
স্প্যানিশ ভাষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি পাবলো নেরুদা। লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে পঠিত কবির নামও পাবলো নেরুদা। রাজনীতিবিদ, কূটনীতিক, বিপ্লবী, প্রেমিক, নোবেলজয়ী—এমন অসংখ্য অভিধা তাঁর নামের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়। তিনি ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই চিলির পারলাল শহরে জন্মগ্রহণ করেন।
কবি হিসেবে নেরুদা যেমন বিশ্বব্যাপী তুমুল আলোচিত, তেমনি তাঁর রাজনৈতিক জীবন আজও আলোচনার খোরাক জোগায়। ১৯৭০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চিলির কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে তাঁকে মনোনীত করা হয়েছিল। পরে স্যোশালিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে চিলির গণ ঐক্য ব্লকের পক্ষে নেরুদার দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা কমরেড সালভাদোর আলেন্দেকে প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়। আলেন্দে বিজয়ী হন। কিন্তু ১৯৭৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আলেন্দে ক্ষমতাচ্যুত হন। তারপর গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আলেন্দে মৃত্যুবরণ করেন। এসব ঘটনা পাবলো নেরুদাকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়ে যায়। বন্ধু আলেন্দের মৃত্যুর মাত্র ১২ দিন পর ১৯৭৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পাবলো নেরুদা সান্তিয়াগোতে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুও পরবর্তীকালে বিতর্কের জন্ম দেয়। সরকারিভাবে দাবি করা হয়েছিল, তিনি ক্যানসারের কারণে মারা গেছেন। কিন্তু পরে অভিযোগ ওঠে যে তাঁকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হতে পারে।
নেরুদার মৃত্যুর পাঁচ মাস আগে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্যবিষয়ক মাসিক গণসাহিত্য-এর ১৯৭৩ সালের মার্চ-এপ্রিল সংখ্যায় (প্রথম বর্ষ, ৮-৯ যুগ্ম সংখ্যা) মতিউর রহমানের এই প্রবন্ধ ‘চিলির কবি পাবলো নেরুদা’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়। পাবলো নেরুদা ও সালভাদোর আয়েন্দের জীবদ্দশায় প্রকাশিত এই প্রবন্ধ তৎকালীন বাংলা ভাষার পাঠকদের সামনে সুদূর লাতিন আমেরিকার সাহিত্য ও রাজনীতির এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। ‘অন্য আলো’ অনলাইন পাঠকের জন্য প্রবন্ধটি আবারও তুলে ধরা হলো।
মার্চ ১৯৭৩। প্রতিদিন চিলি থেকে নতুন নতুন খবর আসছে। সুদূর লাতিন আমেরিকায় চলছে এক সুদূরপ্রসারী বিপ্লবী প্রক্রিয়া। চিলির জনগণ একের পর এক ক্ষুদ্র আর বৃহৎ লড়াইয়ে বিজয়ী হয়ে এগিয়ে চলেছে সেই আলোক উদ্ভাসিত পথে, যে পথে রয়েছে শতাব্দীর লাঞ্ছনা, ঘাম আর রক্ত থেকে মুক্তির ফুটন্ত সম্ভাবনা। ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ আর সংগ্রামে বলিষ্ঠ এই চিলির জাতীয় কবি পাবলো নেরুদা। তিনি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।
চিলির চড়াই-উতরাই, মেহনতি মানুষের বিজয়ের অবশ্যম্ভাবিতা, তাদের সুখ-দুঃখ, অশ্রু আর স্বপ্ন অবিস্মরণীয়ভাবে চিত্রিত হয়েছে পাবলো নেরুদার কবিতায়। গোটা লাতিন আমেরিকা প্রতিরোধে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে তাঁর কবিতায়। তাঁর প্রচণ্ড গতিশীল লেখনীতে মূর্ত হয়ে উঠেছে সংগ্রামমুখর বিশ্ববিপ্লবের প্রতিটি উত্থান-পতন। তাই চিলি, লাতিন আমেরিকা আর মানবজাতির সর্বজনীন কবি পাবলো নেরুদা।
পাবলো নেরুদা মাতৃভূমি চিলি, যুদ্ধ, ক্ষুধা, জীবন, শ্রম আর ভালোবাসার গান গেয়েছেন অবিরাম। তাঁর কবিতায় রাতের হাওয়া, গহিন অরণ্য, পাহাড়, নদী আর সমুদ্র, এমনকি মাচুপিচুর মতো মৃত নগরীও প্রাণ পেয়েছে, জীবন্ত হয়ে উঠেছে।
এক বিচিত্র জটিল আর ঘাত-প্রতিঘাতমুখর বর্ণাঢ্য জীবন কবি পাবলো নেরুদার। খুব অল্প বয়সেই কবিতা লিখে এবং কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে খ্যাতি অর্জন করেন তিনি। একসময়ে খাবার সংগ্রহের জন্য তিনি মৃত পিতার ঘড়ি বিক্রি করেছিলেন, যাতে তাঁর কাব্য সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত না হয়।
পাবলো নেরুদা চিলির কনসাল হিসেবে রেঙ্গুন, কলম্বো, বাটাভিয়া, সিঙ্গাপুর, মাদ্রিদ, বুয়েনস এইরেস, প্যারিস ও মেক্সিকো শহরে কাজ করেছেন। সফর করেছেন চীন, ভারত, জাপান ও যুক্তরাষ্ট্র। বিশ্বশান্তি আন্দোলনের নেতা হিসেবে ভ্রমণ করেছেন সারা ইউরোপ।
স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় প্রজাতন্ত্রী দেশপ্রেমিকদের সর্বপ্রকার সহযোগিতা করেছেন, স্পেনীয় শরণার্থীদের জন্য সাহায্য তহবিল গঠন করেছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে মেক্সিকোর রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে স্তালিনগ্রাদের সমর্থনে সেঁটেছেন পোস্টার; শ্রমিক-জনসাধারণের ভোটে সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন ১৯৪৫ সালে।
১৯৫০ সালে পাবলো নেরুদা বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী পাবলো পিকাসো ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ গায়ক পল রবসনের সঙ্গে একত্রে বিশ্বশান্তি পুরস্কার লাভ করেন। তিনি স্তালিন শান্তি পুরস্কার (পরবর্তী সময়ে যা লেনিন শান্তি পুরস্কার নামে পরিচিত) পান ১৯৫৩ সালে। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে পাবলো নেরুদাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করা হয় ১৯৬৫ সালে। তিনিই প্রথম লাতিন আমেরিকান সাহিত্যিক, যাঁকে এ সম্মানে ভূষিত করা হয়।
১৯৭০ সালে চিলিতে বামপন্থী ও গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট সরকার গঠিত হলে পাবলো নেরুদা প্যারিসে রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত হন। অতিসম্প্রতি কাব্যসাধনায় অধিকতর সময়দানের তাগিদে তিনি সে পদ থেকে অবসর গ্রহণের কথা ঘোষণা করেছেন।
চিলির এই মহান কবিকে ১৯৭১ সালে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। ‘একটি মহাদেশের ভাগ্য ও স্বপ্নকে জীবিত করে তোলার আদি শক্তিকে কার্যকর করে কবিতা রচনা’র জন্যই সুইডিশ একাডেমি পাবলো নেরুদাকে নির্বাচিত করেছে বলে ঘোষণা করে। দেরিতে হলেও এ সংবাদে বিশ্ববাসী আনন্দিত হয়েছিল। গর্ববোধ করেছিল এই ভেবে যে তাঁদেরই একজন, অত্যন্ত নিকটের প্রিয় কবি সম্মানিত হলেন।
পাবলো নেরুদার নোবেল পুরস্কার লাভ এক অর্থে বিশ্বশান্তি আন্দোলনের বিরাট বিজয় বলে স্বীকৃত হয়েছিল। কারণ, পাবলো নেরুদা কমিউনিস্ট। তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন ও বিশ্বের নিপীড়িত জাতিসমূহের অন্তরঙ্গ সুহৃদ।
জীবনদর্শন হিসেবে মার্ক্সবাদকে গ্রহণ করার পর থেকেই পাবলো নেরুদার কবিতা পায় প্রচণ্ড গতি, ভরাট নদীর মতো কানায় কানায় ভরে ওঠে আর তা আছড়ে পড়ে শতাব্দীর পোড় খাওয়া মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে। বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারার উত্তরণ ঘটল বিংশ শতাব্দীর সংগ্রামী মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্মতায়, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মৌল দায়িত্ববোধে।
বিশ্বশান্তি ও সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের একনিষ্ঠ সাধক, নিরলস যোদ্ধা। অনেক সমালোচকের মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শের জন্যই তিনি আরও আগে নোবেল পুরস্কার পাননি।
১৯১৭ সালে স্থানীয় একটি পত্রিকায় পাবলো নেরুদার কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয়। পিতার মৃত্যুর পর তিনি সান্তিয়াগোতে চলে আসেন। সাধারণভাবে সাংবাদিকতা শুরু করলেও মূলত কাব্য সৃষ্টিতেই তিনি মনোনিবেশ করেন।
পাবলো নেরুদা ১৯০৪ সালের ১২ জুলাই পারলালে এক রেলশ্রমিকের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন। আসল নাম রিকার্দো এলিয়েসের নেফতালি রেইয়েস বাসোয়ালতো। নিকটবর্তী টেমুকো শহরেই তিনি বেড়ে ওঠেন। ১৯২৩ সালে ১৯ বছর বয়সে প্রকাশিত ‘ক্রেপুসকুলারিও’ (ছায়ার সমাবেশ)-এর লেখক হিসেবেই তিনি পাবলো নেরুদা নামটি প্রথম ব্যবহার করেন (এ সম্পর্কে অন্য একটি মতও রয়েছে। উইলিস বার্নস্টোন সম্পাদিত মডার্ন ইউরোপিয়ান পোয়েট্রি গ্রন্থে কবির সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দিতে গিয়ে বলা হয়েছে, ১৫ বছর বয়সেই ‘পাবলো নেরুদা’ ছদ্মনামে সেলবা আউস্ত্রাল পত্রিকায় প্রথম কবিতা পাঠান)। উনিশ শতকের চেকোস্লোভাকিয়ার কবি জান নেরুদার (১৮৩৪-১৮৯১) নাম থেকে তিনি ছদ্মনামের পদবিটি গ্রহণ করেন। পাবলো নেরুদা যখন কবিতা লেখা শুরু করেছেন, তখন সমগ্র লাতিন আমেরিকার আধুনিক সাহিত্যে বিরাজ করছে এক গভীর হতাশা। নেরুদার প্রথম কবিতা প্রকাশের বছরকাল পূর্বে স্পেনীয় কবিতার রাজ্যে ‘মডার্নিজমে’র জন্মদাতা রুবেন দারিওর মৃত্যু হয়েছে। নিকারাগুয়ার এই শক্তিশালী কবি ফরাসি সিম্বলিস্টদের রীতিতে কবিতা লিখে প্রভূত জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন। তাঁর মৃত্যুর অল্প দিনের মধ্যেই মডার্নিজমের কাল শেষ হয়ে যায়।
প্রথম মহাযুদ্ধোত্তরকালে ইউরোপের শিল্পকলার ক্ষেত্রে ফিউচারিজম, দাদাইজম, কিউবিজম, সুররিয়ালিজম প্রভৃতি নানা ধরনের যেসব পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছিল, তা লাতিন আমেরিকার কবি-সাহিত্যিকদেরও গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সুররিয়ালিজমের ফ্রি ফর্ম তাঁদের আকৃষ্ট করে বিশেষভাবে। পাবলো নেরুদাও সমাজের অন্ধকার ও উজ্জ্বল দিকগুলো বর্ণনা করতে গিয়ে একটা নিজস্ব ধারায় সুররিয়ালিজমকে গ্রহণ করেন। ১৯২৪ সালে নেরুদার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কুড়িটি প্রেমের কবিতা ও একটি হতাশার গান’ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে কবিকে এনে দেয় জনপ্রিয়তা। স্পেনীয় কবিতার জগতে নেরুদার আবির্ভাব হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো সবাইকে চমত্কৃত করে দেয়।
জীবনদর্শন হিসেবে মার্ক্সবাদকে গ্রহণ করার পর থেকেই পাবলো নেরুদার কবিতা পায় প্রচণ্ড গতি, ভরাট নদীর মতো কানায় কানায় ভরে ওঠে আর তা আছড়ে পড়ে শতাব্দীর পোড় খাওয়া মানুষের হৃদয়ে হৃদয়ে। বিচ্ছিন্ন চিন্তাধারার উত্তরণ ঘটল বিংশ শতাব্দীর সংগ্রামী মেহনতি মানুষের সঙ্গে একাত্মতায়, বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের মৌল দায়িত্ববোধে।
এ প্রসঙ্গে আর্জেন্টিনার লা হোরা পত্রিকার সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল কারণ সম্পর্কে বলতে গিয়ে পাবলো নেরুদা বলেছিলেন, ‘আমার সাহিত্য সৃষ্টির ক্ষেত্রে এক অচল অবস্থায় পৌঁছে আমি বেরোবার একটা ভালো পথ খুঁজে বের করতে চেয়েছিলাম। দুঃখের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যেই আমি সে পথ খুঁজে পেয়েছি।...লেখক হিসেবে আমি শূন্য রাতে প্রাচীর ভেঙে বেরোবার চেষ্টায় ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। এখন আমি সুখী। আমাদের পথের মাঝখান দিয়ে চলতে হবে—চলতে হবে জীবনের দিকে। রাজনীতি থেকে দূরে সরে থাকে যে লেখক, সে হলো কল্পকাহিনির জীব; সে কল্পকাহিনি আবিষ্কার ও পোষণ করেছে ধনতন্ত্র।...আমাদের একটা আলাদা জগৎ গড়তে হবে, সেটা এত শোক-দুঃখ ভরা থাকবে না, তা হবে সুখের জগৎ। তার জন্য লেখককে হতে হবে এক বিরাট বাহিনীর সৈনিক। তাকে না থেমে বা ওদিক-সেদিক না করে এগিয়ে চলতে হবে।’ (নভেম্বর, ১৯৭১ সংখ্যায় প্রকাশিত, পৃ. ৪২১, পরিচয়)
‘আজ রাতে আমি লিখতে পারি’ কবিতায় লিখেছেন: আজ রাতে আমি সবচেয়ে বিষণ্ন পঙ্ক্তিমালা লিখতে পারি। যেমন উদাহরণস্বরূপ লিখতে পারি, ‘রাতটি বিচূর্ণ এবং নীল নক্ষত্রমালা দূরে কম্পমান।’ রাতের হাওয়া আকাশে ঘুরে ঘুরে গান গায়।
পাবলো নেরুদার কর্মবহুল জীবনের মতো কাব্যসাধনার প্রতিটি স্তরেই এসেছে নিত্যনতুন বৈচিত্র্য। বস্তু, আঙ্গিক, অভিব্যক্তি—সবকিছুতেই তাঁর জাদুকরি স্পর্শ অভিনব ভাবের সৃষ্টি করেছে। তাঁর কবিতা কখনো বজ্রের মতো গুরুগম্ভীর স্বরে বেজে উঠেছে, আবার কখনো অত্যন্ত নিচু গলায় আলাপী ঢঙে কথা বলেছে।
নেরুদার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ১৯২৬ সালের বেস্টসেলার নিরন্তন মানুষের সন্ধানে সে সময়ের কঠোর নৈতিকতাবাদী সমাজেও প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সেই কাব্যগ্রন্থের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রয়েছে আজও। এই কাব্যগ্রন্থের ২০টি কবিতা সিরিজের শেষটির কিছু অংশ উদ্ধৃত করছি, যাতে মানবজীবনের চিরন্তন অনুভূতি প্রকাশিত হয়েছে অত্যন্ত সহজভাবে। কবি তাঁর প্রেমিকার কথা বলছেন, যার সঙ্গে তাঁর এখন আর কোনো সম্পর্ক নেই। কবির বর্তমান নিঃসঙ্গ দুঃখভরা স্মৃতি বারবার তাঁকে পিছু টানছে। যদিও কবি বুঝতে পারছেন, তাঁর প্রেমিকার অনুপস্থিতি চিরস্থায়ী, তবু কবির নিঃসঙ্গতারও ক্ষান্তি নেই। ‘আজ রাতে আমি লিখতে পারি’ কবিতায় লিখেছেন:
আজ রাতে আমি সবচেয়ে বিষণ্ন পঙ্ক্তিমালা লিখতে পারি।
যেমন উদাহরণস্বরূপ লিখতে পারি, ‘রাতটি বিচূর্ণ
এবং নীল নক্ষত্রমালা দূরে কম্পমান।’
রাতের হাওয়া আকাশে ঘুরে ঘুরে গান গায়।
আজ রাতে আমি বিষণ্নতম পঙ্ক্তিমালা রচনা করতে পারি।
আমি ওকে ভালোবাসতাম এবং কখনো সে আমাকেও ভালোবাসত।
আজকের মতো অনেক রাতজুড়ে আমিও তাকে ভালোবাসতাম
কী করে কেউ ওর দিঘল, প্রশান্ত চোখ ভালো না বেসে পারবে?
সে আমার ভাবনার নয়, তাকে হারিয়ে ফেলেছি অনুভব করা—
আজ রাতে আমি বিষণ্ন পঙ্ক্তিমালা রচনা করতে পারি।
শোনো, তার বিহনে অধিকতর ভারাক্রান্ত আত্মার কবিতা
ফসল-খেতে শিশিরের মতো ঝরে।
আমার ভালোবাসা ওকে ধরে রাখতে পারেনি।
এতে কী এসে-যায়! চূর্ণবিচূর্ণ হয়েছে এই রাত আর সে
আমার সঙ্গে নেই।
এটাই সব। দূরে গান গাইছে কেউ, দূরে তাকে হারিয়েছে
বলে আমার আত্মা সন্তুষ্ট নয়।
আমার দৃষ্টি তাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, যেন তার কাছে যেতে
চাইছে। আমার হৃদয় ওকে খুঁজছে, আর সে আমার সঙ্গে নেই।
একই রাত্রি একই গাছগুলোকে সাদা করে ফেলছে।
সেই সময়ের আমরা আর একরকম নই।
আমি আর ওকে ভালোবাসি না, এটা নিশ্চিত! অথচ
কী ভালোই-না ওকে বাসতাম! আমার কণ্ঠস্বর তার শ্রুতিকে
স্পর্শ করার জন্য বাতাসকে খুঁজত।
অন্যের, সে অন্যের হয়ে যাবে। আমার আগের চুমোর মতো
তার কণ্ঠস্বর, তার উজ্জ্বল শরীর, তার অসীম নয়ন।
এটা নিশ্চিত, আমি আর ওকে ভালোবাসি না; কিন্তু
হতে পারে আমি ওকে ভালোবাসি। ভালোবাসা
এত ক্ষণস্থায়ী, বিস্মৃতি বড় দীর্ঘস্থায়ী।
কারণ, এ রকম রাতে আমি তাকে আমার বাহুতে
জড়িয়ে ধরেছিলাম; আমার আত্মা তাকে হারিয়ে ফেলেছে।
যদিও আমাকে সে এটা শেষ যন্ত্রণা হিসেবে ভুগিয়েছে
এবং এই শেষের কবিতা তার উদ্দেশেই লিখেছি।
(অনুবাদ: শামসুর রাহমান)
বহু সমালোচক নেরুদাকে ‘রাজনৈতিক’ কবিতার লেখক হিসেবে চিত্রিত করে তাঁকে খাটো করতে চেয়েছেন। যেমনটা চেষ্টা করা হয়েছিল মায়াকভস্কির ক্ষেত্রেও। পাবলো নেরুদা স্বয়ং হৃদয়ে স্পেন কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় ঘোষণা করেছেন, কেন তিনি এ ধরনের কবিতা লেখেন, যা তথাকথিত সমালোচকেরা কবিতার উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ।
সে সময় অনেক ক্ষেত্রেই পাবলো নেরুদা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও নিজস্ব খেয়ালি-কল্পনা দ্বারা পরিচালিত হয়েছেন। তত্কালীন সময়ে রচিত একটি গদ্যে তার কিছুটা আভাস মেলে। তিনি বলেছেন, ‘নাগরিক হিসেবে আমি একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ। কিন্তু আইন, সরকার ও প্রতিষ্ঠিত সব সংস্থাকে আমি ঘৃণা করি।’
পরবর্তীকালে ইউরোপীয় সুররিয়ালিজম, সিম্বলিজম ও রিয়ালিজমের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন নেরুদা তাঁর কবিতায়। মার্ক্সবাদকে জীবনদর্শন হিসেবে গ্রহণ করার পর তিনি কাব্যে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ ও প্রতীকবাদকে মিশ্রিত করেছেন অনায়াসে। ফলে কবিতা হয়ে ওঠে আরও গভীর, আরও বাঙ্ময়।
পাবলো নেরুদা তাঁর পূর্ণতাপ্রাপ্ত নিজস্ব স্টাইল সম্পর্কে আমেরিকার কবি ও প্রাবন্ধিক রবার্ট ব্লাইয়ের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সচেতন একটি দেশে আমি জন্মেছি। যারা লড়াই করে, তারা জনগণের কাছ থেকে পূর্ণ সমর্থন পায়। প্রকৃতপক্ষে চিলির সব লেখকই বামপন্থার সমর্থক—সেখানে কোনো ব্যতিক্রম নেই বললেই চলে। আমরা জনগণের সমর্থন পাই এবং তারা আমাদের বুঝতে সক্ষম—এটা আমরা অনুভব করি...কবি হিসেবে জনতার সঙ্গে আমাদের সত্যিকার যোগাযোগ রয়েছে। আমি আমার কবিতা আবৃত্তি করি দেশের সর্বত্র প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরে—বছরের পর বছর, আমি অনুভব করি এটা আমার কর্তব্য।’ (আলান বোল্ড সম্পাদিত ‘দ্য পেঙ্গুইন বুক অব সোশালিস্ট ভার্স’, পৃ. ৪৯)
পাবলো নেরুদার কাব্যধারা ক্যাস্টালিয়ান কবিতার সুমহান ঐতিহ্য আর চিলির লোকসাহিত্যের অপূর্ব ভান্ডারে সমৃদ্ধ হয়েছে। ফরাসির দুই মহান কবি শার্ল বোদলেয়ার আর তরুণ বিদ্রোহী কবি আর্তুর র্যাঁবোকে আত্মস্থ করেছেন তিনি গভীরভাবে। অন্যদিকে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কবি ভ্লাদিমির মায়াকভস্কি আর আমেরিকার গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর ওয়াল্ট হুইটম্যানকে আকণ্ঠ পান করেছেন নেরুদা। নেরুদা লিখেছেন, ‘আমরা সেই তরুণ বয়সে মায়াকভস্কির গলার স্বরে চমকে উঠলাম—মিঠি মিঠি শব্দের ভুবনে আওয়াজ বাজতে লাগল যেন পুরোনো বাড়ি ধসিয়ে দেওয়া রাজমিস্ত্রির হাম্বুর।’ (তরুণ সান্যাল: পাবলো নেরুদার নোবেল পুরস্কার বিজয়, পরিচয়, নভেম্বর, ১৯৭১)
আর ‘ওগো, কাঠুরিয়া জাগো’ নামের দীর্ঘ, অপূর্ব কবিতাটিতে নেরুদা হুইটম্যানকে ‘হে আমার সৈনিক বন্ধু’ বলে সম্বোধন করেছেন। আর লিখেছেন ‘ওয়াল্ট হুইটম্যান/ তুমি আমাকে দাও তোমার উদাত্ত কণ্ঠ/ তোমার ঘুমন্ত হৃদয়ের অসীম শক্তি/ দাও আমাকে তোমার গাছের শিকড়ের মতো উচ্ছ্বসিত মুখাবয়ব, যেন আমার কণ্ঠ/ গেয়ে উঠতে পারে পুনর্জীবনের গান।’ (অনুবাদ: কমলেশ সেন)
বহু সমালোচক নেরুদাকে ‘রাজনৈতিক’ কবিতার লেখক হিসেবে চিত্রিত করে তাঁকে খাটো করতে চেয়েছেন। যেমনটা চেষ্টা করা হয়েছিল মায়াকভস্কির ক্ষেত্রেও। পাবলো নেরুদা স্বয়ং হৃদয়ে স্পেন কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতায় ঘোষণা করেছেন, কেন তিনি এ ধরনের কবিতা লেখেন, যা তথাকথিত সমালোচকেরা কবিতার উপকরণ হিসেবে গ্রহণ করতে নারাজ।
‘কয়েকটি ব্যাপারের ব্যাখ্যা’ কবিতাটিতে স্পেনের ওপর বর্বর ফ্যাসিস্ট বাহিনীর আক্রমণ এবং মাদ্রিদের ওপর বোমাবর্ষণের চিত্র ফুটে উঠেছে (সে সময়ে নেরুদা মাদ্রিদে ছিলেন এবং সবকিছুই স্বচক্ষে দেখেছেন)। তিনি লিখেছেন:
…আর একদিন সকালে সবকিছু জ্বলে উঠল দাউ দাউ
একদিন সকালে মাটি ফুঁড়ে
লাফিয়ে উঠল বহ্ন্যুৎসব
গোগ্রাসে গিলল জীবনকে,
আর তার পর থেকে আগুন আর আওন,
তার পর থেকে শুধুই বারুদ,
তার পর থেকে রক্ত আর রক্ত।
অ্যারোপ্লেন আর মুরদের সঙ্গে নিয়ে দস্যুদল,
অঙ্গুরীয় আর ডাচেসদের সঙ্গে নিয়ে দস্যুদল,
আশীর্বাদরত ডোমিনিকান ভিক্ষুদের সঙ্গে নিয়ে দস্যুদল
আকাশ ফুঁড়ে নেমে এল শিশু-হন্তারক,
আর রাস্তা থেকে রাস্তায় বয়ে গেল শিশুর রক্ত
অত্যন্ত সহজে, শিশুর শোণিতের মতোই শিশুর রক্ত।
শৃগালেরও অরুচি যত সব শৃগাল
শুকনো কাঁটাগাছও থুতু করে উগরে দেবে এমন সব পাথর
ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নেবে বিষধর এমনই বিষধর।
আমি দেখেছি স্পেনের রক্ত তোমাদের মুখের ওপর
উদ্ধত ফণা
গর্ব আর ছুরিকার একটিমাত্র ঢেউয়ে
ডুবিয়ে দিতে তোমাদের!
এসো দেখো রক্ত রাস্তায় রাস্তায়,
এসো দেখো
রাস্তায় রাস্তায় রক্ত,
এসে দেখো রক্ত
রাস্তায় রাস্তায়!
(অনুবাদ: মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়)
পাবলো নেরুদা একজন চিলিয়ান—একজন কবি, যিনি চিলির সাধারণ মানুষ এবং জনসাধারণের সবচেয়ে ঐতিহ্যশালী সংগঠিত পার্টি-কমিউনিস্ট পার্টি থেকেই পান তাঁর কাব্য সৃষ্টির প্রেরণা। চিলির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সেখানকার শ্রমিক আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনের ‘জনক’ বলে পরিচিত লুইস এমিলিও রেকাবেরেন—তাঁর উদ্দেশে লেখা ‘চিলির জনক’ কবিতায় নেরুদার কাব্য সৃষ্টির উৎস প্রস্ফুটিত হয়েছে সহজ-সুন্দরভাবে।
পাবলো নেরুদার কবিতায় শুধু চিলি আর স্পেনের বন্দী ও শোষিত মানুষই উপস্থিত হয়নি, সোভিয়েত ইউনিয়নের বীর জনতা এবং ধর্ষিত প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, পেরু, মেক্সিকো আর নিকারাগুয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষও উপস্থিত হয়েছে। উপস্থিত হয়েছে ফ্রান্স, গ্রিস, ইতালি, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া আর চীনের মুক্তিকামী যোদ্ধারা।
একই সঙ্গে বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম শিল্প-সাহিত্যিকেরাও ভিড় জমিয়েছেন পাবলো নেরুদার কাব্যের ক্যানভাসে। এসেছেন ইলিয়া এরেনবুর্গ, পল এলুয়ার, লুই আরাগঁ, থিওডোর ড্রেইসার, রাফায়েল আলবার্তি, ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, ভার্জিনিয়া উলফ, হাওয়ার্ড ফাস্ট আর স্পেনের কারাগারে নিহত মিগুয়েল হার্নান্দেস, যাঁকে ‘হে আমার পুত্র’ বলে সম্বোধন করে নেরুদা লিখেছেন, ‘ওরা জানুক, যারা তোমায় হত্যা করেছে/ এর দাম ওরা দেবে রক্ত দিয়ে।’
‘বিশ্বের শেষ দরদি পিতা চার্লি চ্যাপলিন’—প্রখ্যাত মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ গায়ক পল রবসন আর মেক্সিকোর সংগ্রামী চিত্রশিল্পী আলফ্রেদো সিক্যুরিয়াসও সমাদৃত হয়েছেন তাঁর কবিতায়।
পাবলো নেরুদার বিশ্ব সম্পর্কে ধ্যানধারণার পরিবর্তনে এবং মানবজাতির মুক্তিসংগ্রামে তাঁর যোগদানকে অবশ্যম্ভাবী করে তোলে স্পেনের গৃহযুদ্ধ। ১৯৩৬ সালে স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় নেরুদা ছিলেন সেখানে। হিটলার-মুসোলিনির সাহায্য-সমর্থনপুষ্ট জেনারেল ফ্রাঙ্কো জনপ্রিয় প্রগতিশীল প্রজাতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। ফ্যাসিবাদকে রুখতে বীর স্পেন তখন লড়ছিল, জ্বলছিল আর রক্ত দিচ্ছিল। সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক আর প্রগতিশীল মানুষ স্পেনের পক্ষে দাঁড়ালেন। আন্তর্জাতিক ব্রিগেডে যোগ দিলেন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ শিল্পী-সাহিত্যিক আর বিবেকবানেরা। নেরুদা তাঁদের সংস্পর্শে এলেন। মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর গভীর প্রত্যয় নিয়ে মাদ্রিদ প্রতিরক্ষার দ্বিতীয় বার্ষিকীতে ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত হলো স্পেন ইন দ্য হার্ট, যার ভূমিকায় লেখা ছিল, ‘গণতন্ত্রের সৈনিকেরা এই বইয়ের কাগজ বানিয়েছেন, ছাপার অক্ষরগুলো কম্পোজ করেছেন এবং বইটির মুদ্রণ সমাধান করেছেন।’
এই কাব্যগ্রন্থের ‘শহীদ প্রজাতন্ত্রীদের মায়েদের উদ্দেশে’ কবিতায় উচ্চকণ্ঠে নেরুদা ঘোষণা করেছেন, ‘ছুড়ে ফেলে দাও/ তোমাদের শোকবস্ত্র, সঞ্চিত করো একত্র অশ্রুজল,/ যতক্ষণ না তারা পরিণত হয় অস্ত্রে।’ (অনুবাদ: মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়)
আর ‘আন্তর্জাতিক ব্রিগেডের মাদ্রিদ-প্রবেশ উপলক্ষে’ কবিতায় নেরুদা লিখেছেন, ‘নিঃশব্দে, দৃঢ়পদে/ ভোরের আগমনী ঘণ্টাধ্বনির মতো,/ দূরদূরান্ত থেকে গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বপ্ন নীল চোখ নিয়ে/ আসছে সেই স্পেনদেশি শহরে, কোণঠাসা স্বাধীনতা যেখানে/ জন্তুর দাঁত-নখে ভূপতিত নিহত হবার মুখে।’ (অনুবাদ: মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়)
তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দুনিয়াজোড়া প্রগতিশীল মানুষের লড়াই আর দেশে দেশে কমিউনিস্টদের মহান আত্মত্যাগের ফলে বিশ্বের স্বাধীনতা, সভ্যতা আর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি রক্ষা পেল এক অমোঘ ধ্বংসের হাত থেকে। সে সময় বামপন্থীদের সঠিক নীতি, মানবতাবোধ ও বীরত্বে আকৃষ্ট হয়ে বিভিন্ন দেশের বিশ্বের সেরা সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিজ্ঞানীরা কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিলেন। তাঁদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলেন পাবলো পিকাসো, জুলিও কুরি, পল এলুয়ার, থিওডোর ড্রেইসার, পল ল্যাঞ্জেভাঁ প্রমুখ। আর চিলির পাবলো নেরুদাও যোগ দিলেন কমিউনিস্ট পার্টিতে ১৯৪৫ সালে। সে সময়েই সোভিয়েত কথাশিল্পী ইলিয়া এরেনবুর্গের একটি বইয়ের ভূমিকায় তিনি লিখলেন:
‘আজটেক, আর্জেন্টিনা বা কিউবার কোনো যুবককে কাফকা, রিলকে বা লরেন্স নিয়ে চোখের জল ফেলতে দেখলে আমার রাগ হয়।...আজ যে সংগ্রাম না করে সে কাপুরুষ। আগেকার দিনের যেসব জের কায়ক্লেশ এখনো টিকে আছে, তাদের নিয়ে মশগুল থাকা অথবা স্বপ্নের গোলকধাঁধার মধ্যে পথ হাতড়ে বেড়ানো আমাদের দিনের যোগ্য কাজ নয়।...আমাদের সংগ্রামের মধ্যেই আছে শিল্পের উত্স।’
সারা বিশ্বের অভূতপূর্ব সম্মান আর প্রতিষ্ঠা লাভ করে পাবলো নেরুদা কখনো নিজের সাধারণ জীবনের কথা ভোলেননি। কখনো মাতৃভূমি আর মহাদেশের প্রতি কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হননি বিন্দুমাত্র। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তরকালে কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতায় র্যাডিক্যাল গঞ্জালেস ভিদেলা ক্ষমতাসীন হলেও প্রগতিশীল শক্তির ওপর অত্যাচার চালালে অশুভ চক্রান্তকে প্রতিরোধ করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেন তিনি। পাবলো নেরুদা তখন চিলির কংগ্রেসের সিনেটর।
১৯৪৮ সালে নেরুদা পুলিশের গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপন করতে বাধ্য হন। সে সময় তিনি সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে দিন কাটিয়েছেন। সাহায্য গ্রহণ করেছেন। সেসব দিনের কথা ‘পলাতক’ কবিতায় অপূর্ব সজীবতা পেয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘আমার জন্য সব দরজাই উন্মুক্ত হাট হাট খোলা।’ অবশেষে আন্দিজ পর্বতমালার সীমান্ত অতিক্রম করে তিনি আর্জেন্টিনায় চলে আসেন। তারপর তিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও পূর্ব ইউরোপীয় দেশগুলো পরিভ্রমণ করেন।
নির্বাসিত দিনগুলোতে নেরুদা কবিতা রচনা করেন অব্যাহত গতিতে এবং অত্যাচারী ভিদেলার বিরুদ্ধে যেকোনো প্রকার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেন। সে সময়েই প্রকাশিত হয় নেরুদার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘কান্তো হেনেরাল’, যাতে বিধৃত হয়েছে লাতিন আমেরিকার প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময়ের ইতিহাসের কিছু নকশা। আছে মহাদেশের অগ্ন্যুদ্গিরণকারী রূপ আর তার খণ্ড খণ্ড ছবি। এই কাব্যগ্রন্থের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হলো ‘মাচুপিচুর শীর্ষে’ কবিতাটি। পেরুভিয়ান আন্দিজ পর্বতমালার ওপর অবস্থিত, প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে তৈরি আমেরিকার সবচেয়ে প্রাচীন এই শহরের অস্তিত্ব মানুষের কাছে অজ্ঞাত ছিল বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশক পর্যন্ত। এই কবিতার মধ্য দিয়ে নেরুদা সমগ্র লাতিন আমেরিকার স্বপ্ন ও আশাকে তুলে ধরেছেন। অনেকের মতে, এই দীর্ঘ ভাষণধর্মী অসাধারণ কবিতাটি এ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবিতা।
অবশেষে ১৯৫২ সালের আগস্ট মাসে পাবলো নেরুদা ফিরে আসেন প্রিয় মাতৃভূমি চিলিতে। সঙ্গে সঙ্গে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সালভাদোর আয়েন্দের পক্ষে প্রচারকার্যে অবতীর্ণ হন। পরবর্তী সময়ে আলেন্দে ১৯৫৮, ১৯৬৪ সালের নির্বাচনী সংগ্রামে অংশ নেন। ১৯৭০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে চিলির কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে পাবলো নেরুদাকে মনোনীত করা হয়। পরে সোশ্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে সমঝোতা হওয়ায় চিলির গণ ঐক্য ব্লকের পক্ষে আলেন্দেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিজয়ী হন।
পাবলো নেরুদা একজন চিলিয়ান—একজন কবি, যিনি চিলির সাধারণ মানুষ এবং জনসাধারণের সবচেয়ে ঐতিহ্যশালী সংগঠিত পার্টি-কমিউনিস্ট পার্টি থেকেই পান তাঁর কাব্য সৃষ্টির প্রেরণা। চিলির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং সেখানকার শ্রমিক আন্দোলন ও গণ-আন্দোলনের ‘জনক’ বলে পরিচিত লুইস এমিলিও রেকাবেরেন—তাঁর উদ্দেশে লেখা ‘চিলির জনক’ কবিতায় নেরুদার কাব্য সৃষ্টির উৎস প্রস্ফুটিত হয়েছে সহজ-সুন্দরভাবে। তিনি লিখেছেন:
রেকাবেরেন, চিলির সন্তান,
চিলির জনক, আমাদের পিতা,
মৃত্তিকা আর উত্পীড়নে গঠিত
তোমার কাঠামো, তোমার মুখচিহ্নে
জন্ম নেয়
অনাগত বিজয়ী দিনগুলোর দুর্ভেদ্যতা।
তুমিই মাতৃভূমি, পম্পা ও জনতা,
বালুকা, কাদামাটি, স্কুল, গৃহ,
নবজন্ম, মুষ্টি, অভিযান,
আদেশ, যাত্রা, আক্রমণ, গম,
লড়াই, মহত্ত্ব, প্রতিরোধ।
রেকাবেরেন, তোমার দৃষ্টিতলে
শপথ নিচ্ছি
আমাদের জন্মভূমির ক্ষত
আর ছেঁড়া দেহ ধুয়েমুছে দেব আমরা।
আমরা শপথ নিচ্ছি
লজ্জাহত বালুকারাশির ওপর
স্বাধীনতা তার অনাবৃত ফুলকে
আকাশে তুলে ধরবে।
আমরা শপথ নিচ্ছি
জনতার বিজয় পর্যন্ত
তোমার পথেই চলব।
(অনুবাদ: মতিউর রহমান)
কবি পাবলো নেরুদা সেই রৌদ্রোজ্জ্বল পথেই চলেছেন। চলেছেন যুদ্ধ আর জীবনে। সম্মুখপানে চলেছেন এক অনন্য স্বদেশের জন্য, যার ‘কুন্তলের প্রতি ভাঁজে ভাঁজে জড়ানো সেই আশ্চর্য দিন’—যেখানে ছিনিয়ে নেবে না কেউ মুখের গ্রাস আর ‘শোনা যাবে শুধু গান, আর গান, আর গান’।
কিঞ্চিৎ পরিমার্জিত