
গত মাসে মারা গেলেন বিশ্বখ্যাত জাপানি শিল্পী ইয়াইয়োই কুসামা। ক্যানভাস থেকে স্থাপনাকলা, বস্তু থেকে শরীর—তাঁর শিল্পযাত্রা বারবার ভেঙেছে শিল্পের প্রচলিত সীমানা। আত্মবিলোপ, পুনরাবৃত্তি ও অসীমতার শিল্পভাষা তাঁকে সমকালীন শিল্পের অন্যতম স্বতন্ত্র শিল্পীতে পরিণত করেছে।
১৯৬৯ সালের ২৪ আগস্ট, নিউইয়র্কের মিউজিয়াম অব মডার্ন আর্টের ভাস্কর্য বাগানে জাদুঘরের অনুমতি ছাড়াই কয়েকজন নগ্ন মানুষ ফোয়ারার জলে দাঁড়িয়ে ছিল। জীবন্ত শরীর আর আশপাশের স্থির ভাস্কর্যের মধ্যে তৈরি হয়েছিল এক অস্বস্তিকর দৃশ্য। পরদিন নিউইয়র্ক ডেইলি নিউজ ছবিটি ছেপে প্রশ্ন তোলে, ‘কিন্তু এটা কি শিল্প?’
এই প্রশ্নটি আজও ইয়াইয়োই কুসামার শিল্পের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে, যদিও তার অর্থ বদলে গেছে। একটি বিন্দু দিয়ে শুরু হওয়া তাঁর শিল্পযাত্রা ধীরে ধীরে ক্যানভাসের সীমা ছাড়িয়ে গেছে, বস্তুর শরীরে ছড়িয়েছে, ঘর ও পরিবেশকে দখল করেছে, মানুষের শরীর পর্যন্ত পৌঁছেছে। এই দীর্ঘ যাত্রার কেন্দ্রে ছিল একটি সহজ কিন্তু গভীর অনুসন্ধান—একটি রূপ বারবার ফিরে এলে তার কী হয়? সে কি নিজের পরিচয় ধরে রাখে, নাকি বহুবার ফিরে আসতে আসতে বৃহত্তর কোনো অভিজ্ঞতার মধ্যে বিলীন হয়ে যায়?
১৯২৯ সালে জাপানের নাগানো প্রদেশের মাতসুমোতোয় কুসামার জন্ম, এক সংরক্ষণশীল ব্যবসায়ী পরিবারে, যারা বীজ ও চারাগাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল। শৈশব থেকেই তিনি এমন দৃশ্যগত অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন, যেখানে বিন্দু, জাল বা পুনরাবৃত্ত রূপ চারপাশের পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করে ফেলত—একটি টেবিলক্লথের নকশা যেন হঠাৎ পুরো ঘর ছেয়ে ফেলত, কিংবা ফুলের বাগানে দাঁড়িয়ে মনে হতো ফুলগুলো কথা বলছে। এই দৃশ্যগত অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি কখনো ভয়ের মতো অনুভব করেছেন, আবার সেগুলোর মধ্য থেকেই গড়ে তুলেছেন নিজের শৈল্পিক ভাষা।
শৈশবেই আঁকা শুরু করলেও পরিবার তাঁর শিল্পী হওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে সমর্থন করেনি। একজন নারীর জন্য প্রথাগত গৃহস্থজীবনের বাইরে গিয়ে শিল্পচর্চা করাটা তখনকার সমাজে সহজ কোনো পথ ছিল না। এই পারিবারিক অসম্মতিই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পচর্চাকে শুধু নান্দনিক অনুশীলন নয়, নিজের জীবন বেছে নেওয়ার একধরনের লড়াইয়েও পরিণত করেছিল।
তাঁর শৈশবের একটি আঁকায় প্রকৃতি ও জৈবিক রূপের প্রতি যে নিবিড় মনোযোগ দেখা যায়, তা জর্জিয়া ও’কিফের ফুলকে বৃহৎ পরিসরে দেখার প্রবণতার কথা মনে করিয়ে দেয়। এটি কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাবের সম্পর্ক নয়; বরং প্রকৃতির ক্ষুদ্র অংশের মধ্যেও বৃহত্তর এক দৃশ্যজগৎ আবিষ্কারের দুটি স্বতন্ত্র প্রবণতা, যারা পরে এক আশ্চর্য যোগাযোগে মিলিত হবে।
জাপান ছাড়ার আগেই কুসামা শিল্পী হিসেবে প্রকাশ্য পরিসরে কাজ শুরু করেছিলেন। ১৯৫২ সালের ১৮ থেকে ১৯ মার্চ মাতসুমোতো সিটি ফার্স্ট কমিউনিটি সেন্টারে তাঁর একক প্রদর্শনী হয়, যেখানে দুই শতাধিক কাজ প্রদর্শিত হয়েছিল বলে জানা যায়। মূলত জলরঙে আঁকা জৈবিক ও বিমূর্ত রূপের সেই কাজগুলোতেই পুনরাবৃত্তির প্রথম চিহ্ন দেখা যাচ্ছিল।
তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা নিহোঙ্গার সঙ্গে যুক্ত ছিল—জাপানি ঐতিহ্যবাহী চিত্রকলার এই ধারায় প্রাকৃতিক রঞ্জক, রেখার সংযম এবং শূন্যস্থানের ব্যবহার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত এই রীতির কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা কুসামার অস্থির, প্রায় আচ্ছন্নকর দৃশ্যকল্পনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। তাই তিনি সেই রীতির মধ্যে দীর্ঘদিন থাকেননি। তবু জাপানি দৃশ্যঐতিহ্যের কিছু সংবেদন তাঁর কাজে থেকে গেছে বলে মনে হয়: পৃষ্ঠকে সক্রিয় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা, কেন্দ্রের কর্তৃত্ব কমিয়ে দেওয়া এবং একটি চিহ্নকে পুরো দৃশ্যজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া।
এই প্রক্রিয়ার নাম তিনি নিজেই দিয়েছিলেন আত্মবিলোপ। একটি চিহ্ন একা থাকলে তাকে আলাদা করে দেখা সম্ভব। কিন্তু একই চিহ্ন অসংখ্যবার ফিরে এলে চোখ আর প্রতিটিকে আলাদা করে ধরে রাখতে পারে না; শিল্পীর ব্যক্তিগত অঙ্গভঙ্গিও সেই শ্রমসাধ্য পুনরাবৃত্তির মধ্যে মিলিয়ে যায়। অসীমতা তাই দূরত্বের হিসাব নয়; দৃষ্টির এমন এক অবস্থা, যেখানে শেষ সীমাটি চোখের নাগালের বাইরে সরে যায়।
এখানে জাপানি নন্দনতত্ত্বের মা ধারণাটিও গুরুত্বপূর্ণ। মা শুধু শূন্যতা নয়, উপস্থিতির মাঝখানে থাকা বিরতি—সংগীতে দুটি স্বরের মাঝের নীরবতা যেমন সংগীতেরই অংশ, তেমনি দৃশ্যকলায় দুটি রূপের মাঝের ফাঁকা জায়গাও দৃশ্যের অংশ। একটি বিন্দু ও আরেকটি বিন্দুর মাঝের দূরত্বও তাই অর্থবহ। কুসামার পুনরাবৃত্তির মধ্যে শুধু প্রাচুর্য নেই; আছে ফাঁক, ছন্দ এবং এক রূপ থেকে অন্য রূপে যাওয়ার সময়। তাঁর অসংখ্য বিন্দু ও জালের ভেতর এই বিরতিগুলোই পুনরাবৃত্তিকে নিছক ভিড়ে পরিণত হতে দেয় না; দৃশ্যের মধ্যে শ্বাস নেওয়ার একটি ছন্দ তৈরি করে।
১৯৫৫ সালে জর্জিয়া ও’কিফের সঙ্গে তাঁর চিঠি বিনিময় আমেরিকার দিকে তাকিয়ে থাকা এক তরুণ শিল্পীর জীবনের একটি ছোট কিন্তু অর্থপূর্ণ ঘটনা। একটি বইয়ের দোকানে ও’কিফের কাজ দেখে মুগ্ধ হয়ে কুসামা তাঁকে চিঠি লেখেন, নিজের কিছু জলরঙের কাজের ছবিও পাঠান এবং জানতে চান, কীভাবে একজন শিল্পী হিসেবে এগিয়ে যাওয়া যায়। বিস্ময়করভাবে ও’কিফ উত্তর দেন। তিনি সতর্ক করে দেন যে আমেরিকায়, বিশেষত নিউইয়র্কে, একজন শিল্পীর জীবিকা নির্বাহ করা সহজ নয়, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁকে উৎসাহও দেন।
এই সংযোগ কুসামার সামনে আমেরিকার দিকে একটি বাস্তব দরজা খুলে দেয়। ১৯৫৭ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। সিয়াটলে তাঁর প্রথম আমেরিকান একক প্রদর্শনী হয়। পরের বছর তিনি নিউইয়র্কে চলে আসেন। ১৯৫৯ সালের ৯ থেকে ২৯ অক্টোবর ব্রাটা গ্যালারিতে তাঁর প্রদর্শনীতে যে শিল্পভাষা দেখা যায়, তা তাঁকে দ্রুত সমকালীন নিউইয়র্কের শিল্পপরিসরে স্বতন্ত্র করে তোলে।
তখন নিউইয়র্ক যুদ্ধোত্তর শিল্পবিশ্বের প্রধান কেন্দ্র। বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ ক্যানভাস সম্পর্কে শিল্পীদের ধারণা বদলে দিয়েছে। জ্যাকসন পোলকের ছবিতে রং ও রেখা পুরো পৃষ্ঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে; কোনো একক কেন্দ্র ছবিকে নিয়ন্ত্রণ করে না। কুসামার ইনফিনিটি নেটস এই একই শিল্পপরিসরে জন্ম নিলেও তার ভাষা ছিল অন্য রকম। অসংখ্য ক্ষুদ্র বাঁকানো রেখা তিনি একটির পর একটি বসিয়েছেন, যতক্ষণ না পৃথক রেখার পরিচয় হারিয়ে পুরো ক্যানভাস একটি দৃশ্যক্ষেত্রে পরিণত হয়।
এই প্রক্রিয়ার নাম তিনি নিজেই দিয়েছিলেন আত্মবিলোপ। একটি চিহ্ন একা থাকলে তাকে আলাদা করে দেখা সম্ভব। কিন্তু একই চিহ্ন অসংখ্যবার ফিরে এলে চোখ আর প্রতিটিকে আলাদা করে ধরে রাখতে পারে না; শিল্পীর ব্যক্তিগত অঙ্গভঙ্গিও সেই শ্রমসাধ্য পুনরাবৃত্তির মধ্যে মিলিয়ে যায়। অসীমতা তাই দূরত্বের হিসাব নয়; দৃষ্টির এমন এক অবস্থা, যেখানে শেষ সীমাটি চোখের নাগালের বাইরে সরে যায়।
ষাটের দশকের শেষভাগে কুসামার শরীরভিত্তিক কর্মসূচিগুলো এমন এক সময়ে ঘটছিল, যখন নিউইয়র্কের জনপরিসরে যুদ্ধ, শরীর, নগ্নতা এবং ব্যক্তিগত ও যৌন স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তীব্র ছিল। তাঁর বডি ফেস্টিভ্যাল ও হ্যাপেনিংয়ে শরীরে বিন্দু আঁকা, নগ্নতা, নৃত্য ও প্রতিবাদ একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। ১৯৬৯ সালের ২৪ আগস্টের ‘গ্র্যান্ড অর্গি টু অ্যাওয়েকেন দ্য ডেড অ্যাট মোমা’ ছিল এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
ষাটের দশকের শুরুতে এই পুনরাবৃত্তি ক্যানভাসের বাইরে এসে বস্তুর শরীরে আশ্রয় নেয়। চেয়ার, সোফা এবং গৃহস্থালি জিনিসপত্র তিনি অসংখ্য নরম, সেলাই করা ফ্যালিক, অর্থাৎ পুরুষাঙ্গের প্রতীকী রূপে ঢেকে দেন। যে প্রতীককে সাধারণত ক্ষমতা ও আক্রমণাত্মকতার সঙ্গে যুক্ত করা হয়, তা এখানে নরম কাপড়ে তৈরি, হাতে সেলাই করা এবং সংখ্যায় এত বেশি যে তার প্রচলিত ক্ষমতার ভাষাই অস্থির হয়ে ওঠে।
এই কাজগুলোকে শুধু যৌন প্রতীকের পুনরাবৃত্তি হিসেবে দেখলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এড়িয়ে যাওয়া হয়। প্রতিটি সেলাই ব্যক্তিগত শ্রমের চিহ্ন, অথচ ফলাফলটি দেখতে যন্ত্রে তৈরি কোনো ভোগ্যপণ্যের মতো। যুদ্ধোত্তর আমেরিকার ব্যাপক উৎপাদনের যুগে একই জিনিসের অবিরাম পুনরুৎপাদন দৈনন্দিন বাস্তবতার অংশ ছিল। কুসামার অ্যাকিউমুলেশন সেই ভঙ্গি ধার করে, কিন্তু কারখানার নিরাসক্ততার জায়গায় বসিয়ে দেয় হাতে সেলাই করা এক ক্লান্তিকর, ব্যক্তিগত পুনরাবৃত্তি। ফলে বস্তুটি একই সঙ্গে গণ–উৎপাদনের ব্যঙ্গচিত্র এবং একজন শিল্পীর একান্ত শ্রমের সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।
নরম ভাস্কর্যের প্রসঙ্গে ক্লেস ওল্ডেনবার্গ ও লুইজ বুর্জোয়ার নাম স্বাভাবিকভাবেই আসে, যদিও তাঁদের কারও সঙ্গেই কুসামার সম্পূর্ণ মিল নেই। বুর্জোয়ার নরম রূপে শরীর, স্মৃতি ও সম্পর্কের টানাপোড়েন স্পর্শযোগ্য হয়ে ওঠে; কুসামার নরম রূপে একটি চিহ্ন নিজের সীমা ছাড়িয়ে সংখ্যার ভিড়ে নতুন অর্থ তৈরি করে।
১৯৬৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর থেকে ১৯৬৪ সালের ১১ জানুয়ারি পর্যন্ত নিউইয়র্কের গারট্রুড স্টেইন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত অ্যাগ্রিগেশন: ওয়ান থাউজ্যান্ড বোটস শো কুসামার এই অনুসন্ধানে নতুন মাত্রা যোগ করে। একটি নৌকা ছিল প্রদর্শনীর কেন্দ্রে, আর তার ৯৯৯টি আলোকচিত্র প্রতিরূপ গ্যালারির দেয়ালজুড়ে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। বাস্তব নৌকাটি তখন আর একা কোনো বস্তু নয়; দর্শকও আর শুধু একটি বস্তু দেখতে আসেন না, তিনি নিজেই পুনরাবৃত্তির ভেতর দাঁড়িয়ে থাকেন। এভাবেই একটি বস্তুকে ঘিরে জন্ম নেওয়া পুনরাবৃত্তি প্রথমবারের মতো গোটা গ্যালারিকেই নিজের ক্ষেত্র বানিয়ে নেয়।
দুই বছর পরের কাজে পুনরাবৃত্তি শুধু স্থান দখল করেই থামেনি; তা দর্শককেও নিজের প্রতিফলনের মধ্যে টেনে নিয়েছিল। ১৯৬৫ সালের ৩ থেকে ২৭ নভেম্বর নিউইয়র্কের আর ক্যাসটেলেন গ্যালারিতে অনুষ্ঠিত ফ্লোর শো প্রদর্শনীতে কুসামা তৈরি করেন তাঁর প্রথম আয়নার ঘর—‘ইনফিনিটি মিরর রুম: ফ্যালিস ফিল্ড’। মেঝে জুড়ে ছিল অসংখ্য নরম ফ্যালিক রূপ, আর চারপাশের আয়নায় তাদের প্রতিফলন এমনভাবে বিস্তৃত হতো যে সীমিত ঘরটি দৃষ্টির কাছে সীমাহীন বলে মনে হতো। ঘরে প্রবেশ করামাত্র দর্শকের নিজের শরীরও সেই প্রতিফলনে ধরা পড়ে যেত। ফলে তিনি আর শিল্পকর্মের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা কেউ থাকেন না; নিজেই দৃশ্যের একটি চলমান অংশ হয়ে যান।
ষাটের দশকের শেষভাগে কুসামার শরীরভিত্তিক কর্মসূচিগুলো এমন এক সময়ে ঘটছিল, যখন নিউইয়র্কের জনপরিসরে যুদ্ধ, শরীর, নগ্নতা এবং ব্যক্তিগত ও যৌন স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক তীব্র ছিল। তাঁর বডি ফেস্টিভ্যাল ও হ্যাপেনিংয়ে শরীরে বিন্দু আঁকা, নগ্নতা, নৃত্য ও প্রতিবাদ একসঙ্গে উপস্থিত হয়েছে। ১৯৬৯ সালের ২৪ আগস্টের ‘গ্র্যান্ড অর্গি টু অ্যাওয়েকেন দ্য ডেড অ্যাট মোমা’ ছিল এই ধারার সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি।
আজ কুসামার অসীম আয়নার ঘর ইমার্সিভ শিল্পের আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দর্শককে চারপাশের দৃশ্যপরিবেশের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা শিল্পে তাঁর আগেও ছিল। প্যারিসের অরঁজেরি জাদুঘরের ডিম্বাকৃতি কক্ষে ক্লদ মোনের শেষ জীবনের ওয়াটার লিলিজ প্যানেলগুলো এমন এক দেখার পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে জল, আলো ও উদ্ভিদের বিস্তার দর্শকের দৃষ্টিকে ঘিরে ফেলে এবং দিগন্তরেখা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
সেখানে শরীর শুধু দৃশ্যের একটি উপাদান ছিল না; সামাজিক নিয়মের বিরুদ্ধে তার প্রকাশ্য উপস্থিতিই কাজটির অর্থ বহন করছিল। জাদুঘরের প্রতিষ্ঠিত শিল্পব্যবস্থা ও জীবন্ত শরীরের স্বাধীন উপস্থিতিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে কুসামা শিল্পের সীমানাকে প্রশ্ন করেছিলেন। শরীরে আঁকা বিন্দুগুলোও তাঁর আগের শিল্পভাষা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়—ক্যানভাসে জন্ম নেওয়া চিহ্ন এবার জীবিত মানুষের ত্বকে বসে সরাসরি জনপরিসরের সঙ্গে সংঘাতে জড়াল।
১৯৭৩ সালে কুসামা জাপানে ফিরে যান। ১৯৭৭ সাল থেকে তিনি স্বেচ্ছায় টোকিওর সেইওয়া মানসিক হাসপাতালে বসবাস শুরু করেন এবং কাছের স্টুডিওতে গিয়ে নিয়মিত কাজ করতেন। জীবন ও কাজের সম্পর্ক তাঁর ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ হলেও শিল্পকর্মকে কেবল জীবনের ব্যাখ্যা হিসেবে পড়লে তার স্বাধীন জটিলতা হারিয়ে যায়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পের উৎস হতে পারে, কিন্তু শিল্পকর্ম শেষ পর্যন্ত নিজস্ব ভাষায় দর্শকের সামনে দাঁড়ায়।
এই সময়েও তাঁর শিল্পচর্চা থেমে থাকেনি। পূর্ববর্তী দশকগুলোর নেট, বিন্দু, বস্তু ও পরিবেশ নির্মাণের অনুসন্ধান নতুন নতুন রূপে ফিরে এসেছে। এই ধারাবাহিকতাই নব্বইয়ের দশকে তাঁর আন্তর্জাতিক পুনর্মূল্যায়নের ভিত্তি তৈরি করেছিল।
১৯৯৩ সালের ১৩ জুন থেকে ১০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ৪৫তম ভেনিস বিয়েনালে জাপান প্যাভিলিয়নে কুসামার প্রতিনিধিত্ব তাঁর আন্তর্জাতিক পুনর্মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। সেখানে প্রাথমিক নেট পেইন্টিং ও নরম ভাস্কর্যের পাশাপাশি নতুন কাজ প্রদর্শিত হয়; কেন্দ্রীয় আকর্ষণগুলোর একটি ছিল ১৯৯১ সালের ‘মিরর রুম: পাম্পকিন’। বহু দশকের বিচিত্র শিল্পচর্চাকে তখন আধুনিক ও সমকালীন শিল্পের বৃহত্তর ইতিহাসে নতুনভাবে দেখা শুরু হয়।
আজ কুসামার অসীম আয়নার ঘর ইমার্সিভ শিল্পের আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে দর্শককে চারপাশের দৃশ্যপরিবেশের মধ্যে নিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা শিল্পে তাঁর আগেও ছিল। প্যারিসের অরঁজেরি জাদুঘরের ডিম্বাকৃতি কক্ষে ক্লদ মোনের শেষ জীবনের ওয়াটার লিলিজ প্যানেলগুলো এমন এক দেখার পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে জল, আলো ও উদ্ভিদের বিস্তার দর্শকের দৃষ্টিকে ঘিরে ফেলে এবং দিগন্তরেখা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
তবে একটি মৌলিক পার্থক্য থেকে যায়। মোনের পুকুরে দর্শকের নিজের প্রতিবিম্ব ফেরত আসে না—দৃশ্যটি তাঁকে ফিরিয়ে দেখায় না। কুসামার আয়নায় কাচ শুধু পরিবেশকে প্রসারিত করে না, দর্শকের শরীরকেও প্রতিফলনের মধ্যে বসিয়ে দেয়। ফলে মোনের দর্শক পরিবেশ দ্বারা ঘেরা থাকেন, আর কুসামার দর্শক নিজেই সেই পরিবেশের একটি দৃশ্যমান, পুনরাবৃত্ত অংশ হয়ে ওঠেন।
পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন শিল্পী দর্শক ও শিল্পকর্মের এই সম্পর্ককে নিজেদের ভাষায় নতুনভাবে অনুসন্ধান করেছেন। জেমস টারেল আলোকে স্থান ও উপলব্ধির বিষয় করে তুলেছেন, ওলাফুর এলিয়াসন প্রাকৃতিক উপাদানের মাধ্যমে দর্শকের নিজের উপস্থিতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করেছেন, আর ডিজিটাল যুগে টিমল্যাব প্রযুক্তিনির্ভর পরিবেশকে দর্শকের চলাচলের সঙ্গে পরিবর্তনশীল করে তুলেছে। এরা কেউ একই পথের ধারাবাহিক ধাপ নন; প্রত্যেকে দর্শক ও শিল্পকর্মের মধ্যকার দূরত্ব নিয়ে নিজের মতো করে পরীক্ষা চালিয়েছেন।
একটি বিন্দু একা দাঁড়ালে সে শুধুই একটি বিন্দু। তার পাশে দ্বিতীয় বিন্দু এলেই জন্ম নেয় একটি দূরত্ব, একটি নীরব বিরতি। আর সেই বিন্দু যখন হাজারবার ফিরে আসে, প্রতিফলন যখন প্রতিফলনের জন্ম দিতে থাকে, একসময় সেই দূরত্ব ও বিরতিগুলোই আমাদের দৃষ্টির নাগালের বাইরে চলে যায়—তখনই হয়তো আমরা তাকে অসীম বলে চিনি। ইয়াইয়োই কুসামা অসীমকে আঁকেননি। তিনি এমন একটি দৃশ্যভাষা তৈরি করেছিলেন, যার মধ্যে প্রবেশ করলে অসীমতার অনুভূতি আমাদের নিজের ভেতর জন্ম নেয়।
এই বৃহত্তর আলোচনায় কুসামার অসীম আয়নার ঘরের স্বাতন্ত্র্য স্পষ্ট। আয়না তাঁর কাছে শুধু স্থানকে বড় করে দেখানোর কৌশল নয়। প্রতিফলন একই সঙ্গে দৃশ্যকে বহুগুণে বাড়ায় এবং দর্শকের নিজের উপস্থিতিকে সেই দৃশ্যের মধ্যে আটকে ফেলে। অসীমতার অভিজ্ঞতা তাই বাইরে কোথাও ঘটে না; দর্শক নিজেই তার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং তার অংশ হয়ে ওঠেন।
জাপানি দৃশ্যঐতিহ্যের পৃষ্ঠ, বিরতি ও দৃশ্যকে দেখার বিশেষ সংবেদন তাঁর শিল্পভাষার সঙ্গে নানাভাবে সম্পর্কিত। নিউইয়র্ক তাঁকে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠিত সীমার বিরুদ্ধে কাজ করার এক উন্মুক্ত শিল্পপরিসর। কিন্তু কুসামার শক্তি কোনো সহজ পূর্ব-পশ্চিমের সমীকরণে নেই। তিনি নিজের অভিজ্ঞতা ও শিল্পভাষার মধ্য দিয়ে বিভিন্ন প্রভাবকে এমনভাবে রূপান্তরিত করেছেন যে তাঁর বিন্দু শেষ পর্যন্ত কোনো একক শিল্পঐতিহ্যের চিহ্ন হয়ে থাকেনি।
আজ তাঁর অসীম আয়নার ঘরে মানুষ প্রবেশ করে ছবি তোলে, নিজের উপস্থিতিকে ধরে রাখে। এই দৃশ্যের সঙ্গে একটি বৈপরীত্য আছে—তাঁর শিল্পের কেন্দ্রেই ছিল নিজেকে মুছে ফেলার এক নিরন্তর আকাঙ্ক্ষা, আত্মবিলোপ। অসংখ্য প্রতিফলনের মধ্যে মুখটি দেখা যায়, আবার একই মুহূর্তে অন্য অসংখ্য প্রতিফলনের সঙ্গে মিশেও যায়। নিজেকে দৃশ্যমান করার তাগিদ আর বৃহত্তর কোনো কিছুর মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা—এই দুই বিপরীতমুখী টান কুসামার আয়নার ঘরে পাশাপাশি বসবাস করে।
২০২৬ সালের ১৪ আগস্ট, ৯৭ বছর বয়সে টোকিওর একটি হাসপাতালে ইয়াইয়োই কুসামার মৃত্যু হয়। জীবনের একেবারে শেষ পর্যন্ত তিনি ছবি এঁকেছেন। তাঁর মৃত্যুকে তাই একটি শিল্পজীবনের সমাপ্তি বলে পড়া কঠিন—কারণ তিনি যে দৃশ্যভাষা রেখে গেছেন, তা এখনো আমাদের দেখার অভ্যাসের ভেতরে সক্রিয়।
একটি বিন্দু একা দাঁড়ালে সে শুধুই একটি বিন্দু। তার পাশে দ্বিতীয় বিন্দু এলেই জন্ম নেয় একটি দূরত্ব, একটি নীরব বিরতি। আর সেই বিন্দু যখন হাজারবার ফিরে আসে, প্রতিফলন যখন প্রতিফলনের জন্ম দিতে থাকে, একসময় সেই দূরত্ব ও বিরতিগুলোই আমাদের দৃষ্টির নাগালের বাইরে চলে যায়—তখনই হয়তো আমরা তাকে অসীম বলে চিনি।
ইয়াইয়োই কুসামা অসীমকে আঁকেননি। তিনি এমন একটি দৃশ্যভাষা তৈরি করেছিলেন, যার মধ্যে প্রবেশ করলে অসীমতার অনুভূতি আমাদের নিজের ভেতর জন্ম নেয়।
সৈয়দ গোলাম দস্তগীর: চিত্রশিল্পী ও শিল্পলেখক