
আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার ইন্তেকাল করেছেন। সেদিন মাগরিবের একটু আগে খবরটা জানলাম। মাগরিবের নামাজ পড়েই এ লেখা লিখতে বসলাম। না লিখে পারলাম না বলে। আমার চট্টগ্রাম কলেজের সহপাঠী নূরুল আজমের উৎসাহে ১৯৫৪ সালে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর কাছে সাক্ষাৎকার দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হই আমি। সম্ভবত পরদিন বিভাগের সামনে টাঙানো নোটিশ বোর্ডে রুটিন বা অন্য নির্দেশনা রয়েছে কি না, জানতে গিয়ে গাফ্ফারের সঙ্গে আমার পরিচয়। তিনিও সবে ভর্তি হয়েছেন বললেন এবং আমাকে মধু রেস্তোরাঁয় (মধুর ক্যানটিন) চা খেতে নিয়ে গেলেন। সেখানে দেখলাম, তিনি বেশ সুপরিচিত। যাহোক, পরে অনেক কিছু জানলাম।
প্রথমত, গাফ্ফার তখন ‘সওগাত’ পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক! দ্বিতীয়ত, সে বছর বা সম্ভবত তার আগের বছর ‘দিলরূবা’ পত্রিকায় তাঁর একটি উপন্যাস (চন্দ্রদ্বীপের উপাখ্যান) প্রকাশিত হয়েছে, বিশেষ সুখ্যাতি অর্জন করেছিল সেটি। আমি এসব তথ্য জানলাম কিন্তু খুব একটা পরোয়া করলাম না। কারণ, তখন আমি কিছু লিখছি না এবং লেখক হওয়ার কোনো অত্যুৎসাহও পোষণ করছি না। গাফ্ফারও সহজভাবে আমার সঙ্গলাভে তৃপ্ত হচ্ছিলেন। কদিন পর ক্লাস শুরু হলে আমরা দুজন দ্বিতীয় রোতে পাশাপাশি বসতে থাকলাম। কয়েক মাসের মধ্যে গাফ্ফার আমার খাতায় দুটি কবিতা লিখে রাখলেন। ইতিমধ্যে আমি ড. মুলকরাজ আনন্দের একটি গল্প অনুবাদ করে গাফ্ফারকে দেখতে দিলাম। অবশ্য প্রকাশের ইচ্ছা আমার ছিল না। কাজটা ঠিকমতো হলো কি না, তারই একটা অভিমত জানা ছিল আমার অভিপ্রায়। অথচ কয়েক দিন পর তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তিনি আমাকে বললেন, ‘সওগাত’ অফিসে গিয়ে নাসিরুদ্দীন সাহেবের কাছ থেকে টাকাটা নিতে। কিসের টাকা? ‘কেন, আপনার লেখার টাকা!’ আশ্চর্য! এই হলেন আমার বন্ধু আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ১৯৫৫ সালে আমরা শেষবারের মতো সংগ্রামী কায়দায় ‘অমর একুশে’ উদ্যাপন করলাম।
একবার আমি ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের বার্তা নিয়ে গিয়েছিলাম: বাংলাদেশে একজন পত্রিকা সম্পাদককে যত বেশি বেতন দেওয়া সম্ভব হবে, তা তাঁরা দেবেন গাফ্ফার যদি ইত্তেফাকে এসে যোগ দেন। মৃদুহাস্যে গাফ্ফার প্রত্যাখ্যান করলেন সে প্রস্তাব। বললেন, তাতে তাঁর পক্ষ-বিপক্ষ দুই পক্ষের দ্বারা তিনি আক্রান্ত হবেন। তবে তিনি বিশেষভাবে জানালেন যে ব্রিটিশ সরকার তাঁর পরিবারের জন্য যা করেছে, তার তুলনা হয় না এবং তখনো তাঁর স্ত্রীর জন্য যা করছে, তা দেশে গেলে সম্ভব হতো না।
সেই ১৯৫৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত গাফ্ফার আমাকে বহুবার আপ্যায়িত করেছেন। আমি হয়তো বার দু-এক সামান্যভাবে তাঁকে প্রতিদান দিতে পেরেছি। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব থেকেছে অক্ষুণ্ন। এখানে আমি দুটি উদাহরণ দেব। প্রথমত, ১৯৫৯ সালে প্যারিসে রওনা দেওয়ার প্রাক্কালে (সম্ভবত) ‘পূর্বদেশ’ পত্রিকায় গাফ্ফারের ডেস্কে গিয়ে আমি বিদায় জানাতে গেলাম। তিনি তখন আমাকে ছাড়লেন না। বাসায় একটা ফোন করে আমাকে মধ্যাহ্নভোজনের জন্য নিয়ে গেলেন। সেখানে তাঁর স্ত্রী বেশ করকমের মাছ দিয়ে আপ্যায়ন করলেন। গাফ্ফারের স্ত্রী ছিলেন আবার ইতিহাস বিভাগের সহপাঠী জিয়াউদ্দিনের ছোট বোন। জিয়া ও আমি যথাক্রমে অক্সফোর্ড ও প্যারিস থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে প্রায় একই সময়ে (১৯৬৮) চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিই। মুক্তিযুদ্ধের সময় কী করে যেন গাফ্ফারের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়নি, হয়েছিল আমার স্ত্রী নাসরীনের সঙ্গে।
মুক্তিযুদ্ধের পর গাফ্ফারের কর্মব্যস্ত দিন কাটছে সংবাদপত্রের জগতে, আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে। তবে তাঁর পত্রিকায় আমি লিখেছি বলে মনে পড়ে। এর মধ্যে তাঁর স্ত্রীর অসুস্থতার সংবাদ জানলাম। ভারতের বিভিন্ন জায়গায় চিকিৎসা শেষে তিনি বিলেত চলে গেলেন। ১৯৭৭ সালে সপ্তাহখানেকের জন্য আমি লন্ডনে গেলে গাফ্ফার আমাকে ‘গঙ্গা’ রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্নভোজনে আপ্যায়িত করলেন। এ রকম তিন–চারবার বিলেতে তিনি আমাকে খাইয়েছেন আর দু–তিন ঘণ্টাজুড়ে গল্প করেছেন। দেশের খবর জেনেছেন। মাঝখানে একবার আমি ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেনের বার্তা নিয়ে গিয়েছিলাম: বাংলাদেশে একজন পত্রিকা সম্পাদককে যত বেশি বেতন দেওয়া সম্ভব হবে, তা তাঁরা দেবেন গাফ্ফার যদি ইত্তেফাকে এসে যোগ দেন। মৃদুহাস্যে গাফ্ফার প্রত্যাখ্যান করলেন সে প্রস্তাব। বললেন, তাতে তাঁর পক্ষ-বিপক্ষ দুই পক্ষের দ্বারা তিনি আক্রান্ত হবেন। তবে তিনি বিশেষভাবে জানালেন যে ব্রিটিশ সরকার তাঁর পরিবারের জন্য যা করেছে, তার তুলনা হয় না এবং তখনো তাঁর স্ত্রীর জন্য যা করছে, তা দেশে গেলে সম্ভব হতো না।
১৯৭১ ছাড়া রাজনীতির সঙ্গে আমি সব সময় সম্পর্কহীন ছিলাম। তাই গাফ্ফারের জীবনের বিরাট অংশের সঙ্গে আমার কোনো যোগ ছিল না। আমার ছোট ছেলে শাজেলের আগ্রহে বহু পর ২০১৮ সালে তাঁর সঙ্গে আবার যোগাযোগ হয় এবং তাঁর আমন্ত্রণে একটি দিনের বড় অংশ তাঁর বাড়িতে কাটালাম আমার স্ত্রী, পুত্র, নাতিসহ। গাফ্ফারের কন্যা আপ্যায়ন অব্যাহত রাখল সর্বক্ষণ। একপর্যায়ে বিরিয়ানিসহ লাঞ্চ সমাপ্ত হলো। গাফ্ফার অনেক গল্প বললেন। বিশেষ করে সৈয়দ আলী আহসানের ঔদার্য নিয়ে। আইএ পরীক্ষার ফিস দিতে অপারগ হয়ে ভারাক্রান্ত সময় কাটাচ্ছেন, এমন দিনে তিনি খবর পেলেন, আহসান সাহেব তাঁকে খুঁজছেন। দেখা হলে তাঁকে ৬০ কি ৮০ টাকা দিয়ে অধ্যাপক আহসান বললেন, সেটি তাঁর ছোটগল্পের একটি সংকলনের জন্য গ্রহণ করার সম্মানীস্বরূপ দেওয়া হলো। গাফ্ফারের প্রয়োজন ছিল ২৫–৩০। তাই দিয়ে সে যাত্রা রক্ষা পেলেন। তা না হলে সেবার তাঁর আইএ পরীক্ষা দেওয়া হতো না এবং অন্যান্য অভাব পূরণ হতো না।
কথা হয়েছিল সৈয়দ সাহেবের আসন্ন শতবর্ষ স্মারকগ্রন্থে তিনি লেখা দেবেন। শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। গাফ্ফার ক্রমাগত অসুস্থ থাকলেন। যাহোক, সুদীর্ঘ সময়ের খণ্ড খণ্ড যোগাযোগে আমাদের জীবনের আনন্দমুখর সৃজনশীল দিন অতিবাহিত হয়েছে। আমার দিক থেকে তাঁর প্রতিভাদীপ্ত কালাতিক্রমণের সাক্ষ্য বিদ্যমান থাকছে, এটি একটি বড় কথা। বাংলাদেশে এককালে উদীয়মান সাহিত্যপ্রতিভা আর উজ্জ্বল সাংবাদিকরূপে তিনি ইতিহাসে সুমুদ্রিত থাকবেন, তা সন্দেহাতীতরূপে বলা যায়।
মাহমুদ শাহ কোরেশী বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক, গণবিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের সাবেক ডীন এবং বাংলা বিভাগের সাবেক অধ্যাপক