গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ

আরপিও–১৯৭২ কেন আরপিও–২০২০ হবে

যেকোনো আইনকে যুগোপযোগী করার জন্য সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। পৃথিবীর প্রায় গণতান্ত্রিক আধুনিক দেশে এ জন্য আইন কমিশন রয়েছে। বাংলাদেশেও আইন কমিশন রয়েছে, যারা প্রয়োজনে সরকারকে পরামর্শ দিয়ে থাকে। আইনের চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার জাতীয় সংসদের।

বাংলাদেশে সাধারণত নতুন আইন প্রণয়ন বা আইন সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় অথবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো উপস্থাপিত করে এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়। এ ব্যাপারে সংসদই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মালিক। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনও (ইসি) একই প্রক্রিয়ায় যেকোনো আইনের সংশোধন, সংযোজন অথবা বিয়োজনের প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে থাকে। তবে সর্বশেষ সিদ্ধান্ত সংসদের ওপরেই ন্যস্ত।

নির্বাচনকে সুষ্ঠু এবং এ–সংক্রান্ত বিষয়গুলোকে যুগোপযোগী করতে বিভিন্ন আইনের সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এ কারণেই প্রায় প্রতিটি নির্বাচনের আগে অথবা প্রয়োজনে নির্বাচনী আইন গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২ (রিপ্রেজেন্টেটিভ পিপলস অর্ডার ১৯৭২) বহুবার সংস্কার হয়েছে। ২০০৭-২০০৮-এ ব্যাপক সংস্কার করা হয় আরও যুগোপযোগী করার জন্য। বহু গুরুত্বপূর্ণ আইন এবং অধ্যায় যুক্ত করা হয়। যেমন প্রার্থীর যোগ্যতা–অযোগ্যতার বিষয়সহ পরিচালনার ক্ষেত্রের পরিবর্তনগুলোর আইন সংযোজন করা হয়। গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২-কে যুগোপযোগী করতে সবচেয়ে বড় যে সংযোজনটি করা হয়, সেটি হলো বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, যার মধ্যে প্রচুর শর্ত দেওয়া ছিল। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ছিল ৩৩ শতাংশ নারীকে ২০২০ সালের মধ্যে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের প্রতি কমিটিতে নিযুক্তি।

রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই শর্ত সাপেক্ষে বাধ্যতামূলক। এ উপমহাদেশের প্রতিটি দেশে রাজনৈতিক দল গঠন, অংশগ্রহণ ও পরিচালনার জন্য নির্বাচনী আইনে যেমন বিধান রয়েছে, তেমনি আলাদা রাজনৈতিক দলের জন্য ‘পলিটিক্যাল পার্টি অ্যাক্ট’ নামক আইন রয়েছে। যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশই সর্বশেষ, যেখানে ২০০৭-২০০৮-এ নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। আরপিও-১৯৭২-এর চ্যাপ্টার ৬–এ-তে সংযোজিত আইনটির ধারা ৯০ বি-তে তিনটি শর্ত দেওয়া হয়েছিল, যার যেকোনো একটির মাধ্যমে যেকোনো রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত হতে পারে। এর মধ্যে ছিল (১) ইতিপূর্বের যেকোনো সংসদে একটি আসনধারী দল, (২) পূর্বতন নির্বাচনগুলোতে মোট ভোটের ৫ শতাংশ অর্জনকারী দল এবং (৩) নির্ধারিত সংখ্যক জেলা ও উপজেলায় যেকোনো দলের সংগঠন ও ন্যূনতম সমর্থক। উল্লেখ্য, উপরিউক্ত তিন শর্তের যেকোনো একটির মাধ্যমে ২০০৮ সালে ২৮টি দলকে নিবন্ধনের উপযোগী হওয়ায় নিবন্ধন দেওয়া হয়েছিল। যার মধ্যে শর্ত এক (১) এ ১৮ টি, শর্ত (২) ৩টি এবং শর্ত (৩) ১৭ টিকে নিবন্ধন দেওয়া হয়। শেষোক্ত ১৭ টির মধ্যে প্রায় সবগুলোই নতুন দল ছিল অথবা পুরোনো নামে নতুন দল নিবন্ধিত হয়েছিল।

২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো বাধ্যতামূলক হিসেবে পুরোনো দলগুলোকে প্রথম দুই শর্তে নিবন্ধন দেওয়া হয় এবং প্রথম ১৮টি দলের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের আলাপ শুরু করা হয়েছিল। ২০০৮-এর পর, বিশেষ করে ২০০৮-এর নির্বাচনের পর থেকে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন আইনের শর্তের প্রথম দুটি উপধারা অকেজো হয়ে পড়ে। শুধু তৃতীয় শর্তের মাধ্যমে নতুন দল নিবন্ধিত হয়েছে বা হচ্ছে। তবে এ আইনের সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, বরং এ আইনকে (আরপিও ১৯৭২) বর্তমানে দলীয়ভিত্তিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও প্রযোজ্য বা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে অথচ আরপিও শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও পরিচালনার জন্য আলাদা আইন রয়েছে। সে আইনে নিবন্ধনের কোনো শর্ত দেওয়া নেই। কাজেই শুধু স্থায়ী প্রতীকের কারণেই হয়তো জাতীয় পর্যায়ের দলের মধ্যে সীমিত রাখা হয়েছে, যা কোনোভাবেই যৌক্তিক নয়।

যাহোক, ওপরের আলোচনার প্রেক্ষাপট বর্তমান নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে নিবন্ধন আইনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেছে এবং ক্ষেত্র চিহ্নিত করে তাদের মতো করে উপস্থাপন করেছে। ওয়েবসাইটের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত চাওয়া হয়েছে। তবে নাগরিক সমাজ এবং নির্বাচনের সঙ্গে জড়িত অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মতামত চাওয়া হয়েছে কি না, তাত্ক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের যেসব প্রস্তাবনা করা হয়েছে তাতে মনে হয় যে বর্তমান কমিশন সামনে নয়, পশ্চাৎপদ হওয়ার নীতি গ্রহণ করেছে। নিবন্ধন আইনসহ অন্য অনেক বিষয়কে গুলিয়ে ফেলা হয়েছে। যত্সামান্য পর্যালোচনা করলে বিষয়টি সহজে উপলব্ধি করা সম্ভব।

বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের উদ্যোগের প্রথমেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়, সেটি হলো কোন কারণ বা যুক্তিতে নির্বাচন কমিশন ‘গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ১৯৭২ ’–কে পরিবর্তন করে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ ২০২০’ করতে যাচ্ছে, তার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। আরপিও–১৯৭২ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাংলাদেশের সংবিধান ১৯৭২-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বের সরকার কর্তৃক স্বীকৃত। কোন কারণে নির্বাচন কমিশন এ ঐতিহাসিক দলিলের নামসহ খোলনলচে বদলাতে প্রস্তাবনা দিয়েছে তা বোধগম্য নয়। একটি কাণ্ডজ্ঞানহীন এবং ঐতিহাসিক ধারাবাহিক বিবর্তিত প্রস্তাব, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। ভারতের মূল আইনের নাম ‘রিপ্রেজেন্টেশন অব পিপল অ্যাক্ট ১৯৫১ ’। এর বহু সংস্করণ হয়েছে কিন্তু নামটি পরিবর্তিত হয়নি। কারণ, এটি নির্বাচন কমিশনের জন্মের ও ভারতের স্বাধীনতা ও সংবিধানের সঙ্গে জড়িত।

নির্বাচন কমিশন বর্তমান রাজনৈতিক দলের নিবন্ধনের শর্ত (১) ও (২) বদলানোর নিমিত্তে যে সুপারিশ উপস্থাপন করেছে, তা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে। পরিবর্তিত শর্তে প্রস্তাব করা হয়েছে, ‘ (অ) দরখাস্ত দাখিল করিবার তারিখ হইতে পূর্ববর্তী দুইটি সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে একটি আসন লাভ বা (আ) উপরোক্ত নির্বাচনের একটিতে অংশগ্রহণকারী আসনের মোট প্রদত্ত ভোটের পাঁচ ভাগ লাভ’। তৃতীয় শর্তটি অপরিবর্তিত রয়েছে।

প্রথম দুটি শর্ত কতখানি অযৌক্তিক, যার জন্য বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। অনিবন্ধিত দল কোনোভাবেই যেখানে নির্বাচন করতে পারছে না সেখানে ওই দুটি শর্ত অবাস্তব, যদি না নির্বাচন কমিশন অন্য কোনো পন্থায় বা অন্য কোনো কারণে এ ধরনের দলকে শনাক্ত করে থাকে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের শর্তের ব্যাখ্যা হচ্ছে বড় দলের লেজুড় হয়ে নিজস্ব প্রতীকে নয়, বড় দলের প্রতীকে নির্বাচিত হয়ে পরবর্তী সময়ে ফলাফল আলাদাভাবে বিবেচনা করে সেই দলের পক্ষে নেওয়া। শর্তে যদিও ‘দলীয় নির্বাচনী’ প্রতীকের কথা উল্লেখ রয়েছে, সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন থাকে যে অনিবন্ধিত দল হিসেবে নির্বাচনী প্রতীক পাওয়ারই যোগ্য নয়। বোধগম্য নয় যে এসব শর্তের উদ্দেশ্য কী? নানাভাবে নির্বাচন কমিশনের এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।

এ পরিবর্তন যদি বর্তমানে নিবন্ধিত দলের বাইরে অন্যান্য দলকে বিকশিত হতে দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়, সে ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ সঠিক নয়। বরং আমার মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় হলেও শুধু জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দলের মধ্যেই নয়, যেকোনো রাজনৈতিক দলের জন্য উন্মুক্ত করা হোক এবং বিভিন্ন স্তরের নির্ধারিত ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছে বলে বিবেচিত হতে পারে।

উদাহরণ হিসেবে উপজেলা নির্বাচনে ন্যূনতম ২ শতাংশ পদপ্রাপ্তি অথবা প্রদত্ত ভোটের ১০ শতাংশ ভোটপ্রাপ্তি ইউনিয়ন কাউন্সিল নির্বাচনে ৫ শতাংশ পদ ও ১০ শতাংশ ভোটপ্রাপ্ত দল জাতীয় পর্যায়ে নিবন্ধিত হতে যোগ্যতা অর্জন করবে। তবে শর্ত থাকে যে এসব দলকে সাধারণভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সহজ শর্তে নিবন্ধিত হতে হবে। যেহেতু বাংলাদেশে অন্যান্য দেশের মতো আলাদা ‘পলিটিক্যাল পার্টি অ্যাক্ট’ নেই, সেহেতু জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে আলাদা নিবন্ধন আইন তৈরি হওয়া যৌক্তিক। আরপিওতে স্থানীয় নির্বাচনের আইন সংযুক্ত বাঞ্ছনীয় নয়। কারণ, আরপিও জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আইন যে নির্বাচন সংবিধান কর্তৃক বিধৌত নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সাংবিধানিক দায়িত্ব নয় মাত্র, আইন দ্বারা বিধৌত।

সর্বশেষ ৩৩ শতাংশ মহিলাদের বিভিন্ন স্তরের কমিটিতে রাখার বাধ্যবাধকতা। বহু আলোচনা–সমালোচনার পর এ উপধারা সংযোজিত করা হয়েছিল নারী নেতৃত্ব বিকশিত করার প্রয়াস হিসেবে। একে আরও সম্প্রসারিত করে ভবিষ্যতে ৫০ ভাগে উন্নীত করতে হবে। অথচ নতুন প্রস্তাবনায় পুরোনো সময়সীমা ২০২০ সাল বাদ দিয়ে উন্মুক্ত রাখার প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে, যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কোনো রাজনৈতিক দলের নারী সংগঠন এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণ তো করেইনি, বরং প্রত্যাখ্যান করেছে। তারাও মনে করে সময় আরও পাঁচ বছর বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু কোনো সময়সীমা না থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো নারীদের এ অংশগ্রহণ নিয়ে উদাসীন থাকবে অথবা টালবাহানা করবে।

আশা করি, উত্থাপিত মতামতগুলো নির্বাচন কমিশন গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করবে। অন্যথায় নির্বাচন কমিশনের এসব অযৌক্তিক প্রস্তাবনার উদ্দেশ্য নিয়ে জনমনে যে নেতিবাচক সন্দেহ ও আস্থার অভাব তৈরি হয়েছে, তা স্থায়ী রূপ নেবে।

ড. এম সাখাওয়াত হোসেন: নির্বাচন বিশ্লেষক, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা এবং এসআইপিজির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো (এনএসইউ)

hhintlbd@yahoo.com