
২০০৮ সালের ১৭ অক্টোবর ফকির লালন শাহর ১১৮তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে লেখাটি প্রথম আলোর সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছিল। আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো।
লালনগীতি আজ দেশ-বিদেশে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন ভাষার গবেষক, পণ্ডিত এ গানের অকৃত্রিম বাণী ও সুর অনুসন্ধান করছেন। ইত্যবসরে ইংরেজি, ফরাসি, ইতালি, জার্মান, জাপানি, হিন্দি প্রভৃতি ভাষায় লালনগীতি অনূদিত হচ্ছে বলে ক্রমশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিস্তৃতি লাভ করছে লালনের গান আর তাঁর পরিচিতি। উনিশ শতকের আশির দশকে কাঙাল হরিনাথ (১৮৩৩-১৮৯৬) থেকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১) হয়ে পরবর্তী সময়ে অনেক সুধীজন লালনগীতি সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন। কারও কারও সংগ্রহে প্রতীয়মান হয় বিশ্বাসযোগ্য পাঠ। এ ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের সংগ্রহ যেহেতু আদি পাণ্ডুলিপিকেন্দ্রিক, তাই তাঁর সংগ্রহ লালনচর্চার ইতিবৃত্তে যেমন অপরিসীম গুরুত্ব বহন করে, তেমনি তা চিহ্নিত হতে পারে দেশজ সংস্কৃতির একটি উল্লেখযোগ্য সম্ভার হিসেবে। রবীন্দ্র-সংগৃহীত লালনগীতি এযাবৎ ‘লালনগীতিকা’ (১৯৫৮), ‘লালন ফকির: কবি ও কাব্য’ (১৩৮৬) ও ‘লালন সাঁই: দেশ এবং কাল’ (১৯৯৫)—এ তিনটি গ্রন্থে প্রধানত মুদ্রিত হয়েছে। এ ছাড়া রবীন্দ্রনাথ নিজের সংগ্রহভান্ডার থেকে প্রবাসী পত্রিকায় ১৩২২ বঙ্গাব্দে প্রকাশ করেন প্রায় ২০টি গান। তাঁর ‘ছন্দ’ (প্র-স ১৩৪৩) গ্রন্থে ‘বাংলা ছন্দের প্রকৃতি’ প্রবন্ধে প্রবাসীতে প্রকাশিত দুটি প্রায় পুরোপুরি আর একটি খণ্ডিত গান মুদ্রিত হয়েছে। অস্বীকার করা যাবে না যে রবীন্দ্র-উদ্যোগে অনুপ্রাণিত হয়েই মুহম্মদ মনসুরউদ্দিন (১৯০৪-১৯৮৭), উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য (১৮৯৯-১৯৭০), বসন্তকুমার পাল (১৮৯০-১৯৭৫) প্রমুখ লালনগীতি ও লালন-পরিচিতি সংগ্রহ ও প্রচার করে লালনচর্চার ধারা সমৃদ্ধ ও গতিশীল করেছেন।
রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত লালনের গানের সংখ্যা এবং তিনি কতগুলো লালনগীতির আদি খাতা জোগাড় করেছিলেন, তার সঠিক হদিস এখনো জানা যায়নি। সাধক লালন ফকির ১৮৯০ সালে দেহত্যাগ করেন। কয়েক মাস পর পারিবারিক জমিদারি পরগনা শিলাইদহ এস্টেট পরিচালনার জন্য রবীন্দ্রনাথ ১৮৯১ সালে এখানে আসেন। এর দেড় যুগ পর লালনশিষ্যদের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা গড়ে ওঠে। সে সময় তিনি লালনের আসল গান পাওয়ার জন্য বিশেষ মনোযোগী হন। কয়েকটি সূত্রের সমন্বয়ে বোঝা যায়, রবীন্দ্র-সংগ্রহে লালনগীতির অন্তত তিন-চারটি আদি পাণ্ডুলিপি ছিল। এর বাইরে আরও তিনটি আদি খাতা তাঁর ভান্ডারে থাকার সম্ভাবনাকে উড়ো খবর বলে এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
২.
সুবোধচন্দ্র মজুমদার নামের শান্তিনিকেতন থেকে ইংরেজি ও ইতিহাসের এক শিক্ষককে রবীন্দ্রনাথ বাংলা ১৩১৩ সালে শিলাইদহে এনে নিযুক্ত করেছিলেন অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-ম্যানেজারের পদে। এখানে অবস্থানকালে তিনি একদিন ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে গিয়ে লালনশিষ্যদের কাছ থেকে লালনগীতির একটি আদি খাতা হস্তগত করেন। কলকাতার বঙ্গদর্শন (নব পর্যায়) পত্রিকার ১৩১৬ বঙ্গাব্দের বৈশাখ সংখ্যায় ‘গ্রাম্যসাহিত্য’ শিরোনামে সুবোধ মজুমদারের একটি প্রবন্ধ বের হয়। ওই রচনার এক স্থানে তিনি জানিয়েছেন, ‘ছোড়িয়ার আখড়ায় লালন ফকিরের গানের যে খাতা আমরা সংগ্রহ করেছিলাম তাতে এত বর্ণাশুদ্ধি যে তাহা পাঠের অযোগ্য...।’ উদ্ধৃত অংশ অনুসরণে এবং রবীন্দ্রজীবনের সমসময়ের পারিপার্শ্বিকতা লক্ষ করে আমাদের ধারণা, রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক আদিষ্ট হয়ে সম্ভবত লালনের প্রকৃত গান লিখে আনতে গিয়ে সুবোধচন্দ্র লালনগীতির একটি আদি খাতা ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি থেকে নিয়ে আসেন। কিন্তু প্রবন্ধ রচনাকালে সেটি তাঁর হেফাজতে আর ছিল না। খাতাটি সুবোধচন্দ্র আখড়ায় ফেরত দিয়েছিলেন নাকি রবীন্দ্রনাথকে দেন—এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন।
ঘটনার বছরখানেক পর রবীন্দ্রনাথ লালনশিষ্য মনিরুদ্দীন শাহর (১২৪৫?-১৩৩৫ বঙ্গাব্দ) হস্তলিখিত লালনগীতির দুটি পাণ্ডুলিপি পান। পাণ্ডুলিপি দুটি বর্তমানের শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে নিবন্ধিত হয়ে আছে। নিবন্ধন সংখ্যা: 138A (I); (II)। তিন খণ্ড লালনসংগীত বইয়ের সংকলক ছেঁউড়িয়ার নিবাসী ফকির আনোয়ার হোসেন মন্টু শাহর (লালনের প্রশিষ্য, কোকিল শাহর শিষ্য) কাছে মনিরুদ্দীন শাহর হাতের লেখা লালনগীতির একটি ছিন্ন ও খণ্ডিত খাতা আছে। মন্টু শাহর সৌজন্যে ২০০৪ সালের ২৪ মার্চ খাতাটি আমি ফটোকপি করে নিই। এ খাতার হাতের লেখা এবং রবীন্দ্রভবনের দুটি খাতার যেসব পৃষ্ঠার আলোকচিত্র বিভিন্ন গ্রন্থে মুদ্রিত হয়েছে, তা মিলিয়ে দেখলে অনায়াসে ধারণা করা যায়, রবীন্দ্রভবনের খাতা দুটির লিপিকার মনিরুদ্দীন শাহ। বিষয়টি প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেন ‘যুক্তবঙ্গে লালনচর্চা’ (২০০৮) গ্রন্থের লেখক সৈয়দ মনসুর আহমদ। তিনি তাঁর গ্রন্থের ৯১ পৃষ্ঠায় মন্টু শাহর কাছে সংরক্ষিত মনিরুদ্দীন শাহর খাতাটির বরাত দিয়ে বলেছেন যে মনিরুদ্দীন শাহ দুটি খাতায় পেনসিলের দাগ টেনে নিজ হাতে ২৯৭টি গান কালিতে লিপিবদ্ধ করে ১৩১৪-১৫ সালের দিকে রবীন্দ্রনাথকে দেন।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে ১৯৪৭ সালে লালনগীতির দুটি পাণ্ডুলিপি জমা দেওয়া হয় শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন গ্রন্থাগারে। এ দুটি পাণ্ডুলিপি থেকে পরবর্তী সময়ে পুনরাবৃত্তি ১২টি বাদ দিয়ে ২৮৫টি গান অবিকৃতভাবে ছাপা হয়েছে সনত্কুমার মিত্রের ‘লালন ফকির: কবি ও কাব্য’ বইয়ে। অবশ্য এর আগে বিশুদ্ধ বানানে আলোচিত পাণ্ডুলিপির ৮৯টি গান সংযুক্ত করা হয়েছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশিত ‘লালনগীতিকা’ নামের মতিলাল দাশ ও পীযূষকান্তি মহাপাত্রের সম্পাদিত গ্রন্থে।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে উপায় নেই। কারণ, সে যুগে তিনি লালনগীতির আদি খাতা যদি তাঁর হেফাজতে না নিতেন, তাহলে এত দিনের মধ্যে ওগুলো নিশ্চয়ই বিনষ্ট হতো অথবা একেবারে দুর্লভ হয়ে যেত।
উল্লেখ্য, রবীন্দ্রনাথের পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে লালনের একটি গানের খাতা পাওয়া গেছে—এমন খবর শুনে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য ১৯৪৯ সালে খাতাটি পরখ করে দেখার জন্য গিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে। সেদিন তাঁর সঙ্গে ছিলেন রবীন্দ্রবিষয়ক নানা গ্রন্থের রচয়িতা শিলাইদহের সাবেক নিবাসী শচীন্দ্রনাথ অধিকারী। খাতাটি দেখে শচীন্দ্রনাথ পাণ্ডুলিপির লেখক হিসেবে শনাক্ত করেন বামাচরণ ভট্টাচার্য নামের শিলাইদহ জমিদারি এস্টেটের এক পুরোনো কর্মচারীকে। তাই বলা যেতে পারে, বামাচরণের লেখা বলে শনাক্ত করা খাতাটি রবীন্দ্র-পরিবারের পক্ষে ১৯৪৭ সালে জমা দেওয়া, অর্থাৎ মনিরুদ্দীন শাহর লেখা দুটি খাতার একটি যদি না হয়ে থাকে, তাহলে না মানার জো নেই যে বামাচরণ ভট্টাচার্যের লিখিত পাণ্ডুলিপিটি বর্তমানে নিখোঁজ রয়েছে।
৩.
লালনের সবচেয়ে প্রিয় দুই শিষ্যের নাম শীতল শাহ ও ভোলাই শাহ। লালনশিষ্য ভক্তদের কাছে শীতল ও ভোলাই পরিচিত ছিলেন যথাক্রমে ‘বড় ফকির’ ও ‘ছোট ফকির’ নামে। শীতল শাহর ছেলে জগৎ ওরফে জগো শাহর লেখা লালনগীতির একটি খাতা সম্প্রতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এককালে খাতাটির মূল মালিক ছিলেন ভোলাই শাহ। এ খাতার একটি পাতায় মন্তব্য লেখা আছে: ‘Ms of Baul Songs (Colected by tagore?) rare’। এটি সুদীর্ঘকাল ছিল লোকচক্ষুর আড়ালে। ১৯৯৫ সালের পর শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে খাতাটি জমা পড়ে। জমা পড়ার আগে বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজের অধ্যাপক লালন ও বাউল-গবেষক শক্তিনাথ ঝা আলোচ্য খাতা থেকে ৩২০টি গান প্রথমে অবিকৃতভাবে তাঁর ‘ফকির লালন সাঁই: দেশ কাল এবং শিল্প’ (১৯৯৫) গ্রন্থে এবং পরে ‘লালন সাঁই-এর গান’ (২০০৫) বইয়ে বিশুদ্ধ বানানে প্রকাশ করেছেন। শক্তিনাথ ঝা বর্তমান খাতায় লিখিত বিভিন্ন সন-তারিখ দেখে জানিয়েছেন, ১২৯৯ থেকে ১৩১৬ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত আখড়ায় রক্ষিত আরেকটি খাতা থেকে এর গানগুলো অনুলিপি করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কদমখালীর লালনমেলায় বর্তমান শক্তিনাথ ঝার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত আলাপচারিতা আর ‘লালন সাঁই-এর গান’ বইয়ে বর্ণিত ভাষ্য থেকে জানা গেছে, ভোলাই শাহর খাতাটি সংরক্ষিত ছিল রবীন্দ্র-তনয়া মীরা দেবীর মেয়ে নন্দিতার স্বামী কৃষ্ণ কৃপালনীর কাছে। কৃষ্ণ কৃপালনীর কাছ থেকে শ্যামলী তান খাস্তাগীর এটি নিয়েছিলেন দেখার জন্য। শ্যামলীর সূত্রে খাতাটির গানগুলো ‘লালন সাঁই: দেশ কাল এবং শিল্প’ গ্রন্থে প্রকাশিত হওয়ার পর এটি জমা দেওয়া হয়েছে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন গ্রন্থাগারে। নিবন্ধন সংখ্যা: Ms 480। শক্তিনাথ মনে করেন, ভোলাই শাহর আলোচিত খাতা থেকেই ২০টি গান রবীন্দ্রনাথ ছেপেছিলেন প্রবাসী পত্রিকা এবং ‘ছন্দ’ নামের বইয়ে।
যত দূর মনে হয়, মনিরুদ্দীন শাহর লিখিত দুটি খাতার (১২৬+১৭১) ২৯৭টি গান পেয়েও রবীন্দ্রনাথ থামেননি। অতঃপর তিনি ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি থেকে নিয়ে যান ভোলাই শাহর বর্তমান খাতাটি।
রবীন্দ্রনাথ-সংগৃহীত প্রবাসী পত্রিকা বা ‘ছন্দ’ বইয়ে সংকলিত লালনগীতির সঙ্গে ভোলাই শাহর খাতায় লেখা গানগুলোর পাঠে মিল আছে সত্য, কিন্তু সামান্য কিছু পাঠান্তরও চোখে পড়ে। তাই শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় না যে রবীন্দ্রনাথ পুরোপুরি ভোলাই শাহর পাণ্ডুলিপির পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য কিছু কথান্তর শক্তিনাথের দৃষ্টি টেনেছে বলে তিনিও অনুমান করেছেন, ভোলাই শাহর খাতার পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ আরও একটি খাতার পাঠ অনুসরণ করে থাকতে পারেন; যে খাতাটি বর্তমানে শান্তিনিকেতনের কোথাও থাকতে পারে। শক্তিনাথের অনুমানের সমর্থনে উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের একটি ভাষ্য এ পর্যায়ে আরেকটি সূত্র হিসেবে উল্লেখ করা যায়।
উপেন্দ্রনাথ ১৯২৫ সালে যখন ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়াবাড়িতে প্রথম যান, সেই সময়ের একটি শোনা কথা উদ্ধৃত করে তিনি ‘বাংলার বাউল ও বাউল গান’ (১৯৫৭) গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আশ্রমের কর্তৃপক্ষরা বলে যে, সাইজীর আসল খাতা শিলাইদহের “রবি বাবু মশায়” লাইয়া গিয়াছেন।’ (তৃ-মু, ১৪০৮ পৃ, ৫৩৩)
ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া খাতার জন্য লালনের শিষ্য, অনুসারীরা বারবার অনুরোধ-অভিযোগ করেছেন, কিন্তু খাতাটি আর ফেরত আসেনি। তিরিশের দশকে কুষ্টিয়া মহকুমার মুনসেফ ও ‘লালনগীতিকা’র অন্যতম সম্পাদক মতিলাল দাশ বসুমতী পত্রিকায় ১৩৪১ সালের শ্রাবণ সংখ্যায় ‘লালন ফকিরের গান’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘কুষ্টিয়া আসিয়া শুনিলাম যে, কুষ্টিয়ার সন্নিকটেই লালন ফকিরের আখড়া বর্তমান।...লালনের অন্যতম প্রিয় শিষ্য ভোলাই সা ফকির বাঁচিয়া আছেন। তাঁহার নিকট গুরুর খবর জিজ্ঞাসা করিলাম।...ভোলাই সা বলিল, “দেখুন, রবিঠাকুর আমার গুরুর গান খুব ভালবাসিতেন, আমাদের খাতা তিনি লইয়া গিয়াছেন, সে খাতা আর পাই নাই, কলিকাতা ও বোলপুরে চিঠি দিয়াও কোনও উত্তর পাই নাই।”’ এ কথার সত্যতা কত দূর কে জানে?
অন্নদাশঙ্কর রায় ১৯৩৫ সালের গোড়ার দিকে ভারতের দেরাদুন থেকে জেলা নদীয়ার কুষ্টিয়া মহকুমায় বদলি হয়ে সাবডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) হয়ে আসেন। ১৯৩৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিনি ছিলেন ওই পদে। অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘লালন ও তাঁর গান’ (১৩৮৫) নামের বইয়ে লিখিত এক বিবরণে জানা যাচ্ছে, এখানে অবস্থানকালে বিশিষ্ট সংবাদপত্র ও সাহিত্যসেবী কাঙাল হরিনাথের জ্ঞাতি ভাইপো ভোলানাথ মজুমদার তাঁকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, লালনগীতির আসল যে খাতাটি রবীন্দ্রনাথ লালনের আখড়াবাড়ি থেকে নিয়ে গেছেন, তা তিনি ‘যেন কবিগুরুর কাছ থেকে উদ্ধার করতে সাহায্য’ করেন। এ প্রসঙ্গে অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘আসল পুঁথিখানি যে কবির কাছে আছে এ কথা মেনে নিতে আমার অনিচ্ছা ছিল। এ নিয়ে গুরুদেবকে বিরক্ত করা আমি অসমীচীন মনে করি।’ (পৃ. ৪২)
৪.
লালন মুখে মুখে গান বাঁধতেন। শিষ্যরা সেই গান খাতায় টুকে রাখতেন। তাঁর মৃত্যুকালে ছেঁউড়িয়ার সাধনপীঠে ১৫-১৬ জন শিষ্য ছিলেন। শিষ্যদের মধ্যে অনেকের কাছেই ছিল আখড়ায় রক্ষিত মূল পাণ্ডুলিপি থেকে অনুলিপি করা খাতা। সেসব খাতার বেশির ভাগই বিলুপ্তপ্রায়। কয়েকজন লালন-প্রশিষ্য ও ভক্ত-অনুসারী আদি পাণ্ডুলিপি গুরু বা অন্য কোনো সূত্রে পেয়ে সংরক্ষণ করছেন বটে, কিন্তু প্রত্যক্ষ সূত্রে এবং খবরাখবরে মোটামুটিভাবে জানা যায় যে এসব খাতার মলাট যেমন তেল-চুকচুকে, তেমনি ভেতরের পাতা জরাজীর্ণ ও খণ্ডিত; যার বহুলাংশ পাঠের অযোগ্য। এর পরও খাতাগুলো দেখার সুযোগ খুবই কম। খাতার বর্তমান মালিকদের কেউ কেউ মনে করেন, এগুলো সাধনতত্ত্ব; সবাইকে দেখাতে নেই। এমন কথাও শোনা যায়, কারও কারও মৃত্যুর পর তাঁর অন্তিম বাসনা মেটাতে খাতাগুলো কবরে পুঁতে দেওয়া কিংবা মৃতদেহের সঙ্গে চিতায় অগ্নিদাহ করা হয়েছে।
বর্তমানে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত তিনটি খাতা বাদে আর কোথাও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে লালনগীতির আদি পাণ্ডুলিপি নেই। তাই রবীন্দ্রনাথের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে উপায় নেই। কারণ, সে যুগে তিনি লালনগীতির আদি খাতা যদি তাঁর হেফাজতে না নিতেন, তাহলে এত দিনের মধ্যে ওগুলো নিশ্চয়ই বিনষ্ট হতো অথবা একেবারে দুর্লভ হয়ে যেত।
যে খাতা ফিরে পাওয়ার জন্য ভোলাই শাহ আজীবন চেষ্টা করেছিলেন, শান্তিনিকেতন থেকে লালনগীতির সেই আদি খাতাটি বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা এবং সেই সঙ্গে মনিরুদ্দীন শাহর লিখিত রবীন্দ্রনাথকে প্রদান করা লালনগীতির আদি দুটি খাতা মাইক্রোফিল্ম অথবা ফটোকপি করিয়ে নেওয়া কি আজ সম্ভব নয়?