‘ডন কিহোতের কথা শুনে তারা একে অপরের মুখের দিকে হাঁ হয়ে চাওয়াচাওয়ি করতে থাকল। কিহোতের কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে তাদের মন সায় দিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিশ্বাস না করে পারল না। তারা বুঝতে পারল, ডন কিহোতে আর বাঁচবে না। কারণ, এত দিন অসুস্থ অপলাপের পর হঠাৎ সুস্থ আলাপই ছিল সবচেয়ে বড় লক্ষণ। আর এসব কথার সঙ্গে কিহোতে যুক্ত করেছে অনেক সুন্দর সুন্দর ধর্মের আলাপ। আর এত সাজিয়ে–গুছিয়ে সে কথা বলছে যে কারও মনে কোনো সন্দেহই রইল না যে কিহোতে তার স্বাভাবিক জ্ঞান–বুদ্ধি ফিরে পেয়েছে।’ (সের্ভান্তেস ১০৯১)
দ্বিতীয় খণ্ডের শেষ অধ্যায়ে যখন ডন কিহোতে মারা যাচ্ছে, তখন তার পাশে থাকা লোকজনদের মধ্যে এমনটাই ধারণা জন্মাল, ডন কিহোতে হয়তো আর বাঁচবে না। তার কারণ, ডন কিহোতে তার জ্ঞান-বুদ্ধি-বিবেক ফিরে পেয়েছে। অর্থাৎ কিহোতে তত দিনই বেঁচে ছিল, যত দিন সে কল্পনায় ছিল। আর যেই তার কল্পনা থেকে চৈতন্য ফিরে এসেছে, সেই সে চলে এসেছে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে। তাহলে প্রশ্ন হলো, কিহোতে এত দিন ঘোরে ছিল নাকি এখন ঘোরে আছে?
মহৎ শিল্পের অবশ্যই থাকতে হবে প্রাসঙ্গিকতা কিংবা সমসাময়িকতা। আর চাইলেই তো এমনি এমনি প্রাসঙ্গিক থাকা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সর্বজনীনতা। আর আজকে ‘ডন কিহোতে’র অন্তত একটি সর্বজনীনতা নিয়ে আলোচনা করব।
হ্যামলেট যখন লন্ডনের মঞ্চে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, যখন সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে একজন প্রেতাত্মার কথা বিশ্বাস করবে কি করবে না; যখন সে বুঝে উঠতে পারছে না চাচা ক্লডিয়াস খুনি কি না, ঠিক তখনই স্পেনীয় সাহিত্যে ডন কিহোতের আগমন। তুর্গেনেভ মনে করেন, যে বছর ‘হ্যামলেট’ প্রকাশিত হয়, সে বছরই আত্মপ্রকাশ করে ‘ডন কিহোতে’ (তুর্গেনেভ ৯২)। এ মন্তব্যে তুর্গেনেভ অন্তত দুটি ভুল করেছেন: ‘হ্যামলেট’–এর বিবেচনায় প্যারাক্রোনিজম (যে কালবৈষম্যে আগের ঘটনা পরে বর্ণনা করা হয়) এবং ‘ডন কিহোতে’র বিবেচনায় মেটাক্রোনিজম (যে কালবৈষম্যে পরে ঘটনা আগে বর্ণনা করা হয়)। আবার তুর্গেনেভ মনে করেন, দুই সাহিত্যকর্মের আবির্ভাব সপ্তদশ শতাব্দীর একেবারে গোড়ার দিকে এবং এই কাকতালীয় আবির্ভাব নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ (৯২)। তুর্গেনেভের আগের মন্তব্যে ত্রুটি থাকলেও পরের মন্তব্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দুই দেশের, দুই ভিন্ন ভাষার দুটি ভিন্ন মাস্টারপিসকে সমান্তরালভাবে তুলনা করার ফলে ‘হ্যামলেট’ এবং ‘ডন কিহোতে’ যে মানুষের দুই বিপরীত প্রবণতার প্রতীক, তা আমাদের নতুন করে ভাবতে সাহায্য করে। এ প্রসঙ্গে তুর্গেনেভ বলেন:
‘আমরা আগেই লক্ষ করেছি, এই দুটি শ্রেষ্ঠ রচনার একই সময়ে প্রকাশিত হওয়া ভাবনার খোরাক জোগায়। আমার মনে হয়, এই দুই চরিত্রের মধ্যে মানুষের দুটি পরস্পরবিরোধী মৌলিক প্রবণতা মূর্ত হয়ে উঠেছে: মানবসত্তার সেই দুই মেরু, যাদের কেন্দ্র করে মানুষের জীবন আবর্তিত হয়। আমার দৃষ্টিতে, সব মানুষই কোনো না কোনোভাবে এই দুই ধরনের একটির সঙ্গে মিলে যায়। কেউ “হ্যামলেট”–এর মতো, কেউ “ডন কিহোতে”–এর মতো।’ (৯৩)
হ্যামলেট যখন লন্ডনের মঞ্চে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে, যখন সে ঠিক বুঝে উঠতে পারছে না যে একজন প্রেতাত্মার কথা বিশ্বাস করবে কি করবে না; যখন সে বুঝে উঠতে পারছে না চাচা ক্লডিয়াস খুনি কি না, ঠিক তখনই স্পেনীয় সাহিত্যে ডন কিহোতের আগমন।
আর আমরা এ–ও বুঝতে পারি, ‘হ্যামলেট’ বাঁচে নিজের অহমকে কেন্দ্র করে এবং ‘ডন কিহোতে’ বাঁচে নিজের চেয়ে উচ্চতর আদর্শের জন্য। যদি এমনটা না হতো, স্পেনের এক গ্রামের বৃদ্ধ কিহোতে তার ঘোড়ায় চড়ে পৃথিবীকে অন্যায়, অত্যাচার ও অশুভ শক্তির হাত থেকে রক্ষা করতে একা বের হয়ে পড়ত না। আসল নাম আলোনসো কিহানো। কিন্তু তিনি আর আলোনসো কিহানো থাকতে চাইলেন না। হয়ে উঠলেন ‘ডন কিহোতে’। যেন নিজের ব্যাপটাইজ নিজেই করলেন। আর নাম ধারণের পেছনে রয়েছে এক মহৎ উদ্দেশ্য। আর তাই তাকে হতে হবে একজন বীর নাইট। এমন একজন নাইট, যার সামনে পৃথিবী অপেক্ষা করছে ন্যায় ও বীরত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য।
অর্থাৎ হ্যামলেট–এর নিজের গড়িমসি, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, ওফেলিয়ার সঙ্গে হৃদয়ঘটিত টানাপোড়েন, মায়ের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, মাঝেমধ্যে বাবার প্রেতাত্মার আনাগোনা, বন্ধুদ্বয়ের বিশ্বাসঘাতকতা—এসবের মধ্যে হ্যামলেট এমনভাবে ফেঁসে যায় যে তার স্বাধীনভাবে বাঁচা একপ্রকার বিলাসিতায় পরিণত হয়। অপর পক্ষে কিহোতে একজন স্বাধীন এজেন্ট। পথে বেরিয়ে পড়েছে বিশ্বস্ত সঙ্গী সানচো পাঞ্জাকে সঙ্গে নিয়ে।
মিশন একটাই। যুদ্ধ করতে হবে নাইটদের মতো। রক্ষা করতে হবে সাধারণ মানুষকে অত্যাচারীদের হাত থেকে। আর এই সর্বসাধারণের ত্রাতা হওয়ার বাসনা থেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা ‘কিহোতে এত দিন ঘোরে ছিল নাকি এখন ঘোরে আছে?’ এবং সর্বজনীন হওয়ার বিষয়টি একই সূত্রে গাঁথা আছে। এই দুটি বিষয় চলে আসে উপন্যাসের শুরুতেই, যখন এক সমতলে ত্রিশ-চল্লিশটি বায়ুকল দেখে ডন কিহোতে সানচো পাঞ্জাকে বলে:
‘সানচো পাঞ্জা, ভাগ্য আমাদের জন্য এমন এক সুযোগ এনে দিয়েছে, যা আমরা নিজেরা চাইলেও এর চেয়ে ভালোভাবে সাজাতে পারতাম না। ওই যে দেখ ত্রিশটির বেশি ভয়ংকর দৈত্য আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে! আমি তাদের সঙ্গে লড়াই করব এবং একে একে পরাজিত করব। তাদের ধনসম্পদ লুট করেই আমরা নিজেদের ভাগ্য গড়ব। এ এক ন্যায়সংগত যুদ্ধ। পৃথিবীর বুক থেকে এমন দুষ্ট জাতিকে নিশ্চিহ্ন করা ঈশ্বরেরও পছন্দের কাজ।’
সানচো পাঞ্জা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করল, ‘দৈত্য? কোথায় দৈত্য?’
‘ওই যে, তুই দেখতে পাচ্ছিস,’ ডন কিহোতে বলল। ‘লম্বা লম্বা হাতওয়ালা সেই দৈত্যগুলো। তাদের কারও কারও হাত প্রায় দুই লিগ পর্যন্ত লম্বা।’
সানচো বলল, ‘মহাশয়, একটু ভালো করে দেখুন। ওগুলো দৈত্য নয়। বায়ুকল। আর আপনি যেগুলোকে তাদের লম্বা হাত ভাবছেন, সেগুলো আসলে বায়ুকলের পাখা। বাতাসের জোরে পাখাগুলো ঘোরে। আর সেই ঘূর্ণনের ফলে কলের পাথর ঘুরতে থাকে।’
ডন কিহোতে বলে, ‘দেখেই বোঝা যাচ্ছে, তুই এখনো দুঃসাহসিক অভিযানের ব্যাপারে অভ্যস্ত হয়ে উঠিসনি। ওগুলো দৈত্যই। আর যদি তোর ভয় লাগে তাহলে এখান থেকে সরে গিয়ে প্রার্থনা করতে থাক। আমি একাই তাদের সঙ্গে এই ভয়ংকর অসম যুদ্ধে লড়ব।’ (সের্ভান্তেস)
দূর থেকে বাতাসকল দেখে ডন কিহোতে মনে করল সেগুলো বিশাল দৈত্য। সানচো তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে ওগুলো দৈত্য নয়, বাতাসকল। কিন্তু ডন কিহোতে তার নিজের বাস্তবতায় অটল। তিনি ঘোড়া ছুটিয়ে দৈত্যের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে বসে। ফলে যা হওয়ার তা–ই হলো। বাতাসকলের পাখায় তার বর্শা আটকে গেল। আর সে ছিটকে মাটিতে পড়ে গেল। সানচো আবার তাকে বাস্তবতা বোঝাতে চাইল। কিন্তু ডন কিহোতের কাছে পরাজয়েরও একটি ব্যাখ্যা ছিল: কোনো এক জাদুকর তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে দৈত্যগুলোকে বাতাসকলে পরিণত করেছে।
মিশন একটাই। যুদ্ধ করতে হবে নাইটদের মতো। রক্ষা করতে হবে সাধারণ মানুষকে অত্যাচারীদের হাত থেকে। আর এই সর্বসাধারণের ত্রাতা হওয়ার বাসনা থেকেই আমাদের জিজ্ঞাসা, ‘কিহোতে এত দিন ঘোরে ছিল নাকি এখন ঘোরে আছে?’ এবং সর্বজনীন হওয়ার বিষয়টি একই সূত্রে গাঁথা আছে।
দৃশ্যটি হাসির খোরাক সরবরাহ করে। আবার যদি তলিয়ে ভাবি, তবে কি আসলেই শুধু হাসি–তামাশার দৃশ্য এটি? ‘মিগেল দে সের্ভান্তেসের “ডন কিহোতে”র প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৬০৫ এবং দ্বিতীয় খণ্ড ১৬১৫ সালে। ইংরেজিতে প্রকাশিত হয় ১৬১২-২০ সালের মধ্যে; ফরাসিতে হয় ১৬১৪-১৮ সালের মধ্যে; ইতালীয়তে ১৬২২ এবং জার্মানে ১৬৮৩ সালে’ (‘কাডন’ ৭৫৯)। অর্থাৎ ‘ডন কিহোতে’র জনপ্রিয়তা চোখে পড়ার মতো দৃশ্যমান। কিন্তু সময় যতই গেছে উপন্যাসটি ততই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। মানুষের বাস্তবতা বোধের সংকট আরও সর্বজনীন করে তুলেছে। ডন কিহোতের সমস্যা শুধু এই নয় যে সে বাতাসকলকে দৈত্য ভাবছিল। তার সমস্যা হলো সে আর পৃথিবী যেমন–তেমন চোখে দেখতে পারছিল না। তার কারণ হলো, সে পৃথিবীকে দেখছিল তার পড়া অসংখ্য বীরত্বগাথার চোখ দিয়ে। বইয়ের কল্পিত জগৎ তার কাছে এতটাই বাস্তব হয়ে উঠেছিল যে সে নিজের জীবনকেও সেই গল্পের অংশ হিসেবে দেখতে শুরু করেছিল।
এখানেই ‘ডন কিহোতে’র সবচেয়ে আধুনিক প্রশ্নটি নিহিত। আমরা যে পৃথিবী দেখি, সেটি কি সত্যিই পৃথিবী? নাকি আমাদের বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা, গল্প ও পূর্বধারণা দিয়ে নির্মিত পৃথিবী? আজ আমাদের চারপাশে বাতাসকলের অভাব নেই। শুধু তাদের চেহারা বদলে গেছে। আমরা সংবাদ পড়ি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেখি। ভিডিও দেখি। বিভিন্ন মতাদর্শের বক্তব্য শুনি। একই ঘটনা সম্পর্কে দুজন মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি ‘বাস্তবতা’ দেখতে পারে। একজন যে ঘটনাকে সত্যের প্রমাণ মনে করে; অন্যজন সেটিকেই মিথ্যার প্রমাণ হিসেবে দেখতে পারে। কারণ, তথ্যের পাশাপাশি মানুষ তার নিজস্ব বিশ্বাস, রাজনৈতিক অবস্থান, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা ও পূর্বধারণার মধ্য দিয়েও পৃথিবীকে পড়ে। এই জায়গায় ডন কিহোতের বাতাসকল একটি শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।
বাতাসকল নিজে বদলায়নি; বদলেছিল ডন কিহোতের দৃষ্টিভঙ্গি। সে যা দেখেছিল, তার সঙ্গে যা বাস্তবে ছিল তার ব্যবধানই তার ট্র্যাজেডি ও কৌতুকের উৎস। আধুনিক মানুষও কখনো কখনো একই সমস্যায় পড়ে। আমরা কোনো ঘটনাকে তার নিজের অস্তিত্বে দেখি না; বরং আমরা তাকে আমাদের আগে থেকেই তৈরি করা গল্পের ছাঁচে বসিয়ে দেখি। তবে ডন কিহোতেকে কেবল একজন নির্বোধ পাগল হিসেবে দেখলে সের্ভান্তেসের সৃষ্টির গভীরতা বোঝা যাবে না। তার কল্পনা তাকে হাস্যকর করেছে ঠিকই; কিন্তু সেই কল্পনাই তাকে একটি নৈতিক আদর্শ দিয়েছে। সে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়। দুর্বলকে রক্ষা করতে চায়। অসম্ভবকে সম্ভব করার স্বপ্ন দেখে। বাস্তব পৃথিবী তার আদর্শকে গ্রহণ করে না। তবু সে আদর্শ ত্যাগ করেন না।
এখানেই সানচো পাঞ্জার সঙ্গে তার পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। সানচো মাটির মানুষ। সে ক্ষুধা বোঝে। অর্থ বোঝে। শরীরের কষ্ট বোঝে। ডন কিহোতে যেখানে দুর্গ দেখে; সানচো সেখানে সরাইখানা দেখে। যেখানে ডন কিহোতে রাজকন্যার স্বপ্ন দেখে; সানচো সেখানে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা দেখে। একজনের চোখে পৃথিবী আদর্শের। অন্যজনের চোখে প্রয়োজনের।
ডন কিহোতে বই পড়ে নিজেকে বদলে ফেলেছিল। পাঠে পরিচয় নির্মাণ করেছিল। চেয়েছিল বইয়ের চরিত্রের মতো জীবন যাপন করতে। আধুনিক মানুষও বিভিন্ন গল্পের মধ্য দিয়ে নিজেকে চিনতে শেখে। সাহিত্য, সিনেমা, পুরাণ, ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছু মিলে আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে একটি বয়ান তৈরি করে।
কিন্তু সের্ভান্তেস তাদের কাউকেই সম্পূর্ণ সত্য করে তোলেন না। সময়ের পরিক্রমায় সানচোও ডন কিহোতের কল্পনার জগতে অনুপ্রবেশ করতে থাকে। আবার ডন কিহোতের মধ্যেও বাস্তবতার বোধ ফিরে আসতে থাকে। ফলে সত্য জগৎ ও কল্পনার জগৎ একাকার হয়ে গেছে।
এই দ্বৈততাই সম্ভবত মানুষের স্বাভাবিক অবস্থা। কারণ, মানুষ শুধু যা আছে তা নিয়ে বাঁচে না। মানুষ যা নয় তারও স্বপ্ন দেখে। একটি বাড়ি নির্মাণের আগে তার নকশা কল্পনায় তৈরি হয়। একটি রাষ্ট্রের জন্মের আগে তার ধারণা তৈরি হয়। একটি কবিতা লেখার আগে কবির মনে তার অস্পষ্ট অস্তিত্ব তৈরি হয়। যে পৃথিবী আজ বাস্তব, নিশ্চয়ই একসময় তা কারও কল্পনা ছিল।
তাহলে ডন কিহোতের ভুল কোথায়?
সমস্যা কল্পনা করার মধ্যে নয়; সমস্যা তখনই তৈরি হয়, যখন কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য করার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। বাতাসকলকে দৈত্য হিসেবে কল্পনা করা সৃজনশীলতা হতে পারে; কিন্তু সেই কল্পনার ভিত্তিতে বাস্তব পৃথিবীর সঙ্গে সংঘর্ষে যাওয়া বিপজ্জনক।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যখন তথ্যের পরিমাণ বিপুল, কিন্তু সত্যকে শনাক্ত করা সহজ নয়। একটি ছবি, একটি ভিডিও, একটি শিরোনাম কিংবা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট মুহূর্তের মধ্যে আমাদের মনে কোনো ব্যক্তি, ঘটনা বা সমাজ সম্পর্কে একটি ধারণা তৈরি করতে পারে। আমরা অনেক সময় পুরো ঘটনাটি জানার আগেই তার ব্যাখ্যা গ্রহণ করি। তারপর সেই ব্যাখ্যাই আমাদের কাছে বাস্তব হয়ে ওঠে।
আমাদের সময়ের বাতাসকল হয়তো আর মাঠের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল পাখাওয়ালা যন্ত্র নয়। কখনো সেটি একটি ভুল তথ্য, কখনো একটি পূর্বধারণা, কখনো একটি অতিরঞ্জিত ভয়, কখনো আবার এমন কোনো বয়ান, যা আমরা এতবার শুনেছি যে শেষ পর্যন্ত সেটিকেই সত্য বলে মনে হয়।
ডন কিহোতে বই পড়ে নিজেকে বদলে ফেলেছিল। পাঠে পরিচয় নির্মাণ করেছিল। চেয়েছিল বইয়ের চরিত্রের মতো জীবন যাপন করতে। আধুনিক মানুষও বিভিন্ন গল্পের মধ্য দিয়ে নিজেকে চিনতে শেখে। সাহিত্য, সিনেমা, পুরাণ, ইতিহাস, পারিবারিক স্মৃতি, জনপ্রিয় সংস্কৃতি ইত্যাদি সবকিছু মিলে আমাদের পৃথিবী সম্পর্কে একটি বয়ান তৈরি করে। সুতরাং ডন কিহোতের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য হয়তো কেবল এই যে তার বাতাসকল দৃশ্যমান ছিল, আর আমাদের বাতাসকল অনেক সময় অদৃশ্য।
আরও একটি বিষয় এখানে মনে রাখা দরকার। ডন কিহোতে পরাজিত হয়। কিন্তু তার পরাজয় হাসানোর পাশাপাশি আমাদের অস্বস্তিতেও ফেলে। কারণ, তার মধ্যে আমরা এমন এক মানুষকে দেখি যে পৃথিবীকে সহজে মেনে নিতে চায়নি। সে পৃথিবীকে অন্য রকম দেখতে চেয়েছিল। তার কল্পনা ভুল পথে গিয়েছিল। কিন্তু তার আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি ন্যায়ভিত্তিক পৃথিবীর জন্য।
এই দ্বৈততাই ডন কিহোতেকে অসাধারণ করে তোলে। সে একই সঙ্গে হাস্যকর ও মহৎ, বিভ্রান্ত ও স্বপ্নদ্রষ্টা, অবাস্তব ও গভীরভাবে মানবিক। এই মানবিকতা সম্বন্ধে তুর্গেনেভ বলেন, ‘এ কথা কোনোভাবেই ভুলে গেলে চলবে না যে এই বিভ্রান্ত ও উদ্ভ্রান্ত বীর যোদ্ধাই পৃথিবীর সবচেয়ে নীতিবান মানুষ’ (তুর্গেনেভ ৯৫)।
চার শ বছর পর তাই প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে ডন কিহোতে কেন বাতাসকলকে দৈত্য ভেবেছিল? বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত, আমরা নিজেরা কি বাতাসকলকে দৈত্য বলে মনে করছি? আরও কঠিন প্রশ্ন হলো, আমরা কি কখনো সানচোর মতো থেমে গিয়ে নিজেদের জিজ্ঞেস করি, ‘ওগুলো সত্যিই কি দৈত্য?’
এই উপন্যাসের শক্তি এখানেই। একজন ডন কিহোতে আমাদের হাসতে শেখায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হয়ে আমাদের দিকেই ফিরে আসে। আমরা বুঝতে পারি, প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছুটা ডন কিহোতে আছে। কেউ নিজের স্বপ্নের জন্য বাস্তবতার বিরুদ্ধে লড়ে। কেউ নিজের বিশ্বাসের জন্য। কেউ নিজের কল্পিত পৃথিবীর জন্য।
সহায়ক গ্রন্থ
সের্ভান্তেস, ‘ডন কিহোতে’, নতুন দিল্লি ১১০০০২, প্রকাশ বুকস, ২০১৭।
তুর্গেনেভ আইভান, ‘হ্যামলেট অ্যান্ড ডন কিহোতে’, সম্পাদনা মোশে স্পিগেল, শিকাগো রিভিউ, খণ্ড ১, নং. ৪, ১৯৬৫, ৯২-১০৯।
কাডন, জে এ ‘দ্য পেঙ্গুইন ডিকশনারি অব লিটারেরি টার্মস অ্যান্ড লিটারেরি থিওরি’, পেঙ্গুইন বুকস, ১৯৯২।
ভট্টাচার্য, বীতশোক এবং সুবল সামন্ত, সম্পাদকমণ্ডলী, ডন কুইকসোট, কলকাতা ৭০০০৭৩, সঞ্জয় সামন্ত ও এবং মুশায়েরা, ২০০৭।