বাংলা সাহিত্য-ইতিহাসে কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে যে কয়েকটি প্রচলিত বয়ান দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো—তিনি চরম দরিদ্র, প্রায় অনাহারী, সামাজিকভাবে নিম্নবিত্ত এক মুসলমান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন; তাঁর ডাকনাম ‘দুখু মিয়া’ রাখা হয়েছিল পারিবারিক দারিদ্র্য ও দুঃখ-দুর্দশার প্রতীক হিসেবে; আর তাঁর বাউন্ডুলে, ঘরছাড়া, উদাসীন জীবন ছিল মূলত অর্থনৈতিক বঞ্চনার স্বাভাবিক ফল। এই বয়ান এতটাই পুনরাবৃত্ত হয়েছে যে তা অনেকাংশেই ইতিহাসের বিকল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু জীবনীমূলক তথ্য, বংশপরিচয়, লোকসংস্কৃতি এবং গ্রামীণ সমাজের বিশ্বাসব্যবস্থাকে একত্রে বিবেচনা করলে দেখা যায়, এ ধারণার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে।
ইতিহাসের কাজ কেবল প্রতিষ্ঠিত বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করা নয়; বরং প্রচলিত ব্যাখ্যার অন্তর্নিহিত অনুমানগুলো পরীক্ষা করা। কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব সম্পর্কেও সেই কাজটি প্রয়োজন। বিশেষত, তাঁর ‘দুখু’ নামের উৎস, পারিবারিক পরিচয়, বংশীয় ঐতিহ্য এবং তাঁর স্বভাবের ব্যাখ্যা নিয়ে যে সরলীকৃত ধারণা প্রচলিত হয়েছে, তা ইতিহাসসম্মত তথ্যের আলোকে নতুনভাবে দেখা জরুরি।
নজরুল ইসলামের পূর্বপুরুষেরা কোনো অখ্যাত কৃষক বা প্রান্তিক পরিবারভুক্ত ছিলেন না। তাঁদের বংশপরিচয় অনুসরণ করলে দেখা যায়, কাজী খেবরাতুল্লাহ্ ছিলেন এই পরিবারের উৎসসূত্র পূর্বপুরুষ। তাঁর চার পুত্র—কাজী গোলাম হোসেন, কাজী আবদুল জলিল, কাজী জয়নাল আবেদিন ও কাজী কমরুদ্দীন। কাজী গোলাম হোসেনের দুই পুত্র ছিলেন কাজী আমিনুল্লাহ্ ও কাজী নাজিবুল্লাহ্। কাজী নাজিবুল্লাহ্র পুত্রদের মধ্যে ছিলেন কাজী বজলে করিম, যাঁর নাম নজরুল-জীবনের নানা প্রসঙ্গে এসেছে। অন্যদিকে কাজী আমিনুল্লাহ্র একমাত্র পুত্র ছিলেন কাজী ফকির আহমদ, অর্থাৎ কবি নজরুল ইসলামের পিতা।
এই বংশধারার ঐতিহাসিক গুরুত্ব এখানেই যে ‘কাজী’ উপাধিটি কেবল পারিবারিক নাম নয়; এটি ছিল একটি প্রশাসনিক ও বিচারিক মর্যাদার পরিচয়। মোগল আমলে বিচারকার্য পরিচালনার অধিকার ও দায়িত্বের সূত্রে তাঁদের পূর্বপুরুষেরা ‘কাজী’ উপাধি লাভ করেছিলেন। নজরুল পরিবারে প্রচলিত তথ্য এবং বিভিন্ন জীবনীগ্রন্থে উল্লেখ আছে যে সম্রাট শাহ আলমের আমলে তাঁরা লাখেরাজ সম্পত্তির অধিকারও লাভ করেছিলেন এবং বিহারের হাজিপুর অঞ্চল থেকে বর্ধমানের চুরুলিয়ায় এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন। অর্থাৎ নজরুলের পরিবার একসময় সামাজিক মর্যাদা, প্রশাসনিক ভূমিকা এবং সম্পত্তির অধিকারসম্পন্ন এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবার ছিল।
এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য স্মরণে রাখা প্রয়োজন। কোনো পরিবারের আর্থিক অবক্ষয় এবং তার বংশীয় পরিচয় এক বিষয় নয়। বাংলার অসংখ্য জমিদার, তালুকদার, সৈয়দ, কাজী কিংবা অভিজাত পরিবার ইতিহাসের নানা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সম্পদ হারিয়েছে; কিন্তু তাই বলে তাদের ঐতিহাসিক পরিচয় বিলুপ্ত হয়নি। কাজী ফকির আহমদের সময়ে পরিবারটির আর্থিক দুরবস্থা ছিল, এ কথা সত্য। কিন্তু এই সত্য থেকে যদি সিদ্ধান্তে পৌঁছানো হয় যে নজরুল জন্মগতভাবে একটি অনভিজাত বা নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছিলেন, তাহলে সেটি ঐতিহাসিকভাবে যথার্থ হয় না।
সমস্যা এখানেই যে অনেক গবেষক ও প্রাবন্ধিক পরিবারটির অতীত ঐতিহ্যকে প্রায় উপেক্ষা করে শুধু শেষ পর্যায়ের অর্থনৈতিক সংকটকে নজরুল-পরিচয়ের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন। ফলে ‘অভিজাত বংশের আর্থিক অবক্ষয়’-এর জায়গায় তৈরি হয়েছে ‘চিরদরিদ্র পরিবারের সন্তান’—এই সরলীকৃত চিত্র। এর ফলেই নজরুলকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে তুলনা করার সময় একটি কৃত্রিম বৈপরীত্য নির্মিত হয়েছে। একদিকে বিপুল ঐশ্বর্যের জোড়াসাঁকো, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্যের চুরুলিয়া—এই দ্বৈততার মধ্যে নজরুল-প্রতিভাকে ব্যাখ্যা করার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্য সমালোচনায় স্থান পেয়েছে। অথচ বাস্তবতা আরও জটিল। রবীন্দ্রনাথ যেমন এক ঐতিহ্যবাহী জমিদার পরিবারে জন্মেছিলেন, তেমনি নজরুলও এক ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারে জন্মেছিলেন। পার্থক্য ছিল দুই পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থার সময়পর্বের ব্যবধানে, বংশীয় মর্যাদায় নয়।
এই প্রেক্ষাপটে ‘দুখু’ নামটির ব্যাখ্যাও নতুনভাবে বিবেচনা করা দরকার। প্রচলিত ধারণা হলো, পারিবারিক দুঃখকষ্ট, অভাব-অনটন ও দুর্দশার কারণে শিশুর নাম রাখা হয়েছিল ‘দুখু মিয়া’। এ ব্যাখ্যা এত বেশি প্রচারিত হয়েছে যে অধিকাংশ পাঠক সেটিকেই স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরে নেন। কিন্তু লোকসংস্কৃতির আলোকে বিষয়টি বিচার করলে অন্য একটি সম্ভাবনা অধিক গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।
বাংলার লোকসমাজে বহু শতাব্দী ধরে একটি বিশ্বাস প্রচলিত ছিল যে কোনো পরিবারের সন্তান যদি পরপর মৃত্যুবরণ করে, তবে পরবর্তী সন্তানকে এমন একটি অবহেলাসূচক বা অনাকর্ষণীয় নাম দিতে হবে, যাতে অশুভ শক্তি, অমঙ্গল কিংবা মানুষের কুদৃষ্টি তার ওপর না পড়ে। এই বিশ্বাস কেবল মুসলমান সমাজে নয়, হিন্দু সমাজেও সমানভাবে প্রচলিত ছিল। সে কারণে সন্তানদের নাম রাখা হতো কেল্টে, ফেলা, কালু, বুধারু, মঙ্গুলু, দুখু, ভোলা, কানা, ফকির, এমনকি কখনো কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে অবজ্ঞাসূচক নামও দেওয়া হতো। উদ্দেশ্য ছিল সন্তানকে অশুভ দৃষ্টি থেকে রক্ষা করা। লোকবিশ্বাসে মনে করা হতো, অত্যন্ত আকর্ষণীয় বা গৌরবময় নাম সন্তানের প্রতি অশুভ শক্তির আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়।
এই সামাজিক বাস্তবতা স্মরণে রাখলে নজরুলের ডাকনাম ‘দুখু’র ব্যাখ্যা একেবারেই ভিন্ন মাত্রা লাভ করে।
বিভিন্ন জীবনীকারের বর্ণনা অনুযায়ী, কাজী ফকির আহমদ ও জাহেদা খাতুনের ঘরে পরপর চার পুত্রের অকালমৃত্যু হয়েছিল। তারপর জন্ম নেন নজরুল ইসলাম। জনশ্রুতি আছে, এই ধারাবাহিক মৃত্যুর পর জাহেদা খাতুন তারাপীঠে গিয়ে সন্তান কামনা করেছিলেন। এ ঘটনার প্রত্যক্ষ দলিল নেই, তাই এটিকে নিশ্চিত ইতিহাস বলা যাবে না; কিন্তু এটিকে সম্পূর্ণ উড়িয়েও দেওয়া যায় না। কারণ, উনিশ শতকের শেষভাগ এবং বিশ শতকের গোড়ার বাংলার গ্রামীণ সমাজে মুসলমান পরিবারগুলোর মধ্যেও বিভিন্ন লোকবিশ্বাস, মানত, পীর-দরগাহ, তীর্থস্থান কিংবা অলৌকিক আশ্রয়ের প্রতি আস্থা ছিল একটি সুপরিচিত সামাজিক বাস্তবতা। কাজেই এই লোকশ্রুতির ঐতিহাসিক সম্ভাবনাকে অস্বীকার করারও কারণ নেই।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আজও বাংলার বহু অঞ্চলে দেখা যায়, যেসব মায়ের সন্তান বারবার মারা যায়, তাঁদের পরবর্তী সন্তান জন্মালে তার কান ফুটিয়ে দেওয়া হয়, বিশেষ অলংকার পরানো হয় অথবা তাকে ‘মল্লি’ বলে ডাকা হয়। উদ্দেশ্য একটাই—সন্তানকে মৃত্যুর অশুভ ছায়া থেকে রক্ষা করা। এই লোকাচার এখনো বিলুপ্ত হয়নি। ফলে ১০০ বছরের বেশি আগে চুরুলিয়ার মতো গ্রামীণ সমাজে একই ধরনের বিশ্বাস কার্যকর ছিল, এ কথা অনুমান করা মোটেই অযৌক্তিক নয়।
সুতরাং ‘দুখু’ নামের মধ্যে পারিবারিক দারিদ্র্যের প্রতীক খোঁজার চেয়ে লোকবিশ্বাসের সাংস্কৃতিক ব্যাখ্যা অধিক যুক্তিসংগত বলে মনে হয়। এই নাম ছিল সন্তানের প্রতি অবহেলার প্রকাশ নয়; বরং তাকে বাঁচিয়ে রাখার এক মায়াময় কৌশল। বাংলার অসংখ্য মায়ের মতো জাহেদা খাতুনও হয়তো বিশ্বাস করেছিলেন, আকর্ষণহীন একটি নাম তাঁর সন্তানকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করবে।
এ ব্যাখ্যা গ্রহণ করলে ‘দুখু মিয়া’ নামটি সম্পূর্ণ নতুন অর্থ ধারণ করে। এটি দারিদ্র্যের দলিল নয়; বরং মাতৃত্বের উদ্বেগ, লোকবিশ্বাসের শক্তি এবং এক গভীর সাংস্কৃতিক বাস্তবতার স্মারক।
২.
কাজী ফকির আহমদকে নিয়েও একটি প্রচলিত ধারণা গড়ে উঠেছে। তাঁর নামের সঙ্গে ‘ফকির’ শব্দটি যুক্ত থাকায় অনেকেই ধরে নিয়েছেন তিনি জন্মগতভাবে দরিদ্র, অসহায় কিংবা সমাজের নিম্নস্তরের মানুষ ছিলেন। অথচ ঐতিহাসিক তথ্য অন্য কথা বলে। ‘ফকির’ এখানে সামাজিক পরিচয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত নাম, আর তাঁর জীবনাচরণে যে সুফিবাদী প্রবণতা ছিল, সেটিই তাঁকে গ্রামীণ সমাজে ধর্মপ্রাণ মানুষ হিসেবে পরিচিত করেছিল। তিনি পীরপুকুরের মাজারের খাদেম ছিলেন, মসজিদের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, নামাজ-রোজা, তসবিহ ও কোরআন তিলাওয়াতে অধিক সময় ব্যয় করতেন। সংসারের অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য নিরন্তর সংগ্রামী গৃহকর্তার চেয়ে তিনি ছিলেন একধরনের আধ্যাত্মিক প্রকৃতির মানুষ। ফলে পরিবারের আর্থিক দুরবস্থা যেমন ছিল বাস্তব, তেমনি সেই দুরবস্থার পেছনে তাঁর সংসার-ঔদাসীন্য ও আধ্যাত্মিক জীবনবোধের প্রভাবও উপেক্ষা করা যায় না।
এখানেই নজরুলের ব্যক্তিত্ব ব্যাখ্যার একটি নতুন সূত্র পাওয়া যায়। এত দিন পর্যন্ত তাঁর ভবঘুরে স্বভাব, ঘরছাড়া জীবন, অস্থির মন কিংবা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছুটে বেড়ানোর প্রবণতাকে অনেকেই কেবল অর্থনৈতিক অভাবের পরিণতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দারিদ্র্য কি একমাত্র ব্যাখ্যা? ইতিহাস সে কথা বলে না।
শৈশব থেকেই নজরুলের মধ্যে যে অসাধারণ কৌতূহল, নতুনকে জানার আকাঙ্ক্ষা, ধর্মীয় সাধনার প্রতি আকর্ষণ, সন্ন্যাসী-ফকির-সুফিদের সংস্পর্শে যাওয়ার প্রবণতা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাহিত্য পাঠের আগ্রহ এবং অজানার প্রতি এক অদম্য টান দেখা যায়, তার সবকিছুকে অর্থনৈতিক অনটনের ফল বলা যায় না। এগুলো ছিল তাঁর সহজাত মনন, তাঁর সৃজনী চেতনা এবং পারিবারিক উত্তরাধিকারের সম্মিলিত প্রকাশ।
প্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায়, আজহারউদ্দীন খান কিংবা শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণায় যে নজরুলের পরিচয় পাওয়া যায়, সেখানে তিনি কেবল অভাবগ্রস্ত বালক নন; বরং এক অস্থির অনুসন্ধিৎসু প্রাণ। কখনো তিনি মসজিদে ইমামতি করছেন, কখনো কোরআন তিলাওয়াত করছেন, কখনো আবার রামায়ণ-মহাভারত পড়ছেন, কখনো সাধু-সন্ন্যাসীর আশ্রমে যাচ্ছেন, আবার কখনো সুফি–দরবেশের সঙ্গে কয়েক দিন কাটিয়ে ফিরে আসছেন। এই বহুমাত্রিকতা কোনো অর্থনৈতিক বাধ্যবাধকতার পরিচয় নয়; বরং এটি একটি মুক্ত, অনুসন্ধানী ও কাব্যিক মানসের লক্ষণ।
বরং বলা যেতে পারে, তাঁর পিতা ফকির আহমদের আধ্যাত্মিক জীবনবোধ এবং সংসারবিমুখ স্বভাব নজরুলের মধ্যে উত্তরাধিকারসূত্রে কোনো না কোনো মাত্রায় সঞ্চারিত হয়েছিল। পিতা যেমন মাজার, মসজিদ ও আধ্যাত্মিক সাধনায় নিবিষ্ট ছিলেন, তেমনি পুত্রও পরবর্তীকালে ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার গণ্ডি অতিক্রম করে মানবমুক্তির বৃহত্তর দর্শনের দিকে অগ্রসর হন। তবে পিতার ধর্মনিষ্ঠা যেখানে মূলত ইসলামি সাধনায় সীমাবদ্ধ ছিল, সেখানে নজরুল সেই সীমা ভেঙে হিন্দু, বৌদ্ধ, সুফি, বৈষ্ণব ও শাক্ত—সব ধারার মধ্যেই এক অভিন্ন মানবধর্মের সন্ধান করেছেন।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নজরুলের আধ্যাত্মিকতার উৎস ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনেক লেখক একে কেবল ইসলামি সাধনার ফল হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। আবার অন্যদিকে কেউ কেউ তাঁকে সম্পূর্ণরূপে বিদ্রোহী, ধর্মবিরোধী অথবা কেবল রাজনৈতিক কবি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। বাস্তবে এই দুই চিত্রের কোনোটিই পূর্ণাঙ্গ নয়। নজরুলের শৈশবের পরিবেশেই ছিল মসজিদ, মাজার, পীরের আস্তানা, লেটোগানের দল, গ্রামীণ পালাগান, হিন্দু পুরাণ, সুফিসংস্কৃতি এবং লোকধর্মের এক বিস্ময়কর সহাবস্থান। ফলে তাঁর অসাম্প্রদায়িকতা কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং শৈশব থেকেই বহুসাংস্কৃতিক বাস্তবতার মধ্যে বেড়ে ওঠার স্বাভাবিক ফল।
এ কারণেই তিনি একই কণ্ঠে যেমন ইসলামের হামদ-নাত রচনা করতে পেরেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীত, কীর্তন, ভজন, কৃষ্ণসংগীত ও আগমনী গানও লিখেছেন। এই সাংস্কৃতিক উদারতার ভিত্তি তাঁর পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশেই নিহিত ছিল।
তাঁর শৈশব নিয়ে আরেকটি প্রচলিত ধারণা হলো—তিনি অভাবের তাড়নায় লেটো দলে যোগ দিয়েছিলেন, রুটির দোকানে কাজ করেছিলেন, বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়িয়েছিলেন। ঘটনাগুলো সত্য হলেও ব্যাখ্যাটি অসম্পূর্ণ। কারণ, বাংলার বহু কিশোরই অভাবের কারণে শ্রমজীবী হয়েছে; কিন্তু সবাই নজরুল হয়নি। অর্থনৈতিক বাস্তবতা একজন মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করে, কিন্তু তার সৃষ্টিশীল চরিত্র নির্ধারণ করে না। নজরুলের ক্ষেত্রেও অভাব ছিল, কিন্তু সেই অভাব তাঁর কল্পনাশক্তি, শিল্পবোধ, সাংস্কৃতিক অভিযাত্রা কিংবা মানবতাবাদী চেতনার একমাত্র উৎস নয়।
বরং তাঁর জীবনের বিভিন্ন পর্বে দেখা যায়, সুযোগ পেলেই তিনি বিদ্যালয়ে ফিরে গেছেন, বই পড়েছেন, সাহিত্যচর্চা করেছেন, নাটক লিখেছেন, গান রচনা করেছেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েও সাহিত্যচর্চা বন্ধ করেননি। অর্থাৎ তিনি কেবল জীবিকার জন্য সংগ্রামরত একজন শ্রমজীবী কিশোর ছিলেন না; তিনি একই সঙ্গে ছিলেন এক বিরল প্রতিভাসম্পন্ন সাংস্কৃতিক অভিযাত্রী।
এই প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের তুলনাকেও নতুনভাবে দেখা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের তুলনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ঐশ্বর্য এবং নজরুলের দারিদ্র্যকে মুখ্য বিষয় করে তোলা হয়েছে। যেন রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন স্বর্ণের প্রাসাদে আর নজরুল জন্মেছিলেন নিঃস্ব কুঁড়েঘরে। এই তুলনা সাহিত্যিক মূল্যায়নের চেয়ে আবেগপ্রবণ সামাজিক বয়ানকে শক্তিশালী করেছে বেশি।
বাস্তবে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল—উভয়েই ঐতিহ্যবাহী পরিবারে জন্মেছিলেন। একজন জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি, অন্যজন ঐতিহাসিক কাজী পরিবারের উত্তরাধিকারী। পার্থক্য ছিল এই যে ঠাকুর পরিবারের অর্থনৈতিক ভিত্তি দীর্ঘকাল অটুট ছিল, কিন্তু কাজী পরিবারের আর্থিক ভিত সময়ের সঙ্গে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছিল। এই পার্থক্যকে অস্বীকার করার যেমন অবকাশ নেই, তেমনি কাজী পরিবারের বংশীয় মর্যাদাকে অস্বীকার করারও কোনো ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই।
অতএব নজরুলকে ‘নিম্নবিত্তের কবি’ বলার চেয়ে ‘নিম্নবিত্তের প্রতিনিধি’ বলা অধিক যথার্থ। কারণ, তিনি নিম্নবিত্ত সমাজ থেকে উঠে আসেননি; বরং তিনি তাঁর সাহিত্য ও সংগ্রামের মাধ্যমে কৃষক, শ্রমিক, মজুর, নিপীড়িত নারী, বঞ্চিত মানুষ এবং সাম্প্রদায়িক বিভাজনের শিকার সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর মানবতাবাদ ছিল আত্মপরিচয়ের সীমা ভেঙে অপরের জীবনের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার মানবিক সক্ষমতা। এ কারণেই তিনি নিজের সামাজিক পরিচয়কে অতিক্রম করে সর্বজনের কবি হতে পেরেছিলেন।
আজ কাজী নজরুল ইসলামের শৈশব ও পারিবারিক ইতিহাসকে নতুনভাবে পাঠ করার প্রয়োজন রয়েছে। কারণ, ইতিহাসের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হলে তাঁর দারিদ্র্য যেমন স্মরণে রাখতে হবে, তেমনি তাঁর বংশীয় ঐতিহ্যও স্মরণে রাখতে হবে; তাঁর সংগ্রাম যেমন মূল্যায়ন করতে হবে, তেমনি তাঁর পারিবারিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও বুঝতে হবে; তাঁর ‘দুখু’ নামের মধ্যে যেমন লোকজ মায়ের কান্না শুনতে হবে, তেমনি সেই নামের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বাংলার লোকবিশ্বাস, মাতৃত্বের আতঙ্ক ও জীবনরক্ষার প্রাচীন সংস্কৃতিকেও স্বীকার করতে হবে।
সুতরাং কাজী নজরুল ইসলামের শৈশবকে কেবল দারিদ্র্যের কাহিনি হিসেবে নয়; বরং একটি ঐতিহ্যবাহী কাজী পরিবারের অর্থনৈতিক অবক্ষয়, বাংলার লোকসংস্কৃতি, সুফিমানস, বহুসাংস্কৃতিক পরিবেশ এবং এক অসাধারণ সৃষ্টিশীল প্রতিভার বিকাশের ইতিহাস হিসেবে পুনরায় পাঠ করাই সময়ের দাবি। এই পুনঃপাঠ নজরুলকে ছোট করে না; বরং তাঁকে আরও বৃহত্তর, আরও ঐতিহাসিক এবং আরও সত্য করে আমাদের সামনে উপস্থিত করে।