ইথিওপিয়ার দক্ষিণে ওমো ভ্যালিতে হামার জনগোষ্ঠীর বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
ইথিওপিয়ার দক্ষিণে ওমো ভ্যালিতে হামার জনগোষ্ঠীর বিয়ের অনুষ্ঠানের ছবি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

বিশ্ব পর্যটন দিবস আজ

ওমো ভ্যালিতে বিয়ের অদ্ভুত উৎসব

ইথিওপিয়ার দক্ষিণে ওমো ভ্যালি—দুর্গম এক জনপদ, যেখানে আজও নিজস্ব সংস্কৃতি ও জীবনযাপনের ধারায় টিকে আছে হামার জনগোষ্ঠী। সেই জনপদে বিয়ের উৎসব দেখতে গিয়ে লেখক প্রত্যক্ষ করেছেন তাদের নানা আচার, সাজসজ্জা, নাচ ও বুল জাম্পিংয়ের আয়োজন। বিশ্ব পর্যটন দিবসে তুলে ধরা হলো ভিন্ন এক ভূগোলের মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির কাছাকাছি যাওয়ার এই ভ্রমণ-অভিজ্ঞতা।

হামার দক্ষিণ ইথিওপিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। ইথিওপিয়ায় ৮০টি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হামার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি—প্রায় ৪০ হাজার। দক্ষিণ ইথিওপিয়ার ওমো ভ্যালি একটি প্রত্যন্ত অঞ্চল। এখানে নাগরিক কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ নেই। নেই কোনো স্কুল, কলেজ বা হাসপাতাল। এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা স্বনির্ভর জীবনযাপন করে। অর্থাৎ, নিজেদের খাবার নিজেরাই উৎপাদন করে এবং পশুপালন করে। প্রত্যন্ত ও দুর্গম এ এলাকায় সরকার আসে না, তাদের দেখাশোনাও করে না। ইথিওপিয়ার অন্য এলাকার মানুষও এদিকে আসে না। এটি হামারদের নিজস্ব অঞ্চল। এখানে তাদের নিজস্ব নিয়মকানুন আছে। হামার জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি আছে। এরা প্রকৃতিপূজারি। প্রকৃতিকে তারা এক অতুলনীয় শক্তি হিসেবে মনে করে। এরা যে ঈশ্বরের পূজা করে, তাঁর নাম ওয়াক্ক। তাদের মতে, ওয়াক্ক এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা, রক্ষাকর্তা ও দানকর্তা। এ ছাড়া বারজো নামের ঈশ্বরকে তারা মানে, যিনি ভাগ্যবিধাতা এবং যার নামে মন্ত্র পড়লে বৃষ্টি নামে ও গৃহপালিত পশুর স্বাস্থ্য ভালো থাকে। কারণ, তাদের মূল জীবিকা গবাদিপশু পালনের ওপর নির্ভরশীল।

এই জাতিগোষ্ঠী এখনো কয়েক হাজার বছর আগের জীবনযাপন করছে। আমি যাব হামারদের বিয়ের অনুষ্ঠান দেখতে। তাদের বিয়ের অনুষ্ঠান বেশ কয়েক দিন ধরে চলে। ইথিওপিয়া ভ্রমণের প্রথম শর্ত হলো গাইড ছাড়া একা ঘোরা যাবে না। আর জাতিগোষ্ঠী গ্রাম দেখতে হলে নিজের গাইডের সঙ্গে সেই জাতিগোষ্ঠীর একজন গাইডকেও সঙ্গে রাখতে হবে। ট্যুর অপারেটর কোম্পানি থেকে আমাকে ড্রাইভারসহ জিপ ও গাইড দেওয়া হয়েছে পুরো ওমো ভ্যালি সড়কপথে ঘুরে বেড়ানোর জন্য।

হামার জনগোষ্ঠীর বিয়ের অনুষ্ঠানে আগত অতিথি নারী
বিবাহিত নারীদের চেনা যায় সহজেই, কারণ তাদের চুল কাঁধ অবধি ছেঁটে ড্রেডলক বা ছোট ছোট বিনুনি করা আর সামনে ভুরু অবধি ব্যাং করে কাটা। মাথায় লাল মাটি, লোহার জংয়ের রং আর মাখন মাখানো। তাদের মাথা রোদের ঝলকে চকচক করছে। গলায় মাটির তৈরি মোটা হার। মাটির হার মানে মেয়েটি বিবাহিত।

গাইডের নাম মেলাক। ওমো ভ্যালিতে মফস্‌সল শহর পার হলে আর পিচঢালা সড়কপথ থাকে না। সেখানে মাটি আর নুড়িপাথরের পথ পাওয়া যায়। জাতিগোষ্ঠীর গ্রামগুলোয় যাওয়ার জন্য তুরমি নামের একটি ছোট শহরে আসতে হয়। ছোট শহর না বলে তুরমিকে দুর্গম মফস্‌সল শহর বলা যায়। আর হামারদের গ্রামগুলো তুরমি থেকে সবচেয়ে কাছে। তুরমিতে সাধারণ ইথিওপিয়ান মানুষজন বাস করে, যাদের বেশভূষা সাধারণ ইথিওপিয়ানদের মতো। তুরমিতে স্কুল, হাসপাতাল আছে। হামার জনগোষ্ঠীর গ্রাম এখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। শহর থেকে তুলনামূলকভাবে কাছে বলে হামাররা পোশাকের ব্যবহার শিখেছে। আগে নারী-পুরুষ কেউই ঊর্ধ্বাঙ্গে বস্ত্র পরিধান করতেন না। এখন নারীরা টি-শার্ট পরেন। আগে শুধু ছাগলের চামড়া দিয়ে শরীরের নিচের অংশ ঢেকে রাখতেন। এখন তাঁরা স্কার্ট পরেন। এ ছাড়া অবশ্য জীবনযাপনের মান উন্নত হয়নি। আমার জিপ হামারদের গ্রামের দিকে চলছে। সামনে এতক্ষণ ঝোপজঙ্গল ছিল। ঝোপজঙ্গল শেষ হয়ে ধু ধু প্রান্তর দেখা যাচ্ছে। বালু আর নুড়িপাথরের এ প্রান্তরে গাছপালা তেমন নেই। বালুর রং না বাদামি, না ধূসর। জিপ চলতে চলতে দেখি, দূরে একদল হামার নারী গ্রামের দিকে যাচ্ছেন। সবার পরনে হাঁটুসমান স্কার্ট আর টি-শার্ট। টি-শার্ট অবশ্য বুক পর্যন্ত তুলে গেরো দিয়ে বাঁধা। দেখতে আমাদের দেশের ব্লাউজের মতো লাগছে। বিবাহিত নারীদের চেনা যায় সহজেই, কারণ তাদের চুল কাঁধ অবধি ছেঁটে ড্রেডলক বা ছোট ছোট বিনুনি করা আর সামনে ভুরু অবধি ব্যাং করে কাটা। মাথায় লাল মাটি, লোহার জংয়ের রং আর মাখন মাখানো। তাদের মাথা রোদের ঝলকে চকচক করছে। গলায় মাটির তৈরি মোটা হার। মাটির হার মানে মেয়েটি বিবাহিত। যাঁর গলার হারে একটি ঝুল, তিনি তাঁর স্বামীর একমাত্র স্ত্রী। যাঁর হারে কয়েক ভাগে ঝুল বা লকেটের মতো দেওয়া, তাঁর স্বামীর স্ত্রী ততজন।

হামারদের বিবাহে অতিথি পুরুষদের সাজসজ্জা
সামনে কয়েকজন পুরুষ গাছের নিচে মাটিতে বসে রূপচর্চা করছেন বা সাজগোজ করছেন। একদল সুদর্শন যুবক এমনিই বসে আছেন। সুগঠিত, মেদহীন দেহ; পরনে কোমর থেকে হাঁটু অবধি একখণ্ড কাপড়, যা কোমরে পেঁচানো আছে। কাপড়টি দেখে মনে হলো এ জাতিগোষ্ঠীর তাঁতে বোনা কাপড়।

পুরুষের বহুবিবাহ এ গোষ্ঠীর সাধারণ প্রথা। অবিবাহিত মেয়েদের গলায় পুঁতির চওড়া মালা থাকে। তাদের চুল সাধারণ ড্রেডলক করা ও কালো। মানে, তাঁরা বিয়ের আগে মাথায় মাটি ও জংয়ের রং মাখেন না, আর তাতে মাখনও মাখানো থাকে না। সবাই গলায় ছাড়াও হাতে ও পায়ে পুঁতি বা তামার চওড়া গয়না পরে। বিশেষত হাতে ও বাহুতে মেয়েরা তামার তৈরি মোটা ব্রেসলেট ও বাজুবন্ধ পরেন। কেউ কেউ এক হাতে, কেউ কেউ দুই হাতেই পরেন।

একটা জায়গায় গাড়ি থামিয়ে মেলাক আমাকে নিয়ে চলল বিয়ের অনুষ্ঠানের একটি অংশে। বাইরে থেকে যাকে ঝোপজঙ্গল বলে মনে হচ্ছে, কিন্তু জঙ্গল ভেদ করে ভেতরে দল বেঁধে হামার নারী-পুরুষ গাছের নিচে বসে আছে বা একে অন্যের সঙ্গে হাসিঠাট্টা করছে। এই ভিড়ের মধ্যে ঢোকার আগে মেলাক আমাকে আমার স্থানীয় গাইডের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিল। ছেলেটির নাম ইনাক। স্থানীয় ছেলে, হামার জনগোষ্ঠীর ভাষা জানে। ও তুরমিতে গিয়ে খানিকটা পড়াশোনা করেছে।

মেলাক আমাকে ইনাকের সঙ্গে ছেড়ে দিল। ইনাক সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছে আমাকে তাদের সংস্কৃতি জানানোর। সামনে কয়েকজন পুরুষ গাছের নিচে মাটিতে বসে রূপচর্চা করছেন বা সাজগোজ করছেন। একদল সুদর্শন যুবক এমনিই বসে আছেন। সুগঠিত, মেদহীন দেহ; পরনে কোমর থেকে হাঁটু অবধি একখণ্ড কাপড়, যা কোমরে পেঁচানো আছে। কাপড়টি দেখে মনে হলো এ জাতিগোষ্ঠীর তাঁতে বোনা কাপড়। সবার গলায় পুঁতির মালা, হাতে পুঁতির চওড়া ব্রেসলেট আর পায়ে পুঁতির অ্যাংকলেট। কয়েকজন মাথায় পুঁতির তৈরি গোল ব্যান্ডের মতো পরেছেন, কারও ব্যান্ডে পাখির পালক গোঁজা।

এই হামার ছেলেটির বিয়ে হতে চলেছে
একটু খেয়াল করে দেখি, তাদের হাঁটুতে বেশ বড় আকারের, গলার লকেটের সমান অর্ধচন্দ্রাকার এবং ভেতরে ফাঁপা বেশ অনেকগুলো ঘুঙুর ঝুলছে। একেকটা ঘুঙুর মোটা সুতা বা ফিতা দিয়ে মূল দড়ির সঙ্গে বাঁধা। ঘুঙুরগুলো ইস্পাত দিয়ে তৈরি। আকারে বড়, তাই শব্দও জোরে জোরে হচ্ছে।

অসাধারণ তাদের ফ্যাশন সেন্স। তাদের সবার মাথা কামানো বা কদমছাঁট। চুল বড় হলে তারা মাথা কামিয়ে ফেলেন। তাদের পায়ে টায়ার দিয়ে তৈরি স্যান্ডেল। আরেক পাশে সারি সারি নারীরা বসে আছেন। পুরুষদের মতো তারা অবশ্য হাসিঠাট্টা করছেন না। আমি ওঁদের পাশে গিয়ে বসতে পারি কি না, তা ইনাককে জিজ্ঞেস করলাম। ইনাক সম্মতি দিল। এর মধ্যে খেয়াল করলাম, মেলাক উধাও। ইনাক ভালো ছেলে, তবে আমাকে এ রকম একা ফেলে মেলাক কেন যাবে? ওর তো আমার সঙ্গে থাকার কথা। খুবই ফাঁকিবাজ গাইড দেখছি। আমি গিয়ে হামার নারীদের পাশে বসলাম। একহারা গড়ন সবার, আর বেশ লম্বা। তারা মাটিতে বসে আছেন। আমিও পায়ের পাতার ওপর ভর করে বসলাম। পাশের কয়েকজনের কিছু ছবি তুললাম, কিন্তু তাদের অভিব্যক্তির তেমন পরিবর্তন হলো না। যাঁরা বসে আছেন, তাঁরা সবাই বিবাহিত। বসার সময় তারা স্কার্টটা গোছা করে তুলে বসেছেন। মাথায় কড়ি দিয়ে বানানো ব্যান্ড পরা, কারও কারও ব্যান্ডে পাখির পালক গোঁজা। তাদের সুগঠিত শরীর বা উন্মুক্ত পায়ের দিকে কেউ তাকাচ্ছে না। হঠাৎ একদল নারী ঝমঝম শব্দ তুলে সামনের খালি জায়গায় চক্রাকারে কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে লাইন বেঁধে একজনের পেছনে আরেকজন নাচতে ও ঘুরতে লাগল। কিন্তু ঘুঙুরের মতো ঝমঝম শব্দ আসছে কোথা থেকে? একটু খেয়াল করে দেখি, তাদের হাঁটুতে বেশ বড় আকারের, গলার লকেটের সমান অর্ধচন্দ্রাকার এবং ভেতরে ফাঁপা বেশ অনেকগুলো ঘুঙুর ঝুলছে। একেকটা ঘুঙুর মোটা সুতা বা ফিতা দিয়ে মূল দড়ির সঙ্গে বাঁধা। ঘুঙুরগুলো ইস্পাত দিয়ে তৈরি। আকারে বড়, তাই শব্দও জোরে জোরে হচ্ছে।

বরের মা
নারীদের সাজসজ্জা তুলনামূলকভাবে কম। পুরুষেরা সেজে যাচ্ছেন। পুরুষদের গলার মালায়ও ভিন্নতা আছে। ছোট ছোট নানা রঙের পুঁতি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে তাঁদের মালা। সামনের দিকে লকেটের মতো পুঁতি ঝুলে আছে। হাতে পুঁতির চওড়া ব্রেসলেট, পায়ে চওড়া নূপুর বা অ্যাংকলেট।

তারা কয়েকবার ঘুরে এসে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কয়েকটা লাফ দিল আর তাদের একজনের হাতে থাকা ভুভুজেলার মতো দেখতে শিঙা বা বাঁশি বাজাল। বাঁশিগুলো পিতলের তৈরি, আওয়াজও একদম ভুভুজেলার মতো। হঠাৎ বাঁশির বিকট আওয়াজে আমার হাত থেকে মোবাইল ফোন পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। পরেরবার আর চমকে উঠিনি।

নৃত্যদলে বিবাহিত–অবিবাহিত মেয়েরা আছেন। তবে এখানে দর্শক শুধু বিবাহিত নারীরা। নারীদের দল ঘুরে ঘুরে নাচছেন, লাফাচ্ছেন আর বাঁশি বাজাচ্ছেন, আর একদল নারী তা উপভোগ করছেন—এমন দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না। দর্শক নারীদের মুখে কথা নেই। যেন তারা গম্ভীর বা কথা ফুরিয়ে গেছে। বেশির ভাগের বয়স চল্লিশের ওপরে। তাঁদের মুখে হাসিও নেই। এত উৎসবমুখর পরিবেশে তাঁদের মুখে হাসি কেন নেই, তা বুঝলাম না। স্থানীয় গাইড ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু সে আমার প্রশ্ন না বুঝে কী যে আবোলতাবোল বলল, তা সে নিজেই জানে। ফাঁকিবাজ মেলাককে কোথাও দেখছি না। তাই কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারছি না। আরেক পাশে যুবকেরা সাজসজ্জায় ব্যস্ত। একজন আরেকজনকে সাজিয়ে দিচ্ছে। মাটিতে বসে লাল মাটি আর চুনের গোলা ব্যবহার করে আঙুলে একটু একটু রং নিয়ে প্রথমে গালে, পরে কপালে ও চোখের চারপাশে চক্র আঁকছে। সবশেষে কাঠি দিয়ে মোটা দাগের ওপরের দিকে ফোঁটা ফোঁটা দিচ্ছে। আমার দেখতে ভালো লাগছে।

নারীদের সাজসজ্জা তুলনামূলকভাবে কম। পুরুষেরা সেজে যাচ্ছেন। পুরুষদের গলার মালায়ও ভিন্নতা আছে। ছোট ছোট নানা রঙের পুঁতি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে তাঁদের মালা। সামনের দিকে লকেটের মতো পুঁতি ঝুলে আছে। হাতে পুঁতির চওড়া ব্রেসলেট, পায়ে চওড়া নূপুর বা অ্যাংকলেট।

বিবাহে অতিথি পুরুষ
বিয়ের আগে কনেকে সামনে আনা হয় না। কনেকে একটি ঘরে আবদ্ধ থাকতে হয় প্রায় ১৫ দিন। দিনের আলোয় সে বের হতে পারে না। খাবার, পানি ইত্যাদি তার কুটিরে পৌঁছে দেওয়া হয়। অন্ধকার হয়ে গেলে শৌচালয়ের কাজ করে। এ সময় কনের সারা শরীর লাল মাটির প্রলেপে আবৃত রাখা হয়।

কারও কারও মাথার ব্যান্ডে পাখির পালক গোঁজা। তাঁদের কাছে আয়না নেই, থাকলে দেখতে পেত কত ভালো লাগছে তাঁদের দেখতে। এই জনপদে কারও বিলাসী, দামি বা অতিরিক্ত জিনিসপত্র নেই। একজোড়া কাপড়, দৈনন্দিন আহার্য, কিছু গবাদিপশু আর পাতার কুটির—তাঁদের সম্বল। দিনে একবেলা সোরগাম নামের শস্যের পরিজ খায়। অসুখ-বিসুখে গাছগাছালি আর জড়িবুটি ভরসা। তথাকথিত সভ্য জগতের কেউ এখানে আসে না। আদিম, সরল, সহজ জীবন তাঁদের। আমাদের জগৎ থেকে তাঁরা অনেক দূরে অবস্থান করেন। তবে তাঁদের নিয়মানুবর্তিতা, ন্যায়নীতির কাছে আধুনিক সভ্যতা হার মানে। প্রতি গ্রামে গ্রামপ্রধান আছেন। আর সবাই গ্রামপ্রধানের সিদ্ধান্ত মেনে নেয়। যার জন্য এত আয়োজন বা সাজগোজ, সেই অনুষ্ঠানকে বলা হয় বুল জাম্পিং সেরেমনি বা স্থানীয় ভাষায় উকুলি বুলা। বরকে পাঁচ বা তার চেয়ে বেশি ষাঁড়ের পিঠের ওপর লাফিয়ে যেতে হবে। একবারে না পারলে সে অকৃতকার্য হবে। বিয়ের যোগ্য হলে বরপক্ষ প্রস্তাব নিয়ে কনেপক্ষের কাছে যায়। বিয়েতে সামর্থ্য অনুযায়ী কনের পিতাকে যৌতুক দেওয়ার নিয়ম আছে।

শুরু হয় কুড়িটি ছাগল আর দশটি ষাঁড় দিয়ে। এর বেশিও দেওয়া হয় সামর্থ্য অনুযায়ী। বিয়ের আগে কনেকে সামনে আনা হয় না। কনেকে একটি ঘরে আবদ্ধ থাকতে হয় প্রায় ১৫ দিন। দিনের আলোয় সে বের হতে পারে না। খাবার, পানি ইত্যাদি তার কুটিরে পৌঁছে দেওয়া হয়। অন্ধকার হয়ে গেলে শৌচালয়ের কাজ করে। এ সময় কনের সারা শরীর লাল মাটির প্রলেপে আবৃত রাখা হয়।

বিয়েতে আসা অতিথি নারী
এতক্ষণে মেলাকের দেখা পেলাম। সে বলল, ‘চল, আমরা মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে যে মাঠে, সেদিকে যাই।’ আমি, মেলাক, ইনাক চললাম সেদিকে। যে পথ ধরে হেঁটে যেতে হবে, সেদিকটা জুড়ে আছে শুকনো বালু আর নুড়িপাথর। আমাদের সঙ্গে গ্রামবাসীও চলছে।

হামার বিয়ের আরেকটি প্রথা বা আচার হলো অনুষ্ঠানে আগত মেয়েরা পিঠ পেতে ভাইদের কাছ থেকে বেত্রাঘাত গ্রহণ করে। আর সেটা মেয়েরা করে আনন্দের সঙ্গে। যেকোনো মেয়ে ভুভুজেলা হাতে ধরে উৎসবের মাঝে তার ভাইকে খোঁজে। ভাইকে খুঁজে পেলে কাকুতি-মিনতি করে, যেন তাকে লম্বা সরু লাঠি দিয়ে পিঠে আঘাত করা হয়। এ যেনতেন আঘাত নয়। আঘাতে যেন পিঠ কেটে গিয়ে রক্ত ঝরে। তাতেই এই অনুষ্ঠানের প্রতি সম্মান ও সমর্থন দেখানো যাবে। আমার সামনে একটি মেয়ে হাতে ভুভুজেলা নিয়ে ভাইকে অনুরোধ করতে থাকল প্রহার করার জন্য, কিন্তু ভাই রাজি হচ্ছিল না। শেষমেশ রাজি হলো। মাটিতে পড়ে থাকা সরু কঞ্চির মতো লম্বা একটা লাঠি তুলে নিয়ে হালকা আঘাত করার আগেই বোন খুশিতে লাফাতে লাফাতে ভুভুজেলা বাজাতে শুরু করল। ভাইয়ের আঘাত ততটা গভীর ছিল না। মেয়েটির দেখাদেখি অন্য মেয়েরাও জুটে গেল প্রহৃত হওয়ার জন্য, কিন্তু ভাইটি পালিয়ে গেল। আরেকটু সামনে একই দৃশ্য দেখা গেল। এবার অন্য একটি মেয়ে। ভাইটি মেরে দাগ তুলে রক্ত বের না করা অবধি বোনটি অটল ছিল।

অবশেষে রক্তাক্ত পিঠ নিয়ে মেয়েটি মনের আনন্দে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ রকম পিঠে ক্ষত আর রক্ত নিয়ে বেশ কয়েকজন মেয়েকে দেখলাম ঘুরে বেড়াতে। আমি তাদের খোলা পিঠের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। এতক্ষণে মেলাকের দেখা পেলাম। সে বলল, ‘চল, আমরা মূল অনুষ্ঠান হচ্ছে যে মাঠে, সেদিকে যাই।’ আমি, মেলাক, ইনাক চললাম সেদিকে। যে পথ ধরে হেঁটে যেতে হবে, সেদিকটা জুড়ে আছে শুকনো বালু আর নুড়িপাথর। আমাদের সঙ্গে গ্রামবাসীও চলছে।

বেশ উঁচু উঁচু অ্যাডেনিয়ামগাছে গোলাপি ফুল ফুটেছে
এ অঞ্চলের মাটির রং লাল আর এদিকটায় মাটিতে বালু আর নুড়িপাথর বেশি। বুল জাম্পিং অনুষ্ঠান যে মাঠে হবে, সেখানে আগে থেকেই বেশ কিছু ষাঁড় জড়ো করে রাখা হয়েছে। গ্রামের মানুষও অনেক জড়ো হয়েছে। তবে তারা কেউ বিশৃঙ্খলভাবে এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। সবাই সারিবদ্ধভাবে মাঠ ঘিরে গোল করে দাঁড়িয়ে বা বসে আছে।

আশপাশে কয়েকটা গ্রামজুড়ে হামার জনগোষ্ঠী বসবাস করে। তুরমি কাছে বলে নিজেদের পশু, শস্য, মদিরা, মধুর বদলে জামাকাপড়, স্যান্ডেল কিনে নেয়। তাদের পোশাকে তাই বৈচিত্র্য আছে। নারী-পুরুষ সবাই ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আসা সেকেন্ড হ্যান্ড বা অপ্রয়োজনীয় বা ফ্যাশন চলে যাওয়া টি-শার্ট পরে আছে। পুরুষেরা কেউ কেউ শর্টস আর কেউ কেউ একখণ্ড কাপড় দিয়ে কোমর থেকে হাঁটু অবধি পেঁচিয়ে রেখেছে। অনেক পুরুষ গরু-ছাগল চরিয়ে এখন ঘরে ফিরছে। তাদের হাতে বসার জন্য ছোট টুল। এই টুলকে তারা বালিশও বলে। কারণ, এটির উচ্চতা ৬–৭ ইঞ্চি, চওড়ায় সরু আর দেখতে অনেকটা ডুগডুগির মতো। গরু চরাতে চরাতে ক্লান্ত হয়ে গেলে এটির ওপর বসে বা কখনো মাথার নিচে দিয়ে মাটিতে শুয়ে ঘুমিয়েও পড়ে।

কয়েকজন নারী পায়ের ঘুঙুর আর হাতের ভুভুজেলা বাজিয়ে মূল অনুষ্ঠানের দিকে চলেছে। এ রকম চলতে চলতে দেখি বেশ উঁচু উঁচু অ্যাডেনিয়ামগাছে গোলাপি ফুল ফুটেছে। একেকটা গাছ আমাদের দেশের মাঝারি আকারের বকুলগাছের সমান। আর এত ফুল ফুটেছে যে বড় গাছগুলো পুরোটাই গোলাপি হয়ে আছে। আমি বাংলাদেশ বা ভারতে টবে লাগানো বনসাই আকারের অ্যাডেনিয়ামগাছ দেখেছি। অ্যাডেনিয়াম যে এত বড় গাছ, তা এখানে না এলে জানতে পারতাম না। আশপাশে তেমন গাছপালা নেই, অনেক দূরে দূরে কয়েকটা একাশিয়াগাছ আর ঝোপঝাড় ছাড়া। এ অঞ্চলের মাটির রং লাল আর এদিকটায় মাটিতে বালু আর নুড়িপাথর বেশি। বুল জাম্পিং অনুষ্ঠান যে মাঠে হবে, সেখানে আগে থেকেই বেশ কিছু ষাঁড় জড়ো করে রাখা হয়েছে। গ্রামের মানুষও অনেক জড়ো হয়েছে। তবে তারা কেউ বিশৃঙ্খলভাবে এখানে-সেখানে দাঁড়িয়ে নেই। সবাই সারিবদ্ধভাবে মাঠ ঘিরে গোল করে দাঁড়িয়ে বা বসে আছে।

বিয়েতে আসা অতিথি
এই ভিড়ের মধ্যে আমার চোখ পড়ল দূরে অ্যাডেনিয়াম বনে। সেখানে পুরো জঙ্গল গোলাপি হয়ে গেছে। আমি মেলাক বা ইনাকের তোয়াক্কা না করে ছুটে গেলাম সেই গোলাপি বনে। সেখানে মাথার ওপর থোকায় থোকায় অ্যাডেনিয়াম ফুল বন আলো করে ফুটে আছে। এত অ্যাডেনিয়াম ফুল একসঙ্গে আমি কোথাও দেখিনি।

নারীরা এখন দলে দলে মূল অনুষ্ঠানে আসতে শুরু করেছে। তাদের কেউ কেউ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরেছেন। ছাগলের চামড়ার স্কার্ট, যাতে কড়ি ও পুঁতির বর্ডার দেওয়া। পুঁতির বর্ডার বেশ চওড়া করে দেওয়া। এই স্কার্টে আমাদের সমাজের হিসেবে শরীরের অংশ তেমন ঢাকা যাচ্ছে না, যদিও। তবে এটাই তাদের নিজস্ব পোশাক। একটা আস্ত ছাগলের চামড়া কতই–বা বড় হয়।

মায়েরা শিশুকে পিঠে বেঁধে অনুষ্ঠানে চলে এসেছে। হামার জনগোষ্ঠীর পুরুষেরা গবাদিপশু চড়ানো ছাড়া আর কোনো কাজ করে না। রান্না, বাচ্চা লালন–পালন, দূরের নদী থেকে পানি আনার কাজ নারীদের। ইনাক আমাকে বলল, ‘দেখো, সামনে ছেলের মা দাঁড়িয়ে আছে।’ যে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, সে নেহাতই ৩০ বছর বয়সী একজন নারী। লাল রঙের টি-শার্ট আর ছাগলের চামড়ার স্কার্ট পরে আছে। গলায় মাটির তৈরি মোটা হার আর সঙ্গে পুঁতির চওড়া মালা। হাতে পুঁতির তৈরি চওড়া ব্রেসলেট। সঙ্গে পিতলের তৈরি ব্রেসলেটও আছে। বরের মা ও বাবার দিকের পরিবারের সবাই এসেছে। বরের মায়ের দিকের পরিবার মাঠের এক পাশে অবস্থান করছে আর বাবার দিকের পরিবার মাঠের আরেক পাশে অবস্থান করছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘কনের পরিবার কোথায়?’ কনের পরিবারও এক পাশে আছে। এর মধ্যে নারীরা ভুভুজেলা বাজানো শুরু করেছে আর ধীরে ধীরে ভিড় বাড়ছে।

এই ভিড়ের মধ্যে আমার চোখ পড়ল দূরে অ্যাডেনিয়াম বনে। সেখানে পুরো জঙ্গল গোলাপি হয়ে গেছে। আমি মেলাক বা ইনাকের তোয়াক্কা না করে ছুটে গেলাম সেই গোলাপি বনে। সেখানে মাথার ওপর থোকায় থোকায় অ্যাডেনিয়াম ফুল বন আলো করে ফুটে আছে। এত অ্যাডেনিয়াম ফুল একসঙ্গে আমি কোথাও দেখিনি।

বুল জাম্পিংয়ের জন্য জড়ো করা ষাঁড়
আমি যখন এসব ভাবছি, তখন ইনাক এসে আমার হাত ধরে টেনে অন্য পাশে নিয়ে গেল। ষাঁড়গুলো আসলেই আমার দিকে তেড়ে আসছিল। কিন্তু আমি তো লাল রং পরে নেই। তবু আসছিল। ইনাক এসে না সরালে এতক্ষণে ষাঁড়ের গুঁতায় অক্কা পেতে হতো।

এ অঞ্চল মরুভূমির মতো বালুময়। এখানে অ্যাডেনিয়াম তাই বরাবরের চেয়ে বেশি আহ্লাদ পেয়েছে। এখানে অ্যাডেনিয়ামের স্বর্গরাজ্য। আমি মোহিত হয়ে অ্যাডেনিয়াম ফুল দেখছি, অথচ গ্রামবাসীর এদিকে তেমন মন নেই। তারা উৎসবে ব্যস্ত। মেলাক আর ইনাক আমাকে খুঁজে পেল এখানে। কারণ, আমি ছাড়া এই উৎসবে আর কোনো বিদেশি ট্যুরিস্ট নেই। মেলাক বলল, ‘মূল বুল জাম্পিং এখন শুরু হবে। চলো সেখানে।’ ইনাক বকবক করে আমার মাথা ধরিয়ে দিচ্ছে। বেচারা অনেক তথ্য দিতে চাইছে, কিন্তু ওর ইংরেজি আমি খুব কমই বুঝতে পারছি। তাই বললাম, ‘ভাই ইনাক, তুমি কি একটু থামবে? আমার কিছু জানার থাকলে জিজ্ঞেস করব।’

এদিকে একপাল ষাঁড় আমার দিকে তেড়ে আসছে। আমি ঠিক বুঝতে পারছি না তাদের উদ্দেশ্য কী—এরা কি আমাকে বড় বড় শিং দিয়ে গুঁতা দেবে? ষাঁড়ের গুঁতা খাওয়ার অভিজ্ঞতা না থাকলেও ছোটবেলায় গরুর গুঁতা খাওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। বিশেষ সুখকর অভিজ্ঞতা ছিল না সেটি। আমি যখন এসব ভাবছি, তখন ইনাক এসে আমার হাত ধরে টেনে অন্য পাশে নিয়ে গেল। ষাঁড়গুলো আসলেই আমার দিকে তেড়ে আসছিল। কিন্তু আমি তো লাল রং পরে নেই। তবু আসছিল। ইনাক এসে না সরালে এতক্ষণে ষাঁড়ের গুঁতায় অক্কা পেতে হতো। ষাঁড়ের দলকে মাঝখানে রেখে একদল নারী এখানেও ভুভুজেলা বাজিয়ে গোল চক্র তৈরি করে ঘুরে ঘুরে নাচছে আর লাফ দিচ্ছে। এখানে এই বড় মাঠে এই নৃত্য দেখতে ভালো লাগছে।

হামার নৃগোষ্ঠীর বিয়ের অনুষ্ঠানে গোল হয়ে ঘুরে ঘুরে নারীদের নৃত্য
অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে নারীরা ভুভুজেলা বাজানো শুরু করলেন। আমি ইনাকের সঙ্গে ষাঁড়গুলোর মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে পিঠের দিকে দাঁড়ালাম। কারণ বর এদিক দিয়েই ষাঁড়ের পিঠের ওপর উঠবে। এরপর ভুভুজেলার আওয়াজ তীব্র হলো। আর নারীরা সবাই পায়ের ঘুঙুর বাজিয়ে লাফাতে লাগলেন।

এখান থেকে আমাকে ইনাক আরেকটা জটলার দিকে নিয়ে গেল। সেখানে বর আছে আর বিয়ের কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হচ্ছে। জটলা ভেদ করে দেখি, বর মাটিতে বসে আছে। তার পরনে ছাগলের চামড়া। কিন্তু বরবেশে আমি যাকে দেখছি, সে নেহাতই শিশু। ইনাককে জিজ্ঞেস করে জানলাম, ওর বয়স ১৫ বছর, কিন্তু ওর চেহারা দেখে কিছুতেই ১২–১৩ বছরের বেশি বলে মনে হলো না। ছেলেটির মুখোমুখি তাদের ধর্মযাজক বসে আছে। আর বরকে পেছন থেকে আলিঙ্গন করে আছে তার মামা। ধর্মযাজক মন্ত্র পড়ে বরের হাত স্পর্শ করছে। বরের সামনে রাখা আছে গাছের একগুচ্ছ শুকনো সরু ডাল। কয়েকবার সেই ডাল ছুঁয়ে মন্ত্র পড়া হলো। মন্ত্র পড়ার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলে শুরু হলো আসল অনুষ্ঠান, যার নাম বুল জাম্পিং সেরেমনি। বরকে এখন ষাঁড়ের পিঠের ওপর দিয়ে লাফ দিতে হবে। এই একরত্তি বাচ্চা ছেলে এত বড় বড় ষাঁড় ডিঙাবে কীভাবে? পাশাপাশি পাঁচটা ষাঁড় দাঁড় করানো হলো। এই ষাঁড়গুলোকে ঘিরে গ্রামবাসী এখন দাঁড়িয়ে আছে। তবে নির্দিষ্ট দূরত্ব রেখে। আর আশ্চর্যজনক হলো, এরা ধাক্কাধাক্কি বা মারামারি করছে না। সুশৃঙ্খলভাবে গোল হয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে।

তাদের কাছ থেকে ভারত উপমহাদেশের তথাকথিত সভ্য মানুষদের অনেক কিছু শেখার আছে। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে নারীরা ভুভুজেলা বাজানো শুরু করলেন। আমি ইনাকের সঙ্গে ষাঁড়গুলোর মুখোমুখি না দাঁড়িয়ে পিঠের দিকে দাঁড়ালাম। কারণ বর এদিক দিয়েই ষাঁড়ের পিঠের ওপর উঠবে। এরপর ভুভুজেলার আওয়াজ তীব্র হলো। আর নারীরা সবাই পায়ের ঘুঙুর বাজিয়ে লাফাতে লাগলেন।

হামার নৃগোষ্ঠীর বিয়ের অনুষ্ঠানে নৃত্যরত নারীদের সাথে লেখক
হামারদের বিয়ের মূল অনুষ্ঠান দেখা শেষ হয়ে গেছে। সন্ধ্যা হয়ে এল প্রায়। এরা এখন পান-ভোজন করবে। এরপর এরা সবাই নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাবে। আমাকে রিসোর্টে রেখে আসার জন্য মেলাক তাড়া দিচ্ছে। কারণ, দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগে এখান থেকে চলে যাওয়া আমার জন্য নিরাপদ। আমি জিপে চড়ে বসলাম।

এখন শুরু হবে ষাঁড়ের ওপর দিয়ে লাফ। ছেলেটা খুবই রোগাপটকা ধরনের, তার ওপর আজ নাকি তার শরীর ভালো নেই। তাই পাশাপাশি ষাঁড়গুলোর পিঠে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ানোর জন্য গ্রামবাসী তাকে সাহায্য করল। তাকে ধরে প্রথম ষাঁড়ের পিঠের ওপর উঠিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে সে আড়াআড়িভাবে পাঁচটা ষাঁড়ের পিঠে পা ফেলে ফেলে এপাশে লাফ দিয়ে নেমে গেল। নামার সময় এ পাশেও গ্রামবাসী তাকে ধরে নামাল। ছেলেটি একা কখনোই ষাঁড়ের পিঠে উঠতে পারত না। একে তো ছোট, তার ওপর আজ সে অসুস্থ। এভাবে তাকে ষাঁড়ের পিঠে উঠে, পিঠ থেকে পিঠে লাফিয়ে অপর পাশে নামতে হলো। বুল জাম্পিংয়ের সময় বরকে পুরোপুরি উলঙ্গ হয়ে যেতে হয়। আর প্রতিটি ষাঁড়ের ওপর লাফিয়ে পড়ার সাথে সাথে গ্রামবাসী উল্লাসে ফেটে পড়ে, কারণ সে যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। সে বড় হয়ে গিয়েছে এবং সে এখন একটি পরিবার গঠন করতে পারবে, পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারবে। ছেলেটি নেমেই পোশাক পরে নিল। আমার মনে হলো, ওর তো এখন খেলার বয়স। চেহারায় এখনো শৈশব লেগে আছে। আমি ছবি তুলতে চাইলে হেসে পোজ দিল। হামারদের বিয়ের মূল অনুষ্ঠান দেখা শেষ হয়ে গেছে। সন্ধ্যা হয়ে এল প্রায়। এরা এখন পান-ভোজন করবে। এরপর এরা সবাই নিজ নিজ ঘরে ফিরে যাবে। আমাকে রিসোর্টে রেখে আসার জন্য মেলাক তাড়া দিচ্ছে। কারণ, দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগে এখান থেকে চলে যাওয়া আমার জন্য নিরাপদ। আমি জিপে চড়ে বসলাম। একা কোথাও যাওয়ার উপায় নেই, তাই ওদের কথামতোই চলতে হবে। হামারদের বিয়ের মূল অনুষ্ঠান বাইরের কারও দেখার অনুমতি নেই। আর এ অনুষ্ঠান চলে প্রায় ১৫ দিন ধরে। তাই এটুকু দেখেই মনের সাধ মেটাতে হলো।