মিসর

হত্যার মিছিল চলছে

সারি সারি লাশ
সারি সারি লাশ

আয়মান হোসেইনি দেয়ালের পাশে শোয়ানো। দরজার ডানে পড়ে থাকা একটি লাশের গায়ের কাফনে কালো কালিতে লেখা নাম খালেদ আবদুল নাসের। ওই ঘরেই ছিল ৩৭টি লাশ। পুরো মেঝে রক্তে ছোপানো। চিকিৎসকদের পোশাকেও রক্তের ছোপ। কিছু আগে আমাদেরও জুতায় রক্ত লেগে ছিল। দেয়ালের গায়েও রক্ত। স্ট্রেচার বয়ে আনার পথেও ফিতার মতো রক্তের দাগ। রাবা মসজিদের পাশের হাসপাতালে কান্নারত নারী-পুরুষের ভিড়। অনেকেই আল্লাহর নাম ডাকছিল। ‘এই মানুষগুলো সূর্যে চলে গেছে,’ একজন চিকিৎসক আমাকে বললেন, ‘ওরা এখন আল্লাহর সঙ্গে আছে। আর আমরা আছি ছায়ার মধ্যে।’
সবাই মনে হলো নিষ্ঠাবান বিশ্বাসী। আর মৃত ব্যক্তিরা? বেশির ভাগেরই গুলি লেগেছে মুখে। কয়েকজনের চোখে, আরও অনেকের বুকে বিদ্ধ হয়েছে গুলি। আমি মাত্র একজনকে পেয়েছি, ওরা দাবি করছিল যে তার পিঠে গুলি লেগেছে। যাদের দেখলাম তাদের বেশির ভাগেরই মুখে দাড়ি। একটা গণহত্যা ঘটেছে কি? অবশ্যই! আর এরা হলো মৃত ব্যক্তিদের সামান্য একটি অংশ। আরও লাশ আছে বিভিন্ন জায়গায়। জেনারেল আবদুল ফাত্তাহ আল-সিসি যখন মিসরীয়দের শুক্রবারে রাস্তায় নেমে এসে তাঁর প্রতি সমর্থন জানানোর ডাক দিয়েছিলেন, তখন কী ছিল তাঁর মনে?
এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে ভোরের আগে। সবাই বলেছে, পুলিশই গুলি করা শুরু করেছে। প্রথমে আকাশের দিকে, তারপর সরাসরি জনতার দিকে। মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্যরা তখন মোহাম্মদ মুরসির সমর্থনে বিক্ষোভ করছিল প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাতের সমাধির পাশে। মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত খালিদ আল-ইসলামবুলি নামের মিসরীয় সেনাবাহিনীর এক লেফটেন্যান্টের হাতে নিহত হন। সমাধিক্ষেত্রটি রাবা মসজিদের কাছেই। কে প্রথম গুলি করেছিল? উত্তরটা কঠিন নয়। যারা নিহত হয়েছে, তাদের সবাই মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য অথবা তাদের বন্ধু বা পরিবারের লোক। এবং একজন পুলিশও মারা যায়নি।
ব্রাদারহুড বলেছে, তাদের লোকজন নিরস্ত্র ছিল। কথাটা সত্য হওয়া সম্ভব। তার পরও আমাকে বলতে হবে যে মসজিদের কাছের কার পার্কের জায়গাটায় একজন পাহারা দিচ্ছিল, তার হাতে ছিল কালাশনিকভ রাইফেল। সে আমাকে হাসপাতালের পথ দেখিয়ে দিল। বৈরুতে বসবাসের সুবাদে সশস্ত্র তরুণদের দেখা আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। তাহলেও নীল টি-শার্ট পরা লোকটাকে দেখে আমি ধাক্কা খেলাম। অবশ্য এর বাইরে আর কোনো সশস্ত্র লোককে আমি দেখিনি সেখানে।
কিন্তু কী দরকার ছিল এই বিপর্যয় ঘটানোর? আহমেদ হাবিব, সেখানকার চিকিৎসক, আমাকে বললেন যে সারা জীবনে আর কখনো এত বেশি মৃত্যু দেখার অভিজ্ঞতা তাঁর হয়নি। এবং দুই সপ্তাহের চিকিৎসা সরঞ্জাম শেষ করে ফেলেছেন মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। মনে রাখতে হবে, আমরা বলছি মিসরীয়দের কেবল একটা অংশের লাশের কথা। তিনি চিৎকার করে আমাকে বললেন, ‘আমার জামা-কাপড়ের রক্তের দিকে দেখুন।’ চিকিৎসকদের অনেকেই ঘরটার বাইরের নোংরা মেঝেতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। সারাটা সকাল মানুষের জীবন বাঁচানোর সংগ্রামের পর তাঁরা এখন বিধ্বস্ত।
কেউ সেনাবাহিনীকে এর জন্য দোষ দেয়নি। তাতে করে জেনারেল হিসেবে তিনি হয়তো রেহাই পেলেন। কিন্তু সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা হিসেবে তিনি যে জনগণকে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধের সমর্থনে রাস্তায় নেমে আসতে বলেছিলেন, সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না। কিংবা একজন পিতা হিসেবেও তিনি দায়মুক্ত নন। জেনারেল সাহেবের তিন ছেলে ও একটি মেয়ে রয়েছে। কিন্তু আমার দেখা ওই ৩৭টি মৃত মানুষও তো মিসরের সন্তান এবং তারাও কিছুটা সহানুভূতি পাওয়ার যোগ্য। তারা ব্রাদারহুডকে সমর্থন করে বলেই তাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলা যেতে পারে না। শুক্রবার রাতে আমি কয়েকজন বন্ধুকে বলেছিলাম, কায়রোর রাস্তায় হত্যাকাণ্ড ঘটার ভয় পাচ্ছি। আমার মতো একজন বিদেশিও যদি এটা বুঝতে পারে, তাহলে আল-সিসি—দাপুটে জেনারেল কি এটা বুঝতে পারেননি?
আরেকজন চিকিৎসক আমাকে বলেছিলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে, আমরা নাকি এখন সংখ্যালঘু, তাই আমাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই।’ কথাটা আমার পছন্দ হয়নি, কিন্তু লাশভর্তি একটা ঘরের মধ্যে নাটকীয় মুহূর্ত বয়ে যাচ্ছিল। এমনই অবস্থা যে হাসপাতালের কর্মীরা আক্ষরিকভাবেই কাফন মোড়ানো লাশ ডিঙিয়ে চলাচল করছিলেন। একটা সময় ক্যামেরার ফ্ল্যাশের মধ্যে ঘরটা থেকে স্ট্রেচারে করে লাশ নেওয়া শুরু হলো। কেউই ব্রাদারহুডের কর্মীদের শহীদি মর্যাদার বিষয়টা ভুলল না এবং মাঝেমধ্যেই বাইরে থেকে আল্লাহর নামে ধ্বনি উঠছিল। সেখান থেকে একে একে লাশগুলো তোলা হলো মধ্য দিনের গরমের মধ্যে সারি বেঁধে অপেক্ষারত অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে।
মানুষ চরম দুঃখজনক ঘটনার সামনে দাঁড়িয়ে যা যা বলে, অনেকেই সে রকম কথাই বলছিল যে তারা কখনোই ছেড়ে দেবে না, সামরিক শাসনের অধীন হওয়ার বদলে তারা বরং মৃত্যুকেই বেছে নেবে। আর এসব বলা হচ্ছিল সেই দেশে, যে দেশে সামরিক অভ্যুত্থানকে সামরিক অভ্যুত্থান বলা যাচ্ছে না। ড. হাবিব বলতে থাকলেন, মৃত্যুর পরেও জীবন রয়েছে। স্বীকার করছি যে আমি তাঁকে বলেছিলাম এর প্রমাণ দিতে। জোরের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘কারণ আমরা পশু নই, সারাটা জীবন কেবল খাদ্য খাওয়া ও পানি পান করাই আমাদের কাজ নয়। আপনি কি মনে করেন, কেবল এসবের জন্যই আমাদের অস্তিত্ব সৃষ্টি হয়েছে?’
হাসপাতালের পেছনে অনেককে দেখলাম, যারা পায়ে আহত হয়েছে। অনেকেই ব্যথায় গোঙাচ্ছিল। কিন্তু আমাদের মনোযোগজুড়ে ছিল কেবল নিহত ব্যক্তিরা। এত তাজা মৃত্যু যে তাদের মুখে এখনো মৃত্যুর চিহ্ন পড়েনি। একজন প্যারামেডিক একটি লাশের চোখ বন্ধ করতে পারছিলেন না বলে আরেকজন চিকিৎসকের সাহায্য চাইলেন। এটাই হয়তো নিয়ম, মৃত্যুতে আমাদের ঘুমন্ত মানুষের মতো দেখাতে হয়। এবং হয়তো মিসরও সে রকম একটা অবস্থাতেই পড়েছে, যেখানে অনেক কিছু থেকে অনেককেই চোখ বন্ধ করে থাকতে হচ্ছে।
রবার্ট ফিস্ক: ব্রিটেনের দি ইনডিপেনডেন্ট-এর মধ্যপ্রাচ্য প্রতিনিধি।