অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো
অলংকরণ: আনিসুজ্জামান সোহেল। গ্রাফিকস: প্রথম আলো

স্বাধীনতা দিবস সবিশেষ

মুক্তিযুদ্ধের নতুন সামাজিক ইতিহাস রচনার কর্তব্য

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ নতুন করে ফিরে এসেছে। চিরচেনা কোনো সরলীকৃত বয়ানে নয়, জাতীয়তাবাদ-উদ্দীপ্ত কিংবা দলনিষ্ঠ কোনো প্রবল ভাষ্য হিসেবে নয়, মুক্তিযুদ্ধ ফিরে এসেছে পাল্টাপাল্টি বয়ান এবং রাজনীতির লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে নতুন পর্যালোচনামূলক বোঝাপড়ার সুযোগসমেত।

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিবিধ পক্ষ বিবিধ দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের ভাষ্য কিংবা বয়ান হাজির করছে। এক পক্ষ বলতে চাইছে, এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যথেষ্ট বিভাজনের রাজনীতি করা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের ব্যক্তিগত কিংবা গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষায় রাজনৈতিক ঢাল, আড়াল বা হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এই চর্চার অবসান হওয়া জরুরি। অনেকেই ‘জুলাই বিপ্লব’কে ‘দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধ’ হিসেবে দেখতে চাইছেন। তাঁরা বলছেন, ১৯৭১ সালে সংঘটিত ‘প্রথম মুক্তিযুদ্ধ’ মানুষকে প্রকৃত মুক্তি এনে দেয়নি। এই আলাপের জেরেই কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধকে নতুন আলোয় দেখার কথা ভাবছেন দলতান্ত্রিক, এমনকি জাতীয়তাবাদী বোঝাবুঝির বাইরে গিয়ে তাকে নতুন করে বোঝার কথা বলছেন।

আবার কেউ কেউ মুক্তিযুদ্ধের পুরো প্রসঙ্গটিকেই আওয়ামী ফ্যাসিবাদী প্রোপাগান্ডা হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে আলাপ-আলোচনার পরিসর থেকে সরিয়ে রাখতে, আড়াল করতে কিংবা মুছে দিতে চাইছেন। অবধারিতভাবেই এর বিপরীতে আরেক দল মুক্তিযুদ্ধের পুরোনো সরলীকৃত বয়ানকেই ফিরিয়ে আনতে চাইছে।

বলা বাহুল্য, এসব চাওয়াই রাজনৈতিক এবং নিজ নিজ পক্ষ-সংশ্লিষ্টতা থেকে উত্থাপিত। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ১৯৭১-এর সঙ্গে ২০২৪-এর সম্পর্ক নিরূপণে সুস্পষ্ট রাজনৈতিক দলানুগত্য দেখতে পাওয়া যায়। ‘জুলাই’য়ে হাসিনা-বিরোধী যে ঐক্য স্থাপিত হয়েছিল, তা দলমতের পার্থক্য আপাত অর্থে ছাপিয়ে গেলেও অব্যবহিত পরই পার্থক্যগুলো সুস্পষ্ট হয়ে যায়। হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট বিশেষ একটি মহল গণ-অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চান, ২০২৪-কে ১৯৭১-এর ওপরে স্থান দিতে চান। আবার কেউ কেউ দুটিকে একই সমতলে রাখতে চান। গণ-আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আবার ইতিহাসের দুটি মুহূর্তের গুরুত্ব স্বীকার করলেও তাঁদের সমান মর্যাদায় আসীন করতে চাননি। আর আওয়ামী লীগ তো ২০২৪-এর লড়াইকে ১৯৭১-এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হিসেবেই চিহ্নিত করে। অর্থাৎ ১৯৭১-কে ২০২৪-এর আন্দোলনে পক্ষে-বিপক্ষের থাকা দল ও ব্যক্তিরা কীভাবে দেখেন, তার সঙ্গে এই তুলনার আলাপটি যুক্ত।

একটি মহল গণ-অভ্যুত্থানকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে চান, ২০২৪-কে ১৯৭১-এর ওপরে স্থান দিতে চান। আবার কেউ কেউ দুটিকে একই সমতলে রাখতে চান। গণ-আন্দোলনে সংশ্লিষ্ট অনেকেই আবার ইতিহাসের দুটি মুহূর্তের গুরুত্ব স্বীকার করলেও তাঁদের সমান মর্যাদায় আসীন করতে চাননি।

এই আন্দোলনে যুক্ত বড় শক্তিগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী অন্যতম। দলটি সাংগঠনিকভাবে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল এবং এই দলের এখনকার কোনো কোনো নেতা ওই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের সহায়ক শক্তি আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ বিচারে আওয়ামী লীগ পরবর্তীকালে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে যাঁদের শাস্তি দেয়, তাঁদের অনেকেই জামায়াতের নেতা ছিলেন। সেই বিচার–প্রক্রিয়াকে যে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রহসনে পরিণত করেছিল, এ কথা অনস্বীকার্য। কিন্তু এ কারণে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামীর যে দায়, তা এতটুকুও কমে না। কাজেই বোধগম্য কারণেই হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শক্তি জামায়াত হাসিনার শাসনকে প্রত্যাখ্যান করার মধ্য দিয়ে ১৯৭১-কেও প্রত্যাখ্যানের চেষ্টা করেছে। এই চেষ্টায় আওয়ামী লীগের ১৯৭১-কেন্দ্রিক অপরাজনীতিকে যেমন ‘যুদ্ধাপরাধের বিচার’কে প্রহসনে পর্যবসিত করা, রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার বিষয়গুলো ২০২৪-এ জামায়াতকে অশেষ ফায়দা দিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ না–দেখা প্রজন্মের যে বিরাট অংশ হাসিনার শাসনে নিষ্পেষিত হয়েছে, জামায়াত তাদের কাছে এই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পেরেছে যে মুক্তিযুদ্ধের পুরো বিষয়টাই আওয়ামী অপরাজনীতি ও দিল্লির এজেন্ডা।

গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবির যে প্রদর্শনীর আয়োজন করে, সেখানে ‘বিচারিক হত্যাকাণ্ড’ শিরোনামের অধীন যাঁদের ছবি রাখা হয়, তাঁদের অনেকেই সরাসরি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী। অর্থাৎ জামায়াত কিংবা ছাত্রশিবির বুঝেশুনে এবং তাঁদের দ্বারা প্রভাবিত একটা বড় অংশ বুঝে না–বুঝে ১৯৭১-কে ২০২৪ দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে চেয়েছে। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে পণ্যকরণ করেছে এবং রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে বলে বিপরীত দিক থেকে মুক্তিযুদ্ধ-বিরোধিতাকে বৈধতা দেওয়া কিংবা মহিমান্বিত করার কোনো সুযোগ নেই। সেটা জামায়াত করলে যেমন নিন্দনীয়, বিএনপি করলেও তেমনই নিন্দনীয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে শোক প্রস্তাবের তালিকায় যখন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীদের নাম সরকার দলীয় হুইপ দিলেন এবং সেটা যখন অনুমোদিত হলো, তখন নাগরিক হিসেবে আমরা এই ভেবে বিভ্রান্ত হয়েছি যে নির্বাচন–পূর্ব বিএনপি যে রকম খোলাখুলিভাবে ১৯৭১ প্রসঙ্গে তাদের ভূমিকা স্পষ্ট করে জামায়াতের সমালোচনা করেছে কিংবা ‘জুলাই’-পরবর্তীকালে ’২৪ ও ’৭১-এর সম্পর্ক প্রশ্নে বারবার দ্ব্যর্থহীনভাবে ১৯৭১ সালকে প্রশ্নাতীতভাবে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছে, সেসব কি নিছকই তাদের রাজনৈতিক কৌশল ছিল?

সমাজের বিদ্যমান চিহ্ন ও প্রতীকগুলোর অর্থ বদলে গেছে। যেসব বিষয়কে আমরা প্রশ্নাতীত, নিষ্কলুষ ও পবিত্র ভাবতাম, সেসব নিয়ে যে জরুরি প্রশ্ন উঠেছে, সেসবের রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা যে ছিঁড়েখুঁড়ে দেখার প্রয়োজন উচ্চারিত হয়েছে, এটাই সম্ভবত এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্জন।

ইতিহাসের সব ঘটনা বা পাত্রপাত্রীকে তার যথার্থ মর্যাদা দেওয়া জরুরি। আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে বিভাজনের রাজনীতি করেছিল—এই অভিযোগ তুলে জুলাই-পরবর্তীকালে জামায়াত যা করেছে, তাও প্রকারান্তরে বিভাজনেরই রাজনীতি। মুক্তিযুদ্ধের কথা বললেই সেটা দিল্লির দালালি তকমা দেওয়ার এই চটুল রাজনীতি কত দিন ধোপে টিকবে? আওয়ামী লীগ এরই মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের তুরুপের তাস খেলতে শুরু করেছে। কেননা, তারা জানে তারা নিজেরা মুক্তিযুদ্ধকে দলীয় সম্পত্তিতে পর্যবসিত করলেও একাত্তরে স্বজন-হারানো এ দেশের হাজারো পরিবার মুক্তিযুদ্ধকে চিরকাল অন্তরে ধারণ করবে। ফলে জামায়াতের অতিরঞ্জিত এবং একপেশে ভাষ্যের বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের তুরুপে তাস আবারও কার্যকর হয়ে উঠবে। সত্যিকার অর্থে বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের হতে চাইলে জামায়াতের মতো শাক দিয়ে মাছ ঢাকা যাবে না, মুক্তিযুদ্ধে তাদের দায় স্বীকার করে নিতে হবে, তদুপরি আওয়ামী লীগের মতো মুক্তিযুদ্ধকে দখল করে তাকে নিপীড়নের হাতিয়ারও বানানো যাবে না। বরং মুক্তিযুদ্ধ যে একটা বিশুদ্ধ জনযুদ্ধ ছিল, এই মর্মে তাকে যথাযথ মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিতকরতে হবে।

আশার কথা এই যে আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীকে বাদ দিলে এ দেশের সিংহভাগ মানুষ ১৯৭১ ও ২০২৪ বিষয়ে কোনো দ্বিধায় পড়েননি। আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষেরা অনেকেই ২০২৪-কে মাথায় তুলে নেওয়ার সময় এ কথা পরস্পরকে মনে করিয়ে দিয়েছেন যে ১৯৭১-কে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করায় মুক্তিযুদ্ধ থেকে প্রাপ্য মুক্তি প্রকৃত অর্থে মেলেনি। ২০২৪-এ তাই স্লোগান উঠেছিল, ‘লাখো শহীদের রক্তে কেনা দেশটা কারো বাপের না’। এ কারণে ১৯৭১-এর মহিমা সামান্যতমও ক্ষুণ্ন হয় না। ১৯৭১ সালকে মানুষ তাদের মাথার ওপরই তুলে রেখেছে। তর্ক, বিবাদ ও পর্যালোচনামূলক অনুধাবনের মধ্য দিয়ে একাত্তরের এই ফিরে আসা গভীরভাবে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।

২০২৪-এর পরের দেড় বছরে এবং এমনকি এখন পর্যন্ত চারপাশে নানা ঘটনা ঘটছে, যা পরিবর্তনের পক্ষে মাঠে নামা মানুষদের বিষণ্নতায় ডুবিয়েছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও তাদের ভাবিয়েছে যে পরিবর্তন চেয়ে কি আমরা ভুল করেছিলাম? যখন নারীর অথবা তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের ওপর শারীরিক কিংবা সাইবার আক্রমণ হয়, যখন আদিবাসী, দরিদ্র স্কুলশিক্ষক কিংবা শ্রমিকের ওপর হামলা হয়, যখন দেশের মানুষকে অন্ধকারে রেখে আমেরিকার সঙ্গে চুক্তি হয়, যখন দিল্লির ঘাঁটি বলে পত্রিকা অফিসগুলোতে কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়, যখন মুক্তিযুদ্ধকে নিছকই ভারতীয় প্রকল্প বলে চিহ্নিত করা হয়, তখন এ রকম ভাবনা আসে বইকি।

ইতিহাসের যেকোনো বড় ঘটনার মতোই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও আমাদের চেনাজানা ও বোঝাপড়ার জগৎ বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে। সমাজের বিদ্যমান চিহ্ন ও প্রতীকগুলোর অর্থ বদলে গেছে। যেসব বিষয়কে আমরা প্রশ্নাতীত, নিষ্কলুষ ও পবিত্র ভাবতাম, সেসব নিয়ে যে জরুরি প্রশ্ন উঠেছে, সেসবের রাজনৈতিক ব্যঞ্জনা যে ছিঁড়েখুঁড়ে দেখার প্রয়োজন উচ্চারিত হয়েছে, এটাই সম্ভবত এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমরা অনেকেই হয়তো সম্যক জানতাম যে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রবাদী ও জাতীয়তাবাদী বয়ান সমস্যাজনক, বিশেষ কোনো দলকেন্দ্রিক বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক। সেগুলোতে জনমানুষের কৃতিত্ব, লড়াই বা বেদনার অশ্রুর স্বীকৃতি নেই। জনযুদ্ধ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধ সামান্যই আবিষ্কৃত। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সম্পৃক্ততা ও স্বার্থ নিয়েও আমরা নির্মোহ আলোচনা করতে পারিনি। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এসব বিদ্যাজাগতিক এবং জ্ঞানতাত্ত্বিক অচলায়তন ভাঙার পথ খুলে দিয়েছে। এখন কর্তব্য হলো আওয়ামী লীগ, জাতীয়তাবাদ ও রাষ্ট্রবাদের খপ্পর থেকে মুক্তিযুদ্ধকে বের করে এনে তা নিয়ে নতুন সামাজিকইতিহাস লেখা।