অলংকরণ: মাসুক হেলাল
অলংকরণ: মাসুক হেলাল

মৃত্যুদিনে স্মরণ

কমলকুমার মজুমদার এক অস্বস্তির নাম

কমলকুমার মজুমদার মৃত্যুবরণ করেন ১৯৭৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি। মৃত্যুকালে তিনি কমলালেবুর রস পান করেছিলেন। তারপর পাঁচবার মাধব মাধব উচ্চারণ করে চলে গিয়েছিলেন। জগতের অমৃত রস পান করে, প্রিয় নাম জপতে চপতেই চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবেই, যাপিত জীবনে, সাধনায় তিনি অমৃত নাকি বিষের স্বাদ লাভ করেছিলেন?

কমলকুমারের মৃত্যুশয্যার খবর চারপাশের অনেকেই জানতেন। দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ, শয্যাশায়ী ছিলেন। তথাপি, মৃত্যুকালে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন মাত্র দুজন। স্ত্রী দয়াময়ী আর দয়াময়ীর বোন শিবানী। ভক্তদের মধ্যে মাত্র একজন! সুব্রত রুদ্র। তাঁর মৃত্যুর পরদিন মৃত্যু সংবাদ গুরুত্বসহকারে কেউই ছাপেনি। একটিমাত্র পত্রিকা আরেকজন সাহিত্যিকের মৃত্যু সংবাদের সঙ্গে এক কলামে ছোট করে ছেপেছিল ‘যৌথ যাওয়া’। তারপর কোনো স্মরণসভা হয়নি কলিকাতায়। এখনো হয় না। ঢাকায় নব্বইয়ের দশকে কয়েক বছর হয়েছিল। এখন আর হয় না। কিন্তু তাঁকে তো সিরিয়াস লেখকেরা, সাহিত্যের একেবারে ভেতর মহলের মানুষেরা গুরু হিসেবে মানেন। বলা হয়, তিনি সাহিত্যিকদের সাহিত্যিক। অবশ্য সঙ্গে এটাও বলা হয়, বাংলা সাহিত্যের দুরূহতম, দুর্বোধ্য লেখক।

তাঁর মৃত্যুর পরের বছরই ঢাকা থেকে আস্ত একটি বই প্রকাশ হয় বলা যায় নিন্দা করেই। তাঁকে ভারতীয় পৌত্তলিক ধারণার, ব্রাহ্মণ্যবাদী, বামাচারী লেখক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এর আগে তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে নিয়ে ‘মেট্রোপলিটান শিল্পমন ও একজন সিদ্ধ তান্ত্রিকের শব্দসাধনা’ শিরোনামে বৃহৎ যে প্রবন্ধটি রচনা করেন তাঁরই শিষ্য নবনীতা দেব সেন—সেখানেও তাঁকে শুদ্ধ তান্ত্রিক হিসেবে গালমন্দ করা হয় এবং তাঁর সাহিত্যচর্চাকে নৈরাজ্যকর হিসেবেই প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয়। পরে অবশ্য তিনি এ প্রবন্ধের জন্য গুরুর কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন।

সাহিত্যে নিরীক্ষার প্রশ্ন এলেই তাঁর নামটি প্রথমেই আসছে। সিরিয়াস সাহিত্য বললেই তিনি অদ্বিতীয় হয়ে উঠছেন। তথাপি সাহিত্যের সাধারণের মহলে, একাডেমিয়ার জগতে তিনি অনেকটাই ‘অপর’। অস্বস্তির নাম। তাঁকে অস্বীকার করা যাচ্ছে না। আবার স্বস্তির সঙ্গে নেওয়াও যাচ্ছে না। এমনটি কেন ঘটল?

কিন্তু তাতেও কি কমলকুমারের গ্রহণযোগ্যতা বেড়ে গেছে? উত্তর, না। কমলকুমার সাধারণ পাঠকের হননি; কিন্তু তাঁকে ঠিক অস্বীকারও করা যাচ্ছে না। সাহিত্যে নিরীক্ষার প্রশ্ন এলেই তাঁর নামটি প্রথমেই আসছে। সিরিয়াস সাহিত্য বললেই তিনি অদ্বিতীয় হয়ে উঠছেন। তথাপি সাহিত্যের সাধারণের মহলে, একাডেমিয়ার জগতে তিনি অনেকটাই ‘অপর’। অস্বস্তির নাম। তাঁকে অস্বীকার করা যাচ্ছে না। আবার স্বস্তির সঙ্গে নেওয়াও যাচ্ছে না। এমনটি কেন ঘটল? এটার জন্য সাহিত্যের অর্ধসাধক লেখক আর অর্ধমনস্ব পাঠক দায়ী নাকি তিনি নিজেও দায়ী? অর্ধসাধক লেখক আর অর্ধমনস্ক পাঠকের নিয়ে আমরা কথা বলতে চাই না। কেননা স্বয়ং কমলকুমার তাঁদের প্রণাম জানিয়ে চলে গেছেন। আমরা বরং কমলকুমারের দিকেই নজর ফেরাতে চাই।

কমলকুমার মাত্র ১৯ জন পাঠক চেয়েছিলেন। প্রথম বই ‘অন্তর্জলী যাত্রা’ প্রকাশের পর বলেছিলেন, ১৯ কপি বিক্রি হয়েছে, ২০ কপি আবার ফেরত দিয়ে গেছে। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে ঠাট্টা করে বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তব অবস্থা এর চেয়ে তেমন পৃথক কিছু নয়। এখনো কলকাতায় প্রতিবছরই তাঁকে নিয়ে একটা না একটা বই প্রকাশিত হয়। ঢাকায় তাঁর বইয়ের পাইরেসি কপি ছাপা হয়। কিন্তু তবু তিনি সীমিত পাঠকদের, লেখকদের লেখক হয়েই থেকে যাচ্ছেন। পাঠক তো বটেই, লেখকেরাও তাঁকে অনেকটা অস্বস্তির সঙ্গে গ্রহণ করেন। একাডেমিয়া তো এড়াতে পারলে বাঁচে!

উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে লর্ড মেকলে ভারতবর্ষের সাহিত্য–সংস্কৃতির মূল ভিত্তিপ্রস্তরটি রচনা করেছিলেন তাঁর কুখ্যাত মেকলে মিনিটেসের মাধ্যমে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভারতবর্ষে আমরা এমন এক শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করতে চাই, যাদের চামড়া হবে ভারতীয় কিন্তু রুচি হবে ইউরোপীয়।’

এর জন্য অনেকটাই দায়ী কমলকুমার নিজেই। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যেমন বলেছিলেন, কমলকুমার যেন ইচ্ছা করেই তাঁর লেখার চারপাশে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে রাখেন। যেন পাঠক সহজে ঢুকতে না পারেন। এ বেড়াটি প্রথমত রচনারীতির—স্পষ্ট করে বললে ভাষার। তারপর বিষয়েরও। কিন্তু এ ভাষা ও বিষয় কি খুব অচেনা, অপরের? নাকি পাঠক নিজেকেই নিজে চিনতে পারছেন না? নিজের সঙ্গেই নিজে আত্মীয়তার সূত্র হারিয়ে ফেলেছেন। কমলকুমারের ভাষা প্রসঙ্গে বীরেন্দ্রনাথ রক্ষিত লিখেছেন, ‘যে ভাষা ভুলিয়া গিয়াছি।’ যদি ভুলে গিয়ে থাকি, সূত্র হারিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে এই হারানোর কারণটি কী?

এ জন্য আমাদের একটু ইতিহাসের দিকে চকিতে একটু ফিরে তাকাতে হবে।

কমলকুমার মজুমদার (১৭ নভেম্বর ১৯১৪—৯ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯)

উনিশ শতকের ত্রিশের দশকে লর্ড মেকলে ভারতবর্ষের সাহিত্য–সংস্কৃতির মূল ভিত্তিপ্রস্তরটি রচনা করেছিলেন তাঁর কুখ্যাত মেকলে মিনিটেসের মাধ্যমে। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘ভারতবর্ষে আমরা এমন এক শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করতে চাই, যাদের চামড়া হবে ভারতীয় কিন্তু রুচি হবে ইউরোপীয়।’ লর্ড বেন্টিঙ্ক এটাকেই ভারতবর্ষের শিক্ষা ও সংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তী ১০০ বছরে ভারতবর্ষের এমন এক শিক্ষিত শ্রেণি তৈরি হয়, যারা পুরোটাই ইউরোপীয় রুচির। ঘটে শিল্প–সংস্কৃতির ঔপনিবেশীকরণ। ফলে বঙ্কিমচন্দ্র সূচনা করেন বাংলা ভাষায় ভিক্টোরীয় উপন্যাসের ধারা, শুরু হয় যাত্রার বদলে প্রসেনিয়াম থিয়েটার, কবিগানের স্থানে আধুনিক গীতিকবিতা, পশ্চিমের সবকিছু। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে ইংরেজি ভাষা অনুকরণে তৈরি হয় ‘বাবু গদ্য’। কমলকুমার যাকে বলেছিলেন, ‘খুকু গদ্য’। যার ফলে ১৮০১ সালের ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে তৈরি করা গদ্যের কাছে ১৫৫৫ সালের বাংলা গদ্য হারিয়ে যায়।

হাজার বছরের বাংলা সাহিত্যের ধারা পশ্চিমের ধারার পাশে অপাঙ্‌ক্তেয় হয়ে পড়ে। আমাদের মেকলে নির্মিত মন থেকে নিজ মন উধাও হয়ে যায়। আর গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে তো বুদ্ধদেব বসু থেকে জীবনানন্দ দাশ সবাই পশ্চিমের চশমায় আমাদের শহর আর মাঠের ধানখেত দেখতে শুরু করেন। তত দিনে তৈরি মেকলে পরিকল্পিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এই পশ্চিমের কায়দার শিল্প–সাহিত্যে পড়ে স্বস্তিবোধ করতে থাকে। একটা কম্ফোর্ট জোন তৈরি হয়ে যায়। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ নির্মিত গদ্যে ভিক্টোরীয় কাঠামোতে লেখা কথাসাহিত্য এ শ্রেণি স্বস্তির সঙ্গেই পাঠ করতে থাকে। সেখানে হঠাৎ করেই কমলকুমারের আবির্ভাব ঘটে, যাঁর লেখার ধরনটি ‘অদ্ভুত’। তাঁর বিষয় আর ভাষা বেশ অচেনা অচেনা। অস্বস্তিকর। ফলে কেউ তাঁর নাম দেন বামাচারী, কেউ তাঁর নাম দেন তান্ত্রিক। আর যাঁরা ধাক্কা সামলে খানিকটা পড়তে সক্ষম হন, তাঁরা অভিহিত করেন বাংলা সাহিত্যের দুর্বোধ্যতম, দুরূহ লেখক। এবং আলগা রাখতে চিহ্নিত করেন সাধারণের নন, তিনি লেখকদের লেখক।

এখন প্রশ্ন, কমলকুমার কেন এমনটি করতে গেলেন? এটারও উত্তর লুকিয়ে আছে তাঁর যাপিত জীবনের মাঝে।

কমলকুমার মজুমদারের জন্ম ১৯১৪ সালের ১৭ নভেম্বর কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে। পিতা প্রফুল্লচন্দ্র মজুমদার, মা রেণুকাময়ী মজুমদার। পিতামহ বরদাকান্ত মজুমদার। তাঁদের স্থায়ী নিবাস চব্বিশ পরগণা জেলার টাকীতে। কমলকুমারের জন্মকালে তাঁর পিতা পুলিশ অফিসার হিসেবে কলকাতায় কর্মরত, থাকতেন ভাড়াবাড়িতে।

তাঁর সময় ভারতবর্ষে চলছিল ইংরেজ শাসনের চূড়ান্ত পতনের কাল। স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রভাব তখন তুঙ্গে। তাঁর মধ্যে ইংরেজবিরোধী, এ সূত্রে ইংরেজি ভাষার সাহিত্যবিরোধী এক মনোভাব গড়ে উঠেছিল। ঔপনিবেশিক ভাষা ও সাহিত্য ফেলে তিনি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন ঔপনিবেশ–পূর্ববর্তী বাংলা গদ্যে, ভাষা ও সাহিত্যে।

ছোটবেলা থেকেই কমলকুমার ভিন্ন প্রকৃতির ছিলেন। খুব অল্প বয়সে বাসার রান্নাঘরে অর্ধনগ্ন ছবি এনে সেঁটে রেখেছিলেন। মায়ের কাছে মার খেতে গিয়েছিলেন। পুলিশ পিতা রক্ষা করেছিলেন। খুব অল্প বয়সে বিড়ি ধরেছিলেন। তরুণ বয়সে মদও। বাবা ডেকে বলেছিলেন, ‘মদ–বিড়ি খেতে হলে দামি মদ–বিড়ি খাবে। ঘরে বসে খাবে।’ বিড়ি ছাড়লেও মদের নেশা তাঁকে খালাসিটোলার কিংবদন্তি চরিত্রে পরিণত করেছিল। স্কুলে ভর্তি হলে বাবার স্বাক্ষর নকল করে স্কুল থেকে পালিয়ে যেতেন। পরে মিশনারি স্কুলে ভর্তি করলে, সেখানে ফাদারকে মেরে পালিয়েছিলেন। মাথা ন্যাড়া টোলে গেলে সেখান থেকেও পালিয়েছিলেন। ফলে ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, বিদ্রোহের একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছিল।

তাঁর সময় ভারতবর্ষে চলছিল ইংরেজ শাসনের চূড়ান্ত পতনের কাল। স্বদেশি আন্দোলনসহ ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সব আন্দোলনের প্রভাব তখন তুঙ্গে। ফলে তাঁর মধ্যে ইংরেজবিরোধী, এ সূত্রে ইংরেজি ভাষার সাহিত্যবিরোধী এক মনোভাব গড়ে উঠেছিল। ফলে ঔপনিবেশিক ভাষা ও সাহিত্য ফেলে তিনি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন ঔপনিবেশ–পূর্ববর্তী বাংলা গদ্যে, ভাষা ও সাহিত্যে। এ কারণে আমরা পাই বিরামচিহ্নহীন বাংলায় একবাক্যে লেখা তাঁর উপন্যাস ‘সুহাসিনীর পমেটম’। যে বিরামচিহ্নহীন গদ্য ১৬ শতকের বাংলা চিঠিপত্র ও দলিল–দস্তাবেজে ছিল। তিনি রচনা শুরু করেন দেবতার বন্দনা দিয়ে, যে রীতি মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে ছিল। আর বিষয়েও তিনি ফিরে যান সেই প্রান্তিকজনের জগতে, যে জগৎ মধুযুগের বাংলা সাহিত্যের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, মঙ্গলকাব্যে ছিল। ফলে তাঁর ‘পিঞ্জরে বসিয়া শুক’ উপন্যাসের বালক সুঘরাই হয়ে ওঠে রাখাল বালক কৃষ্ণের আর্কিটাইপ। কিন্তু বাবু আমরা তো সেই প্রাকৃত জনের ভাষা ফেলে এসেছি, সূত্র হারিয়ে ফেলেছি।

তাই কমলকুমার মজুমদার ঔপনিবেশ নির্মিত আধুনিক সাহিত্যেরে ড্রয়িংরুমে যেন মধ্যযুগের মাঠ থেকে ফিরে আসা পূর্বপুরুষ। যাঁর স্বদেশি ভাষা ও ভাব আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। তাঁর সঙ্গে আত্মীয়তার সূত্র আমাদের এতটাই ছিন্ন হয়ে গেছে যে অস্বীকার করতে দ্বিধা হচ্ছে না, বিভিন্ন অভিধা দিয়ে অপর করে রাখতে হচ্ছে। কিন্তু চাইলেই কি শিকড় উপড়ে ফেলা যায়? ভুলে যাওয়া গন্ধের মতো মনে পড়ে। ফলে অস্বস্তি সত্ত্বেও কোথাও মায়া রহিয়া গেল।