আবুল হোসেন (১৫ আগস্ট ১৯২২–২৯ জুন ২০১৪) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
আবুল হোসেন (১৫ আগস্ট ১৯২২–২৯ জুন ২০১৪) প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

আবুল হোসেন

কেন প্রথম ‘আধুনিক’ এবং কীভাবে তাঁকে পড়ব

আবুল হোসেন (১৫ আগস্ট ১৯২২–২৯ জুন ২০১৪) কলকাতায় গিয়েছিলেন গ্র্যাজুয়েশন করতে। তখন ‘তিরিশের’ প্রধান কবিদের অধিকাংশের সঙ্গেই তাঁর সরাসরি সাক্ষাৎ হয়। বাংলা কবিতা তত দিনে নতুন ‘আধুনিকতা’য় আস্থা পেয়েছে। ছাত্রজীবনেই প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ নববসন্ত (১৯৪০)। আবুল হোসেন কেন বাংলাদেশের প্রথম ‘আধুনিক’, কবির কাল ও কাব্যশৈলী বিশ্লেষণ করে দেখানো হয়েছে এই লেখায়।

ক্যামেরা উদ্ভাবনের সঙ্গে চিত্রকলার পরিবর্তনের একটা সম্পর্ক আছে। আগে মানুষ যা দেখত চোখ দিয়ে—সেই নিসর্গ, বস্তু বা ঘটনা তার ছবির বিষয় হতো। এরপর ক্যামেরা দখল করে নিল বাস্তবের ছবি আঁকার কাজ। তখন মানুষের প্রয়োজন পড়ল চিত্রকলায় এমন রূপান্তর ঘটানোর, যা কিনা ক্যামেরার পক্ষে সম্ভব নয়। চিত্রকরেরা তখন আঁকা শুরু করলেন মানুষের অন্তর্জগতের ছবি—যেখানে বোধ ও উপলব্ধিই প্রধান। কিন্তু এগুলো যেহেতু বিমূর্ত, পেইন্টিংয়ের ভাষাও হয়ে উঠল বিমূর্ত। রূপান্তরের প্রথম অবস্থায় বিভিন্ন উপকরণ, চিহ্ন ও রং হয়ে উঠল একেক ধরনের প্রতীক বা ভাবের প্রকাশ। চিত্রকলার মতো কবিতায়ও সিম্বলিজমের জন্ম হয়। আধুনিক কবিতার প্রথম ধাপে সিম্বল বা প্রতীক এভাবে কবির ভাব প্রকাশের উপায় হলো।

দেখা যাচ্ছে, আধুনিক চিত্রকলার রূপান্তরের সঙ্গে কবিতার রূপান্তরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে। কবিতায় একসময়ে উঠে আসত প্রকৃতি ও নারীর বর্ণনা—কবির বাস্তবের মুগ্ধতা পদ্যে রূপলাভ করত। ভাবতন্ময়তা ও ঈশ্বরভক্তিও পুরোনো কবিতার বৈশিষ্ট্য। আধুনিক-পূর্ববর্তী কালের পেইন্টিংয়ে কখনো কখনো একটি এপিসোড বা ঘটনাও প্রতিফলিত হতে দেখা যায়; তৎকালে কবিতায়ও বিবৃত হতে দেখা যায় দীর্ঘ কাহিনির বিবরণ। কখনো কখনো পেইন্টিংয়ে প্রতিফলিত হয়েছে ধর্মীয় বিশ্বাস, মানবীয় আদর্শ। কবিদের কবিতায়ও তখন ধর্ম ও আদর্শ অকৃত্রিম বিশ্বাস নিয়েই থেকেছে। কিন্তু আধুনিক কবিতায় রোমান্সজাত মুগ্ধতা, ঈশ্বরভক্তি, মানবীয় আদর্শ—সবই ধসে পড়েছে, বিশ্লিষ্ট হয়েছে, কিংবা রূপান্তর লাভ করেছে।

উনিশ শতককে যদি দুই ভাগ করা হয়, তবে দেখা যায়, এর প্রথম ভাগ শেষ হওয়ার আগেই ইউরোপে রোমান্টিসিজমের ধারা শেষ হয়েছে। যদিও অনেকে বলেন কবিমাত্রই রোমান্টিক। কিন্তু বাস্তব জগৎ থেকে তৈরি হওয়া মুগ্ধতা রোমান্টিক যুগের উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ, এস টি কোলরিজদের মধ্য দিয়ে পূর্ণ হয়ে সমাপ্তি টেনেছে। উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে মানুষের বিশ্বাসে ফাটল ধরতে শুরু করে; কবিতায়ও এর প্রভাব রয়েছে। ডারউইনের মতবাদসহ জ্ঞানের নতুন সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতি বিজ্ঞানকে ধর্মের মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়। আলফ্রেড টেনিসন, রবার্ট ব্রাউনিং—এঁরা এই দ্বান্দ্বিক সময়ের কবি। এরপর বিশ শতকের শুরুতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং সামন্তবাদ থেকে পুঁজিবাদে রূপান্তর পৃথিবীজুড়ে কবিতার ভাব ও ভাষায় আমূল পরিবর্তন আনে। টি এস এলিয়টের ‘দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড’ (১৯২২) মানুষের অবক্ষয়, বিচ্ছিন্নতা ও হতাশার চূড়ান্ত প্রতীকায়িত রূপ।

আবুল হোসেন
আবুল হোসেনের কবিতায় নতুন সময়ের প্রত্যক্ষ ছাপ বিদ্যমান; একই সঙ্গে শৈলীতে কবিতাকে আধুনিক করে তোলার সচেতন প্রয়াসও বর্তমান। প্রথম কাব্যগ্রন্থের নামের মধ্যেই এর প্রকাশ—‘নববসন্ত’ (১৯৪০)। এই কাব্য প্রকাশের প্রায় তিন দশক পরে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সুতরাং আবুল হোসেনের কবিতা কোন বিচারে ‘প্রথম আধুনিক’, সেটা নববসন্ত দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়।

বাংলা কবিতায় বাস্তব-মুগ্ধতা ও ভাবতন্ময়তার কাল মোটাদাগে শেষ হয়েছে বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকেই। এরপর যে পরিবর্তন সূচিত হয়, সেটি ছিল আকস্মিক এবং পাশ্চাত্য-প্রভাবিত। তবে ইংরেজি কবিতার সরাসরি প্রভাব না থাকলেও বাংলা কবিতায় পরিবর্তন আসত। কারণ, এখানেও তখন সমাজ বদলাচ্ছে; শিল্পের বিকাশ হচ্ছে। মধুসূদন দত্ত থেকে উনিশ শতকের মধ্যভাগের যে ‘আধুনিকতা’, সেটি মূলত পদ্যের ভাষাগত এবং ভিক্টোরীয় যুগের বিজ্ঞান ও ধর্মের দ্বান্দ্বিক রূপগত। জীবনানন্দ দাশ, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, বুদ্ধদেব বসু—এঁদের হাতেই বাংলা কবিতার নতুন আধুনিকতার যাত্রা। এঁরাও জীবন, মানুষ, বস্তু ও প্রকৃতিকে কবিতার উপজীব্য করেছেন; কিন্তু সেগুলো বাস্তবের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা ছাড়িয়ে বোধের বহুমাত্রিক রূপের সঙ্গে অন্বিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিরিশি কবিতার নতুন ভাব ও ভাষা নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন, তবু এই ধারাকে তিনি এড়াতে পারেননি। জসীমউদ্‌দীন, বন্দে আলী মিয়ারা এতে আস্থা পাননি; পরিণতিতে তাঁরা ‘আধুনিক’ হতে পারলেন না! কবিতার নতুন রূপটি খুব দ্রুতই বাংলা কবিতার ‘প্রধান’ ধারা হয়ে উঠল। কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিক কাব্যচর্চার ধারায় পূর্ব বাংলা থেকে যাঁরা যোগ দিলেন, তাঁদের মধ্যে ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব ও আবুল হোসেন অগ্রণী। সেটা ছিল বিশ শতকের চল্লিশের দশক।

দুই.

আবুল হোসেনের কবিতায় নতুন সময়ের প্রত্যক্ষ ছাপ বিদ্যমান; একই সঙ্গে শৈলীতে কবিতাকে আধুনিক করে তোলার সচেতন প্রয়াসও বর্তমান। প্রথম কাব্যগ্রন্থের নামের মধ্যেই এর প্রকাশ—নববসন্ত (১৯৪০)। এই কাব্য প্রকাশের প্রায় তিন দশক পরে তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। সুতরাং আবুল হোসেনের কবিতা কোন বিচারে ‘প্রথম আধুনিক’, সেটা নববসন্ত দিয়েই ব্যাখ্যা করা যায়।

ফররুখ আহমদের সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), কিংবা আহসান হাবীবের রাত্রিশেষ (১৯৪৭) কাব্যের আগেই বের হয় আবুল হোসেনের ‘নববসন্ত’। রোমান্সের উচ্ছ্বাস ও মুগ্ধতা থেকে বের হওয়ার প্রাথমিক প্রকাশ আছে ‘নববসন্ত’র ‘নবযুগ’ কবিতায়। রাতের পর রাত জেগে কবি ঘোরতন্ময় হয়ে দেখেছেন ‘জোছনা রাতের সাদা মেঘ আর প্রভাতী পূর্বাকাশ’। কিন্তু এটা তো রোমান্টিক যুগের মুগ্ধতা; আর সেই কাল তো আগেই পেরিয়ে গেছে। তাই বলছেন, ‘আজ দেখি তার রঙিন পাখায় আঁকা/ কুটিল হিয়ার স্নিগ্ধ প্রবঞ্চনা’।

ইয়েটসের মাধ্যমে কবিরা ওই সময়ে মুগ্ধ হন গীতাঞ্জলির ভাববাদে—ঈশ্বরের কাছে নিবেদনে। ইউরোপ তখন বস্তুবাদে আক্রান্ত—বাস্তব জীবনের আকাঙ্ক্ষা ও লালসায় মানুষ রীতিমতো প্রতিহিংসাপরায়ণ। এর বিপরীতে ইয়েটস চোখ বুজে শুনতে পেলেন শান্ত সুর—প্রাচীন ভারতীয় শান্ত রস, যেখান থেকে তৈরি হয় শম ভাব। এজরা পাউন্ড তখন আধুনিক কবিতায় চোখ বন্ধ করেও ইমেজ দেখতে শেখালেন—অন্য ইন্দ্রিয়গুলোকে সচল করে।

শিল্পের বিকাশ ঘটছে, কলকারখানা তৈরি হচ্ছে। কবি মুখোমুখি হলেন আধুনিক যন্ত্রের: ‘কাল মোর এতটুকু হয় নাই ঘুম,/ সারা রাত কাটিয়েছি জেগে বিছানায়’ (‘ডায়নামো’)। শুরুর এই দুই লাইনে রোমান্টিক কবির রাতজাগার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়। কিন্তু আবুল হোসেন তো আধুনিক, তাই প্রকৃতি বা নারী কোনোটাই তাঁর ঘুম নষ্ট করার জন্য দায়ী নয়; বরং তাঁর ঘুম কেড়ে নিয়েছে পথের পাশে একটানা শব্দ করে চলা ডায়নামো। ডায়নামোর অবিরাম শব্দ কাঁপন তোলে গাছের শাখায়, পাতায়। আর সেই শব্দ গান হয়ে ঘুরে ঘুরে আকাশের দিকে ওঠে। একসময় আকাশ থেকে ঐশীবাণী মাটিতে নামত, এখন আধুনিক যন্ত্রের সুর মাটি থেকে আকাশে উঠে যায়! আবার ‘মূষিক’ কবিতায় ঈশ্বরের কর্মকাণ্ডকে ‘ধূর্তামি’ বলতেও দ্বিধা হয় না কবির।

আধুনিক কবিতায়ও বাস্তবের বর্ণনা থাকে; কিন্তু সেখানে মুগ্ধতা থাকে না: ‘এখানে নিবিড় অন্ধকার,/ মরা ছুঁচো ছেঁড়া কাঁথা শুকনো হাড়/ মশা মাছি আর/ হন্যে কুকুর ধম্মের ষাঁড়’ (‘পটভূমি’)। কবিতাটি অন্ত্যমিলে লেখা নয়; তারপরেও আকস্মিকভাবে এই পঙ্‌ক্তিগুলোয় মিল তৈরি হয়েছে: অন্ধকার, হাড়, আর, ষাঁড়। ‘নববসন্ত’ কাব্যের প্রায় প্রতিটি কবিতায় মাঝে মাঝেই এই মিলের প্রবণতা দেখা যায়। আধুনিকতার প্রথম সোপানে কবি অবস্থান করছেন; ফলে কাব্যভাষা হিসেবে গদ্যছন্দ ব্যবহারে পুরোপুরি স্বস্তি মিলছে না।

আধুনিক কবিতার শুরুতে সিম্বল বা প্রতীক বিশেষ ভাব ও অর্থের ব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। আবুল হোসেনের কবিতায় এ রকম প্রতীক বহুল পরিমাণে আছে। যেমন আধুনিক অন্তঃসারশূন্য মানুষকে ‘মমি’র প্রতীকে উপস্থাপন করেছেন: ‘আমরা তো মরে গেছি, আমাদের প্রাণহীন মমি/...অস্থিসার নির্বাক কঙ্কাল’ (‘মমি’)। ধূর্ত লোকদের ‘মূষিকে’র প্রতীকে দেখেছেন: ‘তারপর একদিন প্রাতে জেগে দেখি:/ একি, একি, একি। ভাঙিয়াছে আমাদের স্বপ্ন-নিকেতন,/ সেথা ধূর্ত মূষিকেরা করে বিচরণ’ (‘মূষিক’)। কামনার উদ্দামতাকে দেখেছেন ‘জাহাজের পালে’র প্রতীকে: ‘কে খুলিল, কে খুলিল জাহাজের পাল।/ হৃদয়-সমুদ্র মোর কামনায় উদ্দাম উত্তাল’ (‘প্রাগৈতিহাসিক’)।

এর আগে বলা হয়েছে, আধুনিক যুগে ক্যামেরার উদ্ভাবনের পর কীভাবে বাস্তব-অনুগ পেইন্টিংয়ের বিপরীতে চিত্রকলায় সিম্বল বা প্রতীক গুরুত্ববহ হয়ে ওঠে। সিম্বলিজমের বিকাশ উনিশ শতকের শেষভাগে। আবার, মানুষ যখন বাস্তবের চোখ বন্ধ করেছে, তখন তার অন্তশ্চক্ষু খুলে গেছে। এখান থেকেই ইমেজিজমের অভিযাত্রা। বিশ শতকের শুরু থেকেই কবিতায় সচেতনভাবে চিত্রকল্পের ব্যবহার হতে থাকে। এজরা পাউন্ড এই ধারার সূচনাকারী। ইমেজিজম অপ্রয়োজনীয় শব্দ বর্জন করে, সরাসরি বিষয়কে তুলে ধরে এবং প্রথাগত ছন্দকে অস্বীকার করে।

এজরা পাউন্ড ছিলেন ডব্লিউ বি ইয়েটসের কাব্য-আসরের তরুণ কবি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন গীতাঞ্জলি নিয়ে হাজির হন লন্ডনে, তখন বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়নি। ফলে বিশ্বাসের চূড়ান্ত ভাঙন তখনো ঘটেনি। ইয়েটসের মাধ্যমে কবিরা ওই সময়ে মুগ্ধ হন গীতাঞ্জলির ভাববাদে—ঈশ্বরের কাছে নিবেদনে। ইউরোপ তখন বস্তুবাদে আক্রান্ত—বাস্তব জীবনের আকাঙ্ক্ষা ও লালসায় মানুষ রীতিমতো প্রতিহিংসাপরায়ণ। এর বিপরীতে ইয়েটস চোখ বুজে শুনতে পেলেন শান্ত সুর—প্রাচীন ভারতীয় শান্ত রস, যেখান থেকে তৈরি হয় শম ভাব। এজরা পাউন্ড তখন আধুনিক কবিতায় চোখ বন্ধ করেও ইমেজ দেখতে শেখালেন—অন্য ইন্দ্রিয়গুলোকে সচল করে।

বাংলাদেশের আধুনিক কবিতায় আবুল হোসেন খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়া হয় না। কারণ, তাঁর কবিতায় আধুনিকতার উপাদান প্রায় ক্ষেত্রেই ‘প্রাথমিক পর্যায়ের’ কিংবা ‘পরিণত নয়’। অথচ আধুনিক কবিতার পরম্পরা বিবেচনায় নিলে আবুল হোসেনের কাব্যশৈলী, কবিতার বিষয় ও ভাবনা পাঠক-গবেষকের কাছে জরুরি হয়ে ওঠে।

এজরা পাউন্ডের ‘ইন আ স্টেশন অব দ্য মেট্রো’ (১৯১৩) কবিতাটি এখনো পর্যন্ত ইমেজিজমের আদর্শ নমুনা হয়ে রয়েছে: ‘ভিড়ের মাঝে এসব মুখের সাথে হঠাৎ করে দেখা/ ভেজা, কালো ডালে ফুটে থাকা ফুলের পাপড়ি’। কবিতা এটুকুই। এজরা পাউন্ড যেখানে ট্রেনের ভিড়ের মানুষগুলোকে ফুলের পাপড়ি হিসেবে দেখেছেন, আবুল হোসেন সেখানে ট্রেনকেই আফ্রিকার তাড়া-খাওয়া একদল জন্তু হিসেবে দেখিয়েছেন: ‘তারপর দরকার থাক আর/ নাই থাক বের হয়ে পড়ে তারা, যেমন পালে পালে/ আফ্রিকায় মাঠে তাড়া-খাওয়া হাতি হরিণ জেব্রা গন্ডার/ হুড়মুড় করে ছোটে দিগ্বিদিক’ (‘ট্রেন’)।

ভারতবর্ষে কমিউনিজমের প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২০ সালে। আধুনিক কবিতায় বাস্তব যেসব বিষয় উত্থাপিত হয়েছে, তার মধ্যে গণমানুষের অধিকার ও সংগ্রাম প্রভাববিস্তারকারী একটি প্রসঙ্গ। আবুল হোসেনের প্রথম কাব্যগ্রন্থে এর প্রকাশও দেখা যায়: ‘যেখানে মানুষ দৈনন্দিন কাজে/ প্রাণপাত করে দুঃস্বপ্নের মাঝে,/ ...সেই জনতার দীপ্ত মিছিল ধরে/ নবযুগ আসে রক্ত দিনের ভোরে’ (‘পোস্টার’)। এই অনুপ্রেরণা আবুল হোসেন তাঁর পূর্বসূরি কবি বিষ্ণু দের কাছ পাননি, সুভাষ মুখোপাধ্যায় থেকেও নয়; কারণ, তাঁদের মার্ক্সবাদী ধারার কাব্য আবুল হোসেনের পরে প্রকাশিত হয়। বরং মার্ক্সবাদী আন্দোলনের চেতনা ও কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদ আবুল হোসেনকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।

আধুনিক মানুষ কাজের খোঁজে শহরে আসে; কিন্তু তাতেও তার দুমুঠো অন্নের সংস্থান নিশ্চিত হয় না। কবি বলেন, খাদ্যের বা পণ্যের অভাব নেই কলকাতায়, তবু মানুষে মানুষে ব্যবধান তৈরি হয়েছে: ‘বাজারে পণ্য হাজার হাজার/ মেলে না অন্ন তবু ক্ষুধার,/ ঘর আছে তবু মেলে না কো ঘর।/ এই আমাদের আজীবন স্বপ্নের সে শহর’ (‘মন্বন্তরে’)।

আধুনিক সমাজের বড় রূপান্তর ঘটেছে নারীর বাইরে বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে। কিন্তু এ জন্য নারীকে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ যাতনা কম সহ্য করতে হয়নি। ‘বাংলার মেয়ে’ কবিতায় কবি নারীর বয়ানে উপস্থাপন করেছেন তার কষ্ট ও প্রত্যাশাকে। রোকেয়ার প্রচেষ্টায় তত দিনে বাঙালি মুসলমান মেয়েরাও স্কুলে আসতে শুরু করেছে। মধুসূদনের ‘বীরাঙ্গনা কাব্য’র মতো আবুল হোসেন তাঁর কবিতায় নারীর মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেছেন তাঁর ব্যক্তিক-সামাজিক অনুভূতি। তবে কবি ‘পুরুষ’ বলেই হয়তো নারীর মুক্তির উপায় দেখেছেন পুরুষের মাধ্যমে—রূপকথার কোনো রাজকুমার নারীকে মুক্ত করতে আসবে, বন্দী নারী সেই প্রত্যাশায় আছে!

বাংলাদেশের আধুনিক কবিতায় আবুল হোসেন খুব গুরুত্ব দিয়ে পড়া হয় না। কারণ, তাঁর কবিতায় আধুনিকতার উপাদান প্রায় ক্ষেত্রেই ‘প্রাথমিক পর্যায়ের’ কিংবা ‘পরিণত নয়’। অথচ আধুনিক কবিতার পরম্পরা বিবেচনায় নিলে আবুল হোসেনের কাব্যশৈলী, কবিতার বিষয় ও ভাবনা পাঠক-গবেষকের কাছে জরুরি হয়ে ওঠে।