মোবাইল ব্যাংকিং

ডিজিটাল লেনদেন নয়, নগদ টাকা চাই!

শহরে এখন অনেক পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনই চাকরি করেন। বেতনের টাকা তোলা, বাজার করা, ড্রাইভারের বেতন দেওয়া, সন্তানের গৃহশিক্ষকের বেতন দেওয়া, গ্রামে পরিচিতজনকে প্রয়োজনে টাকা পাঠানো ইত্যাদি নানাবিধ কাজ তাঁদের করতে হয় সন্ধ্যাবেলায়। কিন্তু তখন কোনো ব্যাংক খোলা থাকে না। আগে ব্যাংকের এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে এ কাজগুলো করা হতো। আর প্রিয়জনের কাছে টাকা পাঠানোর জন্য কোনো দিন একজনকে ব্যাংক হয়ে বিলম্বে অফিসে যেতে হতো।

কয়েক বছর ধরে এই কাজগুলো অনেক সহজ হয়েছে মূলত ডিজিটাল বাংলাদেশের কল্যাণে। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই এমন লোকজনকে আর্থিক সেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ২০১১ সালে মোবাইল  ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) চালু হয়। তার পরের পাঁচ-ছয় বছরে অনেক মানুষ এই সেবার আওতায় এসেছেন। এ সময়ের মধ্যে মোবাইল ব্যাংকিংই হয়ে উঠেছে গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণভোমরা। ঢাকাসহ শহরাঞ্চলের কর্মরত পোশাককর্মী থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, সরকারি চাকুরে—প্রায় সবাই এখন কোনো না কোনোভাবে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের গ্রাহক বা সেবাগ্রহীতা হয়ে উঠেছেন। এটিকে বলা যায় ডিজিটাল বাংলাদেশের অন্যতম সেরা উদ্যোগ, যাতে প্রান্তজনেরা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। এ সেবা যে গ্রামের সাধারণ মানুষকে শুধু ডিজিটাল ও ব্যাংকিং সেবার আওতায় এনেছে তা নয়, বিশ্ব সম্প্রদায়েরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিল গেটসের প্রতিষ্ঠান বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন পৃথিবীর একমাত্র ট্রিলিওনিয়ার প্রতিষ্ঠান হতে চলেছে, এই প্রতিষ্ঠান আমাদের দেশের অন্যতম মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস ‘বিকাশ’-এ বিনিয়োগ করেছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কেনিয়াতে গিয়ে বাংলাদেশকে স্মরণ করেছেন। গত বছর বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট কিম বলেছিলেন, ‘একটা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে আর্থিক সেবা ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত করার স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করা এক অভূতপূর্ব সাফল্য।’ এই সাফল্যের অন্যতম কারণ হলো প্রচলিত ব্যাংকিং সেবা যাঁদের কাছে পৌঁছাতে পারে না, এমএফএস তাদের কাছে অবলীলায় তা পারে।

উপবৃত্তির কথাই ধরা যাক। বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ের ১ কোটি ৩০ লাখ ছেলেমেয়েকে উপবৃত্তি দেয়। প্রতি মাসে ১০০ টাকা। দেওয়া হয় শিক্ষার্থীর মাকে। এ জন্য মন্ত্রণালয়গুলো মায়েদের নামে কার্ড ইস্যু করেছে। প্রতিবার টাকা দেওয়ার জন্য কোনো এলাকার পাঁচ-ছয়টি স্কুলকে নিয়ে একটি বিতরণ কেন্দ্র তৈরি করা হয়। নির্ধারিত দিনে ব্যাগে করে টাকা নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তা সেখানে যান আর প্রশাসনের নজরদারিতে মায়েরা দূরদূরান্ত থেকে এসে সে টাকা নিয়ে যান। আসা-যাওয়া আর অন্য ভোগান্তির কথা না হয় নাই বললাম। আয়োজনের বিড়ম্বনার জন্য প্রতি মাসে এ টাকা না দিয়ে কয়েক মাস পরপর দেওয়া হয়। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে আগামী মাস থেকে এই মায়েদের কাছে তাদের সন্তানদের উপবৃত্তির টাকা সময়মতো পৌঁছে দেওয়া যাবে। কোনো বিতরণ কেন্দ্র করতে হবে না। মায়েরা ইচ্ছে ও প্রয়োজনমতো এজেন্টদের কাছ থেকে টাকা তুলতে পারবেন। আগামী ১ মার্চ প্রধানমন্ত্রী ৮০ হাজার গ্রামের ১ কোটি মাকে রূপালী ব্যাংক শিওরক্যাশ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে উপবৃত্তির টাকা পৌঁছানোর কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন বলে শুনেছি। তাঁদের মোবাইল ব্যাংক অ্যাকাউন্টও তৈরি করা হয়েছে।

সহজ ও সর্বগামী এই ব্যবস্থা অন্যরাও নানাভাবে ব্যবহারের চেষ্টা করবে, এটাই স্বাভাবিক। সাম্প্রতিক কালে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের একাংশ এমএফএসের অবৈধ ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যবসা চালাচ্ছে, এ অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস ডিপার্টমেন্ট একটি সার্কুলার জারি করেছে। এই সার্কুলারে বাংলাদেশ ব্যাংক কয়েকটি নির্দেশনা দিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত উপকারী না হয়ে ক্ষতিকরও হতে পারে। নতুন নির্দেশনায় ক্যাশ-ইনের ক্ষেত্রে একজন গ্রাহকের দৈনিক সর্বোচ্চ লেনদেনের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা থেকে কমিয়ে ১৫ হাজার টাকা এবং তিনবারের পরিবর্তে দুবার করা হয়েছে। আর মাসিক মোট লেনদেনের সীমা দেড় লাখ থেকে কমিয়ে এক লাখ টাকা করা হয়েছে। দিনে দুই বারে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা লেনদেন করা যাবে। শুধু তা-ই নয়, এখন থেকে কোনো একটি মোবাইল হিসাবে ক্যাশ-ইন হওয়ার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সংশ্লিষ্ট হিসাব থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকার বেশি ক্যাশ-আউট করা যাবে না। বরং কোনো হিসাবে ৫ হাজার টাকা বা তার বেশি নগদ অর্থ জমা দেওয়া (ক্যাশ-ইন) বা তুলে নেওয়ার (ক্যাশ-আউট) ক্ষেত্রে গ্রাহককে অবশ্যই জাতীয় পরিচয়পত্র/স্মার্ট কার্ড বা তার ফটোকপি এজেন্টকে দেখাতে হবে এবং এজেন্ট গ্রাহকের জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর রেজিস্টারে লিখে রাখবেন।

এ দেশের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মূল ব্যবহারকারীদের কথা বিবেচনা করলে এ নির্দেশনাকে রক্ষণশীল মনে হয়। টাকা দ্রুত স্থানান্তরের জন্যই মোবাইল ব্যাংকিং সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বাজারিদের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং একটা আশীর্বাদের মতো। গ্রামীণ অর্থনীতির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হয়ে উঠেছে মোবাইল ব্যাংকিং। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও বাজারিদের একটা বড় অংশ এভাবে আর্থিক লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন। ই-কমার্স, রেল-বাস-বিমানের টিকিট কেনা—এসবের প্রসার বাড়ছে। নতুন সার্কুলারের কারণে আমার যদি কখনো কোনো ছুটির দিনে পরিবারের সবার জন্য বিমানের টিকিট কিনতে হয় তাহলে মোড়ের দোকানে গিয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা ভরে সে কাজটা আমি আর করতে পারব না। যেমন পারবেন না ঢাকার কোনো এক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাঁর গ্রামীণ সরবরাহকারীকে একবারেই সব অর্থ পরিশোধ করতে।

মোবাইল ব্যাংকিং প্রচলিত ব্যাংককে ছাড়িয়ে যাচ্ছে এর ব্যবহারের সুবিধার জন্য। বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল মুদ্রা ব্যবহারের যে শ্লথগতি ছিল, মোবাইল ব্যাংকিং সেটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশ এখন ডিজিটাল অর্থব্যবস্থার দিকে যাওয়ার জন্য নানা রকম উদ্যোগ নিচ্ছে। সম্প্রতি ভারতে বড় মুদ্রার নোট বাতিলের ফলে অনেকেই ডিজিটাল টাকায় লেনদেনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছেন।

অথচ আমাদের দেশে গড়ে ওঠা একটা ডিজিটাল সংস্কৃতিকে উল্টোরথে তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ ব্যাংক যেন বলতে চায়, ডিজিটাল লেনদেনের দরকার নেই, নগদ টাকায় লেনদেন করুন।

মুনির হাসান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।