জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ থেকে প্রকাশিত উদ্বোধনী খাম অবলম্বনে
জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ থেকে প্রকাশিত উদ্বোধনী খাম অবলম্বনে

মৃত্যুদিনে স্মরণ

জীবনানন্দের ধূসর পাণ্ডুলিপি

প্রায় ১০০ বছর পর এই যে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ পড়ছি, আস্বাদ করছি এবং সমান্তরালে পর্যবেক্ষণ করছি এ কাব্যগ্রন্থের ১৭টি অমূল্য কবিতা । ১৯৩৬ সালের ডিসেম্বরে (কবির ৩৬ বছর বয়সে) জীবনানন্দ দাশের ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশিত হয়। রবীন্দ্রনাথকে ১ কপি পাঠিয়ে জীবনানন্দ দাশ চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘৮-১০ বছর আগের রচিত কবিতা কুড়িয়ে এবার আর একখানা বই বের করলাম। আমার মনে হয়, বইয়ের কবিতাগুলোর একটা নিজস্ব Soul রয়েছে। সাহিত্যের বিষয়বস্তু চিরন্তন; কিন্তু প্রকাশের বৈশিষ্ট্য বিশেষ বিশেষ রূপের জন্ম দেয়।’

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো যদি বইটি প্রকাশের ৮–১০ বছর আগে লেখা হয়, সে হিসাবে প্রায় ১০০ বছর আগে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র কবিতাগুলো রচিত। অন্যদিকে জীবনানন্দের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝরা পালক’ প্রকাশিত হয় ১৯২৭ সালে (কবির ২৭ বছর বয়সে)। ‘ঝরা পালক’ নজরুল এবং মোহতিলালের কবিতার প্রভাবে রচিত এবং একজন কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ হিসেবে প্রকাশের তাড়নায় কবিতাগুলো আড়ষ্ট ছিল এবং অপরিপক্বও ছিল। ধরে নেওয়া যায়, ‘ঝরা পালক’ প্রকাশের পর এক/দুই/তিন বছর পর এই ১৭টি কবিতা রচিত। এই অল্প ব্যবধানে জীবনানন্দ কীভাবে একান্ত নিজস্ব স্বরে ও সুরে বাংলা কবিতার বাঁকবদল করা কবিতাগুলো লিখেছিলেন? কীভাবে জীবন ও মৃত্যুকে এতটা নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখেছিলেন কবিতায়? কীভাবে এই অল্প সময়ের ব্যবধানে বিশাল রূপান্তর হয় একজন কবির নিজস্ব কাব্যভাষা ও কবিতার অন্তদৃষ্টি? প্রায় ১০০ বছর পার হয়ে গেলেও চিরন্তন এর স্বাদ। মনে হয় না প্রায় ১০০ বছর পূর্বের সময়ে চলে গেছি, মনে হয় এ সময়েরই যাপনে কবিতাগুলো জীবিত ও গতিশীল হয়ে আছে এবং প্রতিটি কবিতারই আসলেই একটি করে ‘Soul’ আছে।

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র এক বড় অনুষঙ্গ প্রকৃতি, যা কবির হৃদয়ের সঙ্গে মিশে প্রকাশিত হয়েছে বিরল সৌন্দর্য ধারণ করে। গভীর প্রকাশ ঘটেছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, অতীতমুখিনতা, অস্তিত্বের সংকট, ঘোর ও বিপন্নতা। বারবার ফিরে এসেছে কবিতায় হারিয়ে ফেলা এক অমোঘ মুহূর্ত, যা ছিল ক্ষণিকের। জীবন ও মৃত্যু নিয়ে এক দার্শনিক বোধ সহজ হয়ে এসেছে। উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, বোধ, অলংকার, পরাবাস্তববাদ, অস্তিত্ববাদ ও অভিব্যক্তিবাদ সুনিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন জীবনানন্দ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে।

কবি বুদ্ধদেব বসু অক্লান্ত শ্রম দিয়েছিলেন ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশে। বুদ্ধদেব বলেছিলেন, ‘যখন বই ছাপা হলো ধাত্রীর কাজও আমি করেছিলাম, তাই ঐ গ্রন্থটিকে নিজের জীবনের একটি অংশ বলে মন হয় আমার।’ স্বভাবতই জীবনানন্দ বইটি উৎসর্গ করেন বুদ্ধদেব বসুকেই।

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র এক বড় অনুষঙ্গ প্রকৃতি, যা কবির হৃদয়ের সঙ্গে মিশে প্রকাশিত হয়েছে বিরল সৌন্দর্য ধারণ করে। গভীর প্রকাশ ঘটেছে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা, অতীতমুখিনতা, অস্তিত্বের সংকট, ঘোর ও বিপন্নতা। বারবার ফিরে এসেছে কবিতায় হারিয়ে ফেলা এক অমোঘ মুহূর্ত, যা ছিল ক্ষণিকের। জীবন ও মৃত্যু নিয়ে এক দার্শনিক বোধ সহজ হয়ে এসেছে। উৎপ্রেক্ষা, রূপক, প্রতীক, বোধ, অলংকার, পরাবাস্তববাদ, অস্তিত্ববাদ ও অভিব্যক্তিবাদ সুনিপুণভাবে ব্যবহার করেছেন জীবনানন্দ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে।

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র ‘নির্জন স্বাক্ষর’ কবিতায় দেখা যায়, অনুপম সৌন্দর্য মিশে আছে। প্রেমিকের ব্যথিত বর্তমান ছুঁয়ে কবিতাটি অতীতমুখী হয়ে প্রেমিকের বর্তমানে ফিরে আসে।

জীবনানন্দ দাশ

‘মাঠের গল্প’ কবিতায় চারটি ভাগ—মেঠো চাঁদ, পেঁচা, পঁচিশ বছর পরে এবং কার্তিক মাঠের চাঁদ। মেঠো চাঁদ অংশে জোছনাশোভিত চাঁদের আলোয় একা মাঠ, একা মানুষের চিত্র হৃদয়ে সুদূর হয়ে আসে। এখানে প্রকৃতির মাঝে নিঃসঙ্গ রূপ এবং সেই রূপে ব্যক্তিরও একাকিত্ব ধরা পড়ে। পেঁচা অংশেও রাতেরই কবিতা। এখানে পেঁচার চোখে মানুষের একাকিত্বের প্রকাশ। পঁচিশ বছর পরে অংশটি শুরুই হয় টুইস্ট দিয়ে। ভাবনায় আসে প্রথমেই পঁচিশ বছর পরে কী দেখা হয়েছিল? তা আর জানা হয় না। পাখির ডিমের খোসা, শসার ফুল, হলদে তৃণ, চড়ুইয়ের ভাঙা বাসা, মাকড়ের ছেঁড়া জাল, শুকনো মাকড়সা—প্রকৃতির আরও কত কিছু অবলম্বন করে লেখা কবিতা! কার্তিক মাঠের চাঁদ অংশ চাঁদকে নিয়েই রচিত। মায়াবী দৃশ্যকল্প চাঁদের আগমনকে মোহনীয় করে তোলা।

‘সহজ’ কবিতায় আছে মেনে নেওয়া এক ‘না’। না আক্ষেপ, না দুঃখবোধ! এক চিত্রপটে যেন আঁকা অতীতের না–পাওয়া এক গহিন অনুভূতি।

‘কয়েকটি লাইন’ কবিতার প্রকাশ সৃষ্টির সেই আদি সূত্রে—সবাই একদিন চলে যাবে। সব জমকালো মুহূর্ত জীবনের, ব্যর্থতা জীবনের একদিন শেষ হবে। এই দার্শনিকতার ভেতর নিজ নারীর কথা মনে পড়ে কবির, যাকে পাওয়া হয়নি, অথচ যে অস্তিত্বে মিশে আছে আরেকটি হৃদয় হয়ে।

‘অবসরের গান’ সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর। অলস মুহূর্তে যন্ত্রণাবদ্ধ এই পৃথিবী থেকে নিজেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে এনে কিছুটা আয়েশে প্রকৃতির সঙ্গ নেওয়া। প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের উৎসবের যৌথতাও এসেছে নিবিড়তায়। ‘চারিদিকে নুয়ে প’ড়ে ফলেছে ফসল,/ তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল!’ কবিতার এই দুটো চরণ নিয়ে বোদ্ধামহল কী সমালোচনা উসকে দিয়েছিল সেই সময়! অথচ এ কবিতাতেই কবি আরও বলেছিলেন, ‘অলস মাছির শব্দে ভরে থাকে সকালের বিষণ্ন সময়,/ পৃথিবীরে মায়াবীর নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়!’

‘অনেক আকাশ’ কবিতা যেন কবির ‘সলিলোকুই’—একান্তে নিজের সাথে কথা বলা। এ কবিতায় কোনো বাঁধন নেই, অনুভূতি ভাসিয়ে দেওয়া। যেন কোনো মানুষ সমুদ্রের ভরাট আর গভীর জলরাশির ভারী ভারী ঢেউ সরিয়ে ধীরে আগাচ্ছে আর ভাবছে, ‘নীড়ের মতন বুকে একবার তার মুখ গুঁজে ঘুমাতে চেয়েছি।’

‘পরস্পর’ কবিতাটি নারীকে কেন্দ্র করে। পাঠকের সাথে কথা বলে যাচ্ছে যেন কবিতাটি। এ কবিতাতেই ‘সাদা স্তন’ উপমা ব্যবহার করা হয়।

‘বোধ’ অস্তিত্ববাদী কবিতা। ভেতরে আঘাত, সম্মুখে বিভ্রম, নিরুপায় মন, প্রেমিকাকে হারাবার হাহাকার সব একসাথে মিশে জল হয়ে আছে যেন এই কবিতায়। তাই কবি ভাবেন, ‘সে কেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে একা কথা কয়!’

‘অবসরের গান’ সম্পূর্ণ প্রকৃতিনির্ভর। অলস মুহূর্তে যন্ত্রণাবদ্ধ এই পৃথিবী থেকে নিজেকে অনেকটা দূরে সরিয়ে এনে কিছুটা আয়েশে প্রকৃতির সঙ্গ নেওয়া। প্রকৃতির সাথে মানুষের উৎসবের যৌথতাও এসেছে নিবিড়তায়। ‘চারিদিকে নুয়ে প'ড়ে ফলেছে ফসল/ তাদের স্তনের থেকে ফোঁটা ফোঁটা পড়িতেছে শিশিরের জল।’ কবিতার এই দুটো চরণ নিয়ে বোদ্ধামহল কী সমালোচনা উসকে দিয়েছিল সেই সময়! অথচ এই কবিতাতেই কবি আরও বলেছিলেন, ‘অলস মাছির শব্দে ভরে থাকে সকালের বিষণ্ন সময়/ পৃথিবীরে মায়াবীর নদীর পারের দেশ বলে মনে হয়!’

‘ক্যাম্পে’ কবিতায় দেখা হয় চিত্রায়িত রাত, চিত্রায়িত জোছনাশোভিত হরিণের দল। কোমলতা, করুণা, ভীরুতা মিশে হাহাকারের এক অদ্ভুত আহত মায়াবী চিত্ররূপময়তাই ক্যাম্পে। সহজভাবে এগিয়ে যায় কবিতা রাতে ঘাই হরিণীর ডাকে আর শেষ হয় মন ভেঙে। সেই সময়ে এই কবিতা নিয়েও বোদ্ধামহলে কত সমালোচনা!

‘জীবন’ সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’তে। এখানে ৩৪টি স্তবক এবং প্রতিটি স্তবকে ৯টি করে চরণ। মৃত্যু, অর্থহীনতা, পুরোনো প্রেমানুভূতি, ব্যর্থতা, সময়কে অধিকার করতে না পারা, প্রকৃতির কাছ থেকে পাওয়া মানসিক আশ্রয় মিলেই এই কবিতা। ৩৪টি ক্যানভাসে ৩৪টি ছবি হয়ে অঙ্কিত যেন এই দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর কবিতা।

কবি জীবনানন্দ দাশ

‘১৩৩৩’ প্রেমের কবিতা। একদা সম্ভাব্য প্রেমিকা প্রেমিকের কাছে এসেছিল অমোঘ মুহূর্ত নিয়ে। সেই অনুভূতি পরবর্তী সময়ে আশাহত প্রেমিক হৃদয়ে গোপন আলোর রোশনাই করে রাখে বছরের পর বছর এবং সেই অনুভূতি ঘিরেই এই কবিতা।

‘প্রেম’ কবিতাটি প্রেম নিয়েই। শাশ্বত প্রেম, নর-নারীর প্রেম, চিরচেনা প্রেম, প্রেমকেই বলা, প্রেমের সাথে কথা বলা। প্রেমকে মহিমান্বিত করা নয়, প্রেম যে চিরন্তন তা–ই অনুধাবন করা।

‘পিপাসার গান’ প্রকৃতি নিয়ে লেখা। প্রকৃতির অনুভূতি কেমন হয়? সেটা যেন জানা হয়ে যায় এ কবিতায়।

‘পাখিরা’ অস্তিত্ববাদী কবিতা। জীবনের দর্শনদর্পণে রেখে দেখা যেন এ কবিতা।

‘শকুন’ কবিতা যুদ্ধের কদাকার দিককে ইঙ্গিত করে যায় প্রতীকীভাবে। যুদ্ধে যখন মানুষের বেঁচে থাকা, মানুষের যাপন অগুরুত্বপূর্ণ, বরং গুরুত্বপূর্ণ কেবল যুদ্ধ—তার এক স্থির চিত্র যেন এ কবিতা।

‘মৃত্যুর আগে’ কবিতায় কবি বলেন, ‘আমরা দেখেছি যারা বুনো হাঁস শিকারীর গুলির আঘাত/ এড়াতে উড়িয়া যায় দিগন্তের নম্র নীল জোৎস্নার ভিতরে।’ মৃত্যুর আগে এই পৃথিবী কী রূপময় ছিল! তারই বহিঃপ্রকাশ দেখি চিত্ররূপময়তায় এ কবিতায়।

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র শেষ কবিতা ‘স্বপ্নের হাতে’। কবিতাটি জীবনদর্শন আর প্রকৃতির নিবিড় স্পর্শে চুপচাপ এগিয়ে চলে শেষ হয় এবং তার সাথে পরিসমাপ্তি ঘটে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থের।

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র ‘শকুন’ কবিতাটি বাদে বাকি ১৬টি কবিতাই দীর্ঘ কবিতা। ভূমেন্দ্র গুহর স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়, ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ নিয়ে জীবনানন্দের একধরনের স্মৃতিময় মমতাস্পর্শ ছিল। ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ নিয়ে জীবনানন্দ একদা বলেছিলেন, ‘ওখানে একটু বেশি অগোছালো হয়ে পড়তে হয়েছিল।’

অল্প সময়ের ব্যবধানে ‘ঝরা পালক’–এর কবিতাগুলো থেকে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র কবিতাগুলোতে এসে আধুনিক বাংলা কবিতায় এক নতুন আকাশ দিয়েছিলেন জীবনানন্দ। তিনি চাইতেন তাঁর কবিতাকে একটি অখণ্ড ও অটুট অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রাহ্য করা হোক এবং এই চাওয়া ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’র কবিতাগুলো সৃষ্টির মুহূর্তকাল থেকেই। ‘ঝরা পালক’ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের যে নেতিবাচক মন্তব্য ছিল, তা কি আরও জেদ, আরও অনুপ্রেরণায় নিয়েছিলেন জীবনানন্দ? জীবনানন্দ খোদাই করলেন কবিতার এক নতুন পথ আর তাতে বসালেন নতুন নদীর নতুন বহতা জল। বাংলা কবিতাকে সম্পূর্ণভাবে পাল্টে দিয়ে বিষয়ে, প্রকাশে ও অনুভবে জীবনানন্দ দাশ হয়ে উঠলেন বিপন্ন বিস্ময়ের প্রকৃতির কবি! রবীন্দ্রনাথও জীবনানন্দের পাঠানো ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ পাঠ করে চিঠিতে জীবনানন্দকে জানান, ‘তোমার কবিতাগুলো পড়ে খুশি হয়েছি। তোমার লেখার রস আছে, স্বকীয়তা আছে এবং তাকিয়ে দেখার আনন্দ আছে।’

১৯২২ সালে প্রকাশিত টি এস এলিয়টের লেখা ‘ওয়েস্ট ল্যান্ড’ ইংরেজি সাহিত্যের বাঁক বদলে দিয়েছিল আধুনিক কবিতায়, যা ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র ও শিক্ষক কবি জীবনানন্দকে কবিতায় প্রসারিত হতে, আড়ষ্টতা মুছে ফেলে বিশাল এক সৃষ্টিশীলতায় মগ্ন হতে অনুপ্রাণিত করেছিল হয়তো। রবীন্দ্রবলয়হীন এক উন্মুক্ত জীবনদায়ী কবিতার নতুন আকাশ সৃষ্টি হয় জীবনানন্দের হাত ধরেই; ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ প্রকাশের মাধ্যমে।

একবার বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন, ‘“ধূসর পাণ্ডুলিপি”তে আমরা যে কবিকে পেলুম তিনি সুদূর, স্বপ্নাবিষ্ট; তার মনোলোক যেন একটি ধূসর কোমল পরিমণ্ডল যেখানে যাকে বাস্তব বলি তার আভাসমাত্র নেই, কিন্তু সত্য বলে যাকে অনুভব করি তার রঙিন ছায়া পড়েছে। সেই তাঁর নিজস্ব জগত—একান্তই তাঁর—দূর থেকে যাকে মনে হয় সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অলংকরণে অত্যন্ত বেশি আচ্ছন্ন, স্বপ্নের আত্মচালনায় অত্যন্ত বেশি মসৃণ, কিন্তু যার ভিতরে একবার প্রবেশ করলে সহজেই নিশ্বাস নেয়া যায়, সহজেই বিশ্বাস করা যায়।’

‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ বাংলা কবিতার আকাশে এক অপূর্ব, অনন্য নক্ষত্র।