সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী লেখকদের ছবি অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস
সম্ভাব্য নোবেল বিজয়ী লেখকদের ছবি অবলম্বনে প্রথম আলো গ্রাফিকস

নোবেল ২০২৬: সাহিত্য নাকি ভূরাজনীতি

আগামী ৮ অক্টোবর ২০২৬ ঘোষিত হবে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার বিজয়ীর নাম। বিশ্বরাজনীতি, মহাদেশীয় ক্ষমতার ভারসাম্য আর মনস্তাত্ত্বিক কূটনীতির এক জটিল জ্যামিতির উত্তেজনা তৈরি হয় নোবেল পুরস্কার ঘিরে।

গত বছর সাহিত্যের নোবেল উড়ে গিয়েছিল হাঙ্গেরিতে। পরাবাস্তব ও অন্তর্মুখী গদ্যের জাদুকর লাসলো ক্রাসনাহোরকাই পেয়েছিলেন এই সম্মান। এবার কার পালা? ইউরোপ কি তার দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক একাধিপত্য ধরে রাখবে? নাকি পুরস্কারের নৌকা নোঙর ফেলবে এশিয়া, আফ্রিকা বা লাতিন আমেরিকার কোনো অবহেলিত বন্দরে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে লেখকের সাহিত্যশৈলী দেখলে চলবে না। তাকাতে হয় সমকালীন ভূরাজনৈতিক চালের দিকেও। মনে পড়ে যায়, আলফ্রেড নোবেলের উইলের সেই উক্তি ‘ইন অ্যান আইডিয়ালিস্টিক ডিরেকশন’ এই আদর্শগত অভিমুখ শব্দবন্ধটিকে সুইডিশ একাডেমি যুগে যুগে বৈশ্বিক রাজনীতির হাওয়া অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের সাহিত্য সমালোচকেরা দীর্ঘকাল ধরেই নোবেল কমিটির একটি বড় পক্ষপাতের দিকে আঙুল তুলেছেন। সেটি হলো এর চরম ‘ইউরোকেন্দ্রিকতা’। নোবেলের এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের ইতিহাসে আজ পর্যন্ত অর্ধেকেরও বেশি পুরস্কার গেছে ইউরোপীয় ভাষাগুলোর। বিশেষ করে ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান আর সুইডিশ ভাষার পকেটে।

লিউডমিলা উলিৎসকায়া

এখানেই কাজ করে ভাষার এক প্রচ্ছন্ন উপনিবেশ। আফ্রিকার নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গো অথবা দক্ষিণ এশিয়ার অমিতাভ ঘোষের মতো কালজয়ী লেখকদের নোবেল কমিটির নজরে পড়তে হলে বেশ কাঠখড় পোড়াতে হয়।

শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক ভাষার অনুবাদ–কাঠামোর ওপরই নির্ভর করতে হয়। মূল ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি আর রূপক পশ্চিমা অনুবাদের ছাঁচে পড়ে অনেক সময় তার খাঁটিত্ব হারায়। অথচ ইউরোপের একজন মাঝারি সারির লেখকও মূল ভাষায় সহজলভ্যতার কারণে স্টকহোমের সুনজরে চলে আসেন। ফলে সাহিত্যের নোবেল বৈশ্বিক হওয়ার দাবি করলেও তা বহুলাংশে ইউরোপীয় নান্দনিকতার একচ্ছত্র মানদণ্ডেই বন্দী রয়ে গেছে।

নোবেল কমিটি সব সময় দেখানোর চেষ্টা করে তারা কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক এজেন্ডা দ্বারা চালিত নয়। কিন্তু নোবেলের অতীত ঘাঁটলে দেখা যায়, একাডেমি অবলীলায় বিশ্বরাজনীতির পাশা খেলায় অংশ নিয়েছে। ১৯৫৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের চরম বিরোধিতার মুখে বরিস পাস্তেরনাককে, ১৯৭০ সালে আলেকজান্ডার সোলঝেনিৎসিনকে নোবেল দেওয়া মোটেও কোনো আকস্মিক সাহিত্যিক ঘটনা ছিল না। অনেক সমালোচকই মনে করেন, এটি ছিল স্নায়ুযুদ্ধের তীব্র আবহে সোভিয়েত ইউনিয়নের একনায়কতন্ত্র ও সাম্যবাদী সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের এক মোক্ষম মনস্তাত্ত্বিক চাল।

শেষ পর্যন্ত পশ্চিমা ও ঔপনিবেশিক ভাষার অনুবাদ–কাঠামোর ওপরই নির্ভর করতে হয়। মূল ভাষার অন্তর্নিহিত শক্তি আর রূপক পশ্চিমা অনুবাদের ছাঁচে পড়ে অনেক সময় তার খাঁটিত্ব হারায়। অথচ ইউরোপের একজন মাঝারি সারির লেখকও মূল ভাষায় সহজলভ্যতার কারণে স্টকহোমের সুনজরে চলে আসেন। ফলে সাহিত্যের নোবেল বৈশ্বিক হওয়ার দাবি করলেও তা বহুলাংশে ইউরোপীয় নান্দনিকতার একচ্ছত্র মানদণ্ডেই বন্দী রয়ে গেছে।

বর্তমান একবিংশ শতাব্দীর ভূরাজনীতিতেও এই সমীকরণটি সমানভাবে সত্য। সমকালীন বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চীনের আগ্রাসী নীতি ও আধিপত্যবাদের মুখে ক্যান শুয়ের মতো একজন প্রান্তিক, পরীক্ষামূলক চীনা কথাসাহিত্যিককে নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে তুমুল জল্পনা চলছে। তার পেছনে কি কেবলই তাঁর জাদুবাস্তবতা? চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় তাঁর মা-বাবা চরম রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। তাঁর ‘লাভ ইন দ্য নিউ মিলেনিয়াম’ বা ‘দ্য ফ্রন্টিয়ার’ উপন্যাসগুলো পড়লে মনে হয় পাঠক কোনো এক অদ্ভুত স্বপ্নের ভেতর দিয়ে হাঁটছেন। চীনের রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের সমান্তরালে একজন ব্যক্তির শৈল্পিক স্বাধীনতাকে পুরস্কৃত করার এক প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক ইন্ধনও কি নোবেল কমিটির এই পূর্বাভাসের পেছনে কাজ করছে? একইভাবে রুশ লেখক লিউডমিলা উলিৎসকায়ার নাম সামনে আসা ইঙ্গিত করছে স্টকহোমের দরজার পেছনে বিশ্বরাজনীতির হাওয়া সব সময়ই একটি বড় অনুঘটক।

সম্ভাব্য আলোচনায় থাকা পরের নামটি এক চিরন্তন সাহিত্যিক জল্পনার। হারুকি মুরাকামি। সমকালীন বিশ্বসাহিত্যে তাঁর মতো জনপ্রিয় নাম খুব কমই আছে।

একাকিত্ব আর জাদুর বাস্তবতার এক অনন্য রসায়ন তৈরি করেছেন তিনি তাঁর লেখায়। তাঁর মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘1Q84’ পাঠককে এক সমান্তরাল টোকিও শহরে নিয়ে যায়। যার আকাশে দুটি চাঁদ ওঠে। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের বোদ্ধাদের মনে থাকার কথা—জাপানি সাহিত্যের দুই মহিরুহ তামুরা রিউচি কিংবা শুনতারো তানিকাওয়াও কিন্তু নোবেল পাননি! মুরাকামির বড্ড বেশি সমসাময়িক ও বৈশ্বিক ইমেজের নিচে ঢাকা পড়া নাগরিক বিষাদ পাঠক হৃদয়ে দোলা দেয় সত্য। কিন্তু সুইডিশ একাডেমির গম্ভীর ও ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যিক নিক্তিতে তা শেষ পর্যন্ত কতটা ওজনদার বলে গণ্য হবে তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যায়।

হারুকি মুরাকামি

নোবেল জয়ী ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ও কেনজাবুরো ওহেই-এর লেখায় যে খাঁটি জাপানি শিকড় ও যুদ্ধোত্তর আত্মিক সংকট ছিল মুরাকামি সেখানে বড্ড বেশি পশ্চিমা। হয়তোবা সে জন্যই তাঁর নোবেল না পাওয়ার সমীকরণটি আজীবন একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছে।

দক্ষিণ এশিয়া থেকে ১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পেয়েছিলেন। তারপর এই বিশাল, বৈচিত্র্যময় প্রাচীন উপমহাদেশে আর কোনো লেখক সাহিত্যে নোবেল পাননি। এই দীর্ঘ খরা কি সাহিত্যিক যোগ্যতার অভাবে, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক অন্ধত্ব ও ঔপনিবেশিক অবহেলা?

এই শূন্যতার ভেতরে দাঁড়িয়ে এবার সালমান রুশদির নাম আলোচনার টেবিলে। এ যেন এক মহাকাব্যিক নিয়তির মতো শোনায়। বুকার অব বুকার্স জয়ী ‘মিডনাইট’স চিলড্রেন’-এর এই স্রষ্টা আজীবন লড়েছেন স্বৈরাচার আর অন্ধত্বের বিরুদ্ধে। ‘মিডনাইট’স চিলড্রেন’ হলো জাদুর বাস্তবতার আবহে লেখা এক মহাকাব্যিক উপন্যাস, যেখানে সলিম সিনাই নামের এক অলৌকিক যুবকের জীবনগাথার মধ্য দিয়ে এসেছে দেশভাগ, আধুনিক ভারতের রাজনৈতিক উত্থান-পতন এবং ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস।

১৯৮৮ সালে ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ প্রকাশের পর তাঁর ওপর নেমে আসে ফতোয়া আর নির্বাসনের খড়্গ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ২০২২ সালে নিউইয়র্কের সেই প্রাণঘাতী ছুরি হামলার ক্ষত। সবকিছু মিলিয়ে রুশদি আজ বিশ্বজুড়ে মুক্তচিন্তা ও বাক্‌স্বাধীনতার এক জীবন্ত ইশতেহার। সুইডিশ একাডেমি যদি এবার বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং স্বৈরতান্ত্রিক সেন্সরশিপের বিরুদ্ধে একটি ঐতিহাসিক ও সাহসী অবস্থান নিতে চায় তাহলে রুশদির চেয়ে যোগ্য আর কেউ হতে পারেন না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, একাডেমি কি সেই ভূরাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ঝুঁকি নেবে? নাকি রুশদিও হোর্হে লুইস বোর্হেস, মিলান কুন্দেরার মতো নোবেল ছাড়াই ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবেন?

একাকিত্ব আর জাদুর বাস্তবতার এক অনন্য রসায়ন তৈরি করেছেন তিনি তাঁর লেখায়। তাঁর মহাকাব্যিক সৃষ্টি ‘1Q84’ পাঠককে এক সমান্তরাল টোকিও শহরে নিয়ে যায়। যার আকাশে দুটি চাঁদ ওঠে। কিন্তু বিশ্বসাহিত্যের বোদ্ধাদের মনে থাকার কথা—জাপানি সাহিত্যের দুই মহিরুহ তামুরা রিউচি কিংবা শুনতারো তানিকাওয়াও কিন্তু নোবেল পাননি! মুরাকামির বড্ড বেশি সমসাময়িক ও বৈশ্বিক ইমেজের নিচে ঢাকা পড়া নাগরিক বিষাদ পাঠক হৃদয়ে দোলা দেয় সত্য। কিন্তু সুইডিশ একাডেমির গম্ভীর ও ঐতিহ্যবাহী সাহিত্যিক নিক্তিতে তা শেষ পর্যন্ত কতটা ওজনদার বলে গণ্য হবে তা নিয়ে প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যায়।

দক্ষিণ এশিয়ার আরেকজন শক্তিশালী দাবিদার ভারতের ইংরেজি ভাষার লেখক অমিতাভ ঘোষ। তাঁর ‘আইবিস ট্রিলজি’, ‘দ্য শ্যাডো লাইনস’ ঔপনিবেশিক ইতিহাস, আফিম যুদ্ধ ও মানুষের অভিবাসনের এক মহাকাব্যিক দলিল। জলবায়ু পরিবর্তন সমকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাস্তব সংকট। এই সংকটের কালে পরিবেশ ও ইতিহাসের মেলবন্ধনে লেখা অমিতাভ ঘোষের সাহিত্যকে পুরস্কৃত করা নোবেল কমিটির জন্য একটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ শোধের মাধ্যম হতে পারত।

দক্ষিণ এশিয়ার মতোই আফ্রিকার সাহিত্যিক মানচিত্রটিকেও নোবেল কমিটি দীর্ঘকাল ধরে এক ধরনের ঔপনিবেশিক চশমা দিয়ে দেখেছে। ২০২১ সালে তানজানিয়ার আবদুলরাজাক গুরনাহ নোবেল পাওয়ার পর আফ্রিকার সাহিত্য নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও এই মহাদেশের আসল ক্ষোভ ও দাবি কিন্তু এখনো উপেক্ষিত। এই আলোচনায় সবার আগে আসে কেনিয়ার জীবন্ত কিংবদন্তি নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর নাম। নগুগি হলেন বিশ্বসাহিত্যে ‘ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড’। মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশ-মুক্তির সবচেয়ে বড় প্রবক্তা।

সালমান রুশদি।

নগুগি একসময় ইংরেজি ভাষায় তাঁর বিশ্বখ্যাত উপন্যাসগুলো যেমন ‘উইপ নট, চাইল্ড’, ‘আ গ্রেইন অব হুইট’ লিখেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তিনি বুঝতে পারেন, ঔপনিবেশিক শাসকের ভাষায় নিজের মাটির আসল গন্ধ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ফলে তিনি ইংরেজি বর্জন করে নিজের মাতৃভাষা ‘গিকুয়ু’-তে লিখতে শুরু করেন। এর জন্য তাঁকে চড়া মূল্য চুকাতে হয়। কারাবরণ থেকে শুরু করে দীর্ঘ নির্বাসন। সুইডিশ একাডেমি যদি এবার খাঁটি উত্তর ঔপনিবেশিক লড়াই, রাজনৈতিক বন্দিত্ব এবং নিজের ভাষার জন্য আমরণ সংগ্রামকে কুর্নিশ জানাতে চায় তাহলে নগুগির চেয়ে বড় কোনো নাম এই মুহূর্তে পৃথিবীতে নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সোমালিয়ার নুরুদ্দিন ফারাহর নাম। তাঁর ‘ব্লাড ইন দ্য সান’ ট্রিলজিতে আফ্রিকার একনায়কতন্ত্র, গৃহযুদ্ধ এবং নারীদের ওপর হওয়া প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতনের নির্মম ছবি তিনি এঁকেছেন, যা সমকালীন বিশ্বরাজনীতির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

অন্যদিকে রয়েছেন কানাডীয় লেখক মার্গারেট অ্যাটউডের নামও। বহু বছর ধরে সাহিত্যের নোবেল নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন তিনি। ঔপন্যাসিক, কবি ও প্রাবন্ধিক হিসেবে তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যজীবন বিস্তৃত নানা বিষয় ও আঙ্গিকে। ‘দ্য হ্যান্ডমেইড’স টেইল’ তাঁকে বিশ্বজুড়ে বিশেষ পরিচিতি দেয়। উপন্যাসটিতে ডিস্টোপিয়ান সমাজে নারীদেহ, ক্ষমতা, রাষ্ট্র এবং নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কের এক ভয়াবহ ভবিষ্যৎচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। জলবায়ু সংকট, স্বৈরতন্ত্র ও পুরুষতান্ত্রিক অবদমনকে তিনি সায়েন্স ফিকশনের আখ্যানে তুলে এনেছেন। এটি সমকালীন পৃথিবীর জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। নোবেল কমিটির মনে যদি সমকালীন লিঙ্গ-রাজনীতি এবং নারীর অধিকারের লড়াইকে প্রাধান্য দিতে মন চায় সে ক্ষেত্রে অ্যাটউড এবার অন্যতম শীর্ষ দাবিদার।

নুরুদ্দিন ফারাহ

এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমেরিকার উত্তর-আধুনিকতার রহস্যপুরুষ থমাস পিনচনের নাম। বয়স নব্বইয়ের কোঠায়। পিনচন বিশ্বসাহিত্যের সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্রগুলোর একজন। কয়েক দশক ধরে তাঁর কোনো সাম্প্রতিক ছবি দুনিয়ার কেউ দেখেনি। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি ‘গ্র্যাভিটিজ রেইনবো’ উত্তর-আধুনিক উপন্যাসের বাইবেল সমতুল্য। বিজ্ঞান, ইতিহাস, গণিত আর সামাজিক ব্যবস্থার অন্তরালে থাকা গোপন চক্রান্তের এক জটিল কোলাজ তৈরি করেন তিনি। ইতিহাস বলে নোবেল একাডেমি বাণিজ্যিকভাবে সফল সাহিত্যকে সব সময় এড়িয়ে চলে। পিনচন এবার নোবেল পেলে তা হবে মার্কিন পুঁজিবাদের ভেতরের ফাঁপা রূপটাকে ব্যঙ্গ করার এক বৈশ্বিক স্বীকৃতি।

নোবেল কমিটি মহাদেশীয় ভারসাম্য রক্ষা করতে একটি অলিখিত ভৌগোলিক আবর্তন নীতি মেনে চলে বলে মনে করেন অনেক সমালোচক। ২০২১ সালে আফ্রিকার আবদুলরাজাক গুরনাহ, ২০২২ ও ২০২৩ সালে পশ্চিম ও উত্তর ইউরোপে যথাক্রমে অ্যানি এরনাক্স ও জন ফসে, ২০২৪ সালে এশিয়ার হান কাং এবং ২০২৫ সালে পূর্ব ইউরোপ থেকে লাসলো ক্রাসনাহোরকাই নোবেল পেয়েছেন।

দক্ষিণ এশিয়ার মতোই আফ্রিকার সাহিত্যিক মানচিত্রটিকেও নোবেল কমিটি দীর্ঘকাল ধরে একধরনের ঔপনিবেশিক চশমা দিয়ে দেখেছে। ২০২১ সালে তানজানিয়ার আবদুলরাজাক গুরনাহ নোবেল পাওয়ার পর আফ্রিকার সাহিত্য নিয়ে বিশ্বমঞ্চে নতুন করে আলোচনা শুরু হলেও এই মহাদেশের আসল ক্ষোভ ও দাবি কিন্তু এখনো উপেক্ষিত। এই আলোচনায় সবার আগে আসে কেনিয়ার জীবন্ত কিংবদন্তি নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর নাম। নগুগি হলেন বিশ্বসাহিত্যে ‘ডিকলোনাইজিং দ্য মাইন্ড’। মনস্তাত্ত্বিক উপনিবেশ-মুক্তির সবচেয়ে বড় প্রবক্তা।

এই চক্রটি স্পষ্ট ইঙ্গিত করছে, ২০২৬ সালে পুরস্কারের নৌকাটি হয়তো ইউরোপ ও এশিয়ার বাইরে যেতেও পারে। বিশেষ করে লাতিন আমেরিকা যেমন আর্জেন্টিনার সিজার আইরা, ওশেনিয়া থেকে যেমন অস্ট্রেলিয়ার জেরাল্ড মারনেন নয়তো উত্তর আমেরিকার কোনো প্রান্তে নোঙর ফেলতে পারে। তবে বিশ্বমঞ্চের চলমান নানামুখী কূটনৈতিক টানাপোড়েন, যুদ্ধ ও আন্তর্জাতিক সংকটের আবহে অনেক কিছু পাল্টে যেতে পারে। প্রায়ই দেখা যায়, বিশেষ কোনো আদর্শ ও বৈশ্বিক স্বার্থের সঙ্গে মিলে যাওয়া সাহিত্যকে নোবেল কমিটি প্রচ্ছন্নভাবে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

নোবেলের এই অভ্যন্তরীণ জ্যামিতির দিকে তাকালে একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নোবেল পুরস্কার শতভাগ রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত নয়। হয়তো এর পেছনে মহাদেশীয় ভারসাম্য আর প্রচ্ছন্ন ইন্ধনের খেলা কাজ করে। কিন্তু এটিই বিশ্বসাহিত্যের অমূল্য রত্নগুলোকে নতুন করে চেনার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক জানালা। ক্যান শুয়ের পরাবাস্তব চীন, রুশদির লড়াকু ইতিহাস, মার্গারেট অ্যাটউডের দুঃস্বপ্নের ভবিষ্যৎ; অন্যদিকে নগুগি ওয়া থিয়োঙ্গোর ঔপনিবেশিক ভাষার লড়াই সব কটি নদীই শেষ পর্যন্ত মিশেছে মানুষের অনুভূতির এক অন্তহীন সাগরে।

মার্গারেট অ্যাটউড

আমাদের আজকের আলোচনায় আরও কয়েকটি নাম বাদ দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না। কানাডার কবি ও প্রাবন্ধিক অ্যান কারসন, রোমানিয়ার ঔপন্যাসিক মিরচা কার্তারেরেস্কু, মেক্সিকান লেখক ক্রিস্তিনা রিভেরা গারসা, আর্জেন্টিনার সেসার আইরা এবং স্পেনের এনরিকে ভিলা-মাতাসও সাম্প্রতিক নোবেল-আলোচনায় আছেন। তাঁদের প্রত্যেকের সাহিত্যিক পরিসর আলাদা। তাঁদের দীর্ঘদিনের সৃজনশীল কাজ, অনুবাদে উপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক পাঠক সমালোচনার কারণে তাঁরাও মুরাকামি, ক্যান শুয়ে, রুশদি, অমিতাভ ঘোষ ও মার্গারেট অ্যাটউডদের পাশে অবস্থান করছেন। তবে মনে রাখা দরকার, এগুলো কোনো আনুষ্ঠানিক মনোনয়ন তালিকা নয়। আন্তর্জাতিক সাহিত্য মহল, গণমাধ্যম ও নানা পূর্বাভাসে উঠে আসা নাম।

শেষ পর্যন্ত ৮ অক্টোবর কে পুরস্কার পাবেন? সেটি জানা যাবে কয়েক দিনের মধ্যেই। তার আগপর্যন্ত অনুমান চলবে। কেউ ভূগোল দেখবেন, কেউ রাজনীতি, কেউ ভাষা, কেউ সাহিত্যিক উত্তরাধিকার দেখবেন।

আর হয়তো শেষ পর্যন্ত এমন একজনের নাম ঘোষণা হবে, যাঁর কথা এই মুহূর্তের আমাদের কোনো আলোচনাতেই নেই।

সেটাই নোবেলের পুরোনো রহস্য।

সাহিত্যের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যও বোধ হয় এটাই। একটা পুরস্কার একজন লেখককে পাঠকের সামনে নিয়ে আসতে পারে। শেষ পর্যন্ত লেখকের লেখনী দ্বারাই তাঁর জায়গা ঠিক হয়। নোবেল ঘোষণা শেষ হওয়ার পর পাঠক যখন সেই লেখকের বই খুলে বসবেন, তখনই পুরস্কারের আসল যাত্রা শুরু হবে।

বিপাশা চক্রবর্তী

প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক