কবিতাকে গাওয়া হলে সেটা কতটা কবিতা থাকে? গীত কবিতা কি নীরবে পঠিত কবিতার চেয়ে বেশি কার্যকর? এ রকম কিছু প্রশ্ন করা হয়েছিল কয়েকজনকে। উত্তরে একজন বললেন, কবিতাকে গাওয়া হলে সেটা গান হয়ে যায়, কবিতা থাকে না। অন্যজন বললেন, কবিতা থাকে, কিন্তু রূপ বদলে যায়। আরেকজন বললেন, কবিতাকে গাওয়া উচিত নয় বলে মনে করি। আমি তখন তৃতীয়জনের কাছে জানতে চাইলাম, কেন এমন মনে হয় আপনার? আপনার কি মনে আছে প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের কথা? এই তো কিছুদিন আগেই প্রয়াত হলেন তিনি। ‘আমি বাংলায় গান গাই…’ অথবা, ‘আলু বেচো ছোলা বেচো, বেচো বাখরখানি/ বেচো না বেচো না বন্ধু তোমার চোখের মণি’র সেই খালি গলার গায়ক। সারা জীবন কবিতাকেই তো গেয়ে গেলেন। বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে প্রতুলদার গান আমাদের খুব ভাবিয়েছিল যে কেন এত ভালো লাগে। জাহিদ ভাই একবার সেই কারণগুলো নির্দিষ্ট করতে চেয়ে বললেন, তাঁর উচ্চারণ—অর্থাৎ তাঁর শব্দগুলোর উচ্চারণ তিনি এমনভাবে করতেন, বিশেষ বিশেষ জায়গায় বিশেষ কিছু ধ্বনির ওপর এমনভাবে জোর দিতেন যে শ্রোতার মনে প্রভাব ফেলতে পারত। সেই সঙ্গে রয়েছে তাঁর কোমল ও হৃদয়স্পর্শী সুর।
কবিতাকে গাওয়া হলে সেটা কবিতার প্রকৃতি, শ্রোতার অভিজ্ঞতা আর প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতের ওপর নির্ভর করে অনেকটাই। জেমস যেমন গেয়েছিলেন শামসুর রাহমানের সেই কবিতা ‘ক্যামেলিয়া হাতে এই সন্ধ্যায়, ভালোবেসে যত খুশি বলতে পারো এই ফুল আমার…।’ আমরাও তখন চিৎকার করে গাইতাম, ‘সুন্দরীতমা আমার…।’ তাহলে কবিতাকে গাইলে কী বদলায়? বদলায় বলতে শব্দের সঙ্গে সুর যুক্ত হয়। সুর শব্দকে নতুন মাত্রা দেয়—মাত্রা, ভঙ্গি, গতি, টান, বিরতি—সবকিছুর ওপর সুর প্রভাব ফেলে। ফলে কবিতার আবহ, আবেগ এবং অর্থ অনেক সময় সংগীতের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অর্থের কিছু অংশ যেমন স্পষ্ট হয়ে ওঠে শ্রোতার কাছে তেমনি আবার কিছু অংশ হয়ে যায় ঝাপসা। নীরব পাঠে কবিতার যে জায়গায় পাঠক নিজের মতো ব্যাখ্যা করে নিতেন, সেখানে সুর ও গায়কির প্রকাশভঙ্গি নির্দিষ্ট একটি আবেগ তৈরি করে দেয়। ফলে কল্পনার স্বাধীনতায় কিছু সীমাবদ্ধতা আসে, অন্যদিকে বাড়তে পারে আবেগের গভীরতা।
গীত কবিতা কতটা কার্যকর, তা এককথায় বলা যায় না। গীত কবিতার শক্তিকে যদি আমরা চিহ্নিত করতে চাই তাহলে দেখতে পাব সুর ও তাল সরাসরি শ্রোতার আবেগে প্রভাব ফেলে। কবিতাটি সহজে মনে থাকে। আবেগময় তীব্রতা বাড়ে। সম্মিলিত অভিজ্ঞতার স্বাদ পাওয়া যায়, অর্থাৎ দলগতভাবে গাওয়া বা শোনার অভিজ্ঞতা বলতে যা বোঝায়। একটু আগেই এমদাদ যেমন বলছিল আমাদের জাতীয় সংগীতের কথা।
অন্যদিকে নীরবে পঠিত কবিতার প্রধান শক্তি হচ্ছে স্বাধীনতা—অনুভূতি নিয়ে, অর্থ নিয়ে নিজের মতো করে চিন্তা করার, নিজের নিজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা। শব্দের সূক্ষ্ম গঠন, রূপক, ব্যঞ্জনা—এসব অনেক বেশি স্পষ্ট হয়ে দেখা দিতে পারে পাঠকের সামনে। পঠিত কবিতায় বাক্যের ভেতরে অব্যক্ত—শব্দ থেকে শব্দে, লাইন থেকে লাইনে, স্তবক থেকে স্তবকে না-বলা বক্তব্যও ধরতে পারেন নীরব পাঠক। নিজের সঙ্গে কবিতার ব্যক্তিগত, অন্তর্মুখী সম্পর্ক তৈরি করেন। শঙ্খ ঘোষ বা রিল্কার কবিতা নীরবে পড়লেই বেশি ভালো লাগে, তাই নয় কি?
সমষ্টিগত আবেগ, দ্রুত প্রভাব আর স্মরণীয়তার কথা ভাবলে মনে হয় গীত কবিতাই বেশি কার্যকর। অন্যদিকে গভীর অর্থ গ্রহণ, ব্যক্তিগত পাঠ, ব্যঞ্জনামূলক ধীর অভিজ্ঞতার কথা চিন্তা করলে কবিতার নীরব পাঠকেই উত্তম বলে মনে হয়। তাই কবিতাকে গাওয়া হলে কবিতা ঠিক কবিতা থাকে না বটে; কিন্তু আবেদন কমে যায় না, বরং রূপান্তরিত হয়। তার শিল্প-শক্তি কখনো বাড়ে, কখনো বদলায়; কিন্তু তা আর ‘একক পাঠের কবিতা’ থাকে না—হয়ে ওঠে একটি সমন্বিত শিল্পরূপ: কবিতা + সুর + কণ্ঠ।
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর।
মানুষের মুখ পড়িতে যে জানে, সে আমার মতোই পড়িবে মানুষের মুখাবয়ব—
যে-দেশে মানুষ তত বড়ো নাই, সে-দেশে যাইতে আমার মন আর চাহে না।
রবীন্দ্রনাথের এ কবিতার কথাই যদি ভাবি আমরা, দেখতে পাই, কবিতাটি ‘বাংলা’কে এক সর্বজনীন রূপের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরছে। বাক্যগুলো দীর্ঘ ও ধীর—নীরবে পড়লে তীব্র মননশীলতা তৈরি হয়। ‘মানুষের মুখ পড়িতে যে জানে’ কথাটি পাঠক নিজস্ব ব্যাখ্যায় উপলব্ধি করতে পারেন। নীরব পাঠে নিজের বাংলাকে, নিজের স্মৃতি, নিজের পরিচয়কে ভেবে নিতে পারেন। অন্তর্মুখী দেশপ্রেম তৈরি হয়; আবেগ মানসিক স্তরে জমা হয়। রবীন্দ্রনাথের বাক্যগঠনের ধীরতা, দীর্ঘ টান, ‘মানুষের মুখ’, ‘রূপ খুঁজিতে’—এসব ব্যঞ্জনা নীরবতায়ই বেশি স্পষ্ট হয়।
এখন ধরুন যদি এই কবিতাকে রবীন্দ্রসংগীতের মতো সামান্য ধীর তাল ৬/৮–এ গাওয়া হয়, তখন কী হবে?
বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি—
তাই আমি যাই—না আর…
মানুষের মুখ—যে—পড়িতে—জানে…
সে—আমা—র—মতোই জানে—মানুষের মুখাবয়ব…
কবিতাটি হঠাৎ দেশপ্রেমের সংগীতের রূপ নেবে। নীরবে পড়লে যা দার্শনিক, ভাবগভীর—গাওয়া হলে তা হয়ে যাচ্ছে আবেগে ভরপুর, দোলায়িত। মন চালিত হয় বাংলার গর্ব, সুরের টান ও কণ্ঠের উত্থান–পতনে। গায়ক বা সুরকারের নির্দিষ্ট ছন্দ, বিরতি, টান–এর ওপর কবিতার আবেগ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। গাওয়া হলে কবিতাটি একক পাঠকের জন্য আর থাকছে না; বরং অন্যদের সঙ্গে শোনার মতো হয়ে ওঠে। সমবেত আবেগ জন্মায়, যা নীরব পাঠে নেই।
আপনি কি কবিতাকে সংগীত হিসেবে ভাবছেন, আর সেই সঙ্গে চিন্তাভাবনা বা আবেগের বাহক হিসেবেও? কবি রবার্ট ব্লাইকে যখন এ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা হয়, তিনি বলেন, কবিতা বিভিন্নভাবে সংগীতে পরিণত হতে পারে। আমি দুটি বিষয় নিয়ে ভাবছি: প্রথমত, প্রাচীনকালে যে সাতটি পবিত্র স্বরধ্বনি বোঝা যেত, সেগুলো এখানে প্রতিভাত হতে পারে। কবিতায় স্বরধ্বনিগুলো প্রবেশ করলে দীপ্তি আসে এবং শক্তি যোগ হয়; এমনকি তারা হাত-পা কিংবা শরীরকে নির্দিষ্ট উপায়ে নড়াচড়া করতেও উৎসাহিত করে। বলা যেতে পারে, সাতটি স্বরধ্বনি বুদ্ধির মধ্য দিয়েই শরীরে প্রবেশ করে। তারপর চিমিং বলে একটা জিনিস আছে। চিমিং মানে হচ্ছে লাইনের ভেতরে ছোট ছোট শব্দ একে অপরের সঙ্গে ধ্বনিত হওয়া। একধরনের অভ্যন্তরীণ ছন্দ, লেখক তাঁর পাঠককে কোনো প্রকার সতর্ক না করেই করেন।
বেশির ভাগ ভালো কবিতায় পুনরাবৃত্তিমূলক শব্দ থাকে। কিন্তু যে কেউ চিমিংকে একরকম নীতিতে পরিণত করতে পারে। যদি চিমিংয়ের শব্দ তিনবার পুনরাবৃত্তি হয়, তবে তা সুরে পরিণত হয়। তারপর পুরো স্তবকটিই সংগীত হয়ে যায়।
কবি জেমস রাইট এক সাক্ষাৎকারে আরেকটি আইরিশ ট্র্যাডিশনের কথা বলছিলেন। নিছক অহংকার আর বেঁচে থাকার সংকল্পের ওপর যার ভিত্তি। এখানে কবিতা নিজেই জীবনকে প্রাণময় রাখতে পারে। যতক্ষণ সুর আছে—গাইতে পারবে যতক্ষণ, ততক্ষণ যেকোনো কিছুই সইতে পারবে। রাফতেরির কথা বলেছিলেন। আঠারো শতকের এন্থোনি রাফতেরি, অন্ধ এবং শিক্ষিত, যাঁর হাতে বীণা থাকত সব সময়। একবার তিনি এক বারে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তখন এক লোক এসে জিজ্ঞেস করল, ‘আহা, কে ওই বেচারা অন্ধ! বীণা হাতে নত হয়ে কর্নারে দাঁড়ানো বুড়োটা কে?’ রাফতেরি ঘুরে দাঁড়ালেন, বললেন, ‘আমি রাফতেরি, কবি, আশা আর ভালোবাসায় পূর্ণ, আলোহীন চোখ আমার, অক্লেশ নম্রতায়, হদয়ের আলোয় হেঁটে যাচ্ছি পশ্চিমে, যদিও পথের শেষে কিছুটা দুর্বল ও ক্লান্ত এখন, দেখো আমায়, দেয়ালের দিকে আমার পিঠের দিকে তাকাও, শূন্য পকেটে গান করছি আমি।’ রাইট আরও বলছিলেন, কবিতার সংগীত তাঁকে বড় এক চেতনায় উজ্জীবিত করে, প্রচুর কবিতার সম্ভাবনা জাগায় তাঁর মধ্যে।
তাহলে, সংগীতীয় গুণ সৃষ্টি করে কবিতার শব্দের ভেতর তাকে বাজিয়ে তোলা কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব বলেই তো এলিজাবেথীয় কবিগণ দারুণভাবে তা করে দেখিয়েছেন। তাঁদের মাথায় যখন পঙ্ক্তি ঘোরে তখন তাঁরা একই সঙ্গে কথা বলা আর গান গাওয়ার পদ্ধতি আয়ত্ত করে নেন। তবে নিজের ওপর সম্পূর্ণ প্রভাব বিস্তার করতে দেন না। প্রায় ১০ হাজার উদাহরণ আছে এমন—শেক্সপিয়ার তাঁর নাটকে গানের অভিনিবেশ ঘটিয়েছিলেন। বেন জনসন দারুণ সব গান লিখেছেন। স্যার জন ডাওল্যান্ড, পৃথিবীর বিখ্যাত এক সংগীতশিল্পী, তাঁর সময়ে সবার ওপরে ছিল তাঁর অবস্থান। স্যার জন হ্যারিংটন, স্যার জন ডেভিস আর তাঁর ‘নোসে তেসাম’, জর্জ পিলি, এঁরা সবাই তো ওই রকমই ছিলেন।
ওয়াল্ট হুইটম্যানও আয়ত্ত করতে পেরেছিলেন। যদিও তিনি বুঝতে পারেননি; কিন্তু পারতেন। তাঁর কবিতা থেকে একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ‘শুনেছি তোমার ওই দারুণ মিষ্টি গলা।’ এই লাইনটা পড়ার পর পরবর্তী লাইনটি পড়তে ও শুনতে একদমই বেগ পেতে হয় না: ‘ওঃ শরতের বাতাস, বনের ভেতরে অন্ধকারে হেঁটে যাই আর শুনতে পাই সব ছাপিয়ে তোমার শোকবিহ্বল দীর্ঘশ্বাস।’ কেন বেগ পেতে হয় না এখানে? ওই যে, সংগীতীয় গুণ সৃষ্ট কবিতা।