
কাজী নজরুল ইসলাম যে ঘুম-ভাঙানিয়া গান গেয়ে পরাধীন জাতিকে এক উন্মত্ত পথের দিকে চালিত করেছিলেন, সেই পথ কেবল স্বাধীনতার পথই ছিল না, জাতিগত বন্ধনের সুদৃঢ় প্রত্যয়ও ছিল বটে। নজরুলীয় চেতনার স্তর থেকে স্তরান্তরে মানবিকীকরণের যে মৌল অঙ্গীকার তাঁর সাহিত্যের মোটিফ হিসেবে এসেছে, সেখানে আমাদের দাঁড়াতে হয়, নিজেকে আরেকবার ভালোভাবে দেখে নিতে হয়, কারণ, আমরা কখনো কখনো আমাদের থেকে, আমাদের মূল অভিগমন থেকে সরে যাই এমন এক জায়গায়, যেখান থেকে মানবমুক্তির পথ বেশ দূরের হয়ে ওঠে। নজরুল পাঠে আমরা আবার সেই জায়গাটায় ফিরে আসতে পারি, যেখান থেকে আমরা বারবার দূরে সরে যাই। উপনিবেশ তাঁর সাহিত্য-মেজাজ তৈরিতে সহায়তা করেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। উপনিবেশ-উত্তর সময়ে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা এবং নজরুল–সাহিত্যের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন আরও বেশি এ কারণে যে নজরুল আজও আমাদের প্রেরণার বিশেষ উৎস হিসেবে বিবেচিত। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে সাম্প্রদায়িক ঐক্যের প্রতি নজরুল জোর দিয়েছিলেন। কারণ, তিনি বুঝেছিলেন, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রভুরা বিভেদের রাজনীতি দিয়ে ভারতবর্ষকে শাসন করার সুবিধা নিতে চাইছে। তিনি স্বরাজের কথা বলেননি, তিনি চেয়েছিলেন ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা। লিখেছিলেন, ‘এ দেশ ছাড়বি কিনা বল/ নইলে কিলের চোটে হাড় করিব জল।’ এই পঙ্ক্তিদ্বয়ের কাব্যমূল্য নিয়ে ভাবনার চেয়ে এর কাব্যশক্তি (প্রায়োগিক অর্থে) নিয়ে ভাবাই যুক্তিযুক্ত হবে। এর শক্তি যতই তাৎক্ষণিক হোক না কেন, সেটুকু মেজাজ ও কাব্যশক্তিকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশই নেই। এই যে একটি কবিতার দুটি পঙ্ক্তি একটি জাতির মস্তিষ্কে অগ্নি জ্বালিয়ে তা নিভে গেল, তাঁর এই ক্ষণিকের স্পন্দনটুকু আমাদের স্মরণের ডালায় না রেখে উপায় থাকে না।
উপনিবেশ কেবল অর্থনৈতিকভাবেই কোনো জাতিকে পঙ্গু করে ফেলে না, রাষ্ট্রীয় কাঠামোকেও দুর্বল করে, তার ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরও আঘাত হানে। কখনো কখনো কোনো জাতির ভাষা-সংস্কৃতিকে এমনভাবে পঙ্গু করে ফেলে যে স্বাধীনতা লাভের পরও অনেক কাল সেই পঙ্গুত্ব নিয়ে তাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। আফ্রিকার উপনিবেশগুলোর দিকে তাকালে এসব বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক শাসকেরা সোমালিয়াসহ অনেক দেশের নিজস্ব ভাষাকে দীর্ঘকাল বিকশিত হতে দেয়নি, বরং নানা কৌশলে তা ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছে। উপমহাদেশে নজরুলের আবির্ভাব সেই সময়ে, যখন ঔপনিবেশিক শাসনের পারদ ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামছে। ঔপনিবেশিক আবহেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিকশিত হয়েছে। মাইকেল, বঙ্কিম ও রবীন্দ্রনাথের মতো প্রতাপশালী প্রতিভাধরদের হাতে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য একটি মর্যাদাপূর্ণ জায়গায় পৌঁছে যায়। এমনকি বিশ্বদরবারেও তার স্থান হয় রবীন্দ্রনাথের নোবেলপ্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। নজরুলের আবির্ভাবে বাংলা ভাষার শিরায় প্রবাহিত হয় ভিন্ন রকমের প্রাণদায়ী শক্তি। নানা প্রান্ত থেকে তাঁর শব্দচয়নের পারঙ্গমতা তাঁর মৌলিক সৃজনশক্তিরই বহিঃপ্রকাশ। একটি সম্পূর্ণ আলাদা মেজাজের কাব্যভাষা তৈরির মধ্য দিয়ে বাংলা কবিতায় তাঁর স্বাতন্ত্র্য স্বাক্ষর রাখার বিষয়টি ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখা প্রয়োজন।
বাঙালির অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাবেই যে দানা বেঁধে ওঠে, এ কথা জোর দিয়েই বলা যায়। রবীন্দ্রনাথ ধীর লয়ে ক্রমাগত বাঙালির চিরায়ত সাংস্কৃতিক প্রত্যয়কে প্রভাবিত করেছেন, আর নজরুল তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে, বজ্রনির্ঘোষ তাড়নায় বাঙালির চেতনায় এনেছেন এক চিরন্তন অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক বোধ। এই প্রত্যয় ও বোধই আমাদের দাঁড়াতে শিখিয়েছে অন্যায়-অবিচার, শাসন-শোষণ ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে। ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন হয়ে নানামুখী সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় সেই চেতনারই উত্তরাধিকার।
১৯২২ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত কবি কাজী নজরুল ইসলাম মূলত কবিতাচর্চা করেছেন। ’৩০-এর পরে তিনি কবিতাচর্চা করলেও মূলত ব্যস্ত থেকেছেন সংগীত রচনায় এবং ১৯৪২ সালের ১০ আগস্ট বাক্রুদ্ধ হওয়ার আগপর্যন্ত তিনি কবিতা ও বিপুল সংগীতের মধ্য দিয়ে জয় করেছিলেন গণমানুষের মন। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতির এক বলিষ্ঠ ঐক্যের মধ্যে ভারতবর্ষের সর্বৈব মুক্তি ও প্রশান্ত মুখ। এই সংশ্লেষী দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তাঁকে নানাবিধ গালাগাল শুনতে হয়েছে—মুসলমানেরা তাঁকে কাফের আখ্যা দিয়েছে তাঁর কবিতা ও গানে হিন্দু দেব-দেবীর নাম থাকায় এবং হিন্দু রমণীর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ায়। আবার হিন্দুরাও তাঁকে আরবি-ফারসি শব্দ ব্যবহারের কারণে গালমন্দ করেছে। এসব তিনি সহ্য করেছেন নিবিষ্টচিত্তে, সাহসে-সংযমে, সহাস্যে, ভালোবাসার ঐকান্তিক বোধে। তিনি বলেছেন, ‘আমি হিন্দু-মুসলমানের মিলনে পরিপূর্ণ বিশ্বাসী। তাই তাদের সংস্কারে আঘাত হানার জন্যই মুসলমানী শব্দ ব্যবহার করি বা হিন্দু দেব-দেবীর নাম নিই।’
অন্যভাবে বললে, তিনি প্রজ্ঞা নয় হৃদয় দিয়ে বেঁধেছেন কবিতার ফ্রেম। যে কারণে তাঁর অনেক কবিতার বিরুদ্ধে স্থূলতার, অতিকথনের অভিযোগও উঠেছে। তাঁর দ্বিতীয় বিদ্রোহটা ছিল চিরচেনা প্রচল ও সংস্কারের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের মধ্য দিয়ে মুক্তির সুদূর দিগন্তে পৌঁছার লক্ষ্যে।
নজরুল ইসলাম এক আশ্চর্য বিদ্রোহের কবি। দুটো দিক থেকে এই বিদ্রোহকে ব্যাখ্যা করা যায়। একদিকে তিনি রবীন্দ্রবলয়মুক্ত কবিতার পথ করে দিলেন—যখন অন্য কবিরা রবীন্দ্রপ্রভাবে মেধার অপচয় করছেন শুধু, নতুন কিছু কিংবা রবীন্দ্রসৃষ্টি থেকে আলাদা কোনো কিছুর আভাস পাওয়া যাচ্ছে না, সেই সময়ে নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা এক স্বতন্ত্র সৃষ্টি–আভায় নতুন পথের সন্ধান এনে দিল। রবীন্দ্রবলয়মুক্ত যে আধুনিকতায় ’৩০-এর কবিরা পাশ্চাত্য প্রভাবে নতুন কবিতার বাগান সাজালেন, সেই বাগানে যাওয়ার পথটি নজরুলই তৈরি করেছিলেন, কিন্তু তিনি নিজে আর সে পথে হাঁটেননি। বাংলা আধুনিক কবিতার ইতিহাসে এ ক্ষেত্রে নজরুল ছিলেন পাইওনিয়ার এবং এটি ছিল নজরুলের সবচেয়ে বড় কাজ; কারণ পথে হাঁটা যতটা সহজ, পথ তৈরি ততটাই কঠিন।
তিনি কেন সেই পথে হাঁটেননি অথবা তিনি আধুনিক কবি কি না—প্রভৃতি প্রশ্নের অবতারণা হতেই পারে। তিনি অবশ্যই আধুনিক কবি; কারণ, তাঁর কবিতায় প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর সময়ের বেদনা-নৈরাশ্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। তবে ’৩০-এর কবিরা যে অর্থে আধুনিক, তিনি সে অর্থে আধুনিক নন। পশ্চিমি সংজ্ঞায় হয়তো তাঁকে আধুনিক বলতে দ্বিধা করবেন অনেকেই, কিন্তু মনে রাখতে হবে তিরিশের সেই আধুনিকতা ছিল ইউরোপীয় সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত। উত্তর-ঔপনিবেশিক সময়ে নজরুলকে আজ নতুনভাবে মূল্যায়নের সময় এসেছে।
নজরুল ছিলেন খাঁটি বাঙালি কবি; তিনি বাংলাদেশের জলবায়ু, মাটি ও মানুষের হৃদয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছেন তাঁর পরিপূর্ণ মানবদৃষ্টির প্রাখর্যে; সর্বৈব মুক্তি-অন্বেষী তাঁর আধুনিক চেতনা গড়ে ওঠে ভারতবর্ষের মৌলিক সমস্যাবলির আকর থেকে। তিনি তিরিশি আধুনিকতার পথে হাঁটেননি; কারণ, তিনি বাঙালির জীবন–ঐতিহ্যের, সংগ্রামের চিরচেনা পথের চারণ হতে চেয়েছেন। গণজাগরণের মঞ্চে দাঁড়িয়ে তিনি নিম্নবর্গীয় মানুষের দিকে তাকালেন, পরাধীন ভারতবর্ষের রক্তাক্ত মুখের দিকে চেয়ে তিনি এক আলাদা ঘরানায় নিজেকে স্থিত করলেন।
অন্যভাবে বললে, তিনি প্রজ্ঞা নয় হৃদয় দিয়ে বেঁধেছেন কবিতার ফ্রেম। যে কারণে তাঁর অনেক কবিতার বিরুদ্ধে স্থূলতার, অতিকথনের অভিযোগও উঠেছে। তাঁর দ্বিতীয় বিদ্রোহটা ছিল চিরচেনা প্রচল ও সংস্কারের বিরুদ্ধে, সাম্রাজ্যবাদী শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে এবং সর্বজনীন প্রেম ও ভ্রাতৃত্বের মধ্য দিয়ে মুক্তির সুদূর দিগন্তে পৌঁছার লক্ষ্যে। তিনি একই সঙ্গে দ্রোহ ও প্রেমের কবি। তিনি বলেছেনও ‘মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য।’
আধুনিক ইউরোপীয় কবিতা সাধারণ মানুষের বোধগম্যতার বাইরে চলে যায়। এলিয়ট-পাউন্ড থেকে শুরু করে আমাদের বিষ্ণু দে পর্যন্ত কবিতাকে জটিল করে তুললেন। রবীন্দ্রনাথও বিষ্ণু দে’র কবিতার দুর্বোধ্যতার কথা বলেছেন। নজরুলের কবিতার সারল্য কিংবা দ্রোহ তাঁর উপনিবেশিত আহত মানস ও মননের প্রতিচ্ছবি। কবিতাকে তিনি মানবমুক্তির এক অবিনাশী ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছেন। তাঁর কাব্যিক দ্রোহে মিশে আছে অনাদিকালের অম্লান সৌন্দর্য, এক ভিন্ন ভাবের নান্দনিক বোধ ছাড়া তাঁর দ্রোহের বলয়চক্র মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়।
আফ্রিকান কবিরা কিন্তু ইউরোপীয় তথাকথিত আধুনিকতায় গা ভাসিয়ে দেননি। আমরা জানি লিওপোল্ড সেডার সেঙ্ঘর, এইমে সেজায়ার প্রমুখের নেতৃত্বে যে ‘নেগ্রিট্যুড’ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই আন্দোলন সারা আফ্রিকার লেখকদের অনুপ্রাণিত করেছিল এবং তাঁরা নিজস্ব শিকড়ের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছিলেন, নিজস্ব ঐতিহ্য-সংস্কৃতির বিচিত্র যোজনায় সাহিত্য করায় ব্রতী হয়েছিলেন। কিন্তু তিরিশি আধুনিকতায়, আফ্রিকান লেখকদের মতো আমাদের লেখকেরা নিজস্ব ঐতিহ্য-অন্বিষ্টতায় স্থির থাকতে পারেননি। যে কারণে রবীন্দ্রনাথ সেই আধুনিকতাকে নানাভাবে ভর্ৎসনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের সেই ভর্ৎসনাকে পশ্চাৎপদতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। কিন্তু আজ আমরা যখন ঔপনিবেশিক আবেশমুক্ত সাহিত্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি, আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠছে কেন রবীন্দ্রনাথ সেদিনের সেই আধুনিকতাকে ‘গালমন্দ’ করেছিলেন। তবে এ কথাও ঠিক যে রবীন্দ্রনাথ সে–সময়ে নিজস্ব ঐতিহ্য ও শিকড়নির্ভর আধুনিকতার কোনো ডিসকোর্সও দাঁড় করাতে পারেননি, যেটা সেঙ্ঘর কিংবা আফ্রিকান লেখকেরা পেরেছিলেন কলোনিয়াল আবহের মধ্যেই। তিরিশি কবিদের মধ্যে জীবনানন্দ দাশের কবিতাতেই কেবল বাংলার জলমাটির খাঁটি গন্ধ পাওয়া যায় এবং যে কারণে তাঁর কবিতা আজও আমাদের টানে, আজও তিনি বহুল পঠিত ও প্রাসঙ্গিক।
নজরুল কেন সেই আধুনিকতার পথে হাঁটেননি, তা আজ আমাদের কাছে স্পষ্ট। সমস্যাসংকুল ভারতবর্ষের নানা ধর্মের, বর্ণের মানুষকে তিনি সম্প্রীতির বাঁধনে যেমন বাঁধতে চেয়েছিলেন, তেমনি ভারতবর্ষের রাজনৈতিক স্বাধীনতার মধ্য দিয়ে অর্থনৈতিক মুক্তি তথা সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থা কায়েমের স্বপ্নও দেখেছিলেন। তিনি ইউরোপীয় আধুনিক কিংবা ‘ইন্টেলেকচুয়াল’ কবি হতে কিংবা ‘কবিতার জন্য কবিতা’ লিখতে চাননি; তিনি গণমানুষের মুক্তির জন্য কবিতা লিখতে চেয়েছিলেন, তাই ক্ষোভে-দুঃখে বলেছিলেন, ‘অমর কাব্য তোমরা লিখিও বন্ধু।’
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের অনেক আগেই কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার নজরুলের কাব্যপ্রতিভার স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করে তাঁর অসাধারণ সৃজনক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যাটা বুদ্ধদেব বসু চিহ্নিত করেছেন: ‘অদম্য স্বতঃস্ফূর্ততা নজরুলের রচনার প্রধান গুণ এবং প্রধান দোষ। যা-কিছু তিনি লিখেছেন, লিখেছেন দ্রুতবেগে; ভাবতে, বুঝতে, সংশোধন করতে কখনো থামেননি, কোথায় থামতে হবে দিশে পাননি।... এ-ক্ষমতা চমকপ্রদ, কিন্তু নির্ভরযোগ্য নয়।’ (কালের পুতুল)। পরে তিনি তাঁকে ইংরেজ কবি বায়রনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
কবি জীবনানন্দ দাশ কবিতা লেখার প্রথম পর্যায়ে নজরুল দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন, যদিও সে প্রভাব তিনি কাটিয়ে উঠেছিলেন অচিরেই। জীবনানন্দ নজরুলের বিপুল প্রতিভার প্রশংসা করেছেন, কিন্তু নজরুলের অনেক কবিতাই মানোত্তীর্ণ নয় বলে অভিমতও দিয়েছিলেন।
নজরুলের কবিস্বভাবের টাইপটা বিবেচনা করলে বোঝা যায়, তিনি যতটা তাৎক্ষণিক, যতটা উচ্ছ্বাসী, যতটা মুক্তিকামী কিংবা সাম্যবাদী, সেই স্বভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে তাঁর কবিতায়। এর চেয়ে বেশি কিছু তাঁর পক্ষে সম্ভবও ছিল না। ফলে তাঁর কবিতাকে দেখতে হবে তাঁর কবিস্বভাবের বৈশিষ্ট্যের আলোকে। এ প্রসঙ্গে সুশীল কুমার গুপ্তর মতামত, ‘আবেগনির্ভর স্বভাবকবি হওয়ার ফলে তাঁর কাব্য নব নব বৈচিত্র্য সৃষ্টি করে পরিপক্বতার অভ্রান্ত লক্ষণ দেখাতে পারেনি।... নজরুলের স্বভাবকবিত্ব অনেক জায়গায় শেষ পর্যন্ত কোনো পরিণতি পায়নি এবং সেই কারণে তাঁর অনেক কবিতাই যুগকে অতিক্রম করতে গিয়ে ব্যর্থতা বরণ করেছে। কিন্তু বিদ্রোহ ও দেহাত্মক প্রেমে যেখানে তিনি যুগের হয়েও যুগকে ছাড়িয়ে যেতে পেরেছেন, সেখানে তিনি আধুনিক ও এখনকার কালেও আধুনিক এবং এইখানেই তাঁর কাব্যের প্রাণশক্তির সবচেয়ে বড় জয় ও সার্থকতা।’ (নজরুলকাব্যের স্বরূপ ও আধুনিকতা)
প্রবল যুগসচেনতার কারণে নজরুল সাময়িকতায় ঋদ্ধ লোকপ্রিয় কবিতা লেখাতেই বেশি উৎসাহিত হয়েছিলেন। বাংলা সাহিত্যে তাঁর স্থান কোন জায়গায় হবে, এ নিয়ে নজরুল ভাবিত ছিলেন না। তিনি একটি পত্রে লিখেছেন: ‘বাঙলা সাহিত্যে আমার স্থান সম্বন্ধে আমি কোনদিন চিন্তা করি নি। এর জন্য লোভ নেই আমার। সময়ই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ সমালোচক। যদি উপযুক্ত হই, একটা ছালা-টালা পাব হয়ত।’ (নজরুল পত্রাবলী)
নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রকাশের অনেক আগেই কবি ও সমালোচক মোহিতলাল মজুমদার নজরুলের কাব্যপ্রতিভার স্বাতন্ত্র্যকে চিহ্নিত করে তাঁর অসাধারণ সৃজনক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু সমস্যাটা বুদ্ধদেব বসু চিহ্নিত করেছেন: ‘অদম্য স্বতঃস্ফূর্ততা নজরুলের রচনার প্রধান গুণ এবং প্রধান দোষ। যা-কিছু তিনি লিখেছেন, লিখেছেন দ্রুতবেগে; ভাবতে, বুঝতে, সংশোধন করতে কখনো থামেননি, কোথায় থামতে হবে দিশে পাননি।... এ-ক্ষমতা চমকপ্রদ, কিন্তু নির্ভরযোগ্য নয়।’ (কালের পুতুল)। পরে তিনি তাঁকে ইংরেজ কবি বায়রনের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
তাঁর বিপুল সংগীতকে তাঁর কবিতার সম্পূরক হিসেবে দেখলে বোঝা যাবে তাঁর প্রতিভার মৌল অঙ্গীকার। এ বিষয়ে বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, “নজরুলের সমস্ত গানের মধ্যে যেগুলি ভালো সেগুলি সযত্নে বাছাই করে নিয়ে একটি বই বের করলে সেটাই হবে নজরুল প্রতিভার শ্রেষ্ঠ পরিচয়; সেখানে আমরা যাঁর দেখা পাবো তিনি সত্যিকার কবি, তাঁর মন সংবেদনশীল আবেগপূর্ণ, উদ্দীপনাপূর্ণ।... ‘বিদ্রোহী’ কবি ‘সাম্যবাদী’ কবি কিংবা ‘সর্বহারা’র কবি হিশেবে মহাকাল তাঁকে মনে রাখবে কিনা জানি না, কিন্তু কালের কণ্ঠে গানের মালা তিনি পরিয়েছেন, সে-মালা ছোট কিন্তু অক্ষয়। আর বাংলা কবিতার ইতিহাসেও তাঁর আসন নিঃসংশয়, কেননা তাঁর কবিতায় আছে সেই শক্তি, যাকে দেখামাত্র কবিত্ব শক্তি বলে চিনতে ভুল হয় না।” (কালের পুতুল)
রবীন্দ্রনাথ যেমন তাঁর গানের ওপর ভরসা করেছেন, তেমনি বলা যায় কেউ একদিন নজরুলের অন্য সব সৃষ্টিকর্ম থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও তাঁর গান থেকে কখনো দূরে সরে যাবে না। ভারতীয় রাগ-রাগিণীর নানাবিধ বৈচিত্র্যের যে তরঙ্গমালা তাঁর গানের ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছে, তা আমাদের অবাক করে।
আগেই বলেছি নজরুল গণমানুষের কবি। সাধারণ অশিক্ষিত মানুষও তাঁকে চেনে, তাঁর কবিতার আবৃত্তি শুনে আনন্দ পায়, তাঁর গান গায় সুরে কিংবা বেসুরে। একজন কবির জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! তাঁর ‘বিদ্রোহী’সহ অনেক কবিতাই আজও প্রাসঙ্গিক, সমকালীন অত্যাচার-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস জোগায়। ‘বল বীর-/বল উন্নত মম শির’—এই সর্বপ্লাবী বাণীই বাঙালির চিরকালীন সংগ্রামী চেতনার প্রতীক।
নজরুলের ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯২২ সালে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রচারের অঙ্গীকার নিয়ে। বিদেশি শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে স্বাধীনতার পক্ষে এই পত্রিকার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। নজরুল বললেন: ‘পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে সকল কিছু নিয়মকানুন বাঁধন-শৃংখল মানা-নিষেধের বিরুদ্ধে।’ (রুদ্রমঙ্গল)
’৩০-এর দশকে নজরুলকে যারা কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছিল তাদেরই মানসপুত্ররা ’৬০-এর দশকে সরকারি নীতি অনুসারে তাঁকে ইসলামি কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসিত করা। বদরুদ্দীন উমর এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের হাতে পড়ে নজরুল ইসলাম ধর্মের বাহক এবং সাম্প্রদায়িক সাহিত্যের অন্যতম প্রতিনিধি!... সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের এই নজরুল সাহিত্য-চর্চা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তা সর্বতোভাবে রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার হাতিয়াররূপে ব্যবহৃত।’
মার্ক্সীয় দর্শনের আলোকে কিংবা বৈজ্ঞানিক যুক্তিতে কমিউনিস্ট বলতে যা বোঝায় নজরুল পুরোপুরি তা ছিলেন না। তাঁর সাম্যবাদ মার্ক্সীয় সাম্যবাদের ছকে বাঁধা কোনো ব্যাপার নয়। যুদ্ধফেরত নজরুল কলকাতায় ফিরে এসে কমরেড মোজাফ্ফর আহমদের কাছে আশ্রয় পান এবং তাঁর সাহচর্যে কমিউনিজমে দীক্ষা নেন; কিন্তু তিনি কমিউনিস্ট হতে পারেননি অথবা বলা যায় সেটা তাঁর পক্ষে সম্ভবও ছিল না। কারণ, প্রকৃত কবি কোনো বিশেষ দর্শন বা ইজমে আটকে থাকেন না। তাঁর সাম্যবাদ ছিল পুরোপুরি মানবতাবাদী, মহাভ্রাতৃত্বের, ঐক্যের, মিলনের। ‘গাহি সাম্যের গান-/ যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা ব্যবধান/ যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রীশ্চান/ গাহি সাম্যের গান!’
একটি ঔপনিবেশিক পরিবেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যে মৌল অঙ্গীকার তিনি ধারণ করেছিলেন তার অনুরণন দেখি তাঁর কবিতায় নানাভাবেই। ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম—ঐ জিজ্ঞাসে কোনজন?/ কাণ্ডারী বল ডুবিছে মানুষ সন্তান মোর মা’র।’ কিংবা ‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান।/ মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’ এই ধরনের কবিতা লিখে তিনি সাম্প্রদায়িক ঐক্যকেই শুধু সমন্বিত রাখেননি, মানুষেরই জয়গান করেছেন।
ব্রিটিশবিরোধী চেতনার মধ্য দিয়ে কেবল পরাধীন ভারতের মুক্তি নয়, সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে শ্রমজীবী মানুষের সাবলীলভাবে বেঁচে থাকার প্রত্যয়ও তাঁর কাব্যদর্শনের একটি জোরালো অংশ। তাঁর সাম্যবাদ মার্ক্সীয় সাম্যবাদ না হলেও তা ছিল এক মহামুক্তির মানবিক সিঁড়ি। এ সম্পর্কে আতাউর রহমান বলেন: ‘নজরুলের সাম্যবাদী চেতনা পূর্ণ বৈজ্ঞানিক না হলেও মানবেতিহাসের বিপ্লবী প্রয়াস সম্পর্কে জাগ্রত ছিল। তাঁর বৈপ্লবিক চিন্তাধারা শক্তি সংগ্রহ করেছে ফরাসী ও রুশ বিপ্লবের ঐতিহ্য এবং শেলী, হুইটম্যান, গোর্কীর সাহিত্য থেকে।’ (নজরুলের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাধারা)। নজরুল ছিলেন রাজনীতিসচেতন কবি। এ কথা বলা অত্যুক্তি হবে না যে সে সময়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পুরোহিত রাজনৈতিক নেতাদের অনেকের চেয়েই নজরুলের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতা ছিল অনেক স্পষ্ট ।
’৩০-এর দশকে নজরুলকে যারা কাফের বলে ফতোয়া দিয়েছিল তাদেরই মানসপুত্ররা ’৬০-এর দশকে সরকারি নীতি অনুসারে তাঁকে ইসলামি কবি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। উদ্দেশ্য ছিল রবীন্দ্রনাথকে নির্বাসিত করা। বদরুদ্দীন উমর এ বিষয়ে লিখেছেন, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের হাতে পড়ে নজরুল ইসলাম ধর্মের বাহক এবং সাম্প্রদায়িক সাহিত্যের অন্যতম প্রতিনিধি!... সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের এই নজরুল সাহিত্য-চর্চা সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তা সর্বতোভাবে রাজনৈতিক সাম্প্রদায়িকতার হাতিয়াররূপে ব্যবহৃত।’
বর্তমান সময়েও লক্ষ করা যাচ্ছে একদল গবেষক ও বুদ্ধিজীবী নজরুলকে মুসলমানের কবি বানাতে উদগ্রীব। তাঁরা নজরুলবিষয়ক বিভিন্ন সেমিনারে ইসমাইল হোসেন সিরাজী ও নজরুল ইসলামকে এক কাতারে নিয়ে এসে সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যই চরিতার্থ করছেন। ইসমাইল হোসেন সিরাজী মূলত চেয়েছিলেন মুসলমানদের মুক্তি, কিন্তু নজরুল ইসলাম চেয়েছিলেন সমস্ত ধর্ম–বর্ণনির্বিশেষে ভারতবর্ষের মুক্তি। তাঁরা ‘অনল প্রবাহ’ এবং ‘অগ্নিবীণা’-র মধ্যে মিল খোঁজেন এবং নজরুলের ওপর সিরাজীর প্রভাবের কথাও বলেন। বিদ্রোহী মেজাজের দিক থেকে তো বটেই, কবিতার ব্যাকরণ ও কলাকৌশলগত দিক থেকেও এই দুটি কাব্যগ্রন্থের বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। প্রভাব কিছুটা থাকতেই পারে, তবে সেই প্রভাবের কারণে এই দুজন কবিকে এক কাতারে এনে মূল্যায়ন করাটা নজরুলকে খণ্ডিত করে অবমূল্যায়ন করার নামান্তরই বটে। বরং বলা যায় ‘অগ্নিবীণা’র ওপর রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’র কিছুটা প্রভাব রয়েছে। নজরুল তাঁর জীবদ্দশায় বারবার কবিগুরুর কাছে তাঁর ঋণ স্বীকার করেছেন। নজরুল শুধু ভারতবর্ষেরই মুক্তি চাননি, তিনি সারা পৃথিবীর নির্যাতিত মানুষের মুক্তির কথা বলেছেন। তাঁর কথায়, ‘আমি এই দেশে এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশের এই সমাজের নই। আমি সকল দেশের সকল মানুষের।’
উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকাকে আলাদাভাবে দেখবার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি উত্তর–ঔপনিবেশিক সাহিত্যভাবনায় নজরুলকে নতুনভাবে বিবেচনারও প্রয়াস চালানো দরকার। তাঁকে খণ্ডিত করে মুসলমানের কবি বানানোর অপচেষ্টায় যারা লিপ্ত, তাদের হাত থেকে নজরুলকে রক্ষা করতে হলে আজকের নতুন প্রজন্মকে নজরুলের পাশে দাঁড়াতে হবে, নজরুলের দর্শনকে ধারণ করতে হবে মনে ও মননে।
‘তরুণ কবিকে লেখা চিঠি’তে জার্মান কবি রাইনার মারিয়া রিলকে বলেছেন, ‘শিল্পী স্বয়ংপ্রতিষ্ঠ’। সেই স্বয়ংপ্রতিষ্ঠার পথ ধরে চেতনার যে আলো প্রতিভার রসায়নে সৃষ্টির মৌল অঙ্গীকারে উদ্ভাসিত হয়—সেই রকমের মৌলিক কবিপ্রতিভার অধিকারী ছিলেন নজরুল ইসলাম। তাঁর ভুবনে, তাঁর সৃজনপ্রতিভার জল-হাওয়ায় ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে মানুষেরই অবিচল বিচরণ। সচল জীবনের দিকে চলমান সেই কাফেলা, সেই যাত্রা নতুনের দিকে, সত্য ও সৌন্দর্যের দিকে।
শুধু কবিতায় নয়, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, কথিকা-বক্তৃতা-গানে জোরালোভাবেই তিনি উপনিবেশ-বিরোধী মনোভাব ব্যক্ত করেছেন এবং তারুণ্য ও যুবশক্তির বন্দনা করেছেন। যৌবনের অদম্য শক্তি ও সাহসকে তিনি পরাধীন ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য কাজে লাগাতে চেয়েছেন। ‘অরুণ প্রাতের তরুণ দল’কে এগিয়ে যাওয়ার মন্ত্র দিয়েছেন, ‘নওজোয়ান’দের কানে পৌঁছে দিয়েছেন মুক্তির বারতা।
সাম্য-মৈত্রী ও মুক্তির অনড় অন্বেষায় তাঁর কবিসত্তা সংক্রমিত। তিনি ভাগ্যহত মানুষের চির বন্ধু, সংগ্রামের মূর্ত প্রতীক, মানবিক মুক্তির কান্ডারি। ‘জাগো অনশন-বন্দী, ওঠরে যত/জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত।’ অতঃপর তিনি দৃঢ় চিত্তে আহ্বান করেছেন—‘নিজ-নিজ অধিকার জুড়ে দাঁড়া সবে আজ।’ বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের চৌকাঠে সন্নিবেশিত তাঁর চৈতন্যের সর্বৈব প্রশ্রয়। নির্যাতিত, শোষিত মানুষের জন্য, বিশ্বমানবিকতার পক্ষে তাঁর উচ্চারণের দার্ঢ্য এবং দ্রোহের সাবলীল তেজস্বিতা তাঁর বিদ্রোহী কবিসত্তার এক স্বতন্ত্র মৌল বৈশিষ্ট্য। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকাকে আলাদাভাবে দেখবার যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি উত্তর–ঔপনিবেশিক সাহিত্যভাবনায় নজরুলকে নতুনভাবে বিবেচনারও প্রয়াস চালানো দরকার। তাঁকে খণ্ডিত করে মুসলমানের কবি বানানোর অপচেষ্টায় যারা লিপ্ত, তাদের হাত থেকে নজরুলকে রক্ষা করতে হলে আজকের নতুন প্রজন্মকে নজরুলের পাশে দাঁড়াতে হবে, নজরুলের দর্শনকে ধারণ করতে হবে মনে ও মননে। তথাকথিত নজরুল–গবেষকেরা নজরুলকে একটি স্থিরবিন্দুতে যেন আটকে রেখেছেন। ’৩০, ’৪০, ’৫০ ও ’৬০–এর দশকের নজরুল-সমালোচনার প্যাটার্নটাও বদলানো প্রয়োজন। সাবঅলটার্ন কিংবা সমকালীন সাহিত্যতত্ত্বের আলোকে নজরুলকে আরও বিস্তৃতভাবে আলোচনার জন্য এই প্রজন্মের গবেষকদের এগিয়ে আসা দরকার।