাজপরিবারকে কেন্দ্র করেই এই লেখা।
ইংরেজ আমলের রাজপরিবার হোক কিংবা জমিদার—তাদের ইতিহাসের প্রায় পুরোটাই শোষণ, শাসন, অত্যাচার, অবিচার ও জুলুমের ইতিহাস। ১৭৯৩ সালে ব্রিটিশদের ‘পার্মানেন্ট সেটেলমেন্ট’ বা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে জমিদারদের খাজনা আদায়ের ক্ষমতা বেড়ে যায়। অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারকে প্রতিবছর কত রাজস্ব দিতে হবে, তা স্থায়ীভাবে নির্দিষ্ট করা হয়। ফলে উত্তরবঙ্গের সহজ-সরল প্রাকৃতজনেরা চরম শোষণের শিকার হতে শুরু করেন।
ব্রিটিশ কর্মচারী তথা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী দেবী সিংহ ছিলেন সেই অত্যাচারীর প্রতীক। তাঁর অত্যাচারের প্রতিবাদেই ১৭৮৩ সালে সংঘটিত হয় রংপুর বিদ্রোহ। সে সময় বিভিন্ন নামে অতিরিক্ত খাজনা আদায় করা হতো। ‘আবওয়াব’ করের নামে বিয়ে উপলক্ষে কর, উৎসবের কর, নতুন ফসলের করসহ নানা অজুহাতে জরিমানা আদায় করা হতো। এসব খাজনা দিতে না পারলে জমি কেড়ে নেওয়া, লাঠিয়াল বাহিনী দিয়ে নির্যাতন চালানো, ঘরবাড়ি ভাঙচুর, জোর করে ফসল নিয়ে যাওয়া ও অপমান করা ছিল নিত্য ঘটনা।
কিছু ক্ষেত্রে প্রজাদের গাছে বেঁধে রাখা, প্রকাশ্যে চাবুক মারা কিংবা আটক রাখার কথাও বিভিন্ন দলিল ও স্মৃতিচারণায় পাওয়া যায়। জমিদারের বাড়ি নির্মাণ, রাস্তা তৈরি, নৌকা টানা ইত্যাদি কিংবা জমিদারের ব্যক্তিগত কাজে জোর করে শ্রম দিতে বাধ্য করা বা বেগার খাটানো হতো।
খাজনা দিতে না পারলে গরু, ধান ও গোলা জব্দ করা; জমি নিলামে বিক্রি করে দেওয়াসহ পরিবার উচ্ছেদ করা হতো। নারীদের ওপরেও নিপীড়নের ঘটনা বিভিন্ন বর্ণনায় পাওয়া যায়। এমনকি কোথাও কোথাও নতুন বউকে বাসর রাতের জন্য জমিদারের কাছে পাঠানোর মতো ভয়াবহ রীতিও প্রচলিত ছিল।
আবার নীলকর ও জমিদারেরা অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের জোর করে নীল চাষে বাধ্য করতেন। কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য পেতেন না। অন্যদিকে খাদ্যশস্য ফলানোর সুযোগও তাঁরা হারাতেন। গ্রামের সাধারণ মানুষ আদালত বা প্রশাসনে প্রভাবশালী জমিদারের বিরুদ্ধে সহজে দাঁড়াতে পারতেন না। মিথ্যা মামলা, কারাবন্দী করা কিংবা উচ্ছেদের ঘটনাও ঘটত। জমিদারবাড়ির সামনে দিয়ে জুতা–স্যান্ডেল পরে বা ছাতা মাথায় দিয়ে হাঁটাও ছিল অমার্জনীয় অপরাধ।
শ্রীচণ্ডীচরণ সেনের ঐতিহাসিক উপন্যাস দেওয়ান গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ দেবী সিংহের অত্যাচারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা। সেখানে লেখক রংপুর বিদ্রোহ ও দেবী সিংহের অত্যাচারের বর্বরতার বহু চিত্র তুলে ধরেছেন।
১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গের ছোটলাট স্টুয়ার্ট বেলি গোবিন্দলালের দানের উদারতার জন্য তাঁকে রাজা উপাধি দেন। রাজশাহী বিভাগের তৎকালীন কমিশনার বাহাদুর তাজহাটের রাজভবনে এসে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর হাতে রাজা উপাধির সনদ তুলে দেন। গোবিন্দলাল অসংখ্য পাঠাগার, দেবালয়, জলাশয় ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন; এমনকি দেওয়ানি বন্দীদের কারামুক্তির জন্য সরকারকে অর্থ দিয়েছেন বলে জানা যায়।
ইংরেজ শাসন ও জমিদারের অত্যাচারের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গে কৃষক বিদ্রোহ, তেভাগা আন্দোলন, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহের মতো আন্দোলন গড়ে উঠেছিল।
তবে জমিদারদের ইতিহাসের আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সব জমিদার অত্যাচারী ছিলেন না; বরং কিছু জমিদার শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণমূলক কাজেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের হাত ধরেই এ অঞ্চলের উন্নয়নের বিবর্তন ঘটেছে, শিক্ষা-সংস্কৃতি অগ্রসর হয়েছে। তেমনি এক রাজপরিবারের কথাই এখানে বলব।
মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহর (প্রথম) শাসনামলে শিখ নেতা বান্দা সিং বাহাদুরের নেতৃত্বে শিখ বিদ্রোহ শুরু হয় ১৭০৯–১৭১০ খ্রিষ্টাব্দে। পাঞ্জাব অঞ্চলে মোগল বাহিনী ও শিখদের রায়টের প্রভাব দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছায়। ১৭০৯ খ্রিষ্টাব্দে দিল্লিতে পঞ্চনদ অঞ্চলে যখন শিখ ও যবনের মধ্যে রায়ট চলছিল, তখন বহু শিখ নিজ এলাকা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন তাজহাট রাজবংশের পূর্বপুরুষ শিখ ক্ষত্রিয়। এই বংশের মান্নালাল রায় এককালের প্রসিদ্ধ রংপুর শহরের নিভৃত অঞ্চল, প্রাকৃতজনের আবাসভূমি অর্থাৎ আজকের মাহিগঞ্জে এসে বসতি স্থাপন করেন। তিনি ছিলেন স্বর্ণ ও রৌপ্যের ব্যবসায়ী। এ ব্যবসার মধ্য দিয়ে তিনি ধনবান হয়ে ওঠেন। পরে তার ধন-রত্নের ব্যবসার স্থানকে কেন্দ্র করেই জায়গার নামকরণ হয় ‘তাজহাট’।
মান্নালাল মারা গেলে এই বংশের অত্যন্ত প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি গিরিধারীলাল রায় বিপুল অর্থ ব্যয় ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে তাঁর ভাগনের তাজহাটের সুবৃহৎ সম্পত্তি উদ্ধার করেন। উত্তরাধিকার সূত্রে সেই স্থানে জমিদারির মালিকানা লাভ করেন। অন্যদিকে ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ১ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় গিরিধারীলাল রায়ের ছেলে গোবিন্দলাল রায় জন্মগ্রহণ করেন। গিরিধারীলাল রায়ের মৃত্যুর পর গোবিন্দলাল রায় তাজহাট জমিদারির উত্তরাধিকারী হন। গোবিন্দলাল ছিলেন শান্ত স্বভাবের অত্যন্ত বিনয়ী ও দানশীল। তরুণ বয়স থেকেই তিনি বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজে বিপুল অর্থ দান করতেন। দার্জিলিং শহরে ‘লুইস জুবিলি স্বাস্থ্যনিবাস’ নির্মাণের জন্য সে সময় এক লাখ টাকা দান করেছিলেন তিনি।
১৮৮৮ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গের ছোটলাট স্টুয়ার্ট বেলি গোবিন্দলালের দানের উদারতার জন্য তাঁকে রাজা উপাধি দেন। রাজশাহী বিভাগের তৎকালীন কমিশনার বাহাদুর তাজহাটের রাজভবনে এসে এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তাঁর হাতে রাজা উপাধির সনদ তুলে দেন।
গোবিন্দলাল অসংখ্য পাঠাগার, দেবালয়, জলাশয় ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখেন; এমনকি দেওয়ানি বন্দীদের কারামুক্তির জন্য সরকারকে অর্থ দিয়েছেন বলে জানা যায়।
১৯ শতকের সেই আমলেই ৪ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৭ টাকা দান করেছিলেন তিনি। এ ছাড়া তিনি গোপনে বার্ষিক ও মাসিক দান করতেন, যার পরিমাণ প্রতিবছর ন্যূনতম ছয় হাজার টাকা। এর বাইরে অভুক্তদের ভোজনের জন্য বার্ষিক পাঁচ হাজার টাকা এবং অতিথি আপ্যায়নের জন্য বার্ষিক পাঁচ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছিলেন। এসব গুণের জন্য ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গেশ্বর স্যার চার্লস ইলিয়ট বাহাদুর বেলভিয়ার প্রাসাদে একটি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গোবিন্দলাল রায়কে ‘রাজা বাহাদুর’ উপাধির সনদ দেন।
এরপর গোবিন্দলালের আরও মহান সব কৃতকর্মের জন্য ভূতপূর্ব রাজপ্রতিনিধি লর্ড অ্যালগিন বাহাদুর ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে তাঁকে মহারাজা উপাধি দিয়ে সম্মানিত করেন।
গোবিন্দলাল মহারাজা উপাধি গ্রহণ করলেও তা তিনি বেশি দিন ভোগ করতে পারেননি। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দের ১২ জুন শনিবার ভারতবর্ষ এক ভয়ংকর ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছিল। সেই ভূমিকম্পে বিশেষ করে উত্তরবঙ্গ ও আসামের ব্যাপক ক্ষতি হয়। বহু জমিদারবাড়ি, কাচারিঘর, মন্দির ও বাড়িতে ফাটল ধরে ও ধসে পড়ে। এমনকি তিস্তা নদীর গতিপথ, নাব্য ও জলপ্রবাহে পরিবর্তন ঘটে। মানুষ দিনের পর দিন খোলা মাঠে অবস্থান করে।
সেই ভূমিকম্পে মহারাজা গোবিন্দলালের রাজপ্রাসাদ অর্থাৎ তাজহাট জমিদারবাড়ির ভবন ধসে পড়ে। এ সময় গোবিন্দলাল রাজপ্রাসাদের বারান্দায় বসে আরাম করছিলেন। তিনি ভূমিকম্পে আতঙ্কিত হয়ে প্রাসাদের বাইরে বের হওয়ার চেষ্টা করলে কার্নিশের ইট ভেঙে পড়ে তার বাঁ পায়ের হাড় ভেঙে যায়। মহারানি, কুমার ও রাজকুমারীরা রাজভবনের বাইরে বেরিয়ে শ্রীযুক্ত বঙ্গ চন্দ্র রায়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন এবং প্রাণে রক্ষা পান।
বাবার উত্তরসূরি হিসেবে গোপাললাল রায় ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বইয়ের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। এই লাইব্রেরিতে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আব্বাসউদ্দীন আহমদসহ পশ্চিমবঙ্গের বাঘা বাঘা নেতা, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। জে এন গুপ্ত যখন রংপুরের কালেক্টর ছিলেন, তখন রংপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন সুরেন্দ্র চন্দ্র রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন প্রথম সম্পাদক। সেই সূত্র ধরে রংপুরে কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে।
আহত মহারাজ ছোটলাট স্যার আলেকজান্ডার ম্যাকেঞ্জি বাহাদুরের আদেশে চিকিৎসার জন্য কলকাতা মেডিকেল কলেজের খ্যাতিমান সার্জারি চিকিৎসক ও’ব্রায়েনের শরণাপন্ন হন। সেখানে তিনি আরও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি ও’ব্রায়েনের সামনে একটি উইল করেন। এই উইলে তিনি মহারানি শরৎসুন্দরী দেবী, মহারাজের শ্বশুর শ্রীযুক্ত রামকৃষ্ণ বর্মা, মহারাজের জামাতা শ্রীযুক্ত রায় উমাপ্রসাদ চৌধুরী, মহারাজের ভ্রাতা শ্রীযুক্ত শিব নারায়ণ রায়, মহারাজের পারিবারিক চিকিৎসক শ্রীযুক্ত হরচন্দ্র রায় এবং রংপুর জজ আদালতের শ্রীযুক্ত গোপাল চন্দ্র চক্রবর্তী—এই ছয়জনের নাম অসিয়ত হিসেবে উল্লেখ করেন এবং যাবতীয় সম্পত্তির দেখভাল বা বণ্টনের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
মহারাজ গোবিন্দ লালের প্রথম স্ত্রী অর্থাৎ প্রথম মহারানি একটি কন্যাসন্তান রেখে মৃত্যুবরণ করলে দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছিলেন। দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে দুটি কন্যাসন্তান ও একটি পুত্রসন্তান জন্ম নেয়। গোবিন্দলাল ভূমিকম্পে আহত হওয়ার পর চিকিৎসারত অবস্থায় মাত্র ১০ দিন জীবিত ছিলেন।
মহারাজের মৃত্যুর সময় তার একমাত্র ছেলে গোপাল লাল রায়ের বয়স ছিল ১০ বছর। তাই গোপাল লালের মা মহারানি শরৎসুন্দরী দেবী ও নানা রামকৃষ্ণের কাঁধে জমিদারির ভার পড়ে। ফলে অপ্রাপ্তবয়স্ক উত্তরাধিকারী ও অযোগ্য জমিদারের অভিযোগে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সেই জমিদারি চলে যায় ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক গঠিত কোর্ট অব ওয়ার্ডসের অধীনে। এ সময় রাজকুমার শিক্ষা অর্জনের জন্য চলে যান মধ্যপ্রদেশের রায়পুরের রাজকুমার কলেজে। ১৯০৫ সালে তাঁর মাতৃবিয়োগ ঘটে। সাবালক হওয়ার পর ১৯০৮ সালের ১ আগস্ট গোপাল লাল রায় রংপুরের পৈতৃক তাজহাট জমিদারির দায়িত্ব নেন।
গোপাল লাল রায়ও ছিলেন তাঁর বাবার মতো দানশীল ও উদার ব্যক্তি। তিনি ছোটলাট স্যার লেন্সলট হেয়ার সাহেবের প্রতিমূর্তি স্থাপনের জন্য ২৫০ টাকা দান করেছিলেন এবং ১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা শহরে নবীন ভারত সম্রাটের অভ্যর্থনা আয়োজনের জন্য দুই হাজার টাকা চাঁদা দেন।
১৯১১ খ্রিষ্টাব্দের ১২ ডিসেম্বর দিল্লির বিরাট অভিষেক অনুষ্ঠানে গোপাললালকে আমন্ত্রণ জানান পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের ছোটলাট। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার টাউন হলে হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের সমর্থনে যে সভা হয়, সেই সভায় তিনি উপস্থিত থেকে পাঁচ হাজার টাকা চাঁদার জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে রাজা বাহাদুর রংপুর মিউনিসিপ্যালিটির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এরপর পরপর তিনবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি তিন বছর রঙ্গপুর ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সদস্য ও পাঁচ বছর রঙ্গপুর জমিদার সভার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
১৯১২ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ জুন ভারতেশ্বর মহামান্য পঞ্চম জর্জ ফ্রেডেরিক আর্নেস্ট অ্যালবার্টের জন্মতিথি উপলক্ষে এক অনুষ্ঠানে গোপাল লাল রায় তাঁর কৃতকর্মের পুরস্কার হিসেবে রাজা উপাধিতে ভূষিত হন। তিনি ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর টাউন হলের উন্নয়নে চার হাজার টাকা, বর্ধমান বিভাগের বন্যাপীড়িত মানুষের জন্য এক হাজার টাকা এবং বারাণসী ধামের হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে প্রতিশ্রুতি অনুসারে পাঁচ হাজার টাকা দেন। এই বারাণসী ধামের এক কৃষক মাটি খননের সময় একটি কলসির ভেতর অষ্টধাতুর পাঁচটি বিষ্ণুমূর্তি আবিষ্কার করেন। পরে সরকারের কাছ থেকে গোপাললাল একটি মূর্তি সংগ্রহ করে ১৯১৪ সালের ২০ জানুয়ারি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।
বাবার উত্তরসূরি হিসেবে গোপাললাল রায় ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক মাহিগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বইয়ের সংখ্যা ছিল ১০ হাজারের বেশি। এই লাইব্রেরিতে এসেছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, আব্বাসউদ্দীন আহমদসহ পশ্চিমবঙ্গের বাঘা বাঘা নেতা, সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।
জে এন গুপ্ত যখন রংপুরের কালেক্টর ছিলেন, তখন রংপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন সুরেন্দ্র চন্দ্র রায়চৌধুরী। তিনি ছিলেন প্রথম সম্পাদক। সেই সূত্র ধরে রংপুরে কারমাইকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা লাভ করে ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে। এই কলেজ প্রতিষ্ঠায় কুণ্ডি জমিদার মনীন্দ্র চন্দ্র রায়চৌধুরী ও তাঁর ভাই সুরেন্দ্র চন্দ্র রায়চৌধুরী ৪১৯ বিঘার বিশাল ভূখণ্ড দান করেছিলেন। গোবিন্দলাল ছিলেন প্রধান দাতাদের অন্যতম। বিপুল পরিমাণ অর্থ অনুদান সংগ্রহেও তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নামে কারমাইকেল কলেজে একটি হলের নামকরণ করা হয় জি এল হোস্টেল। বর্তমানে হোস্টেলটি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।
যদিও দেশভাগ সংঘটিত হয় ১৯৪৭ সালে; তবু জমি ও স্থায়ী সম্পত্তির দাবি-নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রম ৩১ মার্চ ১৯৫১ পর্যন্ত ছিল। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য, উন্নয়নসহ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে দেশভাগ যে প্রভাব ফেলেছিল, তার ক্ষতিপূরণ আজও হয়নি। দেশভাগের ফলে গোপাললালের পরিবারও দেশ ছেড়ে চলে যায়।
১৯১৮ সালের ৩ জুন গোপাল লাল রায় তার গণমুখী কৃতকর্মের জন্য মহারাজা উপাধি পান।
রাজ আমল ও জমিদারি উচ্ছেদ হয়ে গেছে। তবে কালের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে তাজহাট রাজবাড়ি। ভূমিকম্পে ধ্বংসের পর অভিজাত এই বাড়ি বিংশ শতকের শুরুর দিকে নির্মাণ করেছিলেন গোপাল লাল রায়। দেশভাগ ও বাংলাদেশ স্বাধীনের পর বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীয়করণের লক্ষ্যে প্রেসিডেন্ট এরশাদ রাজবাড়িটিতে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চ হিসেবে বিভাগীয় হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন করেছিলেন (১৯৮৪-৯১)।
পরে ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে গণতান্ত্রিক সরকার হাইকোর্টের বেঞ্চটি বন্ধ করে দেয়। ১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ প্রাসাদটিকে একটি সংরক্ষিত স্থাপত্য হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দে রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি থেকে রংপুর জাদুঘরকে স্থানান্তর করে এ প্রাসাদের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে আসা হয়। এখন এটি জাতীয় জাদুঘরের আওতাভুক্ত, নাম ‘রংপুর জাদুঘর’। রাজা গোপাল লাল রায়ের নামে রংপুর নগরী থেকে সাতমাথাগামী প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়েছে জি এল রায় রোড।
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বহু রক্তপাতের মধ্য দিয়ে ১৯৪৭ সালের ১৪–১৫ আগস্ট ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসান ঘটে এবং দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি আলাদা রাষ্ট্র গঠিত হয়। দেশভাগের সবচেয়ে গভীর অভিঘাত পড়েছিল বাংলায়। পূর্ববাংলা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হলে দুই বাংলায় নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে বহু হিন্দু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবী পরিবার পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে চলে যান। একই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও কোচবিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার পূর্ববাংলায় এসে নতুন আবাস গড়ে তোলেন। সেই ধারাবাহিকতায় আসামের বরপেটা রোড থেকে আমার নানা আবদুল মালেক ব্যাপারীও তাঁর আত্মীয়স্বজনসহ রংপুরে এসে শালবন মিস্ত্রিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। কোচবিহারের ইতিহাস গ্রন্থ রচয়িতা খান চৌধুরী আমানাতুল্লাহ তাঁর পরিবারসহ রংপুরের ধাপে এসে আবাস গড়ে তোলেন। ভারত থেকে আসা মুসলিম শরণার্থীদের জন্য বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলে কয়েকটি মুহাজির কলোনি গড়ে তোলা হয়েছিল; এর মধ্যে রংপুর স্টেশনের আলমনগর কলোনি ছিল অন্যতম।
দেশভাগের সময় দুই দেশে বহু মানুষ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি বিনিময়ের মাধ্যমে নতুন ভূখণ্ডে জমির মালিকানা গ্রহণ করেন। তবে অনেকে কোনো বিনিময়ের সুযোগ না পেয়েই ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। আবার কেউ কেউ একই সম্পত্তি একাধিক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করায় পরবর্তীকালে জটিল আইনি বিরোধেরও সৃষ্টি হয়, যার কিছু প্রভাব এখনো বিভিন্ন আদালতে বিদ্যমান। যদিও দেশভাগ সংঘটিত হয় ১৯৪৭ সালে; তবু জমি ও স্থায়ী সম্পত্তির দাবি-নিবন্ধনসংক্রান্ত কার্যক্রম ৩১ মার্চ ১৯৫১ পর্যন্ত ছিল। উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্য, উন্নয়নসহ সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোতে দেশভাগ যে প্রভাব ফেলেছিল, তার ক্ষতিপূরণ আজও হয়নি। দেশভাগের ফলে গোপাললালের পরিবারও দেশ ছেড়ে চলে যায়।
ঠিক এভাবেই কালে কালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে। বহু জমিদার, রাজপরিবার শোষণ-শাসনে অতিষ্ঠ প্রজাদের দ্বারা নিঃস্ব হয়েছে, নির্বংশ হয়েছে। ইতিহাস যেমন কাউকে ক্ষমা করে না, তেমনি কোনো রাজা বা রাজনৈতিক নেতাদেরও অন্যায়-অবিচারকে ক্ষমা করে না। তাজহাট রাজবাড়ির ভবন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়—ইতিহাস বড়ই নির্মম।