চলনবিলের আলোকচিত্র ও চিত্রকর্মের সমন্বয়ে
চলনবিলের আলোকচিত্র ও চিত্রকর্মের সমন্বয়ে

চলনবিল

ছয় মাস জলে কষ্ট, ছয় মাস জলের কষ্ট

‘কাম থুইয়া মারে মাছ, অলক্ষ্মী লাগে পাছ।’

চারদিকে অথই পানি। মাছ ধরা ছাড়া আর কীই–বা করার আছে! এমন এক আবহ ছিল আমাদের জীবিকার।

‘মেঘ, বর্ষা, বৃষ্টি—যেন ঠাসবুনট। কবে আসবে ‘বর্ষা’! অধির অপেক্ষা। রুপালি রঙের বর্ষা। এই চলনবিলের ভাইস্যা কাল ঠিক আষাঢ়-শ্রাবণের বৃত্তে আবদ্ধ নয়! আষাঢ় থেকে কার্তিক মাস চারদিকের বন্যার পানিতে ভেসে যায় মাঠঘাট। শেষের দিকে তাই দুই হাত–পা দিয়ে ঠেলতাম। কবে নামব শুকনা দিগন্তে! প্রাণখুলে দৌড়াব মাঠে মাঠে। বর্ষাবন্দী জীবন থেকে হাঁপ ছাড়তে ‘নাইওর’ যেত গ্রামের বঁধুরা। সে-ও এক অনন্য দৃশ্য। এটি লোকসংস্কৃতির আরেক আবেগঘন অধ্যায়। এ অঞ্চলে নাইওর শুরু হতো আষাঢ় মাসে। বিলে পানি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আনন্দে হাত–পা নেচে উঠত এই ভূমির সন্তানদের। বছরের ছয় মাস নৌকা ছাড়া কোনো গত্যন্তর ছিল না।

চলনবিলের দক্ষিণ-পূর্ব কোণের উৎপত্তিস্থল থেকে মাইল দশেক পশ্চিম-উত্তর কোণে আমাদের বাড়ি। গ্রামটি পড়েছে সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর উপজেলায়। বর্ষা মৌসুমে দক্ষিণে তাকালে যত দূর চোখ যায়, পানি আর পানি! দক্ষিণে ধালাই গাঙ। এখনো বর্ষার সময় জলে ধলা হয়ে যায় চরাচর। ধলাই গাঙ যেখান থেকে শুরু, তার অল্প একটু দূরে পোতাজিয়া গ্রাম। সে গ্রামেই শৈশব কেটেছে সাহিত্যিক পরিমল গোস্বামীর। তিনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের মানুষ। তাঁর স্মৃতিকথায় এই অঞ্চলের বর্ণনা পাই এভাবে—‘বর্ষাকালে বাড়ির দরজায় আসে নৌকো। স্থানীয় জমিদার অম্বিকানাথ রায় স্কুলের সেক্রেটারি, তাঁদের প্রশস্ত একটা ঘরে ছিল হেড মাস্টারের বাস। এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বড়ই কষ্ট হতে লাগল। রেড়ির তেলের প্রদীপে রাতে পড়া। তার সলতে অদ্ভুত, বর্ষাকালে জলে এক রকম লতাগাছ হয়, তারই ভেতরের শাঁস, গোল লম্বা এবং শাদা, স্পঞ্জের মতো তেল শুষে নেয়, তাতেই প্রদীপ জ্বলে। গ্রামটিও অদ্ভুত। একেকটা উঁচু জায়গার ওপরে এক একটা পাড়া। এক পাড়া থেকে আর এক পাড়ায় যেতে হলে পাহাড়ের মতো নিচে নেমে কখনো সংকীর্ণ ঢালু পথ বেয়ে, কখনো বা বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে গিয়ে আর এক পাড়ায় আরোহণ। বর্ষাকালে জলে সব ভরে ওঠে এবং দুই পাড়ার মধ্যবর্তী জল পাড়ার জমির সমতলে এসে দাঁড়ায়। তখন নৌকায় যাতায়াত। গ্রামটি প্রকাণ্ড; কিন্তু এ রকম পল্লী ভেনিস আমি আর দ্বিতীয়টি দেখিনি। এ গ্রামে সাইকেল বা মোটর সম্পূর্ণ অচল। মনে হলো এ আমার নির্বাসন। এ রকম জায়গায় বাবা কেন এবং কীভাবে, এসেছিলেন তা আমি জানি না।’

—স্মৃতিচিত্রণ, পরিমল গোস্বামী, দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০ ভাদ্র ১৩৬৭, প্রকাশক, প্রকাশচন্দ্র সাহা, গ্রন্থম ২২।১, কর্নওয়ালিস স্ট্রিট, কলিকাতা-৬।

‘স্মৃতিচিত্রণ’ পড়ার পর পরিমল গোস্বামীর বাল্যবন্ধু এবং ওই পোতাজিয়া গ্রামের জমিদার কুমুদনাথ রায়ের পুত্র ফণীন্দ্রনাথ রায় ১৩৬৭ ভাদ্র, (১৯৬০) সংখ্যায় কথাসাহিত্য (সম্পাদক, গজেন্দ্রকুমার মিত্র) পত্রিকায় একটি প্রবন্ধ লেখেন। রচনাটি যখন লিখেছেন, তখন ফণীন্দ্রনাথ রায়ের বয়স বাষট্টি বছর। তিনি লিখেছেন—

‘জায়গাটির বর্ণনা পরিমল যা দিয়েছেন তা ওর সবখানি নয়। বছরে ছয় মাস এটি “গ্রাম্য ভেনিস” হয়ে থাকে বটে, কিন্তু বাকি ছমাস সেই বিপুল জলরাশি কোথায় সরে যায়, তখন ছোট ছোট টিলার উপর গ্রামের পাড়াগুলি দেখায় যেন পশ্চিমের কোনো পাহাড়ে জায়গা। বিক্রমপুরের পাড়াগুলির সঙ্গে যাঁদের পরিচয় আছে তাঁরা এ কথা বুঝতে পারবেন। গ্রাম থেকে মাইলখানেক দূরে যে নদীটি প্রবাহিত সেটি “চলনবিল” নামে খ্যাত প্রচণ্ড একটি হ্রদ থেকে বেরিয়ে এসেছে। শীত-গ্রীষ্মে সেটি “ছোট নদী” হলেও বর্ষায় যে রূপ ধরত তাকে সাতবেড়িয়ার প্রান্তবাহিনী হলেও পদ্মার চেয়ে খুব ছোট বলা যায় না। পাশাপাশি দুটি নদী এবং তাদের দুই পাশের মাঠ-প্রান্তর এক বিরাট জলবিস্তারের নিচে তলিয়ে গিয়ে যে আকার ধারণ করত ওখানে তাকে বলত “পাথার”। দুর্যোগের দিনে এই কয়েক মাইলব্যাপী পাথার পার হয়ে যেতে আমাদের গ্রামের দক্ষ “শিকারি” মাঝিরাও ভয় পেত। গ্রামের মধ্যের জল প্রণালি এবং জলাশয়গুলি অবশ্য বাইরের এই বিপুল জলরাশির সঙ্গে যুক্ত হলেও ছিল শান্ত; গ্রামের বাইরের মাঠের ধানগাছগুলির (যেগুলির বর্ষার জলের সঙ্গে বেড়ে প্রায় বাঁশগাছের মতো বড় হতো) তাদের দ্বারা পাথারের সেই বিপুল জলরাশির আন্দোলন অনেকখানি প্রতিহত হতো। চলনবিলটি ছিল একটি “ভূমধ্যসাগর” বিশেষ। রাজসাহী এবং পাবনা জেলার সীমানার অনেকখানি জুড়ে এটি অবস্থিত ছিল এবং উত্তরবঙ্গের আত্রাই (আত্রেয়ী) করতোয়া প্রভৃতি নদী প্রবাহিত হয়ে এসে এতে নিজেদের জলসম্পদ উজাড় করে আবার নানা নাম নিয়ে বেরোত, কেউবা পদ্মা কেউবা যমুনার (ব্রহ্মপুত্রের) সন্ধানে। এই প্রাকৃতিক বিন্যাসে চলনবিলের আশপাশের জমিগুলি হয়ে উঠেছিল অত্যন্ত উর্বর এবং নদীগুলির দুপাশে বিস্তৃত ঘাসের জমিগুলি ইজারা নিয়ে অবস্থাপন্ন দুধের ব্যবসায়ীরা প্রধানত কলকাতার সঙ্গে অনেক টাকার দুধ-ঘি এবং ছানার কারবার করতেন। তখনকার স্বল্পতোয়া নদীগুলির তীরে, ঢেউ খেলানো সবুজ মাঠে বা (ছাহামে) বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরা হৃষ্টপুষ্ট গরুতে ভরা এই “বাথান”গুলি দেখে আমার আপনা থেকেই মনে পড়ত বিলেতি বইগুলিতে দেখা হল্যান্ডের অনুরূপ ছবি। আর পুজোর সময়কার ভরা বর্ষার শান্ত দিনে জলে ডোবা ধানক্ষেতগুলির মাঝখানে কুমুদ ফুলের পাড়-দেওয়া খালগুলিতে খোলা নৌকায় বসে দিগন্তবিস্তৃত জলরাশির পারে ছবিতে দেখা কাশ্মীরের পর্বতগুলি বসিয়ে নিতে আমার একটুও অসুবিধা হতো না।’

ছবিতে শাহজাদপুরের নৌকাবাইচ

রবীন্দ্র শতবর্ষ পূর্তি গ্রন্থমালায় ‘ছিন্নপত্রাবলী’র বৃহত্তর সংস্করণ প্রকাশিত হয়। এ বইয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জলপথে’ শিরোনামে একটি ছবি দেখে পরিমল গোস্বামী কৌতূহলী হয়ে লেখেন—

‘“ছিন্নপত্রীবলী” (ছিন্নপত্রের পরবর্তী বৃহত্তর সংস্করণ) নামক বইতে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা রঙীন চিত্র “জলপথে” দেখে চমকে উঠেছিলাম, এ ছবি আমার মনে সেই পঞ্চাশ বছর আগের পরিচিত স্থানের স্মৃতি জাগিয়ে দিয়েছিল—মনে হচ্ছিল পোতাজিয়া হাইস্কুলের ধারে বোটটি বাঁধা আছে।’ পৃষ্ঠা ৫২, আমি যাঁদের দেখেছি, পরিমল গোস্বামী, প্রচ্ছদ: নৃপেন্দ্র ভট্টাচার্য, প্রথম প্রকাশ, এপ্রিল, ১৯৬০, প্রকাশক নির্মলকুমার চক্রবতী, ১।১৯, গোপালচন্দ্র বসু লেন কলকাতা-৫০, পরিবেশক রূপা অ্যান্ড কোম্পানী, কলকাতা: এলাহাবাদ: বোম্বাই।

সে বইয়ে আরও বর্ণনা আছে, ‘...পোতাজিয়া গ্রামের পুব দিক ঘেঁষে বইত বলেশ্বর নদ—তার কূলে ছিল ঠাকুরবাবুদের হাটখোলা, সাহাজাদপুর পৌঁছানোর আগে কবির [রবীন্দ্রনাথের] বোট ভিড়ত সেখানে।’

শিল্পাচার্য অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯২৬-২৭ সালের দিকে জলরঙে বেশ কিছু ল্যান্ডস্কেপ করেছেন, যা ‘শাহজাদপুর সিরিজ’ নামে পরিচিত। শত বছর আগের সেই ছবিগুলো দেখে অনেকটাই অনুমান করা যায় এই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি সম্পর্কে। যা সুর-সন্ধ্যার বুননে অজস্র রহস্যের তোরণ বিদিত করে আমাদের। সত্যিই কি এমন ছিল আমাদের এই অঞ্চল! অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর উল্লাপাড়া রেলস্টেশনের যে ছবি এঁকেছেন, সেটি ১৯২৭ সালে। জলরঙে আঁকা এই ল্যান্ডস্কেপটিতে দেখা যায়, স্টেশনটি খোলা প্রান্তর। ছবিতে দেখা যায়, স্টেশনটির দক্ষিণে কয়েকটি গাছ দাঁড়িয়ে আছে। আরেকটু দূরেই সারি সারি নৌকা বাঁধা ঘাট। কয়েকটি বড় নৌকাও দেখা যায় ছবিটিতে। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আঁকা স্টেশন উল্লাপাড়ায় বর্ষা তথা জলের বিস্তার দেখা যায়! শত বছর আগের চিত্রটি সামনে নিয়ে বর্তমানের উল্লাপাড়া দেখলে কোনোভাবেই মেলানো যায় না।

অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর শাহজাদপুর, উল্লাপাড়ার ল্যান্ডস্কেপ করেন ১৯২৬-২৭ সালে। এরও বছর চারেক আগে নীরদচন্দ্র চৌধুরীর লেখায় এ অঞ্চলের বর্ষার রূপ ধরা পড়েছে এভাবে—

‘১৯১৩ সনের দামোদরের বন্যার বর্ণনা শুনিয়াছিলাম ও ছবি খবরের কাগজে দেখিয়াছিলাম। কিন্তু নিজের চোখে সর্বব্যাপী বন্যা দেখিলাম ১৯২২ সনে উত্তরবঙ্গে। ইহার কথা সকলেরই জানা আছে। সিরাজগঞ্জ হইতে ট্রেনে ঈশ্বরদী আসিতেছি। গভীর রাত্রি, অন্য যাত্রীরা ঘুমাইয়া আছে। আমার কিন্তু ট্রেনে ভালো ঘুম হয় না, প্রায়ই জাগি। সে রাত্রিতে জাগিবামাত্র দেখিলাম, ট্রেন দাঁড়াইয়া আছে, শুনিলাম নিচে লোকে চিৎকার করিয়া কী নির্দেশ দিতেছে তার পর ট্রেন আবার ধারে ধীরে চলিতেছে। একবার উঠিয়া দরজার কাছে গিয়া দাঁড়াইলাম। জ্যোৎস্না রাত্রি, প্রায় দিনের মতো পরিষ্কার, তবে রুপালি। চারিদিক জলে জলাকার, এক রেলের বাঁধ ভিন্ন কোথাও স্থলের চিহ্ন নাই। একটু পরেই ট্রেনটা একটা পুলের উপর আসিয়া আরও বেগ কমাইয়া অতি ধীরে চলিল। দেখি, নিচে নদীর জল প্রায় গার্ডার পর্যন্ত পৌঁছিয়াছে, আর ফেনায় ফেনায় আবতিত হইয়া ঘোর গর্জন করিয়া পুলের নিচ দিয়া যাইতেছে। জলের বেগ এত প্রবল যে দূরে কয়েকটা নৌকার মাঝিরা লগি ঠেকাইয়া নৌকাগুলিকে রুখিতেছিল, নহিলে সেগুলি পুলের উপর পড়িয়া ভাঙিয়া যাইত।

‘পুল পার হইয়া গাড়ি যখন খোলা জায়গার ভিতর দিয়া চলিল, তখন আর একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখিলাম। জল উঁচু-নিচু হয় না প্রবাদেই আছে, বিজ্ঞানেও বলে। কিন্তু রেললাইনের বাঁধের দুধারের জল একেবারে অসমতল। একদিকে জল লাইনের প্রায় কাছে উঠিয়াছে, অন্য দিকে ছয়-সাত ফুট নীচে। বুঝিলাম, পুল ও কালভার্টের অল্পতার জন্য জল একদিক হইতে আর একদিকে তাড়াতাড়ি সরিতেছে না। আরও একটা জিনিস দেখিলাম—পারে পারে শেয়ালেরা বসিয়া আছে, ঊর্ধ্বমুখ হইয়া শৃগালজীবনের এই বিপর্যয়ের ধ্যান করিতেছে। ট্রেনের গর্জনে ও সান্নিধ্যে তাহাদের কোনও ভয় নাই।’

—পৃষ্ঠা, ১৩৪-১৩৫, বাঙালী জীবনে রমণী, নীরদচন্দ্র চৌধুরী, প্রথম প্রকাশ, চৈত্র, ১৩৬৭, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কলিকাতা-১২

ঝুলন্ত রাতের কল্পনার বারান্দায় ভর করে চলে যাই, আরও দূররাজ্যে। কবে কোন দূররাজ্য থেকে যে আমাদের পূর্বপরুষেরা বসতি গেড়েছিলেন এই জলাবতীর দেশে। অথই মেঘপুঞ্জের ভেতরে গিয়ে ভাবনার প্রতিসরণ ঘটে চিত্রশিল্পী মুকুল চন্দ্র দেবের আঁকা ‘ড্রয়িং দ্য নেট, করতোয়া রিভার’ নামের আরও একটি ল্যান্ডস্কেপের ওপর। এটি দেখে নিশ্চয় আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠেন এখানকার ভূমিপুত্ররা। মুকুল দে অবশ্য ছবিটি এঁকেছেন ১৯৭৪ সালে। এই ছবি আঁকারও দুই যুগ পর চলনবিলের ল্যান্ডস্কেপটির কিছুটা দৃশ্যপট স্বচক্ষে দেখার সৌভাগ্য হয়েছে। তিন দশক আগেও চলনবিল যেমন ছিল, তার ছিটেফোঁটা দৃশ্যও এখন আর অবশিষ্ট নেই।

এই অঞ্চলের একটি প্রবাদ আছে, ‘ছমাস জলে কষ্ট এবং ছমাস জলের কষ্ট।’ জলের কষ্ট হলেও একসময় চলনবিল দেশি মাছের আপন ঠিকানা বলে সমাদৃত ছিল। রূপান্তরের অর্থনীতিতে ভূমিপুত্রদের মাছ ধরা ও নৌকা চালানোর পেশাতে এসেছে পরিবর্তন। চলনবিলে নেই আগের মতো পানি। সংগত কারণে মাছের পরিমাণও কমে গেছে। বিলুপ্তি ঘটেছে নানান প্রজাতির মাছের। এই বিলের একসময়ের বিখ্যাত মাছের আড়ত লাহিড়ী মোহনপুর। ১৯২৩ সালে প্রকাশিত রাধারমণ সাহা প্রণীত ‘পাবনা জিলার ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, সরকার মোহনপুর স্টেশন থেকে বছরে প্রায় ৪০ হাজার টাকা কর পেত শুধু মাছ বিক্রির চালানের জন্য। শুধু মাছ নয়, এখান থেকে বিপুল পরিমাণ কাছিমও রপ্তানি হতো কলকাতায়। ১০০ বছরের ব্যবধানে এ অঞ্চলে কাছিম এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। চলনবিলের ভেতর দিয়ে মহাসড়ক তৈরির ফলে মাছের প্রজনন ক্ষমতাও যেমন হ্রাস পেয়েছে, হারিয়ে গেছে জীববৈচিত্র্যও।

ক্ষীর নদী সাগর নামে পরিচিত ছিল এই দুর্জেয় ভূখণ্ড। ‘ইম্পিরিয়াল গেজটিয়ার অব ইন্ডিয়া’ থেকে জানা যায়, ১৮২৭ সালে জনবসতি এলাকা বাদ দিয়ে চলনবিলের জলমগ্ন অংশের আয়তন ছিল ৫৫০ বর্গমাইল বা ১ হাজার ৪২৪ বর্গকিলোমিটার। ১৯০৯ সালে চলনবিল জরিপের এক প্রতিবেদনে ১৪২ বর্গমাইল আয়তন দেখানো হয়। হিসাব অনুযায়ী, ৮২ বছরে চলনবিলের আয়তন কমেছে ৪০৮ বর্গমাইল। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বর্তমানে চলনবিলের আয়তন ১৬৮ বর্গকিলোমিটার। নাটোরের ভূমিপুত্র প্রমথনাথ বিশী তাঁর ‘চলন বিল’ উপন্যাসে লিখেছেন—

‘বর্তমানের মুষ্টিমেয় চলন বিলের কথা ভুলিয়া যাইতে হইবে। আমরা সওয়াশো বছর আগেকার কথা বলিতেছি—তখনই চলন বিল বাংলা দেশের বৃহত্তম জলময় অংশ ছিল, যতই প্রাচীনতর কালে অগ্রসর হওয়া যাইবে, ততই দেখা যাইবে বিলের আয়তন ক্রমে বৃহত্তর হইতেছে। অনুমান করিলে অন্যায় হইবে না যে চার শত বৎসর পূর্ব্বে এই বিলটি রাজসাহী, পাবনা, বগুড়ার অধিকাংশ স্থান জুড়িয়া বিরাজ করিত। ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মার সঙ্গমস্থলের পশ্চিমোত্তর অংশে চলন বিল বিরাজিত; অবস্থান, আকৃতি ও প্রকৃতি দেখিয়া চলন বিলকে উত্তর বাংলার নদনদী স্নায়ুজালের নাভিকেন্দ্র বলিলে অত্যুক্তি হইবে না।’

—পৃষ্ঠা ২১, প্রথম প্রকাশ, মিত্রালয়, ১০ শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট, কালকাতা। বি.দ্র, বইটির তৃতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়, বৈশাখ ১৩৬৪ বঙ্গাব্দে।

১৮২৮ সালের গেজেটিয়ার থেকে জানা যায়, বিলের হান্ডিয়াল গ্রামের চারদিকে ঘন জঙ্গল ও জনশূন্য মাঠ ছিল ডাকাতের অভয়ারণ্য। ডাকাতদের ধরার জন্য ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ষোলো দাঁড়ের ছিপ নৌকা এবং পুলিশ জমাদারের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল।

বিশাল এই জলাধারের কথা নগেন্দ্রনাথ বসু প্রণীত ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ গ্রন্থেও পাওয়া যায় এভাবে—‘জেলা রাজশাহীর মধো চলনবিল নামে এক অতি বৃহৎ বিল আছে। উহা রাজশাহীর মধ্যে বড়ল ও অন্যান্য নদীর সহিত সংযুক্ত হইয়া গোয়ালন্দের নিকট পদ্মায় মিলিত হইয়াছে। রাজশাহী হইতে যাহারা নৌকাযোগে ঢাকা ও ময়মনসিংহ গমন করেন, তাহারা এ বিল বাহিয়া গোয়ালন্দের নিকট পদ্মা নদীতে পড়েন। এ বিল পূর্বে বছদূর পর্যন্ত জলমগ্ন ছিল। কালক্রমে স্থানে স্থানে ভরাট হওয়ায় সেই সকল স্থানে লোকবসতি হইয়া গ্রামপত্তন হইয়াছে।’

—পৃষ্ঠা ১৩৭, পুস্তক বিপণি, ২৭ বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা-৯, প্রথম প্রকাশ, জানুয়ারি ১৯৯৯।

চলনবিলের যে বর্ণনা ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে পাওয়া যায়, তা প্রায় শত বছরের বেশি আগের। কেননা পাবনার ঈশ্বরদী থেকে সিরাজগঞ্জের রেলসংযোগের ফলে চলনবিলের ওপর প্রথম পেরেকটি পড়ে। আর এই রেল সড়ক স্থাপিত হয় ১৯১৪-১৫ সালের দিকে। এর আগে আক্ষরিক অর্থেই চলনবিল ছিল সাগর সমতুল্য।

আবেগে ঠাসা এক সময়—বর্ষাকাল। বর্ষা মেঘের মৌসুম। আকাশে মেঘ চরে বেড়ালে মানুষের মনেও ভর করে রতিকলা। মেঘ নিয়ে আমার কৌতূহলের শেষ নেই। আমাদের বাড়ির সামনে ধু ধু প্রান্তর। বর্ষার পানিতে টইটুম্বর। দিগন্তবিস্তৃত দক্ষিণে বনওয়ারীনগর পর্যন্ত পানি আর পানি। জলে ভাসা দিন। ওপারে মেঘডুম্বুরের ঘাট। সেই ঘাটেরও অস্তিত্ব থাকে না বর্ষায়। পানিতে ডুবে একাকার। তবু মেঘডুম্বুরের নামটি বেশি শুনতাম। এর কারণ আমাদের গ্রামের মাছ ধরার নৌকাগুলো ঘাটে ভিড়িয়ে কে কোন এলাকা থেকে মাছ ধরে ফিরেছে। সেসব গল্পের ফিরিস্তিতে মেঘডুম্বুর নামটি উঠে এসেছে বারবার। মেঘডুম্বুরের একটু আগে খাদির ভিটা। কোনো এককালে খাদি নামের এক লোক দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতের একটি কারখানা খুলেছিলেন জনমানবশূন্য ওই ধু ধু পাথারে। সেই গোয়ালা খাদি কবে পাততাড়ি গুটিয়ে চলে গেছেন! আর কোথায়ই-বা তাঁর বাড়ি, এর কোনো সঠিক তথ্য কারও কাছে নেই। বের করার চেষ্টাও চালিয়েছি কিছুদিন। তবে তাঁর সেই ভিটার নাম এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে—‘এই খাদির বাড়ি যাব। খাদিবাড়ির কাছে অমুকের জমি। অমুকের বাঙ্গির টাল।’

এই খাদির বাড়ি নিয়েও প্রচলিত আছে কত কত মিথ! বর্ষার সময় বিলে মাছ ধরা নৌকাগুলো ঝড়ের বিপৎসংকুল সময়ে এ ভিটাতেই আশ্রয় নেয়। বর্ষার অথই জল। উথালপাতাল ঢেউয়ে ওই ভিটাটুকুও ডুবে গেলে শুধু নাক জেগে থাকে অচেনা একটি বৃক্ষ। ঝড় জলের সাক্ষী হিসেবে পাকাপোক্ত গাছটি এখনো টিকে আছে কি না?

যাহোক, এই ভিটা মাছ ধরার নৌকাগুলোর টার্নিং পয়েন্ট। অভিজ্ঞ জেলেরা ঝাকার মাছ দেখে বলে দিতে পারেন কোন এলাকার মাছ। বিশেষ করে চান্দা, বাঁশপাতা, পাবদা মাছের আধিক্য মেঘডুম্বুর। পূর্বসূরিদের মুখে মেঘডুম্বুরের গল্প এত বেশি শুনতাম। আর ভাবতাম, কবে বড় হব। মাছ ধরতে আমিও যাব। দেখা হবে বাড়ি থেকে ধু ধু প্রান্তরের সেই মেঘডুম্বুর। ছোটবেলায় ভাবতাম, ওটা বুঝি মেঘেরই দেশ। মেঘডুম্বুর থেকে বৃষ্টিতে ভিজে একশা হয়ে বাড়ি ফিরে আসত অনেকেই। ঝড়ঝাপটার উজান ধকল পেরিয়ে তারা যখন বাড়ি ফিরত নৌকাভর্তি মাছ নিয়ে’ সে মাছ যেন উজ্জ্বল শস্য। চক চক করত।

মেঘডুম্বুর মূলত ধলাই নদীর একটি ঘাটের নাম। এই নদীর পূর্ব দিকে গিয়ে মিলিত হয়েছে বড়ালের সঙ্গে। আবার মেঘডুম্বুরের উত্তর থেকে এসেছে গোহালা নামের আরও একটি নদী। এ নদীগুলোই মূলত বিলের অবিরাম জলপ্রবাহ সচল রাখত। একসময় এই বিলের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হতো প্রায় ৪৭টি নদী। জনশ্রুতি আছে, সব সময় পানি সচল বা ‘চলন’ অবস্থায় থাকত বলেই এই বিলের নাম ‘চলনবিল’। বিলের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোর বেশির ভাগই এখন ভরাট আর দখলদারিদের হাতে চলে গেছে।

এই ধলাই নদীর পাড়েই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় গোচারণ ভূমি, যা বাথান বা ছাহাম নামে পরিচিত। এই বাথানিদের জীবন আরেক রোমাঞ্চকর অধ্যায়। এই বাথানিরা বছরের পাঁচ মাস খোলা আকাশের নিচে বসবাস করে একদিন পাততাড়ি গুটিয়ে চলে যায়। রুদ্র বৈশাখের ঝড়, চৈত্রের খরপ্রবাহ, অথবা মাঘশীতল দিনে তারা উন্মুক্ত মাঠের মধ্যে জড়াজড়ি করে থাকে। যদিও এখন বাথানের পরিধি কমে এসেছে অনেকটা। মানুষের মতো গরুকে তোলা হয়েছে সানবাঁধানের ঘরে।

তবু বাথান! গরুর ঘাস, কাঁচা দুধ। গরুর পালের হাম্বা হাম্বা স্বরে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পাথার। তারপর একদিন আষাঢ়ের বিকেলে খবর চাউর হয়, রাউতারা স্লুইসগেট খুলে দিছে বা ভেঙে গেছে। পড়িমরি! মানুষের হইহুল্লোড়। সবকিছু গোছগাছ করে বাড়িতে তোলো। না হলে রাতের মধ্যেই বানের পানিতে তলিয়ে যাবে সব। শুকনা খড়কুটো জলের তোড়ে ভেসে পৌঁছাবে দিয়ারে। খালের ওপারির গ্রামগুলো অপেক্ষায় থাকে, কবে বাঁধ ভাঙবে। দলে দলে কোঁচ, জুঁতি, টেঁটা, বল্লম ঘাড়ে নিয়ে আমাদের বাড়ির নিচ দিয়ে যেতে থাকে। দোবিলাতে মাছের হিড়িক। এখানে পানি পড়া তাদের কাছে একটা উৎসব। কী এক রোমাঞ্চকর দৃশ্য। কে কত বড় মাছ ধরছে তা কয়েক দিন মানুষের মুখে মুখে গল্প হয়ে ফেরে।

পোকার ঝিঁঝিঁ ডাক। এক বিল থেকে আরেক বিলে পানি গড়িয়ে পড়ার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। শিশু-কিশোরের দল বানের পানিকে স্বাগত জানাতে এগিয়ে যাওয়া। জলের স্রোতে গা ভাসিয়ে চিতসাঁতার খেলা। বর্ষার দিন। একসময় ছিল বেদে নৌকার বহর। কত কত দৃশ্যপট। বর্ষার পানিতে মাঠঘাট একাকার হয়ে পড়লে জেলেরা রাতে মাছ ধরতে যান।

দিনে সেই মাছ ধরার নৌকা নিয়ে বাইচ খেলেন। নৌকাবাইচ শেষে সারি গানের আসর। অপার আনন্দ-ফুর্তির মুহূর্ত এই বর্ষার কাল। অপার বিস্ময়কর জাগৎ। এ সময় পানির ওপরে ভাসে প্রতিটি গ্রাম। বিলের মাঝে অনেকগুলো খাল থাকায় খরালি মৌসুমে সহজে এক পাড় থেকে আরেক পাড়ে যাওয়া যায় না। তাই বর্ষার সময়ই বিলের এক পাড়ের মানুষ অন্য পাড়ের মানুষের সঙ্গে আত্মীয়তা ঝালাই করে নিত। নাইওরের নৌকা আর বাইচের নৌকা দেখে আনন্দে উদ্বেলিত মনে কল্পনায় আঁকতাম ফিরে আসবে কবে—আর বর্ষায়! বয়স গড়াল। ফিকে হয়ে গেল বর্ষার রং। ক্রমেই ফুরিয়ে যাচ্ছে চলনবিলের আয়তন। স্তব্ধ হওয়ার অপেক্ষায় জলতরঙ্গের প্রাণের স্পন্দন জোগানো বিশাল জলরাশির চলনবিল।