
বাংলা শিশুসাহিত্যের অন্যতম পুরোধা ছড়াকার আখতার হুসেন আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি প্রায় ছয় দশকের বেশি সময় ধরে শিশু-কিশোরদের জন্য লিখেছেন। তাঁর ছড়া ও শিশুসাহিত্যবিষয়ক মৌলিক গ্রন্থ, জীবনী, অনুবাদ, সম্পাদিত গ্রন্থসহ প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। দেশবরেণ্য এই কীর্তিমানের প্রতি আমাদের অফুরান শ্রদ্ধা।
বাংলা কবিতায় জীবনগঠন ও নীতিকথার শিক্ষা বহু পুরোনো। হরিশ্চন্দ্র মিত্র থেকে জসীমউদ্দীন—অনেকেই উপদেশমূলক কবিতার মাধ্যমে পাঠকের মনন সমৃদ্ধ করেছেন। তবে আধুনিক যুগে ছন্দ–মিল শিথিল হওয়ায় এ ধারার চর্চা হ্রাস পায়। এই শূন্যতা পূরণে ষাটের দশকের কবি ও ছড়াকার আখতার হুসেন অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তিনি কেবল এই ধারার সংকলনই সম্পাদনা করেননি, বরং নিজে ‘সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি’ নামের গ্রন্থে সর্বজনীন উপদেশমূলক কবিতাও লিখেছেন। ছন্দের কারুকাজ ও জীবনবোধের মিশ্রণে তাঁর এই সৃষ্টি শিশু-কিশোরদের নৈতিকতা গঠনে এক অনন্য দিশারি।
বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী উপদেশমূলক কবিতার একটি দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ধারা রয়েছে। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের ‘আমার পণ’, হরিশ্চন্দ্র মিত্রের ‘বড় কে?’, কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের ‘সুখী দুঃখীর দুঃখ বোঝে না’, কালিপ্রসন্ন ঘোষের ‘পারিব না’, রজনীকান্ত সেনের ‘স্বাধীনতার সুখ’, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের ‘উত্তম ও অধম’, শেখ ফজলুল করিমের ‘স্বর্গ ও নরক’, সুনির্মল বসুর ‘সবার আমি ছাত্র’, কুসুমকুমারী দাশের ‘আদর্শ ছেলে’, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের ‘কে?’, কালিদাস রায়ের ‘মাতৃভক্তি’, শেখ হবিবর রহমানের ‘নবীর শিক্ষা’, জসীমউদ্দীনের ‘প্রতিদান’, কাজী কাদের নওয়াজের ‘শিক্ষকের মর্যাদা’ কিংবা আবুল হোসেন মিয়ার ‘একটুখানি’—এসব কবিতা আজও বাঙালির মুখে মুখে ফেরে। জীবনগঠনের কালজয়ী পথনির্দেশ ও সুগভীর নীতিশিক্ষায় সমৃদ্ধ এসব রচনা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে নৈতিক মূল্যবোধ সঞ্চারে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছে।
বাংলা সাহিত্যে উপদেশমূলক কবিতার ধারায় ষাটের দশকের অন্যতম কবি ও শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের অবদান অনন্য। এই ধারার চর্চাকে বেগবান করতে তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা উপদেশমূলক কবিতা’ ও ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা গল্পভিত্তিক উপদেশমূলক কবিতা’—শিরোনামের দুটি আকর গ্রন্থ। এই আকর গ্রন্থদ্বয়ের পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে ছড়াকার রবীন আহসান সম্পাদনা করেন ‘বাংলাভাষায় উপদেশমূলক কবিতা’ সংকলনটি, যা পাঠকপ্রিয়তা ধরে রেখেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন, যতীন্দ্রমোহন বাগচী, কাজী নজরুল ইসলাম, বন্দে আলী মিয়া, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, অন্নদাশঙ্কর রায়, সুকুমার রায়, পবিত্র সরকার, সুকুমার বড়ুয়া, মাহমুদুল্লাহ, দীপংকর চক্রবর্তী, খালেক বিন জয়েনউদদীন, লুৎফর রহমান রিটন, ফারুক নওয়াজ, রহীম শাহ, সুজন বড়ুয়া, আমীরুল ইসলাম, আনজীর লিটন প্রমুখের কবিতায় আমরা উপদেশের উপকরণ খুঁজে পাই। এ ধরনের কবিতা পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটে। এগুলো একই সঙ্গে বিনোদন ও শিক্ষার খোরাক জোগায়।
বাংলা সাহিত্যে উপদেশমূলক কবিতার ধারায় ষাটের দশকের অন্যতম কবি ও শিশুসাহিত্যিক আখতার হুসেনের অবদান অনন্য। এই ধারার চর্চাকে বেগবান করতে তিনি সম্পাদনা করেছেন ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা উপদেশমূলক কবিতা’ ও ‘বাংলাসাহিত্যের সেরা গল্পভিত্তিক উপদেশমূলক কবিতা’—শিরোনামের দুটো আকর গ্রন্থ। এই আকর গ্রন্থদ্বয়ের পথ ধরেই পরবর্তী সময়ে ছড়াকার রবীন আহসান সম্পাদনা করেন ‘বাংলাভাষায় উপদেশমূলক কবিতা’ সংকলনটি, যা পাঠকপ্রিয়তা ধরে রেখেছে। তবে এই সংকলন-প্রচেষ্টার বাইরে কবি হিসেবে আখতার হুসেনের নিজস্ব সৃষ্টিশীলতার উজ্জ্বল স্মারক তাঁর ‘সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি’ (শৈশব, ঢাকা, ২০১৯) কাব্যগ্রন্থটি। গ্রন্থটিতে সন্নিবেশিত ৫৪টি কবিতা সব বয়সের পাঠকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। এবং নীতি ও নৈতিক মূল্যবোধের অনন্য মানদণ্ড তৈরি করে।
জ্ঞানের আধার যে বই, এ কথা সবাই জানি এবং মানি। কেবল বই হলেও হবে না, তাতে ‘সার’ থাকতে হবে। তাঁর লেখা কবিতাটি এমন—
হোক না সে বই ক্ষুদ্র যতই
ক্ষীণ কলেবর,
থাকে যদি সার ছোট সে আধার
বিশাল সাগর।
(হোক না সে বই)
বইয়ের আকৃতি ছোট কিংবা কলেবর ক্ষীণ হলেও তাতে সত্য ও জ্ঞানের ‘সার’ বা মূলবস্তু থাকলে তার গুরুত্ব অপরিসীম। জ্ঞানহীন বিশালতার চেয়ে জ্ঞানগর্ভ ক্ষুদ্র আধারও গভীরতায় সাগরের মতোই অসীম ও মহীয়ান হয়ে ওঠে—আখতার হুসেনের এই চরণে সেই অমোঘ সত্যই প্রকাশ পেয়েছে।
অনেকের লেখাতেই উপদেশ খুঁজে পাই, কিন্তু উপদেশ প্রদানের উদ্দেশ্য নিয়ে কবিতা লেখার চেষ্টা যাঁরা করেছেন, তাঁদের মধ্যে আখতার হুসেনের নামই বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। আখতার হুসেনের লেখা কবিতা থেকে কিছু স্মরণযোগ্য উপদেশ উল্লেখ করা যেতে পারে—
১. ধরেছি বুঝি-বা জ্ঞানবৃক্ষের গুঁড়ি
দেখি সে তো ছোট এক পাথরের নুড়ি।
(ধরেছি বুঝি-বা জ্ঞানবৃক্ষের গুঁড়ি)
২. যে জ্ঞানী বলেন শিখিনি এখনো কিছু
শেখার চেষ্টা মাত্র করেছি শুরু
জ্ঞানভাণ্ডার তার হাতে ধরা দেয়
তিনিই তো হন প্রকৃত শিক্ষাগুরু।
(যে জ্ঞানী বলেন)
৩. মানুষের পরিচয় বিশুদ্ধ মনে
নয় মোটে জমকালো বহিরাবরণে।
(মানুষের পরিচয়)
৪. পরের উপর ভর করে বড় যারা
সঠিক অর্থে বড় নয় মোটে তারা।
(সঠিক অর্থে)
৫. তাই বলি অস্ত্রের নেই প্রয়োজন
নৈতিক বলে যদি ভরা থাকে মন।
(দেহে নয়, মনে)
উদ্ধৃত প্রথম কবিতাংশে বলা হয়েছে, নিজেকে বিপুল জ্ঞানের অধিকারী মনে করলেও প্রকৃত সত্যের সামনে তা অতি নগণ্য। এই চরণে অসীম জ্ঞান সমুদ্রের কাছে মানুষের সীমিত অর্জনের অহংকার ও ক্ষুদ্রতার রূপক প্রকাশ পেয়েছে। উদ্ধৃত দ্বিতীয় কবিতাংশে বলা হয়েছে, প্রকৃত জ্ঞানীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর বিনয়। অসীম জ্ঞানের সাগরে নিজের সীমাবদ্ধতা স্বীকার করে যিনি আজীবন শিক্ষার্থী হিসেবে শেখার সাধনা চালিয়ে যান, যথার্থ জ্ঞানভান্ডার ও প্রকৃত শিক্ষাগুরুর মর্যাদা কেবল তাঁরই প্রাপ্য। তৃতীয় কবিতাংশে বলা হয়েছে, মানুষের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব তার বাহ্যিক পোশাক বা জমকালো আবরণে নয়, বরং অন্তরের সততা ও মনের বিশুদ্ধতায় নিহিত। বাহ্যিক রূপ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু উন্নত চরিত্র ও বিশুদ্ধ মনই মানুষের আসল পরিচয় গড়ে তোলে। চতুর্থ কবিতাংশে বলা হয়েছে, আত্মনির্ভরশীলতাই মানুষের প্রকৃত মর্যাদার ভিত্তি। অন্যের কৃপা বা আশ্রয়ের ওপর ভর করে লাভ করা সাফল্য কখনোই স্থায়ী বা খাঁটি বড়ত্ব হতে পারে না নিজের সামর্থ্য ও যোগ্যতাবলে গড়ে ওঠাই সত্যিকারের বড় হওয়া। পঞ্চম কবিতাংশে বলা হয়েছে, অস্ত্রের বল বাহ্যিক ও ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আত্মিক বা নৈতিক বল সুগভীর ও অপরাজেয়। উন্নত চরিত্র, সততা ও মানসিক দৃঢ়তা থাকলে কোনো পার্থিব অস্ত্রের প্রয়োজন হয় না সত্যের শক্তিতেই অন্যায়কে জয় করা সম্ভব।
বইয়ের আকৃতি ছোট কিংবা কলেবর ক্ষীণ হলেও তাতে সত্য ও জ্ঞানের ‘সার’ বা মূলবস্তু থাকলে তার গুরুত্ব অপরিসীম। জ্ঞানহীন বিশালতার চেয়ে জ্ঞানগর্ভ ক্ষুদ্র আধারও গভীরতায় সাগরের মতোই অসীম ও মহীয়ান হয়ে ওঠে—আখতার হুসেনের এই চরণে সেই অমোঘ সত্যই প্রকাশ পেয়েছে।
নমুনা হিসেবে এই পাঁচটি কাব্যাংশ উল্লেখ করে কবি আখতার হুসেনের উপদেশমূলক কবিতার ধরন বোঝাতে চেয়েছি। এসব উপদেশ তিনি অর্জন করেছেন নিজের জীবনাভিজ্ঞতা থেকে। কখনো পঠিত গ্রন্থ যেমন বাইবেল এবং চাণক্যর শ্লোক থেকেও তিনি বাণী ও ভাব গ্রহণ করেছেন। চাণক্য শ্লোক থেকে ভাব নিয়ে তিনি লিখেছেন—
যে পুরুষ জ্ঞানহীন ষাঁড়ের মতোই
বয়স্ক হতে থাকে এবং ততই
বাড়তে থাকে তার মাংস দেহের
বাড়ে না কেবল তার সীমাটা জ্ঞানের।
(যে পুরুষ)
জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে এখানে। জ্ঞানহীন মানুষের বয়সের সঙ্গে কেবল শারীরিক বৃদ্ধিই ঘটে, কিন্তু তার মেধা ও মননের কোনো বিকাশ ঘটে না। চাণক্যের ভাবাবলম্বনে রচিত এই চরণে কবি দেখিয়েছেন, বিদ্যা ও প্রজ্ঞাহীন জীবন পশুতুল্য শারীরিক বয়োবৃদ্ধি কখনো মানুষের প্রজ্ঞা বা শ্রেষ্ঠত্বের পরিচায়ক হতে পারে না।
কিশোর-উপযোগী দীর্ঘ কবিতা লিখতে তিনি পছন্দ করেন। কাহিনি কবিতাকে তিনি আয়ত্তে রেখেছেন। সেইসব কাহিনি ও চরিত্র থেকে তিনি উপদেশের উপকরণ খুঁজে নেন। এর জন্য কেবল মনুষ্য চরিত্র নয়, প্রাণিকুল থেকেও চরিত্র বেছে নেন। যেমন—
গাধাদের ডেকে বলে অশ্বেরা
‘তোমাদের চেয়ে আমরা সেরা।’
গতির খেলায় তোমরা কি পারো
আমাদের কাছে সর্বদা হারো।
(তুলনা)
অশ্বের মুখে গাধাদের প্রতি এই দম্ভোক্তি সমাজে বিদ্যমান অহংকার ও ক্ষমতার দাপটকে চিহ্নিত করে। গতি ও বাহ্যিক শক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব দেখানোর এই লড়াই কেবল শারীরিক পার্থিব ক্ষমতার বড়াই মাত্র, যা অহংবোধে অন্ধ হয়ে অন্যকে তুচ্ছজ্ঞান করার মানসিকতা ও কৃত্রিম মর্যাদার বিভ্রম তুলে ধরে।
ছয় মাত্রার প্রবহমান মাত্রাবৃত্তে গল্প বলার কৃতিত্ব আখতার হুসেন ভালো করে দেখিয়েছেন। বিশেষ করে ৭+৭+৭ মাত্রার প্রবহমান মাত্রাবৃত্তে কবিতা লেখার মতো কঠিন কাজটিও তিনি ভালো পারেন। যেমন—
আমার কাছে সেই/ বাগান গোলাপের/ সত্যি দামহীন
সকালে সব গাছে/ যেখানে গোলাপের/ ফোটে সে প্রতিদিন।
যেখানে একযোগে/ ফুলেরা ছড়ায় না/ গন্ধ মধুময়,
তেমন উদ্যান/ নামেই আছে শুধু,/ সত্যি খাঁটি নয়।
(মূল্যহীন সেই বাগান)
যেখানে প্রাণের স্বাভাবিক স্পন্দন ও সুবাস নেই, সেই কৃত্রিম প্রাচুর্য মূল্যহীন। প্রতিদিন ফুল ফুটলেও তা যদি সৌরভ না ছড়ায়, তবে সেই বাগান নামের হলেও প্রকৃত সৌন্দর্য হারায়।
ষাটের দশক থেকে বাংলাদেশের কবিতায়, বিশেষ করে কিশোরকবিতা, ছড়া ও গানে আখতার হুসেনের অবদানকে অস্বীকার করার উপায় নেই। দেশের প্রতিটি গণ–আন্দোলনেও সক্রিয় ছিলেন ছড়াকে হাতিয়ার করে। প্রগতিশীল উদার অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বলীয়ান শিশুদের জন্য কাজ করেছেন ‘কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরে’র মাধ্যমে। সারা দেশের শিশু–কিশোরদের গড়ে তুলতে চেয়েছেন মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। শিশু–কিশোরদের সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চায় উদ্বুদ্ধ করেছেন। শিশুসাহিত্যচর্চাকেও উৎসাহিত করেছেন তিনি।
তাঁর রচনা কেবল কল্পনার রসে জারিত নয়, বরং গভীর সমাজভাবনা ও দায়িত্ববোধে ঋদ্ধ। শিশুমনস্তত্ত্ব অনুধাবন করে সরল শব্দ, নিখুঁত ছন্দ ও শাণিত অনুষঙ্গের মেলবন্ধনে তিনি নতুন প্রজন্মকে নীতিজ্ঞান ও দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন। ষাট থেকে সত্তর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক অভিযাত্রায় ছড়াকার হিসেবে তাঁর জোরালো অবস্থান ছিল অনন্য। কেবল লেখালেখিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুনদের হাত ধরে সাহিত্যচর্চার পথ দেখানো এবং সম্পাদনার ক্ষেত্রে তাঁর অবদানও প্রাতঃস্মরণীয়। শিশুর সুকোমল মননে মুক্তচিন্তার বীজ বপন করে একটি চেতনার আলোকোজ্জ্বল প্রজন্ম গঠনে তাঁর এই নিরলস যাত্রা বাংলা শিশুসাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বাংলা শিশুসাহিত্যের অনন্য রূপকার আখতার হুসেন মূল পরিচয়ে একজন খাঁটি কবি। গল্প, নাটক কিংবা জীবনী রচনায় নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখলেও বড়দের সাহিত্যচর্চার পথ ছেড়ে শিশুদের জন্য লেখাকেই তিনি গ্রহণ করেছেন জীবনের পরম ব্রত হিসেবে। শিশুমনস্তত্ত্বের গভীরে প্রবেশ করে আগামীর প্রজন্মকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিতেই তিনি উপহার দিয়েছেন উপদেশমূলক কবিতার অনন্য সংকলন ‘সারাদিন আমি যেন ভাল হয়ে চলি’। কাব্যগ্রন্থটির প্রাথমিক লক্ষ্য শিশু–কিশোরদের মানসিক ও নৈতিক বিকাশ ঘটানো হলেও, এতে জীবন ও নীতিবিদ্যার যে নিবিড় সত্য ফুটে উঠেছে, তা বড়দের চেতনার খোরাক জোগাতেও সমান উপাদেয়।
অসামান্য এই শিশুসাহিত্যচর্চা ও অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে কবি ভূষিত হয়েছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারের মতো সম্মানজনক প্রাপ্তিতে। তবে সব পুরস্কারকেও ছাপিয়ে গেছে দেশের অগুনতি শিশু–কিশোরের অকৃত্রিম ভালোবাসা ও হৃদয়ের শ্রদ্ধা, যা তাঁর পথচলার মূল প্রেরণা।
বাংলা সাহিত্যে যে নীতিশিক্ষামূলক কাব্যধারাটি একসময় ম্লান হতে বসেছিল, আখতার হুসেনের এই সচেতন ও শুভ উদ্যোগের মাধ্যমে তা আবারও নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তাঁর লেখনী পাঠ করে যেকোনো বয়সের পাঠকই নিজের নৈতিক মানদণ্ড ও মূল্যবোধকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার সুযোগ পান। দীর্ঘকালের স্থবিরতা ভেঙে কবি আখতার হুসেনের সচ্ছল হাত ধরে বাংলা সাহিত্যে এই উপদেশমূলক কবিতা রচনার ঐতিহ্যটি পুনরুজ্জীবিত ও বেগবান হলে পাঠকহৃদয় নিঃসংশয়ে পরম আনন্দ ও তৃপ্তি লাভ করবে। ছোটদের কবি আখতার হুসেন আমাদের সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ নাম।