এইচআইভি-এইডস ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে সামাজিক সচেতনতা এবং করণীয়

>

৭ আগস্ট ২০১৯, প্রথম আলোর আয়োজনে এবং এসএমসি ও ইউএসএআইডির সহযোগিতায় ‘এইচআইভি–এইডস ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে সামাজিক সচেতনতা এবং করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে প্রকাশিত হলো।

সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম:
 সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনায় সুপারিশ

 এইচআইভি ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে কনডমের সঠিক ও নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি

 এইচআইভি–এইডস রোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা রয়েছে

 এইচআইভি–এইডস আক্রান্ত নারী মা হতে চাইলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে

 এইচআইভি ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে নিরাপদ ব্যবস্থা হিসেবে কনডমকে জনপ্রিয় করে তোলা দরকার

 কনডমের প্যাকেটে সচিত্র ব্যবহারবিধি দিয়ে এটা ব্যবহারের সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে জানাতে হবে

 শারীরিক সম্পর্ক ছাড়া অন্য যেসব উপায়ে এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে, সেগুলো সম্পর্কে মানুষকে আরও সচেতন করা দরকার

যৌনকর্মীদের জন্য আলাদা বৈশিষ্ট্যসহ কনডমের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন

আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম

বিশ্বের অনেক দেশে এইচআইভি সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। আমাদের দেশেও এর ঝুঁকি রয়েছে। এখানে এখনো এইডসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা খুব কম। সামগ্রিক জনগণের মধ্যে এইডসে আক্রান্ত হওয়ার হার দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা আরেকটু বেশি।

বাংলাদেশে মাদক, অনিরাপদ সম্পর্ক স্থাপন একটা বড় সমস্যা। অনেক প্রবাসী বিদেশে অনিরাপদ সম্পর্কের মাধ্যমে এইডসে আক্রান্ত হন।

কিন্তু দেশে ফিরে তাঁরা অনেক সময় প্রকাশ করেন না। তখন এটা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এটা রোধে আমাদের করণীয় ঠিক করতে হবে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এসব নিয়ে সচেতনতা নেই। ফলে তাদের থেকে এইডস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। এখন এ বিষয়ে আলোচনা করবেন মোহাম্মদ বেলাল হোসেন।

মো. বেলাল হোসেন


মো. বেলাল হোসেন
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী এই মুহূর্তে পৃথিবীতে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এইচআইভি–এইডসে আক্রান্ত।

বিভিন্ন তথ্য–উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, এইচআইভিতে আক্রান্ত বেশির ভাগ মানুষের সংক্রমণের কারণ অনিরাপদ যৌন মিলন।

যদিও অনিরাপদ যৌন অভ্যাসের মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণের আশঙ্কা ১ শতাংশের নিচে। বিভিন্ন কারণের মধ্যে অনিরাপদ যৌন মিলন এইচআইভি ছড়ানোর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে।

নিরাপদ যৌন অভ্যাস গড়ে তুলতে কনডম সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে। কনডম এইচআইভি, যৌনরোগ প্রতিরোধের পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণও রোধ করে।

বাংলাদেশে ১৯৮৯ সালে প্রথম এইচআইভিতে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত করা হয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী সে সময় থেকে ২০১৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলাদেশে মোট এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৬ হাজার ৪৫৫ জন।

এর মধ্যে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৭২ জন এবং জীবিত ব্যক্তির সংখ্যা ৫ হাজার ৩৮৩ জন। শুধু ২০১৮ সালে নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ৮৬৯ জন, যার মধ্যে ১৮৮ জন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী।

নতুন করে সংক্রমিতদের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে মূলত অভিবাসী ও তাদের পরিবার বেশি সংক্রমিত হচ্ছে। এ সংখ্যা ২৪ থেকে ৩৩ শতাংশ। বর্তমানে দেশে সম্ভাব্য এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তির সংখ্যা ১৩ হাজারের মতো।

বাংলাদেশে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার হার দশমিক শূন্য ১ শতাংশের নিচে।

 ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর (নারী, যৌনকর্মী, শিরায় মাদক গ্রহণকারী, হিজড়া ও সমকামী) মধ্যে এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার হার ৩ দশমিক ৯ শতাংশের মতো।

বিশেষভাবে ঢাকা শহরে শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভিতে আক্রান্ত হওয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এ মুহূর্তে যৌনপল্লিতে কনডম ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

এইচআইভিতে আক্রান্ত অভিবাসীদের শনাক্ত করে যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আনা দরকার।

এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের এগিয়ে আসা প্রয়োজন। গণমাধ্যমে এসব বিষয় এলে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে। তাই গণমাধ্যমে এ বিষয়ে প্রচারণা বাড়ানো প্রয়োজন।

মোহাম্মদ শরীফ


মোহাম্মদ শরীফ
কনডম যেন পর্যাপ্ত করা যায়, সে ব্যাপারে কাজ করছি। দেশের অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এখন খাওয়ার বড়ি (পিল) ও কনডমের জন্য আমাদের কাছে খুব বেশি মানুষ আসে না।

কনডম ও খাওয়ার বড়ির ৬০ শতাংশ জোগান দিচ্ছে এসএমসি ও বিভিন্ন ফার্মেসি। স্থায়ী পদ্ধতিও এখন খুব বেশি পাওয়া যায় না। এ জন্য প্রকল্পটা নতুনভাবে সাজিয়েছি।

আমাদের কাছে এখন কনডম পর্যাপ্ত রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর স্কুল হেলথ ও পরিবার পরিকল্পনা প্রকল্প পরিচালনা করে থাকে। আমাদের প্রতিনিধিরা সপ্তাহে দুই দিন স্কুলে গিয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর থেকে কিশোর কেন্দ্র (অ্যাডোলোসেন্ট কর্নার) করা হয়েছে। আমাদের সমাজে কিশোর–কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালের বিষয়ে নিয়ে আলোচনাকে অধিকাংশ সময় ভালোভাবে নেওয়া হয় না।

এ সময় তরুণ–তরুণীদের শারীরিক কিছু পরিবর্তন দেখা দেয়। কৈশরের এটা স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিশোর কেন্দ্রের মাধ্যমে তারা এসব বিষয়ে ধারণা নিতে পারে।

মো. আলী রেজা খান


মো. আলী রেজা খান
পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে বর্তমানে এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তি রয়েছে ২১ লাখ। নেপালে ৩১ হাজার, পাকিস্তানে ১ লাখ ৫০ হাজার, মিয়ানমারে ২ লাখ ২০ হাজার, থাইল্যান্ডে ৪ লাখ ৪০ হাজার, মালয়েশিয়ায় ৮৭ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় ৬ লাখ ৩০ হাজার ও ইরানে ৬০ হাজার মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে বর্তমানে এইচআইভি সংক্রমিত রোগীর সংখ্যা ১৩ হাজার। কিন্তু তাদের সবাইকে আমরা শনাক্ত করতে পারিনি।

তাদের মধ্যে মাত্র ৫ হাজার ৫৮৬ জন সম্পর্কে জানতে পেরেছি। যদিও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর তুলনায় আমাদের দেশে এইচআইভিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা কম। কিন্তু এই সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব ও নিয়ন্ত্রণ গবেষণা ইনস্টিটিউটের ২০১৬ সালের হিসাব অনুযায়ী ঢাকায় শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের সংখ্যা ও তাদের মধ্যে সংক্রমণের হার ২২ শতাংশ। এটা উদ্বেগজনক।

গত বছর এইচআইভি শনাক্ত করা ৮৬৯ জনের মধ্যে মারা গেছে ১৪৮ জন। এই জনবহুল দেশে আরেকটি সমস্যা হলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবস্থান। কক্সবাজারের সিভিল সার্জনের হিসাব অনুযায়ী এ বছর রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রায় ২০০ জন নতুন এইচআইভি আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

 আনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে পুরুষদের ভূমিকা রয়েছে। পুরুষদের আরও সচেতন হতে হবে। এইচআইভি এইডস ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধে পুরুষদের যে ভূমিকা রয়েছে, তা আরও যথাযথভাবে পালনে এগিয়ে আসতে হবে।

মোহাম্মদ বিল্‌লাল হোসেন


মোহাম্মদ বিল্‌লাল হোসেন
আমাদের কতগুলো বিশেষ জনগোষ্ঠী রয়েছে। ২০১৬ সালে তাদের একটা সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিরায় মাদক গ্রহণকারী ও হিজড়া ছাড়া তাদের পরিমাণ ১ শতাংশের কম।

নারী যৌনকর্মী দশমিক ২ শতাংশ, পুরুষ সমকামী দশমিক ২ শতাংশ ও পুরুষ যৌনকর্মী রয়েছে দশমিক ৭ শতাংশ।

ঢাকার দুটি স্থান থেকে আমরা শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের মধ্যে এইচআইভি পরীক্ষা করি।

সেখানে একটি স্থানের শিরায় মাদক গ্রহণকারীদের এইচআইভির হার ২৭ দশমিক ৩ শতাংশ ও অন্য স্থানে এ হার ৮ দশমিক ৯ শতাংশ। এই হার আমাদের জন্য উদ্বেগের। যদিও এটা শিরায় মাদক গ্রহণের মাধ্যমে হচ্ছে।

কিন্তু তাদের নেটওয়ার্কে যৌনকর্মী রয়েছে। এখানে সাধারণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইচআইভি ছড়িয়ে যেতে পারে। বিভিন্নভাবে এইচআইভি ছড়াচ্ছে।

অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ করা গেলে গর্ভধারণের হার ৩০ শতাংশ কম হতো। দ্বৈত সুরক্ষার জন্য কনডম ব্যবহার প্রয়োজন। কনডম একই সঙ্গে এইচআইভি ও অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ করবে।

১৯৮৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মাত্র ৩৭ শতাংশ পরীক্ষা করিয়েছে। আক্রান্ত হওয়ার পর অনেকে বিষয়টি পরিবারকে জানায় না। এতে রোগটি আরও ছড়িয়ে পড়ে।

সামিনা চৌধুরী


সামিনা চৌধুরী
পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি ও এইচআইভি প্রতিরোধ কর্মসূচি দুটোই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা পছন্দের স্বাধীনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে থাকি। যে কেউ তার পছন্দমতো জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী গ্রহণ করতে পারে।

এগুলোর মধ্যে কনডম একটি সামগ্রী। অন্যান্য পদ্ধতির তুলনায় কনডম ব্যবহারে কতগুলো উল্লেখযোগ্য সুবিধা রয়েছে।

কোনো দম্পতি চাইলে এটা যেকোনো সময় ব্যবহার করতে পারে। এ জন্য তাদের অন্য কারও ওপর নির্ভর করতে হয় না।

পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি হিসেবে কনডম তখনই সফল হবে, যখন এটা সঠিক নিয়ম ও ধারাবাহিকভাবে ব্যবহার করা হবে।

দম্পতিকে এর ব্যবহারবিধি সম্পর্কে জানতে হবে। প্রতিবার যৌন মিলনের সময় কনডম ব্যবহার করতে হবে।

শুধু মিলনের আগে ব্যবহার করলে হবে না। কনডম বিপণনকারী প্যাকেটের ভেতরে সচিত্র ব্যবহারবিধি দিয়ে কনডম ব্যবহারের ধারাবাহিক ও সঠিক পদ্ধতি সম্পর্কে ব্যবহারকারীকে জানানো যাবে।

পাশাপাশি টিভিতে এসব বিষয়ের প্রচারণা দরকার।

শুধু কনডম ব্যবহার করেই এইচআইভি প্রতিরোধ করা যাবে না। বিভিন্নভাবে এইচআইভি ছড়াতে পারে। সঙ্গীর সঙ্গে কনডম ব্যবহার করা সত্ত্বেও রক্ত সঞ্চালন বা অন্য মাধ্যমে এইচআইভি সংক্রমণ হতে পারে। তাই যৌন মিলন বাদে অন্য যেসব উপায়ে এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি আছে, সেগুলো সম্পর্কে সচেতন হতে হবে।

কনডমের সহজলভ্যতা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কনডম লুকিয়ে বিক্রি করার বিষয় নয়। ফার্মেসিতে খোলামেলাভাবে কনডম রাখা হচ্ছে। এটা দেখে মানুষ অভ্যস্ত হচ্ছে।

মো. মিজানুর রহমান


মো. মিজানুর রহমান
মুক্ত আকাশ বাংলাদেশ ২০০৩ সাল থেকে এইচআইভি পজিটিভ ও শিরায় মাদক গ্রহণকারী জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করছে। সরকারি ও বেসরকারি সহযোগিতায় আমরা এ কাজগুলো পরিচালনা করে থাকি।

সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা গণমাধ্যম ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু গণমাধ্যমে এসব ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী সহজে অাসতে পারে না।

এইচআইভি পজিটিভ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে একটা চিকিৎসাব্যবস্থার মধ্যে রাখা গেলে এইচআইভি প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

আমরা মাদকাসক্তদের মধ্যে এইচআইভি প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করার সময় তাদের কনডম ও স্বাস্থ্য শিক্ষাসেবা দিয়ে থাকি।

এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে আমরা যে সেবা দিচ্ছি, তা নিশ্চিত করার জন্য আমাদের কিছু বিষয় পুনর্বিবেচনা করার সুযোগ আছে।

আরেকটা বিষয় হলো, যাদের এইচআইভি পজিটিভ আছে, তারা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। এইচআইভি প্রতিরোধে আমরা কনডম ব্যবহারের কথা বলছি কিন্তু রক্তের মাধ্যমেও এইচআইভি ছড়াতে পারে।

আমরা চাহিদা অনুযায়ী সুই, সিরিঞ্জসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য শিক্ষা তাদের দোরগোড়ায় নিয়ে যাচ্ছি। এগুলো তারা সঠিকভাবে শতভাগ ব্যবহার করছে।

সায়মা খান


সায়মা খান
২০১৩ সালে বাংলাদেশসহ সাতটি দেশের মধ্যে একটি গবেষণা হয়েছিল। সেখানে দেখা যায়, এইচআইভি পজিটিভদের মধ্যে অনিচ্ছাকৃত গর্ভধারণের হার ২২ থেকে ৩৬ শতাংশ।

জন্মবিরতিকরণ পিল গ্রহণকারীদের মধ্যে এই হার প্রায় ৩৩ দশমিক ৩ শতাংশের মতো।

এসব বিষয় নিয়ে আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে। এইচআইভিতে আক্রান্ত হলেও নারীরা মা হতে চান। তাঁদের মধ্যে যতজন গর্ভধারণ করেছেন, তার ৮৬ শতাংশ ইচ্ছাকৃত।

এইচআইভিতে আক্রান্ত মা থেকে সন্তান যেন আক্রান্ত না হয়, সে জন্য একটা বহুমুখী সমাধানের দিকে অগ্রসর হওয়া দরকার।

এইচআইভিতে আক্রান্ত মা থেকে সন্তানের এইচআইভি সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি ১৫ থেকে ৪৫ শতাংশ।

কিন্তু নিয়মিত চিকিৎসা ও আক্রান্ত মা থেকে শিশুর মধ্য সংক্রমণ প্রতিরোধসেবা নিলে সে ঝুঁকি নেমে আসে ৫ শতাংশের নিচে।

স্বাস্থ্যসেবায় একদিক থেকে আমরা খুব ভালো এগিয়ে গিয়েছি। সেটা হলো বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে আক্রান্ত মা থেকে শিশুর মধ্যে সংক্রমণ প্রতিরোধসেবা (পিএমটিসিটি) নিয়ে আসা। বাংলাদেশে বর্তমানে ছয়টি সরকারি প্রতিষ্ঠানে এই সেবা রয়েছে।

এই সেবা আরও বাড়ানো উচিত। সেবা যেন যৌনকর্মীরা পায়, তা নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্নভাবে কাজ করতে হবে।

আবু সাইদ মোহাম্মদ হাসান


আবু সাইদ মোহাম্মদ হাসান
গুট মেচার ইনস্টিটিউটের ২০১৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৫৮ লাখ গর্ভধারণ হয়। এর মধ্যে ৪৮ শতাংশ হচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ অর্থাৎ বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২৮ লাখ অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ হয়।

গর্ভধারণ অনিচ্ছাকৃত হওয়ায় তাদের মধ্যে একধরনের অবহেলা কাজ করে। ফলে তাদের যখন গর্ভকালীনসেবা (অ্যান্টিনেটাল কেয়ার) নেওয়ার কথা, তখন হয়তো নিচ্ছে না। অথচ এ সময়ের মধ্যে চারবার চেকআপ করাতে হবো।

কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে একবারও এ সেবা নিচ্ছে না। ফলে এসব মায়ের সন্তান প্রসবকালে প্রসবজটিলতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। গ্রামে দেখা যায় মায়েরা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ করলে বিভিন্ন রকম নিগ্রহের শিকার হন।

অনিরাপদ গর্ভধারণে মাতৃমৃত্যুর হার দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। পরিবার পরিকল্পনাপদ্ধতি সহজলভ্য করা গেলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ প্রতিরোধ করা যাবে।

পরিবার পরিকল্পনার কথা আরও বেশি করে কারিকুলামে আনা দরকার। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়েও এগুলো নিয়ে আলোচনা হয় না।

লিমা রহমান


লিমা রহমান
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) সঙ্গে মিলিয়ে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা হলো মা ও শিশুর মধ্যে প্রতিরোধযোগ্য রোগ ও মৃত্যুঝুঁকি কমানো। এসব নিয়ে সেভ দ্য চিলড্রেন কাজ করে।

এইচআইভি এইডস ও পরিবার পরিকল্পনা—এ দুটি বিষয়েই মা ও শিশুর জীবনের ওপর একধরনের বিরূপ প্রভাব আছে।

৮ কোটি গর্ভধারণের মধ্যে প্রায় ২ কোটি অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ। আমরা নারী যৌনকর্মী নিয়ে কাজ করি।

এ রকম ৬৬৫ জন যৌনকর্মীর যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্যের অবস্থা জানার জন্য একটি জরিপ চালানো হয়েছিল।

নারী যৌনকর্মীরা কী ধরনের পরিবার পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন, তা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই কনডম ব্যবহারের কথা বলেছেন।

কিন্তু ধারাবাহিক কনডম ব্যবহার আমরা নিশ্চিত করতে পারছি না।

নিয়মিত কনডম ব্যবহার নিশ্চিত করতে না পারলে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের আশঙ্কা বেশি থাকে। প্রকল্পের মাধ্যমে কম মূল্যে কনডম সরবরাহ করা হয়।

যৌনকর্মীদের এইচআইভির ঝুঁকি সম্পর্কে জানানো হয়। তবু সংক্রমণের দিক থেকে তাঁরা উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের জন্য আধুনিক ও আকর্ষণীয় জন্মনিয়ন্ত্রণপদ্ধতি প্রবর্তন করা দরকার।

এ কে এম মাসুদ রানা


এ কে এম মাসুদ রানা
ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডায়রিয়াল ডিজিজ রিসার্চ, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) মূলত চারটি জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করে। সেগুলো হলো পুরুষ সমকামী, পুরুষ যৌনকর্মী, হিজড়া ও শিরায় মাদক গ্রহণকারী।

২০১০ সাল থেকে আমাদের কার্যক্রম চলছে। সারা দেশে ২৮ হাজার পুরুষ সমকামী ও ৪ হাজার ৬২ জন হিজড়াকে আমরা এইচআইভি প্রতিরোধ সেবা প্রদান করে থাকি। এই সেবা দেওয়ার জন্য সারা দেশে ৫৩টি কেন্দ্র করা হয়েছে।

এগুলো ৩৬টি জেলায় অবস্থিত। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে আমরা এইচআইভি সেবা ও বিনা মূল্যে কনডম বিতরণ করে থাকি। কেউ যৌনবাহিত রোগে আক্রান্ত হলে আমাদের কেন্দ্রে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

জটিল কোনো যৌনবাহিত রোগ থাকলে আমাদের কর্মীর মাধ্যমে সরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়ে থাকে। আমাদের সেবাগুলো তাদের কাছে যারা পৌঁছে দেয়, তারা ওই জনগোষ্ঠীরই মানুষ।

২০১০ সালে কাজ শুরু করার সময়ে কনডম ব্যবহারের হার ছিল ১৭ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে। এই হার বাড়িয়ে ৫০ শতাংশে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।

বিভিন্ন দেশে পুরুষ সমকামীর মধ্যে কনডম ব্যবহারের হার কাঙ্ক্ষিতভাবে বাড়ানো যাচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে আরেকটি বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। এটা হলো এইচআইভি প্রতিরোধে ওষুধ খাওয়া (প্রি–এক্সপোজার প্রফিল্যাক্সিস), যেটা আমাদের দেশে এখনো চালু হয়নি।

মো. আখতারুজ্জামান


মো. আখতারুজ্জামান
ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশে এইচআইভি রোধে কার্যক্রমের শুরুতে এসএমসি ছিল মাঠপর্যায়ে। নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে তারা পতিতালয়, পরিবহনশ্রমিক ও সীমান্ত এলাকায় কাজ করেছে।

প্রতি মাসে এসএমসি কমপক্ষে ১ কোটি ১৫ লাখ থেকে ১ কোটি ২০ লাখ কনডম বিক্রি করে থাকে।

একটি জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ২ হাজার নারী যৌনকর্মী আছে। তাদের জন্য এসএমসি যদি আবার এগিয়ে আসে, তাহলে কার্যক্রমটা আরও ভালো হতে পারে।

নারী যৌনকর্মীদের জন্য তৈরি কনডমের কিছু আলাদা বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে একটু বেশি লুব্রিকেন্ট, ঘ্রাণ ও রং বিবেচনায় রেখে এসএমসি এগিয়ে এলে ভালো হয়।

সারা দেশে ৭০টি কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র (টিটিসি) রয়েছে। এগুলো প্রতিটি জেলায় আছে। সেখানে বিদেশে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন মেয়াদি
কোর্স রয়েছে। এর মধ্যে এইচআইভি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিটি বিভাগে এইচআইভির চিকিৎসাকেন্দ্র বাড়ানো হয়েছে। মানুষকে এখন আর ঢাকায় এসে ওষুধ নিতে হয় না। তাদের বাড়ির কাছেই আমরা কেন্দ্র করেছি।

মহিউদ্দিন আহমেদ


মহিউদ্দিন আহমেদ
এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগের বয়স ১৫ থেকে ৫০–এর মধ্যে। বিশ্বে ৩ কোটি ৮০ লাখ মানুষ এইচআইভিতে আক্রান্ত। এদের এক-তৃতীয়াংশ হলো তরুণ–তরুণী। তাদের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছরের মধ্যে।

সে জন্য আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীর সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা তাঁদের পুরুষ সঙ্গী থেকে এইচআইভিতে আক্রান্ত হচ্ছেন।ইউএনএফপিএ থেকে প্রায় ৪৫ হাজার ইমামকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।

এইচআইভি বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে মসজিদের ইমামদের ভূমিকা রয়েছে। তাঁদের সঙ্গে আলোচনার সময় তাঁরা বলেছেন এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য তাঁরা ভূমিকা রাখবেন। এ ধরনের কার্যক্রম সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যান্য মাধ্যমেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন।

এ এইচ এম এনায়েত হোসেন


এ এইচ এম এনায়েত হোসেন
আমাদের কৌশলপত্রের মূল লক্ষ্য হলো ৯০-৯০-৯০। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করতে ৯০ শতাংশ সম্ভাব্য এইচআইভি আক্রান্ত শনাক্ত করা। তাদের ৯০ শতাংশ চিকিৎসাসেবার আওতায় নিয়ে আসা। ও চিকিৎসাধীনদের ৯০ শতাংশের ভাইরাসের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখা।

কিন্তু দোরগোড়ায় সেবার সুবিধা থাকার পরও আক্রান্ত ব্যক্তিরা আসছে না। এ জন্য সামাজিক সচেতনতা জরুরি।

যাঁরা এ দেশে কাজ করতে আসেন, তাঁদের কীভাবে স্ক্রিনিং করা যায়, তার চেষ্টা চলছে। এখানে আন্তমন্ত্রণালয়ের অনেক নীতিমালা রয়েছে।

তাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একার পক্ষে এটা কার্যকর করা সম্ভব নয়। এগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি। সবাইকে জানতে হবে যে কীভাবে এইচআইভি ছড়ায় এবং এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

কনডম ও ওষুধ পর্যাপ্ত করা হয়েছে। কনডমের ধারাবাহিক ব্যবহার নিশ্চিতের বিষয়টি আমরা দেখব।

অনেকেই মনে করে গর্ভধারণের জন্য কেবল নারীরা দায়ী। তাই পুরুষেরা কনডম ব্যবহার করতে চান না।

এখানে আমাদের জানতে হবে গর্ভধারণের জন্য পুরুষ ও নারী উভয়ই দায়ী। আমরা সবাই মিলে কাজ করলে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারব।

আব্দুল কাইয়ুম

নিরাপদ ব্যবস্থা হিসেবে কনডমকে জনপ্রিয় করে তোলা দরকার। তাহলে একদিকে এইচআইভি ও অন্যদিকে অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণ রোধ করা সম্ভব হবে। পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে আমাদের দেশে এইচআইভির হার কম।

কিন্তু এটা দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এর বিস্তার রোধে করণীয় ঠিক করতে হবে।

আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।

যাঁরা অংশ নিলেন

এ এইচ এম এনায়েত হোসেন: অতিরিক্ত মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

মো. আলী রেজা খান: ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি)

মোহাম্মদ শরীফ: পরিচালক (মা ও শিশুস্বাস্থ্য) লাইন ডিরেক্টর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তর

সামিনা চৌধুরী: কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ, ইউএসএআইডি

মোহাম্মদ বিল্‌লাল হোসেন: অধ্যাপক, পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মো. বেলাল হোসেন: উপপরিচালক ও কর্মসূচি ব্যবস্থাপক, এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

লিমা রহমান: চিফ অব পার্টি, এইচআইভি–এইডস প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও এইচআইভি–এইডস সেক্টর, সেইভ দ্য চিলড্রেন

মো. আখতারুজ্জামান: সিনিয়র ম্যানেজার, এইডস/এসটিডি প্রোগ্রাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর

সায়মা খান: কান্ট্রি ম্যানেজার, ইউএনএইডস বাংলাদেশ

এ কে এম মাসুদ রানা: প্রজেক্ট কো–অর্ডিনেটর, প্রোগ্রাম ফর এইচআইভি অ্যান্ড এইডস, আইসিডিডিআর,বি

আবু সাইদ মোহাম্মদ হাসান: কর্মসূচি বিশেষজ্ঞ, ইউএনএফপিএ

মহিউদ্দিন আহমেদ: হেড অব বিসিসি, সোশ্যাল মার্কেটিং কোম্পানি (এসএমসি)

মো. মিজানুর রহমান: উপপরিচালক, মুক্ত আকাশ বাংলাদেশ (এমএবি)