এআইয়ের সহযোগিতায় হেমলক বিষের পাত্র হাতে সক্রেটিসের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
এআইয়ের সহযোগিতায় হেমলক বিষের পাত্র হাতে সক্রেটিসের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

নিবন্ধ

সক্রেটিস কি স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন

প্রশ্নের জন্ম

খ্রিষ্টপূর্ব ৩৯৯ সালে এথেন্সের এক আদালতকক্ষে দাঁড়িয়ে সত্তর বছরের এক বৃদ্ধ বললেন, তিনি মৃত্যুকে ভয় পান না। বললেন, অপরীক্ষিত জীবনযাপনের কোনো মানে নেই। বললেন, তিনি সত্যের সেবক, জনতার তোষামোদকারী নন। এথেন্সের ৫০১ জন বিচারকের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি ক্ষমা চাইলেন না, কান্নাকাটি করলেন না, পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ পেয়েও গেলেন না। হেমলক বিষের পাত্র হাতে নিলেন শান্তভাবে। এ মৃত্যুদৃশ্য পশ্চিমা সভ্যতার সবচেয়ে মর্মস্পর্শী এবং সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাগুলোর একটি হয়ে আছে আজও।

প্রশ্নটি হলো, এই বৃদ্ধকে আদালতে কেন আনা হয়েছিল? কোন অপরাধে? আর সেই অপরাধের বয়ানটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল? কারা তৈরি করেছিল? এবং সেই বয়ানের ভেতরে কতটুকু সত্য, কতটুকু রাজনৈতিক কৌশল?

এ প্রবন্ধে সেসব প্রশ্নকেই বিশ্লেষণ করব। কারণ, সক্রেটিসের মৃত্যুর পেছনের গল্পটি শুধু একজন দার্শনিকের মৃত্যুর গল্প নয়। এটি একটি পুরোনো রাজনৈতিক খেলার গল্প, যে খেলার নিয়মকানুন আজও অপরিবর্তিত।

এথেন্সের রাজনৈতিক মঞ্চ: যে ভূমিতে বিষ রোপিত হয়েছিল

সক্রেটিসের বিচারকে বোঝার আগে এথেন্সের সেই সময়কার রাজনৈতিক বাস্তবতাটি বোঝা দরকার, কারণ, এই বিচার কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল একটি দীর্ঘ রাজনৈতিক ঘূর্ণনের শেষ বিন্দু।

পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ (খ্রিষ্টপূর্ব ৪৩১-৪০৪) এথেন্সকে প্রায় গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যে চলা এই দীর্ঘ যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত এথেন্সের পরাজয় ঘটে। স্পার্টার সামরিক শক্তির কাছে নতি স্বীকার করতে বাধ্য হওয়ার পর এথেন্সে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং স্পার্টার মদদে ক্ষমতায় আসে একটি অলিগার্কিক (ধনিকতান্ত্রিক) জান্তা, যাদের ইতিহাস মনে রেখেছে ‘থার্টি টাইরান্টস’ বা ‘ত্রিশ স্বৈরশাসক’ নামে।

৪০৪ থেকে ৪০৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মাত্র আট মাসের এ শাসনামলে ত্রিশজন অলিগার্ক (ধনিক শাসক) এথেন্সে এমন নৃশংসতা চালিয়েছিলেন যে ইতিহাসে তাঁরা কুখ্যাত হয়ে আছেন। ধারণা করা হয়, এ সংক্ষিপ্ত সময়ে তাঁরা প্রায় দেড় হাজার এথেনীয় নাগরিককে হত্যা করেছেন, শত শত মানুষকে নির্বাসনে পাঠিয়েছেন, সম্পদ বাজেয়াপ্ত করেছেন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করেছেন। এ শাসনের মূল নেতা ছিলেন ক্রিটিয়াস, এক অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও নিষ্ঠুর রাজনীতিক, যিনি একসময় সক্রেটিসের সান্নিধ্যে আসা ছাত্রদের একজন ছিলেন।

৪০৩ সালে গণতন্ত্রপন্থীরা আবার এথেন্সের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ওই ত্রিশ স্বৈরশাসকের পতন ঘটে। কিন্তু ক্ষতটা থেকে যায়। প্রতিটি বিপ্লবের পরে যা ঘটে, তা এথেন্সেও ঘটেছিল, মানুষ খুঁজতে থাকে দায়ী কে, শাস্তি দেওয়ার জন্য মাথা চাই। কিন্তু এখানে একটি বাধা ছিল। পুনরুদ্ধার করা গণতন্ত্র একটি সাধারণ ক্ষমা বা অ্যামনেস্টি (সাধারণ ক্ষমা) ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ ৪০৩ সালের আগের কোনো রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য সরাসরি কাউকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে না।

এখানেই তৈরি হয় সেই রাজনৈতিক শূন্যস্থান, যে শূন্যস্থানে ঢুকে পড়েন সক্রেটিস। সরাসরি স্বৈরশাসকদের দোসরদের বিচার করা যাচ্ছে না, তাহলে কাউকে না কাউকে প্রতীকী শাস্তি দিতে হবে। সেই প্রতীক হিসেবে বেছে নেওয়া হলো এথেন্সের সেই বৃদ্ধ দার্শনিককে, যিনি বাজারে ঘুরে বেড়ান, প্রশ্ন করেন, সন্দেহ করেন এবং যাঁর ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন ক্রিটিয়াস ও অ্যালসিবিয়াদেস।

সক্রেটিসের জীবন ও তাঁর বিপজ্জনক সংসর্গ

সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্ব) ছিলেন এথেন্সের এক অদ্ভুত মানুষ। পাথর কাটার কাজ করতেন তাঁর পিতা, মায়ের পেশা ছিল ধাত্রীগিরি। নিজে কখনো কোনো পেশায় যুক্ত হননি। কোনো স্কুল প্রতিষ্ঠা করেননি, কোনো বই লেখেননি। এথেন্সের বাজারে, কামারশালায়, রাজনীতিকদের চায়ের আসরে ঘুরে বেড়াতেন এবং প্রশ্ন করতেন। এ প্রশ্ন করার পদ্ধতিই তাঁকে বিখ্যাত করেছিল, একই সঙ্গে শত্রুও তৈরি করেছিল।

কিন্তু রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিপজ্জনক ছিল তাঁর দুজন অনুগামী। প্রথমজন অ্যালসিবিয়াদেস (আলকিবিয়াদেস), এথেন্সের সবচেয়ে উজ্জ্বল ও বিতর্কিত সামরিক নায়কদের একজন। অ্যালসিবিয়াদেস একসময় সক্রেটিসের কাছাকাছি ছিলেন। পরবর্তীকালে তিনি সিসিলি অভিযানে (খ্রিষ্টপূর্ব ৪১৫) এথেন্সকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলেছিলেন এবং একসময় স্পার্টার কাছে পলায়ন করে স্বদেশের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিলেন। এথেন্সবাসীর কাছে তিনি ছিলেন বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীক।

এআইয়ের সহযোগিতায় হেমলক বিষের পাত্র হাতে সক্রেটিসের প্রতিকৃতি
কৌশলটি ছিল অত্যন্ত চতুর। রাজনৈতিক অভিযোগ আনলে আদালতে প্রমাণ দিতে হতো। কিন্তু ধর্মীয় অভিযোগ অনেক বেশি অস্পষ্ট ও আবেগপ্রবণ। সক্রেটিস কি সত্যিই দেবতাদের বিশ্বাস করেন না? এটা প্রমাণ করা যায় না, কিন্তু জনমানসে সন্দেহের বীজ বোনা যায়। আর যুবকদের বিপথগামী করার অভিযোগ আনলে বোঝানো যায় যে ক্রিটিয়াস ও অ্যালসিবিয়াদেসের মতো মানুষ তৈরি করার কারখানা হলেন সক্রেটিস।

দ্বিতীয়জন ক্রিটিয়াস, ত্রিশ স্বৈরশাসকের মাথা। তিনিও এককালে সক্রেটিসের কাছাকাছি এসেছিলেন। এই দুটি নাম সক্রেটিসের সঙ্গে জুড়ে দেওয়াই ছিল অভিযোগকারীদের সবচেয়ে মারাত্মক হাতিয়ার।

আরেকটি বিষয় এখানে বলা দরকার। সক্রেটিস নিজেই গণতন্ত্রের প্রতি সর্বদা উৎসাহী ছিলেন না। তিনি বলতেন, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত সব সময় ঠিক নয়। নৌকা পরিচালনা করা শেখানো হয় দক্ষ মানুষকে, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনার ভার কেন যেকোনো মানুষের হাতে দেওয়া হবে? এসব প্রশ্ন গণতন্ত্রের সমর্থকদের কানে বিপজ্জনক শোনাত। তাঁরা মনে করতেন, সক্রেটিস গণতন্ত্রকে দুর্বল করছেন।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য টানা দরকার, সক্রেটিস গণতন্ত্রের সমালোচনা করতেন ঠিকই, কিন্তু অলিগার্কি বা ধনিকতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন বলে কোনো প্রমাণ নেই। বরং তাঁর বিচারকে যারা ব্যবহার করতে চেয়েছিল, তারাই একটি বয়ান তৈরি করেছিল। এ বয়ান আসলে রাজনৈতিক অভিলাষের ফসল।

অভিযোগপত্র: কীভাবে সাজানো হয়েছিল বয়ানটি?

৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সক্রেটিসের বিরুদ্ধে তিনজন মানুষ আদালতে অভিযোগ দাখিল করেন। মেলেটাস, একজন কবি; আনিটাস, একজন ধনী ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী রাজনীতিক এবং লাইকন, একজন বাগ্মী বা বক্তা। তিনটি অভিযোগ ছিল। প্রথমত, রাষ্ট্রীয় দেবতাদের অস্বীকার করা এবং নতুন দেবতার প্রবর্তন করা। দ্বিতীয়ত, যুবকদের বিপথগামী করা। এই দুটি ছিল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ। কিন্তু অলিখিত তৃতীয় অভিযোগটিই ছিল আসল, সক্রেটিস স্বৈরাচারীদের সহযোগী ছিলেন।

আনুষ্ঠানিক অভিযোগগুলো কেন এভাবে সাজানো হয়েছিল, সেটা বোঝার জন্য আগে ৪০৩ সালের সাধারণ ক্ষমার কথা মনে রাখতে হবে। ওই সাধারণ ক্ষমার শর্ত অনুযায়ী রাজনৈতিক কারণে সরাসরি কাউকে বিচার করা যাবে না। তাই রাজনৈতিক সহযোগিতার দায়ে সক্রেটিসের সরাসরি বিচার করা সম্ভব ছিল না। আইনি ফাঁক গলিয়ে তাঁকে ধরতে হলে ধর্মীয় ও নৈতিক অভিযোগ আনতে হবে।

কৌশলটি ছিল অত্যন্ত চতুর। রাজনৈতিক অভিযোগ আনলে আদালতে প্রমাণ দিতে হতো। কিন্তু ধর্মীয় অভিযোগ অনেক বেশি অস্পষ্ট ও আবেগপ্রবণ। সক্রেটিস কি সত্যিই দেবতাদের বিশ্বাস করেন না? এটা প্রমাণ করা যায় না, কিন্তু জনমানসে সন্দেহের বীজ বোনা যায়। আর যুবকদের বিপথগামী করার অভিযোগ আনলে বোঝানো যায় যে ক্রিটিয়াস ও অ্যালসিবিয়াদেসের মতো মানুষ তৈরি করার কারখানা হলেন সক্রেটিস।

অর্থাৎ সরাসরি না বলেও বলা হলো। আনুষ্ঠানিক কাগজে রাজনৈতিক কথা নেই, কিন্তু জনতার মনে পৌঁছে দেওয়া হলো একটি স্পষ্ট বার্তা: এই মানুষই এথেন্সের দুর্দশার কারণ।

অ্যারিস্টটলের শিষ্য থিওফ্রাস্টাস পরবর্তীকালে বলেছিলেন, আনিটাসের মূল উদ্দেশ্য ছিল সক্রেটিসকে নির্বাসনে পাঠানো, হত্যা করা নয়। কিন্তু সক্রেটিস নিজে আদালতে যেভাবে উপস্থাপন করলেন নিজেকে, আপসহীনভাবে, দম্ভের সঙ্গে প্রায়, বিচারকদের রায়টা প্রাণদণ্ডের দিকেই ঠেলে দিলেন।

মিথ, সত্য ও তথ্য: একটি বিশ্লেষণ

এ পর্যায়ে প্রশ্নটির সরাসরি মুখোমুখি হওয়া দরকার। সক্রেটিস কি সত্যিই স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন?

প্রথমে আসা যাক, অভিযোগের সত্যতার দিকটিতে। এটা সত্য ঘটনা যে ক্রিটিয়াস ও অ্যালসিবিয়াদেস উভয়ই তরুণকালে সক্রেটিসের কাছে এসেছিলেন। কিন্তু শিক্ষকের নৈতিক দায় কতটুকু শিষ্যের কাজের জন্য? সক্রেটিস কি তাঁদের স্বৈরশাসক হতে শিখিয়েছিলেন? প্লেটোর রচনা পড়লে দেখা যায়, সক্রেটিস ন্যায়বিচার, আত্মার শুদ্ধতা, সত্যের সন্ধান নিয়ে কথা বলতেন। এ শিক্ষার সঙ্গে ত্রিশ স্বৈরশাসকের নৃশংসতার কোনো সরল সংযোগ স্থাপন করা যায় না।

আরেকটি সত্য হলো, ত্রিশ স্বৈরশাসকের শাসনকালে ক্রিটিয়াস সক্রেটিসকে একটি নির্দেশ দিয়েছিলেন, তাঁকে তরুণদের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করতে হবে। এক্সেনোফন (জেনোফন) তাঁর ‘মেমোরাবিলিয়া’ (স্মরণীয় বিষয়সমূহ) গ্রন্থে এ ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। সক্রেটিস সেই নির্দেশ মানেননি এবং প্রকাশ্যে ক্রিটিয়াসের সমালোচনা করেছিলেন। যদি তিনি স্বৈরাচারের দোসর হতেন, তা হলে স্বৈরশাসকের নির্দেশ অমান্য করতেন না।

এ ছাড়া ৪০৬ সালের আরগিনুসাই (আর্গিনিউসাই) যুদ্ধের পরবর্তী বিচারে সক্রেটিস একা দাঁড়িয়ে পুরো সমাবেশের বিরোধিতা করেছিলেন। সেই বিচারে ছয়জন সামরিক কমান্ডারকে দ্রুত মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য জনতা মুখর ছিল। সক্রেটিস বলেছিলেন, এ রায় আইনসম্মত নয়। তিনি জনতার চাপের কাছে মাথা নোয়াননি। এ ঘটনা দেখায় যে তিনি ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়ানোর মানুষ ছিলেন না।

হেমলক বিষের পাত্র হাতে সক্রেটিসের প্রতিকৃতি। এআইয়ের সহযোগিতায় অলংকরণ
সক্রেটিস কারাগারে রইলেন। তাঁর বন্ধু ক্রিটো এসে বললেন, পালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সক্রেটিস রাজি হলেন না। প্লেটো তাঁর ‘ক্রিটো’ সংলাপে মুহূর্তটিকে ধরে রেখেছেন অপূর্বভাবে। সক্রেটিস বললেন, ‘রাষ্ট্রের আইনের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কটা একতরফা নয়। যত দিন এ আইনের অধীনে বসবাস করেছি, তার সুযোগ-সুবিধা নিয়েছি, লেখাপড়া করেছি, পরিবার গড়েছি, তত দিন এ রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নৈতিক চুক্তি আমি মেনে নিয়েছি। এখন কোনো একটি রায় আমার পছন্দ হলো না বলেই সে চুক্তি ভেঙে পালিয়ে যাওয়াটা ন্যায়সঙ্গত নয়।’

তাহলে কোথায় দাঁড়িয়ে আছে মিথটি? মিথটি হলো এ ধারণায় যে শিক্ষক তাঁর শিষ্যের সব কর্মের জন্য দায়ী। ক্রিটিয়াস সক্রেটিসের সান্নিধ্যে ছিলেন, এটা সত্য। কিন্তু ক্রিটিয়াস সক্রেটিসের শিক্ষার কারণে অত্যাচারী হয়েছিলেন, এটা মিথ্যা। বরং কেউ কেউ বলেছেন, ক্রিটিয়াস সক্রেটিসের কাছে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার হাতিয়ার খুঁজতে এসেছিলেন এবং সেটা না পেয়ে দূরে সরে গিয়েছিলেন।

মিথ্যাটি হলো, এই বয়ান যে অনুমান করে নেয় যে সক্রেটিসের দর্শন স্বৈরতন্ত্রের সহায়ক ছিল। আসলে সক্রেটিসের দর্শন ছিল ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার দর্শন। তিনি রাজনীতিকদের, সেনাপতিদের, কবিদের সবার কাছেই জানতে চাইতেন, তুমি কি সত্যিই জানো, তুমি কী করছ? এ প্রশ্ন কোনো ক্ষমতাশালীর জন্যই সুবিধার নয়।

বিচারকক্ষের নাটক: সমাজের নীরবতা ও প্রতিক্রিয়া

৩৯৯ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের সেই বিচারের দিন এথেন্সের ৫০১ জন বিচারক ভোট দিলেন। ২৮০ জন রায় দিলেন দোষী। ২২১ জন রায় দিলেন নির্দোষ। ব্যবধান ছিল ৫৯ ভোটের। প্লেটো ও দিওজিনিস লায়ারতিউসের বিবরণ অনুযায়ী, যদি মাত্র ৩০ জন বিচারক তাঁদের ভোট ঘুরিয়ে দিতেন, তাহলে রায়টাই উল্টে যেত, সক্রেটিস নির্দোষ প্রমাণিত হতেন। এ হিসাবেই বোঝা যায় যে কত সূক্ষ্ম প্রান্তে দাঁড়িয়ে ছিল তাঁর ভাগ্য।

এরপর শাস্তি নির্ধারণের পর্বে উভয় পক্ষ তাদের প্রস্তাব দেবে। অভিযোগকারীরা মৃত্যুদণ্ড চাইলেন। সক্রেটিস প্রথমে কৌতুকচ্ছলে বললেন, তাঁকে বরং প্রতিদিন বিনা মূল্যে খাবার দেওয়া হোক প্রাইটানিউমে (রাষ্ট্রীয় ভোজনশালা), কারণ, তিনি রাষ্ট্রের উপকার করেছেন। পরে বন্ধুদের চাপে সামান্য জরিমানার প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু প্রতিটি কথায় তাঁর আত্মসম্মানের দৃঢ়তা বিচারকদের আরও ক্ষুব্ধ করল। দ্বিতীয় ভোটে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে ভোট পড়ল আরও বেশি।

তারপর এল সেই কুখ্যাত এক মাস। দেলোস দ্বীপে পবিত্র তীর্থযাত্রার কারণে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা স্থগিত রইল। সক্রেটিস কারাগারে রইলেন। তাঁর বন্ধু ক্রিটো এসে বললেন, পালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। সক্রেটিস রাজি হলেন না। প্লেটো তাঁর ‘ক্রিটো’ সংলাপে মুহূর্তটিকে ধরে রেখেছেন অপূর্বভাবে। সক্রেটিস বললেন, ‘রাষ্ট্রের আইনের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কটা একতরফা নয়। যত দিন এ আইনের অধীনে বসবাস করেছি, তার সুযোগ-সুবিধা নিয়েছি, লেখাপড়া করেছি, পরিবার গড়েছি, তত দিন এ রাষ্ট্রের সঙ্গে একটি নৈতিক চুক্তি আমি মেনে নিয়েছি। এখন কোনো একটি রায় আমার পছন্দ হলো না বলেই সে চুক্তি ভেঙে পালিয়ে যাওয়াটা ন্যায়সঙ্গত নয়।’

এমনটাই সক্রেটিসের যুক্তি ছিল। পরবর্তীকালে অনেকেই এ যুক্তির সমালোচনা করেছেন। কেউ বলেছেন, এটি গভীর নৈতিক বিশ্বাস। কেউ বলেছেন, এটি মৃত্যুবরণের একটি দার্শনিক পদ্ধতি। কেউ বলেন, সক্রেটিস আসলে জানতেন যে তাঁর মৃত্যুই হবে তাঁর চিন্তার সবচেয়ে বড় বিজয়।

সক্রেটিসের মৃত্যুর দিন কাছের মানুষেরা কাঁদলেন। সক্রেটিস নিজে শান্ত রইলেন। প্লেটোর ‘ফাইডো’ (ফিডো) সংলাপে যে বর্ণনা আছে, সেটি পশ্চিমা সাহিত্যের সবচেয়ে মর্মস্পর্শী মৃত্যুদৃশ্যগুলোর একটি। হেমলক খেয়ে সক্রেটিস শেষ মুহূর্তে বললেন, ‘ক্রিটো, আমি অ্যাসক্লেপিউসের (স্বাস্থ্যের দেবতা) কাছে একটি মোরগ ঋণী আছি। মনে রেখো।’ জীবনের শেষ কথাটিও একটি সামাজিক দায়বদ্ধতার।

কিন্তু যে সমাজে এ মৃত্যু ঘটল, সে সমাজের প্রতিক্রিয়া কী ছিল? সত্যিই কি সবাই নীরব ছিল?

না, পুরোপুরি নীরব ছিল না। কিন্তু প্রতিবাদও হয়নি। প্লেটো পরে লিখেছেন, বিচারের দিন তিনি সেখানে ছিলেন এবং অসুস্থ ছিলেন মৃত্যুর দিন। প্লেটোর কাছে এ বিচার ছিল এথেন্সের রাজনৈতিক গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে তাঁর জীবনব্যাপী সন্দেহের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তিনি পরে লিখলেন, যে ধরনের গণতন্ত্র এ কাজ করতে পারে, তা আসলে গণতন্ত্র নয়।

এক্সেনোফন, আরেক ঘনিষ্ঠ মানুষ, বিচারের সময় দেশে ছিলেন না। কিন্তু পরে তিনি ‘সক্রেটিসের স্মৃতিকথা’ লিখলেন। সেখানে চেষ্টা করলেন গুরুর একটি মানবিক ও সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য ছবি তুলে ধরতে।

আর সাধারণ এথেনীয় জনতা? তারা বেশির ভাগ নীরব ছিল। কারণটা বোঝার মতো। মাত্র বছর চারেক আগে তারা ত্রিশ স্বৈরশাসকের অত্যাচার দেখেছে। মানুষ ক্লান্ত, ভীত, বিভ্রান্ত। এ পরিস্থিতিতে একজন দার্শনিকের মৃত্যু নিয়ে রাস্তায় নামার সাহস বা প্রয়োজনীয়তা বোধ করার মতো অবস্থা কজনের ছিল?

এখন এ ঘটনার রাজনৈতিক কাঠামোটিকে আরও স্পষ্টভাবে দেখা দরকার। সক্রেটিসের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। এ প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া যায় ‘দোষারোপের রাজনীতি’ বা পলিটিকস অব স্কেপগোটিং (বলির পাঁঠা বানানোর রাজনীতি)। প্রতিটি শাসন পরিবর্তনের পর একটি নতুন শাসন তার বৈধতা প্রমাণ করতে চায় পুরোনো শাসনের সঙ্গে যুক্ত কাউকে শাস্তি দিয়ে। কিন্তু যখন আইনি জটিলতায় প্রত্যক্ষ অপরাধীদের ধরা যায় না, তখন দরকার হয় প্রতীকী শিকারের। সক্রেটিস সেই প্রতীক হয়েছিলেন কয়েকটি কারণে।

তবে কিছুকাল পরে অনুতাপ এল। পরম্পরাগত ঐতিহাসিক বিবরণ বলে যে এথেনীয়রা পরে অনুতাপ করেছিল। মেলেটাসকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল, আনিটাসকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। তবে এ বিবরণের সত্যতা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিন্তু এটুকু নিশ্চিত যে মৃত সক্রেটিস জীবিত সক্রেটিসের চেয়ে অনেক বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠলেন। তাঁর মৃত্যু প্লেটোর রাজনৈতিক দর্শনের জন্ম দিল, যে দর্শন পরের আড়াই হাজার বছরের চিন্তাকে রূপ দিয়েছে।

রেজিম চেঞ্জের (শাসন পরিবর্তন) পুরোনো খেলা: স্বৈরাচারের দোসর বানানোর কৌশল

এখন এ ঘটনার রাজনৈতিক কাঠামোটিকে আরও স্পষ্টভাবে দেখা দরকার। সক্রেটিসের মৃত্যু কোনো দুর্ঘটনা ছিল না, এটি ছিল একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। এ প্রক্রিয়ার নাম দেওয়া যায় ‘দোষারোপের রাজনীতি’ বা পলিটিকস অব স্কেপগোটিং (বলির পাঁঠা বানানোর রাজনীতি)।

প্রতিটি শাসন পরিবর্তনের পর একটি নতুন শাসন তার বৈধতা প্রমাণ করতে চায় পুরোনো শাসনের সঙ্গে যুক্ত কাউকে শাস্তি দিয়ে। কিন্তু যখন আইনি জটিলতায় প্রত্যক্ষ অপরাধীদের ধরা যায় না, তখন দরকার হয় প্রতীকী শিকারের। সক্রেটিস সেই প্রতীক হয়েছিলেন কয়েকটি কারণে।

প্রথমত, সক্রেটিস পরিচিত ছিলেন। ক্রিটিয়াস ও অ্যালসিবিয়াদেসের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল, এটা সবাই জানত। এই পরিচিতি ব্যবহার করে তাঁকে স্বৈরাচারের পরিবেশ তৈরির সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব ছিল।

দ্বিতীয়ত, সক্রেটিস প্রভাবশালী ছিলেন। যুবকদের মধ্যে তাঁর প্রভাব ছিল। এ প্রভাব ছিল বলেই যারা ভবিষ্যতে আবার অনুগত প্রজন্ম গড়তে চাইত, তাদের জন্য তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার একটি আলাদা কারণ ছিল।

তৃতীয়ত, সক্রেটিস ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতেন। প্রশ্ন তোলাটাই আসলে সবচেয়ে বড় অপরাধ। কারণ যে শাসনব্যবস্থাই আসুক, সে তার বৈধতাকে প্রশ্নহীন রাখতে চায়। সক্রেটিস সেটা করতে দেননি।

চতুর্থত, সক্রেটিস একা ছিলেন। কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য ছিলেন না। কোনো সামরিক শক্তি ছিল না তাঁর। ফলে তাঁকে আক্রমণ করার ঝুঁকি কম ছিল।

ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আই এফ স্টোনের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ট্রায়াল অব সক্রেটিস’-এ (সক্রেটিসের বিচার) তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে সক্রেটিসের মৃত্যুর পেছনে মূলত ছিল রাজনৈতিক হিসাবনিকাশ। তিনি লিখেছেন, ‘সক্রেটিস বাঁচতে পারতেন, যদি তিনি রাজনীতি থেকে দূরে থাকার প্রতিশ্রুতি দিতেন। কিন্তু তিনি প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি আদালতে জানালেন যে তিনি প্রশ্ন করতে থাকবেন, যত দিন বাঁচবেন।’ স্টোন এ বিষয়ে সক্রেটিসের সমালোচনাও করেছেন, বলেছেন, একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যিনি প্রশ্ন করে দুর্বল করেন, তাঁর বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের এ প্রতিক্রিয়া বোধগম্য, যদিও ক্ষমাযোগ্য নয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি বিতর্কিত, কিন্তু এটি দেখায় যে সক্রেটিসের মামলাটি এখনো একটি জীবন্ত বিতর্ক।

দোষারোপের প্লেবুক: বর্তমান বিশ্বরাজনীতিতে সেই পুরোনো খেলা

সক্রেটিসের বিচারের পর প্রায় আড়াই হাজার বছর কেটে গেছে। কিন্তু যে কৌশলে তাঁকে স্বৈরাচারের দোসর বানানো হয়েছিল, সে কৌশল আজও কার্যকর। এটি পরিবর্তিত হয়নি, শুধু ভাষাটি বদলেছে।

প্রতিটি শাসন পরিবর্তনের পর নতুন শাসক একই কাজ করেন। পুরোনো শাসনের সঙ্গে যুক্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে, তাঁদের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রমাণ না থাকলেও সংসর্গের দোষ আরোপ করেন। বলা হয়, তুমি অমুকের সঙ্গে ছিলে, তাই তুমিও দোষী। এ যুক্তি আইনের ভাষায় অগ্রহণযোগ্য হলেও জনমানসে অত্যন্ত কার্যকর।

বিশ শতকের ইতিহাসে এই প্লেবুকের অসংখ্য প্রয়োগ দেখা যায়। স্তালিনের সোভিয়েত ইউনিয়নে ‘ট্রটস্কিপন্থী’ বা ‘জনগণের শত্রু’ তকমা দিয়ে যে শুদ্ধি অভিযান চলেছিল, তার মূল যুক্তি ছিল সংসর্গের দোষ। চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবে (খ্রিষ্টাব্দ ১৯৬৬-৭৬) ‘পুঁজিবাদের পথিক’ বলে যাঁদের দাঁড় করানো হয়েছিল সংসদীয় আদালতে, তাঁদের অপরাধও ছিল বিভিন্ন পুরোনো শক্তির সঙ্গে যোগাযোগ। ম্যাকার্থি আমলের আমেরিকায় ‘কমিউনিস্ট সহানুভূতিশীল’ বলে যাঁদের কর্মজীবন ধ্বংস করা হয়েছিল, তাঁদের অনেকের একমাত্র ‘অপরাধ’ ছিল কোনো একটি সভায় কোনো একজন মানুষের পাশে বসা।

এই প্লেবুকের প্রথম ধাপ হলো একটি অপরাধী শ্রেণি তৈরি করা—পুরোনো শাসনের সহযোগী বলে একটি বিমূর্ত শ্রেণি তৈরি করো। এ শ্রেণির সদস্যপদের মানদণ্ড অস্পষ্ট রাখো, যাতে যেকোনো সময় যেকোনো ব্যক্তিকে এ শ্রেণিতে ফেলা যায়।

‘সক্রেটিস স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন’, এ বয়ান একটি রাজনৈতিক নির্মাণ ছিল। এটি সত্য ছিল না, কিন্তু কার্যকর ছিল। এটি প্রমাণিত ছিল না, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য করা গিয়েছিল। এটি সরাসরি বলা হয়নি, কিন্তু সবার মনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। এ প্রক্রিয়াই হলো সবচেয়ে ভয়ংকর। সরাসরি মিথ্যা বললে মানুষ প্রতিবাদ করে। কিন্তু অর্ধসত্য, ইঙ্গিত, সংসর্গের দোষ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বয়ানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। কারণ, এ বয়ান একদিকে খণ্ডন করার মতো সুস্পষ্ট নয়, অন্যদিকে উড়িয়ে দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্যও নয়।

দ্বিতীয় ধাপ, সংসর্গকে অপরাধ হিসেবে প্রমাণ করা। তুমি কার সঙ্গে ছিলে? তুমি কোথায় গিয়েছিলে? তুমি কার ফোন ধরেছিলে? কার সভায় বক্তৃতা করেছিলে? এসব প্রশ্ন কোনো প্রমাণের বিকল্প হয়ে যায়।

তৃতীয় ধাপ হলো, প্রকৃত অভিযোগকে লুকিয়ে রেখে পার্শ্ব–অভিযোগে বিচার করা। সক্রেটিসকে রাজনৈতিক দায়ে বিচার করতে পারেনি বলে ধর্মীয় দায়ে বিচার করা হয়েছিল। আজকের দুনিয়ায় রাজনৈতিক বিরোধীদের দুর্নীতির মামলায়, ট্যাক্স ফাঁকির মামলায়, নৈতিকতার মামলায় ধরা হয়। প্রকৃত কারণটি অলিখিত থাকে।

চতুর্থ ধাপ, জনমানসে ভয় ছড়িয়ে নীরবতা নিশ্চিত করা। যাঁরা এ বিচারকে অন্যায় মনে করেন, তাঁরা যদি চুপ থাকেন, তাহলে বিচারটি আরও সহজ হয়ে যায়। এথেন্সেও তা-ই হয়েছিল।

বাংলাদেশ: একটি পরিচিত প্লেবুকের স্থানীয় প্রয়োগ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্লেবুক এতটাই পরিচিত যে এর প্রতিটি ধাপই পরিচিত লাগে। এখানে শাসন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ‘দোসর’ শব্দটির ব্যবহার এবং প্রয়োগপদ্ধতি প্রায় নিখুঁতভাবে সক্রেটিসের বিচারের কাঠামো অনুসরণ করে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর ‘রাজাকার’ শব্দটি একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক অর্থ বহন করেছিল। যারা পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগী ছিল, গণহত্যায় অংশ নিয়েছিল বা সহযোগিতা করেছিল, তারা ছিল প্রকৃত রাজাকার। কিন্তু পরবর্তী দশকগুলোয় শব্দটি রাজনৈতিক অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ‘রাজাকার’ বলার মাধ্যমে তাকে ৭১-এর বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যায়, তাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার শত্রু বানানো যায়, তার বিরুদ্ধে যেকোনো ব্যবস্থা নেওয়া বৈধ করা যায়। এটি ঠিক সেই প্রক্রিয়া যেখানে সক্রেটিসের সঙ্গে ক্রিটিয়াসের সম্পর্কটিকে ব্যবহার করা হয়েছিল।

আবার প্রতিটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে দেখা যায় একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্ন। বিগত সরকারের ‘দোসর’ হিসেবে চিহ্নিত হন সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সমাজকর্মীরা। যাঁদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ কোনো অপরাধের প্রমাণ নেই, তাঁদের বিরুদ্ধে সংসর্গের প্রমাণ ব্যবহার করা হয়। তুমি অমুক মিছিলে ছিলে, তুমি অমুক অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দিয়েছিলে, তুমি অমুকের ফেসবুক পোস্টে লাইক দিয়েছিলে, এসব ‘প্রমাণ’ দিয়ে গড়ে তোলা হয় একটি মামলার কাঠামো।

এখানে একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে শাসনের সদ্য পতন ঘটেছে, তার সত্যিকারের সহযোগীরা প্রায়ই নিরাপদ থাকেন। কারণ তাঁরা নমনীয়, তাঁরা আপস করতে জানেন, তাঁরা নতুন শক্তির সঙ্গে যোগ দিতে দেরি করেন না। যাঁদের নাম থাকে বিচারের তালিকায়, তাঁরা প্রায়ই সেই সব মানুষ, যাঁরা ক্ষমতার সামনে মাথা নোয়াননি, যাঁরা প্রশ্ন করেছিলেন, যাঁরা দলের বাইরে নিজস্ব কণ্ঠস্বর রেখেছিলেন। এটিও সক্রেটিসের পরিস্থিতির সঙ্গে মিলে যায়। যাঁরা ত্রিশ স্বৈরশাসকের প্রকৃত সহযোগী ছিলেন, তাঁরা বেঁচে গেলেন, কিন্তু সেই মানুষ বিষ খেলেন, যিনি ক্রিটিয়াসের মুখের ওপর বলতে পেরেছিলেন, ‘তুমি যা করছ, তা ন্যায় নয়।’

উপসংহার: বয়ান ও বাস্তবতা

‘সক্রেটিস স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন’, এ বয়ান একটি রাজনৈতিক নির্মাণ ছিল। এটি সত্য ছিল না, কিন্তু কার্যকর ছিল। এটি প্রমাণিত ছিল না, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্য করা গিয়েছিল। এটি সরাসরি বলা হয়নি, কিন্তু সবার মনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

এ প্রক্রিয়াই হলো সবচেয়ে ভয়ংকর। সরাসরি মিথ্যা বললে মানুষ প্রতিবাদ করে। কিন্তু অর্ধসত্য, ইঙ্গিত, সংসর্গের দোষ ইত্যাদি দিয়ে তৈরি বয়ানের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কঠিন। কারণ, এ বয়ান একদিকে খণ্ডন করার মতো সুস্পষ্ট নয়, অন্যদিকে উড়িয়ে দেওয়ার মতো অবিশ্বাস্যও নয়।

আড়াই হাজার বছর পরে আমরা জানি যে সক্রেটিস স্বৈরাচারের দোসর ছিলেন না। তিনি ছিলেন প্রশ্নকারী। আর প্রশ্নকারীরা সব সময়ই বিপজ্জনক থাকেন, কারণ তাঁরা ক্ষমতার মুখের সামনে আয়না ধরেন। সেই আয়নায় ক্ষমতা নিজের কুৎসিত মুখ দেখতে চায় না।

সুতরাং ক্ষমতা আয়না ভাঙে না। সে আয়নাধারীকে ভাঙে এবং আয়নাধারীকে ভাঙার আগে তার ওপর একটি বয়ান চাপিয়ে দেয়, যাতে আয়না ভাঙার মুহূর্তে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেরা ভাবে, হয়তো এই লোক সত্যিই কোনো না কোনো দোষ করেছিল।

এ বয়ান আজও বেঁচে আছে। এথেন্সে জন্ম নিয়েছিল, কিন্তু তার নাগরিকত্ব বিশ্বব্যাপী। প্রতিটি দেশে, প্রতিটি যুগে, প্রতিটি শাসন পরিবর্তনে, এ বয়ান নতুন পোশাক পরে হাজির হয়। শুধু নামগুলো বদলায়, ক্রিটিয়াস থেকে অন্য কোনো নাম, সক্রেটিস থেকে অন্য কোনো মানুষ। কিন্তু খেলাটা এক। আর খেলার নিয়মটাও এক।

এবং সেই নিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একমাত্র উপায় হলো সক্রেটিসের উপায়, প্রশ্ন করা। বয়ানটিকে প্রশ্ন করা, বিচারটিকে প্রশ্ন করা, নিজের নীরবতাকে প্রশ্ন করা। কারণ, যে সমাজে প্রশ্নকারীরা বিষ খান এবং তামাশাকারীরা বিচারক হন, সে সমাজ আসলে বিচার করে না, সে নিজেই বিচারের মুখে দাঁড়িয়ে থাকে।

  • লেখক: কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, কলামিস্ট ও সম্পাদক