ভ্যাট আইন

যৌক্তিকতার নিরিখে নতুন মূসক আইন

বাংলাদেশে মূল্য সংযোজন কর (মূসক বা ভ্যাট) ব্যবস্থা ১৯৯১ সালে প্রবর্তন করা হয়। এরপর গত ২২ বছরে বেশ কিছু বিচ্যুতি আমাদের মূসক ব্যবস্থায় অনুপ্রবেশ করেছে। যেমন: করের ওপর কর, ট্যারিফ মূল্য, সংকুচিত ভিত্তিমূল্য, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যভিত্তিক মূল্য, মূল্য ঘোষণা, অগ্রিম ব্যবসায়ী মূসক, সেবার সংজ্ঞা নির্ধারণ, উৎসে মূসক কর্তন ইত্যাদি। এমতাবস্থায় তাই ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১২-১৬) সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২০১১ সালে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের আধুনিকায়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো কর-বিষয়ক আইনকানুনের সংস্কার।
এই সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই নতুন মূসক আইন প্রণয়নের কাজ শুরু হয়। আর ২০১২ সালের ২৭ নভেম্বর মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন ২০১২ জাতীয় সংসদে গৃহীত হয়। স্বাভাবিকভাবেই নতুন আইনের সঙ্গে পুরোনো মূসক আইন, ১৯৯১-এর বেশ পার্থক্য হয়েছে। দুটি আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে তা পরিষ্কার হবে। একইভাবে নতুন আইনের যৌক্তিকতাও বোঝা যাবে।
বাংলাদেশের মূসক-ব্যবস্থার আওতায় মূলত তিনটি কর আদায় করা হয়—মূসক, সম্পূরক শুল্ক এবং টার্নওভার কর। তাই, নতুন আইনের শিরোনামের সঙ্গে ‘সম্পূরক শুল্ক’ যোগ করে নামকরণ হয় ‘মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২’। নতুন আইনে মূসক বা ভ্যাটের ভিত্তি অত্যধিক সম্প্রসারিত। এই আইনে আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী স্তর এবং সেবার সরবরাহ ও আমদানির ওপর মূসক আরোপ করা হয়েছে। তা ছাড়া, অস্থাবর সম্পত্তি, লিজ, গ্রান্ট, লাইসেন্স, পারমিট, অধিকার, সুযোগ-সুবিধা ইত্যাদিও ভ্যাটের আওতায় আনা হয়েছে। বর্তমান আইনে শুধু আমদানি, উৎপাদন ও ব্যবসায়ী স্তর এবং সেবার ওপর মূসক আরোপিত। তবে নতুন ব্যবস্থায় অব্যাহতি সুবিধা কমিয়ে মূসকের ভিত্তি সম্প্রসারণ করা হয়েছে। শুধু জরুরি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনে সরকার অব্যাহতি প্রদান করতে পারবে, যা পরবর্তী অর্থ আইন গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। এবং পরবর্তী অর্থ আইনে অন্তর্ভুক্ত করা না হলে অব্যাহতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। বর্তমান আইনে সরকারের পাশাপাশি জাতীয় রাজস্ব বোর্ড অব্যাহতি প্রদান করতে পারে। আর অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূসক আদায় করার ভিত্তি হলো মূসকদাতা কর্তৃক ঘোষিত এবং মূসক কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত মূল্য। কিন্তু নতুন আইনে মূসক ভ্যাট আদায়ের মূল্যভিত্তি বিনিময় মূল্য।
নতুন আইনে সব ইউনিট এবং বিক্রয়কেন্দ্রের জন্য একক নিবন্ধন প্রচলিত হবে। তবে, যদি কোনো ইউনিট বা বিক্রয়কেন্দ্র পৃথকভাবে হিসাব সংরক্ষণ করে, সে ক্ষেত্রে ওই ইউনিটের জন্য পৃথক নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তাই কোনো ব্যক্তির করদায় সামগ্রিকভাবে নিরূপণ করা সম্ভব। বর্তমানে, যেসব উৎপাদনকারী বিভিন্ন বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে বিক্রি করে, যেসব ব্যবসায়ীর একাধিক বিক্রয়কেন্দ্র রয়েছে এবং যেসব সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন কেন্দ্রের মাধ্যমে সেবা প্রদান করে, তাদের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ভ্যাট নিবন্ধন বিধান থাকলেও একই মালিকানায় একাধিক উৎপাদককে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন প্রদানের সুযোগ নেই। নতুন আইনে একই মালিকানায় বিভিন্ন উৎপাদক কেন্দ্রীয়ভাবে মূসক নিবন্ধন নিতে পারবেন। ফলে প্রতিপালন ব্যয় কমবে।
নতুন আইনে উপকরণ কর রেয়াতের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। প্রায় সব কাঁচামাল বা উপাদানের ওপর রেয়াত গ্রহণের বিধান করা হয়েছে। বর্তমান আইনে, ভূমি, ভবন, অফিস, যন্ত্রপাতি, যানবাহন এবং শ্রম উপকরণ হিসেবে বিবেচ্য নয় বিধায় এসব উপাদানের ওপর রেয়াত পাওয়া যায় না। নতুন ব্যবস্থায় প্রত্যর্পণ (ডিউটি ড্রব্যাক) পদ্ধতিতে ব্যাপক পরিবর্তন করা হয়েছে। বর্তমানে শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ পরিদপ্তর কর্তৃক প্রত্যর্পণ প্রদান করা হয়। নতুন পদ্ধতিতে কমিশনাররা প্রত্যর্পণ ও রিফান্ড প্রদান করবেন। নতুন ব্যবস্থায় বকেয়া আদায়ের জন্য মূসক কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে। রাজস্ব ফাঁকি উদ্ঘাটনের জন্য দালিলিক প্রতিরোধের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। বর্তমান ব্যবস্থায়, দালিলিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কায়িক প্রতিরোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
মাঝেমধ্যে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রি করা হয়। বর্তমান আইনে কয়েকটি শর্ত পালন করে হ্রাসকৃত মূল্যে পণ্য বিক্রি করা যায়। নতুন আইনে ওই শর্তসমূহ বিলুপ্ত করা হয়েছে। একইভাবে ট্যারিফ মূল্য এবং সংকুচিত ভিত্তিমূল্যের বিধান নেই।
মূসক প্রদানের সময়ে পরিবর্তন আনা হয়েছে—সব ক্ষেত্রে দাখিলপত্র দাখিলের আগে মূসক পরিশোধ করতে হবে। বর্তমান ব্যবস্থায় কিছু ক্ষেত্রে দাখিলপত্র দাখিলের আগে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগ্রিম সরকারি কোষাগারে অর্থ জমা করে চলতি হিসাব রেজিস্টারে ইতিবাচক স্থিতি রাখতে হয়। নতুন আইনে চলতি হিসাব পুস্তক সংরক্ষণের দরকার নেই। আবার বর্তমানে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে সার্কেল অফিসে দাখিলপত্র জমা দিতে হয়। বর্তমানে দাখিলপত্র কার্যকরভাবে প্রক্রিয়াকরণ এবং পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। নতুন পদ্ধতিতে দাখিলপত্র কেন্দ্রীয়ভাবে এবং কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াকরণ করা হবে বিধায় সব দাখিলপত্র পরীক্ষা ও প্রক্রিয়াকরণ করা সম্ভব হবে। বর্তমানে, কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সব ক্ষেত্রেই পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে দাখিলপত্র দাখিল করতে হয়। নতুন ব্যবস্থায় দাখিলপত্র দাখিল করার সময়সীমা বর্ধিত করার বিধান রয়েছে। বর্তমানে দাখিলপত্র দাখিল করার পর তা সংশোধন করা যায় না। কিন্তু নতুন বিধানে সংশোধিত দাখিলপত্র দাখিল করা যাবে। নতুন ব্যবস্থায় কতিপয় ক্ষেত্রে বিশেষ করে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কমিশনার বিলম্বে মূসক প্রদান করার অনুমতি প্রদান করতে পারবেন। বর্তমানে শুধু ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে ভ্যাট পরিশোধ করা যায়। নতুন ব্যবস্থায় ট্রেজারি চালান, ব্যাংক ইন্সট্রুমেন্ট এবং অনলাইনে মূসক পরিশোধ করা যাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কিস্তিতে পরিশোধ করার সুযোগও মিলবে।
নতুন আইনে বিভাগীয় কার্যক্রম এবং অপরাধ সম্পর্কিত কার্যক্রমের পার্থক্য করা হয়েছে। কতিপয় কার্যক্রমকে অপরাধ হিসেবে সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে, যার বিচার করবেন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট। অপরাধসমূহ অআমলযোগ্য এবং আপসযোগ্য করা হয়েছে। তাই অনেক মামলা আপসরফার মাধ্যমে নিষ্পন্ন হয়ে যাবে। বর্তমান আইনে বিচারাধীন মামলার ক্ষেত্রে বকেয়া আদায়ের ওপর স্থগিতাদেশ দেওয়ার ক্ষমতা আপিলাত ট্রাইব্যুনালের নেই। নতুন আইনে আপিলাত ট্রাইব্যুনালকে এ রকম ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
নতুন আইনে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। বার্ষিক ২৪ লাখ টাকা বা তার কম টার্নওভারসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান মূসকের আওতার বাইরে থাকবে। ২৪ লাখ টাকার বেশি কিন্তু ৮০ লাখ টাকার কম বার্ষিক টার্নওভারসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৩ শতাংশ হারে টার্নওভার কর প্রদান করতে হবে। করভার কম হওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান বড় বড় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারবে। বর্তমানে ৮০ লাখ টাকার নিচে বার্ষিক টার্নওভারসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে ৩ শতাংশ হারে টার্নওভার কর প্রদান করতে হয় (কিছু ব্যতিক্রম ব্যতীত) এবং কিছু প্রতিষ্ঠান কতিপয় শর্ত পালন করে কুটিরশিল্প সুবিধা পেতে পারে। কুটিরশিল্পের ওপর বর্তমানে কোনো ভ্যাট বা টার্নওভার কর প্রযোজ্য নেই। বর্তমানে টার্নওভার করের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠান আমদানি করতে পারে না। নতুন ব্যবস্থায় তারা আমদানি করতে পারবে।
বর্তমান জীবনব্যবস্থার একটি নতুন মাত্রা হলো টেলিযোগাযোগ সেবা। বর্তমান আইনে এ বিষয়ের কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু নতুন আইনে টেলিযোগাযোগ সেবার নানা সূক্ষ্ম বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে বিধান প্রণীত হয়েছে। লটারি, লাকি ড্র, র‌্যাফল ড্র এবং সমজাতীয় বিষয়, কর্মচারীকে অর্থের পরিবর্তে দ্রব্যের মাধ্যমে সুবিধা প্রদান, টোকেন বা নোটের মাধ্যমে পরিচালিত বিক্রয় যন্ত্র, মিটার বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রের মাধ্যমে বিক্রয়ের ক্ষেত্রে মূসক পরিশোধের বিধান নতুন আইনে বিধৃত হয়েছে। ট্রাভেল এজেন্ট এবং ট্যুর অপারেটরদের ক্ষেত্রে বিশেষ বিধান করা হয়েছে। নতুন আইনে নিবাসী এবং অনিবাসী সুনির্দিষ্ট করে তাদের করদায়িতা এবং শূন্য হার প্রযোজ্যতা সুস্পষ্ট করা হয়েছে, একক এবং বহুবিধ সরবরাহ, চলমান ব্যবসায় এবং সেকেন্ডহ্যান্ড পণ্যের ওপর ভ্যাট আরোপ বিষয়ে বিধান করা হয়েছে।
ইতিমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড নতুন আইন বাস্তবায়নের জন্য সাংগঠনিক কাঠামো ও মানবসম্পদের পুনর্বিন্যাস করে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, ব্যবসায় প্রক্রিয়া সহজীকরণ, করদাতা সেবা প্রদান ইত্যাদি বিষয় নিশ্চিত করা হবে। ফলে মূসক ব্যবস্থাপনার নতুন পরিবেশে ২০১৫ সালের শেষ নাগাদ নতুন আইন কার্যকর হয়ে রাজস্ব আদায় আশানুরূপভাবে বাড়বে এবং মূসকদাতারা প্রয়োজনীয় সেবা পাবেন।

ড. মো. আব্দুর রউফ: পরিচালক, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল এবং প্রকল্প উপপরিচালক, মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ বাস্তবায়ন প্রকল্প, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড।
roufcus@yahoo.com