
আজ ২৯ অক্টোবর, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। সাংস্কৃতিক জাগরণের মাধ্যমে মানুষের মুক্তির সংগ্রামে শামিল হয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের প্রত্যয় নিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী আজ পদার্পণ করছে সুবর্ণজয়ন্তীতে। চলছি তো অবিরাম মানুষের মিছিলে, লড়ছি তো মুক্তির শপথে—স্লোগানকে সামনে রেখে বেলা তিনটায় কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির শওকত ওসমান মিলনায়তনে মিলিত হচ্ছেন উদীচীর শিল্পী-কর্মী-সহযোদ্ধারা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মানবমুক্তির যে আদর্শ আর চেতনার মশাল হাতে নিয়ে সত্যেন সেন, রণেশ দাশগুপ্তের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করেছিল উদীচী, আজও সে চেতনার মশাল সমুজ্জ্বল, লড়াইয়ের একই আলোতে দীপ্র।
উদীচী একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন কেবল নয়, উদীচী একটি আন্দোলন, একটি চেতনার নাম। যে চেতনার মর্মমূলে মানুষ আর যে আন্দোলনের মূল লক্ষ্যই মানুষের জন্য একটি মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠা। তাই কেবল সংস্কৃতিচর্চার মধ্যেই উদীচী নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেনি; একদিকে যেমন গণমানুষের সংস্কৃতিচর্চার পথ নির্মাণ ও নির্দেশ করেছে, অন্যদিকে গণমানুষের জীবনবোধ ও অধিকার আদায়ের রাজনৈতিক সংগ্রামেও নেতৃত্ব দিয়েছে। তাই স্বাধীনতার সংগ্রামে উদীচীর শিল্পী-কর্মীরা যেমন জীবন বাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেছেন বাংলার লাখো মুক্তিকামী জনতার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, তেমনি স্বাধীন বাংলাদেশ যেন মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনায় পথ চলতে পারে, সে কারণে অবিরাম অব্যাহত রেখেছেন সাংস্কৃতিক সংগ্রাম।
সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের পথকে ঋদ্ধ করার লড়াইয়ে স্বাধীনতার পর থেকেই কাজ করে চলেছে উদীচী। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের লক্ষ্যে সারা দেশের মানুষের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে তুলে ধরার কাজ করে চলেছে নিরলসভাবে। পঁচাত্তরে জাতির পিতাকে হত্যা করার পর বাংলাদেশে যখন একে একে ফিরে আসতে থাকে একাত্তরের পরাজিত শক্তি, তারা যখন রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করে এবং মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে ফিরিয়ে নিতে উদ্যত হয় পাকিস্তানি ভাবাদর্শের দিকে, তখন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী বাঙালির হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে তার বিরুদ্ধে লড়াই জারি রাখে।
সামরিক সরকারের দুঃশাসন, মৌলবাদের উত্থান আর অপরাজনীতির জাঁতাকলে বাংলাদেশ যখন নিদারুণ দুঃসময়ের কাল অতিক্রম করছিল, তখন একাত্তরের চেতনার মশাল জ্বালিয়ে উদীচী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে নিজের সবটুকু সামর্থ্য নিয়ে। ফলে বারবারই উদীচীর ওপর আক্রমণ করেছে মৌলবাদী, সাম্রাজ্যবাদী, বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তির দানব থাবা। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল মাঠে উদীচীর দ্বাদশ জাতীয় সম্মেলনের শেষ দিনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বোমা হামলা করা হয়। ধর্মীয় উগ্র জঙ্গিগোষ্ঠী ২০০৫ সালের ৮ ডিসেম্বর নেত্রকোনা শহরের অজহর রোডে উদীচী কার্যালয়ে বোমা হামলা করে। কিন্তু উদীচীর শিল্পী-কর্মীরা কখনোই তাঁদের আদর্শিক লড়াই থেকে সরে আসেননি। শহীদ সহযোদ্ধাদের ত্যাগের বেদি স্পর্শ করে আদর্শের লড়াই অব্যাহত রাখার দৃপ্ত শপথ নিয়েছেন বারবার, এগিয়ে চলেছেন মুক্তিযুদ্ধের কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।
স্বাধীন বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে গড়ে ওঠা প্রতিটি আন্দোলনে উদীচী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। ২০১৩ সালের ১২ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চিহ্নিত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং জামায়াত-শিবিরসহ সব ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে সপ্তাহব্যাপী প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। একই বছর ৫ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা শাহবাগ আন্দোলনে উদীচীর শিল্পী-কর্মীরা সর্বাত্মক অংশ নিয়েছেন। সারা দেশে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে উদীচীর ৭১টি সাংগঠনিক জেলা সংসদ ও জেলা সংসদের অধীনে ৩১৫টি শাখা একযোগে কাজ করেছে। একের পর এক ব্লগার, লেখক, প্রকাশকসহ মুক্তচিন্তার মানুষের হত্যার মধ্য দিয়ে সারা দেশে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে জঙ্গি-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো, উদীচী তার প্রতিবাদে সব সময় রাজপথে থেকেছে কণ্ঠে স্লোগান আর গণসংগীত নিয়ে।
বর্তমানে বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবীতে জঙ্গিবাদ ও উগ্রবাদের যে ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছে, তার বিরুদ্ধে উদীচী নিরলসভাবে কাজ করছে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের হাতিয়ার নিয়ে। আবহমান বাংলার সংস্কৃতি মানুষকে ভালোবাসার সংস্কৃতি, মানবমুক্তির যে ডাক আমাদের সংস্কৃতির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে, তার চর্চার মধ্য দিয়েই উদীচী প্রতিষ্ঠা করতে চায় একটি মানবিক মর্যাদার রাজনৈতিক লড়াই। সংস্কৃতি যে জাতির মধ্যে যতটা প্রগাঢ়, রাজনীতি সে জাতির কাছে তত বেশি মানবিক—এ সত্য উপলব্ধি করেই উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখনো নিজেদের লড়াই অব্যাহত রাখছে অবিরাম।
উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শিল্পী-সাহিত্যিক সত্যেন সেন খুব সচেতনভাবেই উদীচী নামটি নির্বাচন করেছিলেন। ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, উদীচী অর্থ উত্তর দিক বা ধ্রুবতারা দিক। দিকহারা নাবিকেরা যেমন উত্তর দিকে ধ্রুবতারার অবস্থান দেখে তাঁদের নিজ নিজ গন্তব্য স্থির করেন, তেমনি এ দেশের সংস্কৃতি তথা গণমানুষের সংস্কৃতি, সাংস্কৃতিক আন্দোলন সবকিছুই উদীচীকে দেখে তার চলার পথ চিনতে পারবে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই মহান মুক্তিযুদ্ধসহ বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রাম ও লড়াইয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে উদীচী। উদীচীর ৪৯ বছরের সুদীর্ঘ ইতিহাস নানা চড়াই-উতরাই, বাধা-বিপত্তি, আনন্দ-বেদনার ইতিহাস। কিন্তু উদীচীর পথচলা কখনো থেমে থাকেনি, থাকবেও না। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অদ্যাবধি বাঙালির সব গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামে অনবদ্য ভূমিকা পালন এবং অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক ও প্রগতিশীল জাতি গঠনে ভূমিকা রেখে চলেছে উদীচী। জাতীয় পর্যায়ে এ অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৩ সালে উদীচীকে প্রদান করা হয়েছে ‘একুশে পদক’। দেশের রাজনীতির চলমান সংকটের পেছনে সাম্রাজ্যবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিসমূহের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদ সুস্পষ্ট বলে মনে করে উদীচী। এ রকম পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদীচীর সাংস্কৃতিক সংগ্রাম জাতিকে আবারও পথ দেখাতে সাহায্য করবে নিশ্চয়।
সঙ্গীতা ইমাম: সহসাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী।