
প্রাচীন গ্রিক পুরাণের এক দানবকে যিনি আধুনিক মানুষের প্রেম, নিঃসঙ্গতা ও আত্মপরিচয়ের প্রতীকে রূপ দিয়েছেন, সেই অ্যান কারসনের সাহিত্যভুবন স্বতন্ত্র ও বিস্ময়কর। প্রাচীন সাহিত্যের নিবিড় পাঠ, অনুবাদ ও নিরীক্ষাধর্মী সৃজনে তিনি নির্মাণ করেছেন অতীত ও বর্তমানের এক অনন্য সেতু।
সকাল নয়টা বাজবে বাজবে করছে। বাইরে আইসল্যান্ডের চিরচেনা অবাধ্য আবহাওয়া। ঘরের জানালায় আছড়ে পড়ছে উত্তর মেরু থেকে ছুটে আসা হিমশীতল বাতাসের একটানা শব্দোচ্ছ্বাস। থার্মোমিটারের কাঁটায় তাপমাত্রা যতটুকু দেখাচ্ছে, বাত্যাপ্রবাহের কারণে ঠান্ডাটা তার চেয়ে বেশি। ঘরের ভেতরের জগৎটা স্বাভাবিক, দিনানুদৈনিক, নিরুদ্বেগ। রান্নাঘরের গোল টেবিলে বসে অ্যান কারসন চা আর বিস্কুট খাচ্ছিলেন। অলস চোখে তাকিয়ে দেখলেন, মেঝেটা একটু অপরিচ্ছন্ন হয়ে আছে—কিছু ধুলাবালু, বিস্কুটের কিছু গুঁড়া ছিটকে পড়েছে। ভাবলেন, একটু ঝাঁট দিতে হবে।
ঠিক তখনই শব্দ করে বেজে উঠল ফোনটা। তিনি ফোনের দিকে তাকালেন, ধরলেন না। তিনবার বেজে ফোন থেমে গেল। বব কারি পাশেই ছিলেন। তাঁর তিন যুগের জীবনসঙ্গী। যে নম্বর থেকে ফোনকলটা এসেছিল, সেটি তাঁর চোখে পড়েছে। তিনি সেই নম্বরে কল ব্যাক করে যাঁকে পেলেন তিনি সুইডিশ একাডেমির স্থায়ী সচিব ইনগ্রিদ কার্লবার্গ। তারপর ফোনটি অ্যানের হাতে দিয়ে বললেন, ‘নাও, তোমাকেই খুঁজছে।’
ইনগ্রিদ কার্লবার্গ অ্যান কারসনকে জানালেন, ২০২৬ সালের সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার তাঁকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর দুই ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলনে তা প্রচার করা হবে। অ্যান কারসন অবাক হলেন। তাঁর মনে হলো পুরো ব্যাপারটাই অবাস্তব। তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘আমি এখন আইসল্যান্ডে আছি। বাতাসের অবিরাম শিস শুনছি।’
আইসল্যান্ডের রাজধানী শহর রেইক্যাভিকে নিজের বাড়ি আছে কানাডার প্রবীণ কবি, গবেষক ও অনুবাদক অ্যান কারসনের। সাগরের মধ্যে আগ্নেয়গিরিপ্রসূত আর সাগরে বহমান গ্ল্যাসিয়ারে পরিবৃত এই ছোট নিরুপদ্রব দেশটিতে থাকতে তাঁর ভালো লাগে। রেইক্যাভিকের ‘এগিসসিডা’ নামীয় উপকূলবর্তী এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে এই দম্পতি বছরের একটা দীর্ঘ সময় কাটিয়ে থাকেন। বসার ঘরের মেটে রঙের দেয়ালের জানালায় দাঁড়ালে আইসল্যান্ডের ধূসর পটভূমি ও আটলান্টিক মহাসাগর নজরে আসে। অ্যান কারসন ইতিমধ্যে আইসল্যান্ডের নাগরিকত্বও নিয়েছেন, যাকে বলে দ্বৈত নাগরিকত্ব।
তাঁর জন্ম জুন মাসের ২১ তারিখে। মিথুন আর কর্কট রাশির যৌথ প্রভাবে তিনি একদিকে অন্তর্মুখী, অন্যদিকে স্পষ্টভাষী। রসিকতাও করেন সুযোগ পেলে। একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ‘কীভাবে একটি কবিতা লেখা শুরু করেন?’ তাঁর সোজা উত্তর, ‘আমি না, কবিতাই আমাকে লেখা শুরু করে।’
কে এই অ্যান কারসন? তাঁর নিজের উত্তর: ‘আমি প্রাচীন গ্রিক পড়িয়ে পেট চালাই।’ বস্তুত অ্যান কারসন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাঁদরেল অধ্যাপক। চার দশক পড়িয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি, মিশিগান ইউনিভার্সিটি ও বার্ড কলেজের মতো বড় বড় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৩১। নতুন প্রবন্ধের বই বিঅ্যাওয়্যার দ্য ম্যান হুজ হ্যান্ডরাইটিং সয়েজ লাইক আ রিড ইন দ্য উইন্ড (যে মানুষটির হাতের লেখা বাতাসে হোগলাগাছের মতো দোলে তার বিষয়ে হুঁশিয়ার) আগামী বছর ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত হবে। কাছাকাছি সময়ে প্রকাশিত হবে তাঁর কবিতার বই হাইলাইটস অব কলোনিয়ালিজম (উপনিবেশবাদের সারকথা)। প্রথম কয়েকটি বাদ দিলে, তাঁর প্রায় সব বইয়ের পেছনে লেখক পরিচিতি হিসেবে স্রেফ একটি বাক্য থাকে—‘অ্যান কারসন কানাডায় জন্মেছেন এবং প্রাচীন গ্রিক ভাষা পড়িয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।’ মনে হবে, তাঁর লেখার টেবিল প্রাচীন গ্রিক পুরাণ আর আধুনিক মানুষের ভগ্নহৃদয়ের এক অদ্ভুত জাদুঘর।
ইনগ্রিদ কার্লবার্গ অ্যান কারসনকে জানালেন, ২০২৬ সালের সাহিত্যের নোবেল পুরস্কার তাঁকে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আর দুই ঘণ্টা পর সংবাদ সম্মেলনে তা প্রচার করা হবে। অ্যান কারসন অবাক হলেন। তাঁর মনে হলো পুরো ব্যাপারটাই অবাস্তব। তিনি শান্ত গলায় বললেন, ‘আমি এখন আইসল্যান্ডে আছি। বাতাসের অবিরাম শিস শুনছি।’
এ কথা অতিরঞ্জন কিছু নয়। প্রাচীন গ্রিক সাহিত্যের অনবদ্য ও নিরীক্ষাধর্মী অনুবাদের জন্য তিনি বিশ্বজুড়ে খ্যাত। প্রাচীন গ্রিসের চারজন মহান কবি ও নাট্যকারের সৃষ্টি এবং লাতিন সাহিত্যের এক কবির রচনা তিনি অনুবাদ করেছেন পরম অধ্যবসায়ে। প্রাচীন গ্রিসের বিখ্যাত গীতিকবি সাফোর টিকে থাকা সব কবিতা ও অন্যান্য কাব্যাংশের অনুবাদ নিয়ে তিনি ২০০০ সালে চমৎকার একটি বই প্রকাশ করেছিলেন। যার নাম ইফ নট, উইন্টার: ফ্র্যাগমেন্টস অব সাফো। অ্যান কারসন মাত্র ১৬ বছর বয়সে একটি বইয়ের দোকানে সাফোর কবিতার একটি গ্রিক-ইংরেজি দ্বিভাষিক সংস্করণ খুঁজে পেয়েছিলেন; গ্রিক হরফের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করেছিল; সাফোর খণ্ডিত কাব্যের ধ্বাংসাবশেষে অন্তর্লীন তীব্র কামনা তাঁকে অভিভূত করেছিল। তিনি ভালোভাবে গ্রিক ভাষা শিখে একসময় অনুবাদ করতে শুরু করেছিলেন।
মনে হয় গ্রিক ট্র্যাজেডির উরিপিদিসের নাটকগুলো অ্যান কারসনকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলোর নাম: গ্রিফ লেসনস (যার মধ্যে রয়েছে উরিপিদিসের হেরাক্লেস, হেকুবা, হিপোলিটাস ও অ্যালসেস্টিস), বাকখাই, ইফিজেনিয়া অ্যামাং দ্য টরিয়ানস এবং দ্য ট্রোজান উইমেন: আ কমিক।
সোফোক্লেসের বিখ্যাত দুটি নাটক ইলেকট্রো ও অ্যান্টিগোনে অনুবাদ করেছেন কারসন। অধিকন্তু অ্যান্টিগোনে নাটকটির একটি নিরীক্ষাধর্মী রূপান্তর অ্যান্টিগনিক প্রকাশ করেছেন। অনুবাদ করেছেন এসকাইলাসের আগামেনন, স্তেসিকোরুসের কাব্যাংশ এবং প্রাচীন রোমান কবি গাইয়ুস ভালেরিউস কাতুলুসের একটি শোকগাথা।
২.
অ্যান কারসনের অন্যতম বিখ্যাত বই অটোবায়োগ্রাফি অব রেড একটি কাব্যোপন্নাস। একটি গ্রিক দানবের গল্পকে তিনি আধুনিক যুগের এক কিশোরের সমকামমূলক প্রেম ও একাকিত্বের গল্পে পরিণত করেছেন। কারসন স্তেসিকোরুসের একটি হারানো কাব্যের টুকরো অংশ থেকে এ কাহিনি রচনার অনুপ্রেরণা পেয়েছিলেন বলে কথিত। গ্রিক পুরাণে গেরিয়ন ছিল লাল ডানাওয়ালা এক দানব, যাকে বীরপ্রবর হারকিউলিস হত্যা করে এবং তার গবাদিপশুগুলো চুরি করে। পুরাণে গেরিয়ন কেবলই এক ভিলেন। কিন্তু কারসন ভাবলেন: দানবটার নিজের গল্পটা কী ছিল? তারও তো একটা হৃদয় ছিল!
কারসনের উদ্দেশ্য ছিল সমাজের চোখে যারা ‘দানব’, ‘অদ্ভুতুড়ে’ বা ‘অচ্ছুত’ বলে পরিগণিত, তাদের হৃদয়াভ্যন্তরে বিরাজমান তীব্র মানবিক আবেগানুভূতি তুলে ধরা। কাহিনির শুরুতে কারসন পুরাণের ডানাওয়ালা লাল দানব গেরিয়নকে আধুনিক এক কিশোররূপে পাঠকের সামনে হাজির করেন:
গেরিয়ন ছিল এক ছোট্ট লাল দানব। সে তার মায়ের সঙ্গে থাকত এবং তার একটি বড় ভাই ছিল যে তাকে অন্ধকার ঘরে আটকে রাখত। কিন্তু গেরিয়নের নিজস্ব একটা জগৎ ছিল। সে যখন প্রথম স্কুলে যেতে শুরু করল, তখন বুঝতে পারল সে অন্য সবার চেয়ে আলাদা। তার পিঠে একজোড়া অদৃশ্য কিন্তু ভারী লাল ডানা রয়েছে, যা সে জ্যাকেটের নিচে লুকিয়ে রাখে। সে কথা কম বলত, কিন্তু তার ভেতরের চোখ দিয়ে সে পৃথিবীর সব রঙের তীব্রতা টের পেত। চারপাশের মানুষ যখন তাকে সাধারণ একটি ছেলে হিসেবে দেখছিল, গেরিয়ন তখন তার ডানা দুটির ওজনের ভারে কুব্জ হয়ে এক চিরন্তন একাকিত্বের পরিমাপ করছিল।
মনে হয় গ্রিক ট্র্যাজেডির উরিপিদিসের নাটকগুলো অ্যান কারসনকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রাণিত করেছে। তাঁর অনূদিত গ্রন্থগুলোর নাম: গ্রিফ লেসনস (যার মধ্যে রয়েছে উরিপিদিসের হেরাক্লেস, হেকুবা, হিপোলিটাস ও অ্যালসেস্টিস), বাকখাই, ইফিজেনিয়া অ্যামাং দ্য টরিয়ানস এবং দ্য ট্রোজান উইমেন: আ কমিক।
এই উদ্ধৃতি থেকে অ্যান কারসনের বর্ণনাশৈলী ও মনস্তত্বের অভিমুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গেরিয়নের ডানা দুটো আসলে তার ‘অন্য রকম’ হওয়া এবং উদ্ভিন্ন সমকামিতার অবদমিত রূপক। গেরিয়ন তাঁর ভিন্নতা, যৌনাভিমুখ এবং লাল ডানার কারণে প্রচণ্ড অপরাধবোধ ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত। কারসন লিখেছেন: ‘ইনসাইড দ্য কোট, গেরিয়ন’স উইংস স্ট্রেইন্ড অ্যাগেইনস্ট দ্য উল...হি ওয়াজ আ মনস্টার। হি মাস্ট হ্যাভ নোন ইট।’ কিশোর গেরিয়ন তার মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, সে জ্যাকেটের নিচে তার লাল ডানাজোড়া কীভাবে লুকিয়ে রাখবে?
গেরিয়ন ভাবে, এই বিশাল পৃথিবীতে সে একদম একা ও একাকী। এই একাকিত্ব থেকে পরিত্রাণের সন্ধানে সে ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে সে পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখতে চায়।
একদিন বাসস্টপে হারকিউলিসের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। গেরিয়ন ১৪, হারকিউলিস ১৬। গেরিয়ন হারকিউলিসের প্রেমে পড়ে নিজের শরীর ও সত্তার আসল রূপটি আবিষ্কার করে। তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দৈহিক মিলন বাদ থাকে না। কিন্তু বছর দেড়েকের মধ্যে হারকিউলিস অন্য একটি ছেলেকে বেছে নেয়। সে গেরিয়নকে পরিত্যাগ করে। হারকিউলিসের নির্মম প্রত্যাখ্যানে আহত হয় গেরিয়ন। অ্যান কারসনের ভাষায়:
হারকিউলিস যখন চলে গেল, গেরিয়নের মনে হলো তার লাল ডানা দুটো কেউ জ্যান্ত শরীর থেকে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার নিজের শরীরের এই ভিন্নতা, এই পুরুষালি আকাঙ্ক্ষা যা সমাজ ‘দানবী’ বলে দাগিয়ে দেয়—তা তাকে তীব্র ক্ষোভে কাঁপিয়ে তুলল। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, তার এই ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়, কোনো অসুখ নয়। কিন্তু চারপাশের পৃথিবীটা ছিল এক নিরেট দেয়াল। হারকিউলিসের প্রত্যাখ্যান শুধু একটা প্রেমের বিচ্ছেদ ছিল না, তা ছিল নিজের অস্তিত্বের ওপর এক তীক্ষ্ণ আঘাত। গেরিয়ন তার ক্যামেরার লেন্স দিয়ে সেই শূন্যতাকে ধরে রাখতে চাইল, যেখানে ক্ষোভ আর অপমান একাকার হয়ে তার বুকের ভেতর লাল ডানার মতো ছটফট করছিল।
কাহিনির শেষটা এ রকম: সাত-আট বছর পর হারকিলিসের সঙ্গে গেরিয়নের আবার দেখা হয় আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে। গেরিয়ন হারকিউলিসের সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হয়। জৈবিক ক্ষুধা ছিল, কিন্তু এটি ছিল মূলত নিজের প্রকৃত অস্তিত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার আকুলতা। সে এমন একজনকে খুঁজছিল যে তার ভেতরের লুকানো লাল ডানা দুটিকে ঘৃণার পরিবর্তে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করে নেবে।
এ উপন্যাসের শেষ দিকের পটভূমি পেরু। হারকিউলিসের নতুন প্রেমিক আনকাশ যখন গেরিয়নের ডানা দুটি প্রথম দেখে এবং পরম মমতায় গ্রহণ করে, তখনই গেরিয়ন বুঝতে পারে যে হারকিউলিসের পেছনে এত দিন ছোটা ছিল ভুল মানুষের পায়ে মাথা কোটা। শেষ পর্যন্ত পেরুর জুকু আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে গিয়ে গেরিয়ন তার সব অবদমন ও ক্ষত থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করে। উপন্যাসজুড়ে গেরিয়ন সমাজ, তার নিজের ভাই এবং হারকিউলিসের কাছ থেকে নিজের লাল ডানা এবং তার দানবীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। লজ্জায় ও ভয়ে কুঁকড়ে থাকত সে সব সময়। কিন্তু আগ্নেয়গিরির আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়, সে কোনো কুৎসিত দানব নয়; সে আসলে আগুনের মতো তীব্র, সুন্দর এবং অনন্য। আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে লাল ডানা মেলে ওড়ার মধ্য দিয়ে সে নিজেকে সমাজ এবং হারকিউলিসের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে।
৩.
নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের জীবনের ক্যানভাসটা অবশ্য এখন আর কেবলই শব্দের নয়, তা এখন পেশি আর স্নায়ুর লড়াইয়েরও। আশির কোঠায় দাঁড়িয়ে পারকিনসন্সের সঙ্গে তাঁকে প্রতিদিন বোঝাপড়া করে চলতে হয়। যে আঙুলগুলো একসময় গ্রিক পুরাণের অক্ষরগুলোর নিখুঁত অনুবাদ করত, আজ তারা অবাধ্য। কাগজের পিঠে কলম ধরলে সোজা টানগুলো বেঁকে যায়, অক্ষরগুলো ছিটকে পড়ে এদিক-ওদিক।
সদ্য পাওয়া নোবেল পুরস্কারের প্রাইজমানি ১২ মিলিয়ন ক্রোনা দিয়ে কী করবেন অ্যান কারসন? তিনি ভাবছেন, এর একাংশ তিনি ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ সংস্থাকে দেবেন। বাকিটা দিয়ে এক বন্ধুকে বাড়ি কিনতে সাহায্য করবেন—ওর তো নিজের কোনো বাড়ি নেই!
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: অর্থনীতিবিদ, কথাসাহিত্যিক ও গবেষকএই উদ্ধৃতি থেকে অ্যান কারসনের বর্ণনাশৈলী ও মনস্তত্বের অভিমুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গেরিয়নের ডানা দুটো আসলে তার ‘অন্য রকম’ হওয়া এবং উদ্ভিন্ন সমকামিতার অবদমিত রূপক। গেরিয়ন তাঁর ভিন্নতা, যৌনাভিমুখ এবং লাল ডানার কারণে প্রচণ্ড অপরাধবোধ ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত। কারসন লিখেছেন: ‘ইনসাইড দ্য কোট, গেরিয়ন’স উইংস স্ট্রেইন্ড অ্যাগেইনস্ট দ্য উল...হি ওয়াজ আ মনস্টার। হি মাস্ট হ্যাভ নোন ইট।’ কিশোর গেরিয়ন তার মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, সে জ্যাকেটের নিচে তার লাল ডানাজোড়া কীভাবে লুকিয়ে রাখবে?
এই উদ্ধৃতি থেকে অ্যান কারসনের বর্ণনাশৈলী ও মনস্তত্বের অভিমুখ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। গেরিয়নের ডানা দুটো আসলে তার ‘অন্য রকম’ হওয়া এবং উদ্ভিন্ন সমকামিতার অবদমিত রূপক। গেরিয়ন তাঁর ভিন্নতা, যৌনাভিমুখ এবং লাল ডানার কারণে প্রচণ্ড অপরাধবোধ ও বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত। কারসন লিখেছেন: ‘ইনসাইড দ্য কোট, গেরিয়ন’স উইংস স্ট্রেইন্ড অ্যাগেইনস্ট দ্য উল...হি ওয়াজ আ মনস্টার। হি মাস্ট হ্যাভ নোন ইট।’ কিশোর গেরিয়ন তার মাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, সে জ্যাকেটের নিচে তার লাল ডানাজোড়া কীভাবে লুকিয়ে রাখবে?
গেরিয়ন ভাবে, এই বিশাল পৃথিবীতে সে একদম একা ও একাকী। এই একাকিত্ব থেকে পরিত্রাণের সন্ধানে সে ফটোগ্রাফির দিকে ঝুঁকে পড়ে। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে সে পৃথিবীকে নিজের মতো করে দেখতে চায়।
একদিন বাসস্টপে হারকিউলিসের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়। গেরিয়ন ১৪, হারকিউলিস ১৬। গেরিয়ন হারকিউলিসের প্রেমে পড়ে নিজের শরীর ও সত্তার আসল রূপটি আবিষ্কার করে। তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। দৈহিক মিলন বাদ থাকে না। কিন্তু বছর দেড়েকের মধ্যে হারকিউলিস অন্য একটি ছেলেকে বেছে নেয়। সে গেরিয়নকে পরিত্যাগ করে। হারকিউলিসের নির্মম প্রত্যাখ্যানে আহত হয় গেরিয়ন। অ্যান কারসনের ভাষায়:
হারকিউলিস যখন চলে গেল, গেরিয়নের মনে হলো তার লাল ডানা দুটো কেউ জ্যান্ত শরীর থেকে টান দিয়ে ছিঁড়ে ফেলেছে। সে আয়নার সামনে দাঁড়াল। তার নিজের শরীরের এই ভিন্নতা, এই পুরুষালি আকাঙ্ক্ষা যা সমাজ ‘দানবী’ বলে দাগিয়ে দেয়—তা তাকে তীব্র ক্ষোভে কাঁপিয়ে তুলল। সে চিৎকার করে বলতে চাইল, তার এই ভালোবাসা কোনো অপরাধ নয়, কোনো অসুখ নয়। কিন্তু চারপাশের পৃথিবীটা ছিল এক নিরেট দেয়াল। হারকিউলিসের প্রত্যাখ্যান শুধু একটা প্রেমের বিচ্ছেদ ছিল না, তা ছিল নিজের অস্তিত্বের ওপর এক তীক্ষ্ণ আঘাত। গেরিয়ন তার ক্যামেরার লেন্স দিয়ে সেই শূন্যতাকে ধরে রাখতে চাইল, যেখানে ক্ষোভ আর অপমান একাকার হয়ে তার বুকের ভেতর লাল ডানার মতো ছটফট করছিল।
কাহিনির শেষটা এ রকম: সাত-আট বছর পর হারকিলিসের সঙ্গে গেরিয়নের আবার দেখা হয় আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেসে। গেরিয়ন হারকিউলিসের সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হয়। জৈবিক ক্ষুধা ছিল, কিন্তু এটি ছিল মূলত নিজের প্রকৃত অস্তিত্বের স্বীকৃতি পাওয়ার আকুলতা। সে এমন একজনকে খুঁজছিল যে তার ভেতরের লুকানো লাল ডানা দুটিকে ঘৃণার পরিবর্তে নিঃশর্তভাবে গ্রহণ করে নেবে।
এ উপন্যাসের শেষ দিকের পটভূমি পেরু। হারকিউলিসের নতুন প্রেমিক আনকাশ যখন গেরিয়নের ডানা দুটি প্রথম দেখে এবং পরম মমতায় গ্রহণ করে, তখনই গেরিয়ন বুঝতে পারে যে হারকিউলিসের পেছনে এত দিন ছোটা ছিল ভুল মানুষের পায়ে মাথা কোটা। শেষ পর্যন্ত পেরুর জুকু আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে ডানা মেলে উড়ে গিয়ে গেরিয়ন তার সব অবদমন ও ক্ষত থেকে চিরতরে মুক্তি লাভ করে। উপন্যাসজুড়ে গেরিয়ন সমাজ, তার নিজের ভাই এবং হারকিউলিসের কাছ থেকে নিজের লাল ডানা এবং তার দানবীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। লজ্জায় ও ভয়ে কুঁকড়ে থাকত সে সব সময়। কিন্তু আগ্নেয়গিরির আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে তার মনে হয়, সে কোনো কুৎসিত দানব নয়; সে আসলে আগুনের মতো তীব্র, সুন্দর এবং অনন্য। আগ্নেয়গিরির ওপর দিয়ে লাল ডানা মেলে ওড়ার মধ্য দিয়ে সে নিজেকে সমাজ এবং হারকিউলিসের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করে।
৩.
নোবেলজয়ী অ্যান কারসনের জীবনের ক্যানভাসটা অবশ্য এখন আর কেবলই শব্দের নয়, তা এখন পেশি আর স্নায়ুর লড়াইয়েরও। আশির কোঠায় দাঁড়িয়ে পারকিনসন্সের সঙ্গে তাঁকে প্রতিদিন বোঝাপড়া করে চলতে হয়। যে আঙুলগুলো একসময় গ্রিক পুরাণের অক্ষরগুলোর নিখুঁত অনুবাদ করত, আজ তারা অবাধ্য। কাগজের পিঠে কলম ধরলে সোজা টানগুলো বেঁকে যায়, অক্ষরগুলো ছিটকে পড়ে এদিক-ওদিক।
সদ্য পাওয়া নোবেল পুরস্কারের প্রাইজমানি ১২ মিলিয়ন ক্রোনা দিয়ে কী করবেন অ্যান কারসন? তিনি ভাবছেন, এর একাংশ তিনি ‘ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস’ সংস্থাকে দেবেন। বাকিটা দিয়ে এক বন্ধুকে বাড়ি কিনতে সাহায্য করবেন—ওর তো নিজের কোনো বাড়ি নেই!
ফয়জুল লতিফ চৌধুরী: অর্থনীতিবিদ, কথাসাহিত্যিক ও গবেষক