
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র পরিচালিত চলচ্চিত্র নটীর পূজা নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু জীবনের শেষ পর্বে কেন তিনি চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকলেন, সেই প্রশ্নটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত। তাঁর প্রবন্ধ, চিঠিপত্র এবং শেষ জীবনের শিল্পচর্চার আলোকে এই নিবন্ধে সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হয়েছে।
১৯৩২ সাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বয়স একাত্তর। বিশ্বসাহিত্যে তাঁর অবস্থান তখন সুপ্রতিষ্ঠিত। কবিতা, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, শিক্ষা ও সমাজচিন্তা—প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি নিজস্ব স্বাক্ষর রেখে গেছেন। এরই মধ্যে চিত্রকর হিসেবেও আন্তর্জাতিক পরিচিতি পেয়েছেন। একজন শিল্পীর কাছে এ যেন পূর্ণতার সময়।
ঠিক তখনই তিনি এগিয়ে গেলেন এমন এক শিল্পমাধ্যমের দিকে, যার ভাষা তখনো নির্মাণাধীন। সেই মাধ্যমটির নাম চলচ্চিত্র। ১৯৩২ সালে তিনি পরিচালনা করলেন নটীর পূজা। এটিই তাঁর প্রথম এবং একমাত্র চলচ্চিত্র।
তথ্যটি পরিচিত। কিন্তু এর অন্তর্নিহিত প্রশ্নটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ: জীবনের এই পর্যায়ে এসে কেন রবীন্দ্রনাথ চলচ্চিত্রের প্রতি আকৃষ্ট হলেন? এটি কি শুধু নিজের একটি নাটককে পর্দায় রূপ দেওয়ার চেষ্টা ছিল, নাকি তিনি চলচ্চিত্রে এমন একটি শিল্পসম্ভাবনা দেখেছিলেন, যা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব ছিল না?
এই নিবন্ধ সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।
রবীন্দ্রনাথের শিল্পজীবনের দিকে তাকালে দেখা যায়, তিনি কখনো একটিমাত্র মাধ্যমের শিল্পী ছিলেন না। কবিতা থেকে গান, গান থেকে নাটক, নৃত্যনাট্য, চিত্রকলা এবং শেষ পর্যন্ত চলচ্চিত্র, তাঁর সৃষ্টিশীলতা বারবার নতুন প্রকাশভাষার দিকে অগ্রসর হয়েছে। এই ধারাবাহিকতা ইঙ্গিত দেয়, তিনি কেবল নতুন মাধ্যম গ্রহণ করেননি; মানুষের অনুভূতি প্রকাশের আরও পরিপূর্ণ ভাষাও খুঁজছিলেন।
বিশ শতকের প্রথম তিন দশক ছিল শিল্প ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের সময়। আলোকচিত্র, গ্রামোফোন, রেডিও এবং চলচ্চিত্র মানুষের অভিজ্ঞতাকে প্রকাশের নতুন পথ খুলে দিচ্ছিল। রবীন্দ্রনাথ এই পরিবর্তনের একজন গভীর পর্যবেক্ষক ছিলেন। প্রযুক্তিকে তিনি তার অভিনবত্বের জন্য নয়, শিল্পসম্ভাবনার জন্য মূল্যায়ন করতেন।
এই অনুসন্ধানের প্রথম সূত্র মিলবে রবীন্দ্রনাথের ১৯২৯ সালের প্রবন্ধ ‘চলচ্চিত্র’-তে। সেখানে তিনি এমন একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা আজও চলচ্চিত্রতত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে: চলচ্চিত্র কি সাহিত্য বা নাটকের অনুসারী হবে, নাকি তার নিজের একটি স্বতন্ত্র ভাষা থাকবে?
সেই প্রশ্ন থেকেই শুরু হয় রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্রচিন্তার প্রকৃত যাত্রা।
তবু একটি প্রশ্ন রয়ে যায়। জীবনের এই পর্যায়ে এসে কেন তিনি দৃশ্য, গতি এবং সময়ের শিল্পের প্রতি এত আকৃষ্ট হলেন? সেই উত্তর খুঁজতে হলে নটীর পূজার বাইরেও তাকাতে হবে। দেখতে হবে তাঁর শেষ জীবনের সামগ্রিক শিল্পচর্চা। সেখানেই লুকিয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্রচিন্তার আরও গভীর সূত্র।
ক্যামেরারও একটি ভাষা আছে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চলচ্চিত্র পরিচালনা করার আগেই এই নতুন শিল্পমাধ্যমের নন্দনতত্ত্ব নিয়ে ভাবতে শুরু করেছিলেন। সেই ভাবনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দলিল তাঁর ১৯২৯ সালের প্রবন্ধ ‘চলচ্চিত্র’ এবং একই সময়ে লেখা কয়েকটি চিঠি।
সেখানে তিনি এমন একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা আজও চলচ্চিত্রতত্ত্বের কেন্দ্রে রয়েছে: চলচ্চিত্র কি সাহিত্য বা নাটকের অনুসারী হবে, নাকি তার নিজের একটি স্বতন্ত্র ভাষা থাকবে?
রবীন্দ্রনাথের উত্তর ছিল স্পষ্ট। তিনি লিখেছিলেন, ‘একটি সিনেমার প্রধান বস্তু হচ্ছে স্বরূপ বা প্রতিমূর্তির প্রবাহ। এই স্বরূপের সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব প্রকাশে অন্য কোনো ভাষা প্রয়োগের প্রয়োজন পড়লে, তাহলে তা অযোগ্যতাই প্রমাণ করবে।’
এই কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তার সারমর্ম নিহিত।
রবীন্দ্রনাথের কাছে চলচ্চিত্রের শক্তি গল্পে নয়, দৃশ্যের চলমান প্রকাশে। যেমন সংগীত শব্দের ব্যাখ্যা ছাড়াই অনুভূতি সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি চলচ্চিত্রও দৃশ্য ও গতির মাধ্যমে নিজস্ব রস নির্মাণে সক্ষম। তাই তিনি চলচ্চিত্রকে সাহিত্য বা নাটকের চিত্রায়িত সংস্করণ হিসেবে দেখেননি; দেখেছিলেন একটি স্বতন্ত্র শিল্পমাধ্যম হিসেবে।
এই ভাবনা তাঁর সময়ের তুলনায় ছিল বিস্ময়করভাবে অগ্রসর। তখন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অধিকাংশই ছিল মঞ্চনাট্যনির্ভর। অথচ রবীন্দ্রনাথ ক্যামেরাকে কেবল রেকর্ডিংয়ের যন্ত্র হিসেবে নয়, শিল্পসৃষ্টির একটি ভাষা হিসেবে কল্পনা করেছিলেন।
এ কারণেই তাঁর আলোচনায় প্রযুক্তির চেয়ে নন্দনতত্ত্ব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত ক্যামেরা নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো সেই ক্যামেরা মানুষের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে কতটা নিজস্ব ভঙ্গিতে প্রকাশ করতে পারে।
পরবর্তী সময়ে বিশ্বচলচ্চিত্রের বিকাশও ধীরে ধীরে এই সত্যকে প্রতিষ্ঠা করেছে। চলচ্চিত্রের শক্তি তার নিজস্ব দৃশ্যভাষায়। ভারতীয় চলচ্চিত্রের একেবারে সূচনাকালেই রবীন্দ্রনাথ সেই সম্ভাবনার দিকেই ইঙ্গিত করেছিলেন।
তবে তাঁর কাছে এটি শুধু তাত্ত্বিক উপলব্ধি ছিল না।
প্রবন্ধ লেখার কয়েক বছরের মধ্যেই তিনি নিজেই ক্যামেরার পেছনে দাঁড়ালেন। নটীর পূজা হয়ে উঠল তাঁর শিল্পদর্শনের প্রথম এবং শেষ চলচ্চিত্র-পরীক্ষা।
সেই পরীক্ষার গল্পই পরের অধ্যায়।
নটীর পূজা: ভাবনা থেকে বাস্তবের পথে
১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষার কথা লিখেছিলেন। মাত্র তিন বছর পর তিনি সেই ভাবনাকে বাস্তবে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ১৯৩২ সালে নির্মিত নটীর পূজা তাই শুধুই তাঁর পরিচালিত একমাত্র চলচ্চিত্র নয়, তাঁর শিল্পদর্শনেরও একটি বাস্তব পরীক্ষা।
ছবিটি নির্মিত হয় তাঁরই নৃত্যনাটক অবলম্বনে। অভিনয়ে ছিলেন শান্তিনিকেতনের শিল্পী ও শিক্ষার্থীরা। বাণিজ্যিক সাফল্যের চেয়ে শিল্পভাবনার ধারাবাহিকতাই এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে চলচ্চিত্রটির মূল্যায়ন সহজ নয়। এর পূর্ণাঙ্গ কপি আজ আর সংরক্ষিত নেই। ফলে সমকালীন সংবাদপত্র, স্মৃতিকথা এবং চলচ্চিত্র-ইতিহাসের গবেষণার ওপরই নির্ভর করতে হয়। অধিকাংশ গবেষকের মতে, নটীর পূজার দৃশ্যবিন্যাসে মঞ্চনাটকের প্রভাব স্পষ্ট ছিল। স্থির ক্যামেরা এবং থিয়েটারধর্মী উপস্থাপনা দেখায়, রবীন্দ্রনাথ যে চলচ্চিত্রভাষার কথা লিখেছিলেন, বাস্তবে তা নির্মাণ করা কত কঠিন ছিল।
তবে এখানেই নটীর পূজার ঐতিহাসিক গুরুত্ব।
এটি কোনো পরিপূর্ণ চলচ্চিত্রের গল্প নয়; বরং একজন শিল্পীর আত্মঅনুসন্ধানের দলিল। যিনি লিখেছিলেন, চলচ্চিত্রের নিজস্ব ভাষা থাকা উচিত, তিনিই সেই ভাষা খুঁজতে ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রতিষ্ঠিত কবি হিসেবে নয়, নতুন একটি শিল্পমাধ্যমের অনুসন্ধানী হিসেবে।
এই প্রচেষ্টা হয়তো শিল্পগত পূর্ণতায় পৌঁছায়নি। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়েছে, রবীন্দ্রনাথ চলচ্চিত্র নিয়ে শুধু তাত্ত্বিক আলোচনা করেননি; তিনি নিজের ভাবনাকে বাস্তব নির্মাণের মধ্য দিয়েও যাচাই করতে চেয়েছিলেন।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে নটীর পূজার অধিকাংশ অংশ হারিয়ে যাওয়ায় আমরা সেই প্রচেষ্টার পূর্ণ মূল্যায়ন করতে পারি না। উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র ঐতিহ্যের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি অপূরণীয় ক্ষতি। চলচ্চিত্রটি সম্পূর্ণ সংরক্ষিত থাকলে রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্রচিন্তা নিয়ে আজকের অনেক প্রশ্নের উত্তর হয়তো আরও স্পষ্টভাবে মিলত।
তবু একটি প্রশ্ন রয়ে যায়। জীবনের এই পর্যায়ে এসে কেন তিনি দৃশ্য, গতি এবং সময়ের শিল্পের প্রতি এত আকৃষ্ট হলেন? সেই উত্তর খুঁজতে হলে নটীর পূজার বাইরেও তাকাতে হবে। দেখতে হবে তাঁর শেষ জীবনের সামগ্রিক শিল্পচর্চা।
সেখানেই লুকিয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্রচিন্তার আরও গভীর সূত্র।
বিশ্বচলচ্চিত্রের বিকাশ আমাদের দেখায়, এ প্রশ্নের গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, আকিরা কুরোসাওয়া, আন্দ্রেই তারকোভস্কি কিংবা আব্বাস কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি চলচ্চিত্রের শক্তি শুধু তার কাহিনিতে নয়, তার দৃশ্যভাষা, ছন্দ ও সময়বোধে।
দৃশ্যের দিকে যাত্রা
নটীর পূজাকে বিচ্ছিন্ন একটি ঘটনা হিসেবে দেখলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চলচ্চিত্রচিন্তার গভীরতা ধরা পড়ে না। কারণ একই সময়ে তাঁর শিল্পজীবনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছিল। তিনি ক্রমশ শব্দের পাশাপাশি দৃশ্যের শক্তিকে নতুনভাবে আবিষ্কার করছিলেন।
জীবনের শেষ দশকে তিনি নিয়মিত ছবি আঁকা শুরু করেন। একই সময়ে তাঁর নৃত্যনাট্যেও সংলাপের তুলনায় সংগীত, নৃত্য, শরীরের ভাষা এবং দৃশ্যবিন্যাসের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। এই পরিবর্তনগুলোর দিকে একসঙ্গে তাকালে মনে হয়, তিনি শিল্পকে ক্রমেই দৃশ্য ও গতির মাধ্যমে প্রকাশ করার নতুন সম্ভাবনা খুঁজছিলেন।
অবশ্য একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা জরুরি। রবীন্দ্রনাথ কোথাও সরাসরি লেখেননি যে চিত্রকলা, নৃত্যনাট্য ও চলচ্চিত্র তাঁর একই শিল্প-অনুসন্ধানের অংশ। এটি তাঁর শেষজীবনের সৃষ্টিকর্মের ধারাবাহিকতা থেকে গবেষকদের নির্মিত একটি ব্যাখ্যা। তবে তাঁর শিল্পচর্চার বিবর্তন সেই ব্যাখ্যাকে যথেষ্ট সমর্থন করে।
এই পটভূমিতে চলচ্চিত্রের প্রতি তাঁর আকর্ষণ নতুন অর্থ পায়। সাহিত্য শব্দকে, চিত্রকলা দৃশ্যকে, সংগীত সময়কে ধারণ করে। কিন্তু চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম, যেখানে দৃশ্য, সময়, গতি, সংগীত ও অভিনয় একসঙ্গে কাজ করে। সম্ভবত এই বহুমাত্রিক প্রকাশক্ষমতাই রবীন্দ্রনাথকে আকৃষ্ট করেছিল।
তাঁর শিক্ষা-দর্শনের সঙ্গেও এর একটি সাযুজ্য লক্ষ করা যায়। শান্তিনিকেতনে সাহিত্য, সংগীত, নাটক, চিত্রকলা ও প্রকৃতিকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন শাখা হিসেবে দেখেননি। চলচ্চিত্রও হয়তো সেই সমন্বিত শিল্পভাবনার আরেকটি সম্ভাবনাময় রূপ হয়ে উঠেছিল তাঁর কাছে।
আজ, প্রায় এক শতাব্দী পরে দাঁড়িয়েও তাঁর এই ভাবনা প্রাসঙ্গিক। প্রযুক্তি বদলেছে, ক্যামেরা বদলেছে, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও চলচ্চিত্র নির্মাণে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু মৌলিক প্রশ্নটি একই রয়ে গেছে—নতুন প্রযুক্তি কি শিল্পকে নতুন ভাষা দিচ্ছে, নাকি কেবল নতুন কৌশল?
রবীন্দ্রনাথের উত্তর সম্ভবত প্রযুক্তির চেয়ে শিল্পের পক্ষেই থাকত। তাঁর কাছে কোনো মাধ্যমের মূল্য নির্ধারিত হতো মানুষের অনুভূতিকে কত গভীরভাবে প্রকাশ করতে পারে, সেই ক্ষমতায়।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমাদের ফিরে তাকাতে হয় তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারের দিকে।
একটি চলচ্চিত্রের চেয়ে বড় যে উত্তরাধিকার
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চলচ্চিত্রজীবনের পরিসর মাত্র একটি ছবি—নটীর পূজা। কিন্তু তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তার পরিসর তার চেয়ে অনেক বড়।
এই নিবন্ধের শুরুতে আমরা প্রশ্ন ছিল, জীবনের শেষ পর্বে কেন তিনি চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকলেন? তাঁর লেখা, শিল্পচর্চা এবং নটীর পূজার নির্মাণকে একসঙ্গে বিবেচনা করলে অন্তত একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। তিনি চলচ্চিত্রে এসেছিলেন নতুন একটি শিল্পভাষার সম্ভাবনা অন্বেষণ করতে।
১৯২৯ সালের ‘চলচ্চিত্র’ প্রবন্ধে তিনি যে স্বতন্ত্র চলচ্চিত্রভাষার কথা বলেছিলেন, নটীর পূজা ছিল তারই প্রথম ও শেষ পরীক্ষা। সেই পরীক্ষা শিল্পগতভাবে কতটা সফল, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু তাঁর মৌলিক প্রশ্নটি আজও অম্লান—চলচ্চিত্র কি নিজের ভাষায় কথা বলতে পারছে?
বিশ্বচলচ্চিত্রের বিকাশ আমাদের দেখায়, এ প্রশ্নের গুরুত্ব সময়ের সঙ্গে আরও বেড়েছে। সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, আকিরা কুরোসাওয়া, আন্দ্রেই তারকোভস্কি কিংবা আব্বাস কিয়ারোস্তামির চলচ্চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি চলচ্চিত্রের শক্তি শুধু তার কাহিনিতে নয়, তার দৃশ্যভাষা, ছন্দ ও সময়বোধে।
রবীন্দ্রনাথকে তাই শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক হিসেবে নয়, শিল্পের ভাষা নিয়ে নিরন্তর অনুসন্ধানী একজন চিন্তক হিসেবেও পড়া দরকার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি নতুন একটি শিল্পমাধ্যমের সামনে নিজেকে শিক্ষানবিশ হিসেবে দাঁড় করাতে দ্বিধা করেননি। সেখানেই নিহিত তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
অবশ্য রবীন্দ্রনাথ তাঁদের চলচ্চিত্ররীতির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, এমন দাবি করা যাবে না। তবে এটুকু বলা যায়, তিনি যে নন্দনতাত্ত্বিক প্রশ্ন তুলেছিলেন, পরবর্তী চলচ্চিত্রচর্চা তার গুরুত্ব বারবার প্রতিষ্ঠা করেছে।
আজ, ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগেও তাঁর ভাবনা নতুন অর্থ পায়। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, শিল্পের মৌলিক প্রশ্নটি অপরিবর্তিত থাকে—নতুন মাধ্যম কি মানুষের অভিজ্ঞতাকে আরও গভীরভাবে প্রকাশ করতে পারছে?
রবীন্দ্রনাথের কাছে উত্তরটি ছিল শিল্পের স্বাধীনতায়। কোনো মাধ্যমের মূল্য তার প্রযুক্তিতে নয়, তার নিজস্ব প্রকাশভাষায়।
সম্ভবত এ কারণেই তাঁর একমাত্র চলচ্চিত্রের চেয়ে তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নটীর পূজার অধিকাংশ অংশ হারিয়ে গেছে, কিন্তু তিনি যে প্রশ্ন রেখে গেছেন, তা এখনো জীবন্ত।
রবীন্দ্রনাথকে তাই শুধু একজন কবি বা সাহিত্যিক হিসেবে নয়, শিল্পের ভাষা নিয়ে নিরন্তর অনুসন্ধানী একজন চিন্তক হিসেবেও পড়া দরকার। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি নতুন একটি শিল্পমাধ্যমের সামনে নিজেকে শিক্ষানবিশ হিসেবে দাঁড় করাতে দ্বিধা করেননি।
সেখানেই নিহিত তাঁর চলচ্চিত্রচিন্তার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।
একজন বড় শিল্পী তাঁর সৃষ্টির মধ্যেই শুধু বেঁচে থাকেন না; তিনি বেঁচে থাকেন সেই প্রশ্নগুলোর মধ্যে, যেগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। রবীন্দ্রনাথের চলচ্চিত্রচিন্তা তেমনই একটি উত্তরাধিকার, যা এখনো অসমাপ্ত, এখনো প্রাসঙ্গিক।
পরিশিষ্ট
এই নিবন্ধে ব্যবহৃত তথ্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা, চিঠিপত্র, সমকালীন দলিল এবং ভারতীয় চলচ্চিত্র-ইতিহাসবিষয়ক গবেষণার ভিত্তিতে উপস্থাপিত হয়েছে।
খন্দকার সুমন: লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা
নির্বাচিত তথ্যসূত্র
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রবীন্দ্র রচনাবলী (বিশ্বভারতী), বিশেষত ‘চলচ্চিত্র’ প্রবন্ধ (১৯২৯)।
২. দ্য ইংলিশ রাইটিংস অব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিশ্বভারতী।
৩. অশীষ রাজাধ্যক্ষ ও পল উইলেমেন, এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইন্ডিয়ান সিনেমা।
৪. সত্যজিৎ রায়, আওয়ার ফিল্মস, দেয়ার ফিল্মস।
৫. চিদানন্দ দাশগুপ্ত, টকিং অ্যাবাউট ফিল্মস।
৬. ন্যাশনাল ফিল্ম আর্কাইভ অব ইন্ডিয়া (এনএফএআই) এবং বিশ্বভারতী আর্কাইভস।