বিধানসভা নির্বাচন

আসামে বিজেপির জয় ও বাংলাদেশের উদ্বেগ

আসামে নির্বাচনের মূল ইসু্যগুলোর মধ্যে একাধিক ইস্যু ছিল বাংলাদেশ সীমান্ত ও বাংলাভাষা–সংক্রান্ত
আসামে নির্বাচনের মূল ইসু্যগুলোর মধ্যে একাধিক ইস্যু ছিল বাংলাদেশ সীমান্ত ও বাংলাভাষা–সংক্রান্ত

আসামের সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। নির্বাচনের মূল ইস্যুগুলোর মধ্যে একাধিক ছিল বাংলাদেশ সীমান্ত-সম্পর্কিত এবং বাংলাভাষীবিষয়ক।
আসামে নির্বাচনের গতি-প্রকৃতি সম্যকভাবে বুঝতে গেলে এর অতীত কিছুটা তলিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। পাকিস্তানের দাবিতে আসাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯০৫ সালে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশ গঠিত হয়েছিল, যা পাঁচ বছর পরে রদ হয়ে যায়। বিভাগ-পূর্ব আসামে একক ধর্মাবলম্বী হিসেবে মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে হিন্দু-খ্রিষ্টান-এনিমিস্ট একযোগে ছিল সংখ্যায় কিছু বেশি। যদিও ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজমান ছিল, ভাষাভিত্তিক বিরোধিতাও (বাংলা ভাষার প্রতিকূলে) হতো।
বিভাগ-পূর্বকালে ১৯৪৬ সাল পর্যন্ত আসামে ছিল স্যার মুহম্মদ সা’দ উল্লাহর নেতৃত্বে মুসলিম লিগ সরকার। সেখানে মরহুম আবদুল মতিন চৌধুরী, মুনওয়ার আলী, মোদাব্বের হোসেন প্রমুখ বাঙালির (সিলেটবাসী) যথেষ্ট আধিপত্য ছিল। সিলেটের বসন্ত কুমার দাস, অক্ষয় কুমার দাস এবং আরও অনেক প্রভাবশালী রাজনীতিকও ছিলেন। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে অখণ্ড ভারতের সমর্থনে কংগ্রেসের সঙ্গে জামায়াতে উলামায়ে হিন্দ জোট বাঁধলে মুসলিম লিগ পরাজিত হয় এবং কংগ্রেস নেতা গোপীনাথ বরদলই জামায়াতের সঙ্গে জোট বেঁধে সরকার গঠন করেন। সেই সরকারে বাংলাভাষী মোতালেব মজুমদার ও আবদুর রশীদ জামায়াতের প্রতিনিধি হিসেবে মন্ত্রী ছিলেন।
দেশ ভাগের সময় গণভোটে সিলেট পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে ভোট দিলেও র্যাডক্লিফ রোয়েদাঁদে নীতিবহির্ভূতভাবে সিলেটের মুসলিম অধ্যুষিত করিমগঞ্জ মহকুমার অধিকাংশ এলাকা এবং সন্নিকটবর্তী কাছাড়ের মুসলিম অধ্যুষিত হাইলাকান্দি ও শিলচর ভারতাধীন আসামের সঙ্গে সংযোজিত হয়। এই অঞ্চল বর্তমানে দক্ষিণ আসাম বা বরাক-ভ্যালি বলে অভিহিত। রাজ্যে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি আদায়ের জন্য ১৯৬১ সালে শিলচরে পুলিশের গুলিবর্ষণে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ১১ জন শহীদ হন। কিন্তু ওই অঞ্চলে স্বীকৃত রাষ্ট্র বা রাজ্যভাষা হিসেবে বাংলা গৃহীত হয়নি। যদিও এখন তা জোরদার নয়, এখনো কোনো কোনো বরাক-ভ্যালিবাসীর স্বপ্ন—এই অঞ্চলকে আলাদা প্রদেশ কিংবা স্বায়ত্তশাসিত ইউনিয়ন টেরিটরি করে তোলা।
উত্তর আসামেও বাংলাভাষী অধ্যুষিত মুসলিমপ্রধান অঞ্চল ছিল মুখ্যত নগাঁও গোয়ালপাড়া এবং কামরূপ জেলায়। বরদলই সরকার বঙ্গাল-খেদা আন্দোলন শুরু করলেও স্বাধীনতা-উত্তরকালে সেই এলাকায় অনেক অভিবাসী বাঙালি থেকে যান। সেই অঞ্চলে বিশেষ করে বোড়োদের (আসামের সমতলবাসী উপজাতি) বসবাস। ওই এলাকার বরপেটারই নির্বাচিত প্রতিনিধি বহুকাল ছিলেন সিলেটের মরহুম আবদুল মতিন চৌধুরী।
এই বোড়োরা সংখ্যায় বর্তমান আসামের অধিবাসীদের প্রায় ১৬ শতাংশ। এরা অপেক্ষাকৃত অনুন্নত। বোড়ো-স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য অল-বোড়ো স্টুডেন্টস ইউনিয়ন ১৯৯৩ সালে আন্দোলন শুরু করে। ক্রমে এটা সহিংস রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপান্তরিত হয় এবং ২০০৪ সালে বোড়োল্যান্ড টাইগার্স ফোর্সের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে বোড়ো টেরিটরিয়েল কাউন্সিল গঠিত হয়। এর কেন্দ্রস্থল কোকরাঝর। তবে তা কার্যত আসাম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত। এই বোড়োরা, বিশেষ করে বাঙালি অভিবাসীবিরোধী এবং কয়েকবারই এই অঞ্চলে বাঙালিবিরোধী দাঙ্গা ও অভিবাসী হত্যা হয়। এবারের মতো গতবারের নির্বাচনেও এর বোড়ো পিপলস ফ্রন্ট (বিপিএফ) নামধারী রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
ব্রহ্মপুত্র ভ্যালি বা উত্তর আসামে রয়েছেন বহু অসমিয়া মুসলমান। স্বাধীনতা-উত্তরকালে তাঁরা কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পূর্ণ একীভূত হয়ে যান। স্বাধীনতা-পূর্বকালেও তাঁদের কেউ কেউ কংগ্রেসি রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখেন। পরবর্তী সময়ে কামরূপেরই একজন কংগ্রেসি মুসলমান নেতা ফখরুদ্দিন আলী আহমদ ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
স্বাধীনতা-উত্তরকালে মধ্যবর্তী এক টার্মেই শুধু উগ্র অহমীয় জাতীয়তাবাদী মোহান্তের নেতৃত্বাধীন অসম গণপরিষদ (এজিপি) ক্ষমতায় ছিল। বাকি সব সময়ই ছিল কংগ্রেস। কোনো বামপন্থী দলের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ছিল না, এখনো নেই। সাম্প্রতিক এই বিধানসভা নির্বাচনে একটানা ১৫ বছরের গদিনশিন তরুণ গগৈয়ের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেসের ভরাডুবি হলো।
বর্তমান আসামের ৭৮ হাজার ৪৩৮ বর্গ কিলোমিটার এলাকার প্রায় ২৮ মিলিয়ন অধিবাসীর মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশের সামান্য কম। এবং এর মধ্যে বাংলাভাষীর সংখ্যা অনেক। স্বাধীনতা-উত্তরকালে সব নির্বাচিত বিধানসভায়ই মুসলিম বিধায়কদের সংখ্যা ছিল ২২ থেকে ২৮। অধিকাংশই কংগ্রেসি। কিছুসংখ্যক এজিপিও ছিলেন।
সংখ্যালঘুদের স্বার্থ সংরক্ষিত হচ্ছে না—মুখ্যত এ কারণে কয়েক বছর আগে বদরুদ্দিন আজমল অল ইন্ডিয়া ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (এআইইউডিএফ) নামে একটি সর্বভারতীয় সেক্যুলার (ধর্মনিরপেক্ষ) পার্টি গঠন করেন। বিগত দুই সাধারণ নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তাঁরা তুলনামূলকভাবে সীমিত সাফল্য অর্জন করেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে এআইইউডিএফ সেক্যুলার কংগ্রেস পার্টির সঙ্গে জোট বাঁধতে আগ্রহী ছিল। কিন্তু কংগ্রেস নেতা তরুণ গগৈ বাংলাভাষী আধিপত্যের আশঙ্কায় আজমলের সঙ্গে জোট বাঁধতে অনিচ্ছুক ছিলেন। তাঁর এই জেদের কারণ ছিল, তাঁরই ভাষায়—‘যদি কোয়ালিশন করে জিতি, তাহলে কি ডেপুটি চিফ মিনিস্টার হিসেবে একজন বাঙালির উপস্থিতির সমূহ সম্ভাবনা থাকবে না?’ যদিও নির্বাচনের আগেই ধারণা করা হয়েছিল এককভাবে নির্বাচনে এবার কংগ্রেসের বিজয় অসম্ভব। এআইইউডিএফের সঙ্গে কোয়ালিশন হলে সম্ভাবনা ছিল। কেন্দ্রীয় কোনো কোনো প্রভাবশালী কংগ্রেসি নেতা অবশ্য আজমলের সঙ্গে ঐক্যজোটের কথা চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু তরুণ গগৈয়ের বাঙালি আতঙ্ক এতই প্রবল যে এ বিষয়ে কোনো ফলপ্রসূ আলোচনাই সম্ভব হয়নি। তাই এবার নিজের নাক কেটে অপরের যাত্রা ভঙ্গ করতে তাঁর দ্বিধা হলো না।
১২৬ সদস্যের বিধানসভায় কংগ্রেস পেল মাত্র ৩৩টি আসন আর এআইইউডিএফ পেল ১২টি। সাম্প্রদায়িক শক্তি হিসেবে বিজেপির সঙ্গে কোয়ালিশনে সেক্যুলার এআইইউডিএফ নেতা আজমল ছিলেন সম্পূর্ণ অনাগ্রহী। এই নির্বাচনে তাঁর দল ৭১টি আসনে মনোনয়ন দিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল ৩১ জনই অমুসলমান। ১ মে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস–এ প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে আজমল উপলব্ধি করেছেন কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতির দল পিডিপির সঙ্গে বিজেপির কোয়ালিশনের জন্য (যা অবশ্য তাঁর পরলোকগত পিতা মুখ্যমন্ত্রী মুফতি সাঈদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন) পিডিপির জনপ্রিয়তা বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। এটা অনস্বীকার্য যে একযোগে নির্বাচন করলে কংগ্রেস এবং এআইইউডিএফের নির্বাচনী ফলাফল অনেক ভালো হতো। তখন তাদের সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথা বিশ্লেষকদের অগ্রাহ্য করা সম্ভবপর হতো না। তার ওপর বিপিএফ এবং এজিপির সঙ্গে কার্যকরী সম্পর্ক থাকলে তো কথাই নয়।
এই নির্বাচনে বিজয়ী বিজেপি জোট পেয়েছে ৮৬টি আসন, বিজেপি এককভাবে ৬০টি, এজিপি ১৪টি আসন এবং বোড়োল্যান্ড পিপলস ফ্রন্ট ১২টি আসন। শেষোক্ত দুটি অবশ্যই আঞ্চলিক (রিজওনাল) পার্টি এবং তাদের সদস্যদের বিশেষ স্থানীয় স্বার্থ সংরক্ষণে তাঁরা সচেষ্ট।
তাঁরা মনে করেন, বাঙালি অভিবাসীদের উপস্থিতি তাঁদের স্বার্থবিরোধী, যদিও অভিবাসীরা বিভাগ-পূর্ব আমল থেকেই এখানে বসবাসকারী ভারতীয় নাগরিক। এরা বাংলাভাষী এবং প্রায় সবাই মুসলমান। এই অঞ্চলে বাঙালিবিরোধী রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা বেশ কয়েকটি হয়েছে। নীলা ও মানসে বহু মুসলিম নিহত এবং প্রচুর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়।
বিজেপিও সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শনে বিশ্বাসী। নির্বাচন-পূর্বকালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায় ১৪টি নির্বাচনী সভা করেন। তখন প্রায় প্রতিটিতেই বাংলাদেশ-ভারত-আসাম সীমান্তকে যেকোনো অনুপ্রবেশকারীর জন্য দুর্ভেদ্য (সিল করা সীমান্ত) করার এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বাঙালি অভিবাসীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। বিজেপির তরফ থেকে এই ঘোষণাও দেওয়া হয় যে বাংলাদেশ থেকে আগত হিন্দু শরণার্থীদের স্বাগত জানিয়ে নাগরিকত্ব দেওয়া হবে আর কোনো মুসলমান শরণার্থী হলে তাঁকে বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হবে। এসব আক্রমণাত্মক নির্বাচনী অঙ্গীকার যদি এখন তাঁরা বাস্তবায়ন করতে যান, তাহলে তো মহা সমস্যার সৃষ্টি হবে।
তা ছাড়া সম্প্রতি কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার তাদের প্রশ্নবিদ্ধ আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের সংকল্প প্রকাশ করেছে। এই ইন্টার-লিংকিং অব রিভারস (আইএলআর) পরিকল্পনার ৩০টি পানি স্থানান্তরকরণ প্রজেক্টের ১৪টিই হিমালয় উৎসারিত নদী–সম্পর্কিত। মন্ত্রী উমা ভারতী ঘোষণা করেছেন, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের বাহিত পানি স্থানান্তরিত অবশ্যই করা হবে। পূর্ববর্তী আসাম সরকারের এ নিয়ে প্রশ্ন বা দ্বিধা ছিল। সম্ভবত নবনির্বাচিত আসামের বিজেপি সরকার এতে পূর্ণ সমর্থন জানাবে। এই প্রজেক্ট বাস্তবায়িত হলে তা হবে বাংলাদেশের জন্য মরণফাঁদ।
সম্ভবত স্বার্থের সামঞ্জস্যতার জন্য বিপিএফ ও এজিপি এই জোটে ভবিষ্যতেও থাকতে চাইবে। যদি ভবিষ্যতে সেক্যুলার দল হিসেবে কংগ্রেস ও এআইইউডিএফ জোট হিসেবে কাজ করতে পারে, তাহলে হয়তোবা ভবিষ্যতে আসামের রাজনৈতিক চালচিত্র পরিবর্তনের সম্ভাবনা থাকতে পারে। নইলে গুয়াহাটি (রাজ্য রাজধানী) তাদের জন্য থাকবে ‘হনুজ দূর অস্ত’।
আমরা অবশ্য আশা করব বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করে আসামের নতুন সরকার বাংলাদেশের জনগণের প্রতি বন্ধুত্বমূলক আচরণে উদ্বুদ্ধ হবে এবং উভয় রাষ্ট্রের সম্পর্কের ক্ষতিকারক কোনো পদক্ষেপ নিতে বিরত থাকবে। আমরা তাদের প্রতিবেশীসুলভ শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।
ইনাম আহমদ চৌধুরী: উপদেষ্টা, বিএনপির চেয়ারপারসন।