শ্রীলঙ্কা

তামিল গণহত্যার তদন্ত হবে কি?

শ্রীলঙ্কা একনায়কত্ব উৎখাত করেছে। এখন তাদের সেই পুরোনো মার্কিন-সমর্থিত প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা উচিত, জেনেভায় হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল যা গ্রহণ করেছিল। সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, শ্রীলঙ্কা সরকার যুদ্ধের শেষের দিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অবর্ণনীয় নৃশংসতার ‘স্বাধীন ও বিশ্বাসযোগ্য’ তদন্ত করবে। একটা ব্যাপার খুবই পরিষ্কার, নয়াদিল্লি রাজাপক্ষের সরকারকে বাঁচানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে। কিন্তু মার্কিন নেতৃত্বাধীন ৪৭ জাতির শক্তিশালী সংগঠন শুধু ভারতের আপত্তি দূরে ঠেলে দেয়নি, তারা সেই প্রস্তাবের গুরুত্বও খাটো করতে চায়নি। নয়াদিল্লির মনোভাবের প্রতিবাদে ডিএমকে সে সময় তার সমর্থনও তুলে নেয়।
ভারত যে সে সময় লেসন্স লার্নট অ্যান্ড রিকনসিয়েলেশন কমিশন (এলএলআরসি) গঠনের পরামর্শ দিয়েছিল, সেটা গঠনের সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি; যেটা শ্রীলঙ্কার হাঁড়ির খবর বের করে আনতে পারত। আগে অনুরূপ একটি প্রচেষ্টা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তা বৃথা প্রমাণিত হয়। কারণ, অভিযুক্ত শ্রীলঙ্কা সরকারই সে তদন্ত করেছিল। স্বাভাবিকভাবেই সেই তদন্ত থেকে ভালো কিছু বের হয়ে আসেনি। সেটা ছিল ছলনা।
মাহিন্দা রাজাপক্ষে যখন দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন, তখন নয়াদিল্লির অনেক কিছুই ব্যাখ্যা করার ছিল। ভারত তাঁকে ছোট ছোট অস্ত্র সরবরাহ করেছে। আর তিনি তামিলদের মারতে তা উদারভাবে ব্যবহার করেছেন। তামিলরা শ্রীলঙ্কার সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। যুদ্ধাপরাধের দায়ে রাজাপক্ষের বিচার হওয়া উচিত। কারণ, তামিলদের জঙ্গি সংগঠন এলটিটিই আত্মসমর্পণ করার পরও তিনি ৪০ হাজার তামিলকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করেছেন।
তামিলদের পরাজয়ের পর তিনি সেনা ও পুলিশপ্রধানকে হটে যেতে অনুরোধ করেছেন। তার মানে এটা বোঝা যায় যে তারা কতটা নিপুণভাবে ভারতকে ধোঁকা দিয়েছে। তার পরও নয়াদিল্লির এটা জানানো উচিত ছিল, তিনি কীভাবে বল প্রয়োগের মাধ্যমে দেশ শাসন করেন। আর তাঁর এক ভাই ছিলেন দেশটির প্রতিরক্ষাসচিব।
তাঁর ভূমিকার কথা আমি কখনো ভুলতে পারব না। কারণ, কলম্বোতে এক রাতে পুলিশ আমাকে হেনস্তা করেছিল। আমি বলেছিলাম, এলটিটিইকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা উচিত, সামরিকভাবে নয়। সে রাতে আমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনে দরজা খুলে দিলাম। পুলিশ আমার পাসপোর্ট দেখা ছাড়া আর কিছু করেনি। বার্তাটা ছিল পরিষ্কার। পরের দিনই আমি শ্রীলঙ্কা ত্যাগ করি। এরপর আর কখনোই আমি কলম্বোয় যাইনি।
হ্যাঁ, শ্রীলঙ্কা গণতন্ত্রের খোলসে ফিরেছে, এটা সত্যিই উৎসাহজনক। কিন্তু এটাও দুর্ভাগ্যজনক যে এর বিপরীতে পাকিস্তানের জনগণ প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরে পেতে দৃঢ়প্রত্যয় ঘোষণা করছে না। সংবিধান সংশোধন করে সামরিক আদালতের বিধান সংযোজন করে সে দেশের রাজনীতিকেরা আত্মসমর্পণ করেছেন। এর মানে হচ্ছে, আগামী দুই বছর সে দেশের সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের সামরিক আদালতে বিচার করা হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, এ-সংক্রান্ত একমাত্র মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল রাহিল শরিফ। তিনি বলেন, সামরিক আদালত শুধু সেনাবাহিনীর চাহিদা নয়, সেটা এই বিশেষ সময়ের জন্যই প্রয়োজন। আর ভিতু রাজনীতিকেরা নীরব থেকে তাদের সম্মতি দিয়েছেন।
শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তান উভয়ই আমাদের প্রতিবেশী। সেখানে যা হয়, তার প্রভাব ভারতের ওপরও পড়ে। এটা আশাপ্রদ যে আমাদের গণতন্ত্রের ভিত এতই শক্ত, এসব ঘটনার প্রভাব ঠেকানোর মতো ক্ষমতা আমাদের রয়েছে। তার পরও পাশের বাড়িতে একনায়কতন্ত্র থাকা কিছুটা অস্বস্তিকর। নয়াদিল্লি এসব দেশে গণতন্ত্র রপ্তানি করতে পারে না। কিন্তু প্রতিবেশী দেশে জনগণের যে আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করছে—সেটা নিশ্চিত করতে তার যা করা সম্ভব, তা করা উচিত; অবশ্যই সেখানকার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক না গলিয়ে।
গণতন্ত্র পরাজিত হলেই একনায়কতন্ত্র জেঁকে বসে। ভারত কয়েক বছর আগে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলে ভোট না দিয়ে এই মৌলিক পাপ করেছিল। সেখানে একটি প্রস্তাব পাস হওয়ার কথা ছিল। একটি আন্তর্জাতিক ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখার উদ্দেশ্যে এ তদন্ত হওয়ার কথা ছিল, শ্রীলঙ্কা ঠান্ডা মাথায় এলটিটিইর বিরুদ্ধে সংঘটিত যুদ্ধের সময় তাদের ৪০ হাজার যোদ্ধা ও অন্যদের হত্যা করেছিল কি না। এমনকি তামিলরা নিঃশর্তভাবে আত্মসমর্পণের পরও নাকি এ খুনোখুনি চলেছে।
সে সময় ভারতের নিজেকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘটনায় আমার জওহরলাল নেহরুর কথা মনে পড়ে যায়: আগ্রাসন হলে বা মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে আমার চুপ করে থাকতে পারি না। এমনকি মনমোহন সিং সরকারও সে সময় রাজাপক্ষের একনায়কতান্ত্রিক সরকারকে আশ্বস্ত করেছে। কিন্তু তামিলদের অধিকার ও শাসনব্যবস্থায় তাদের বক্তব্য কী হবে, তা নিয়ে নয়াদিল্লির কোনো মাথাব্যথা ছিল না।
আমার মন বলছে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আমলারা স্বভাবগত কারণেই মনে করেছেন, তাঁরা আসলে ‘দেশের স্বার্থে’ ভোটদানে বিরত থেকেছেন। আর তৎকালীন দুর্ভাগা পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের তো কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। ওই সময় ১০০ জন জেলে শ্রীলঙ্কার জলসীমায় ঢুকে পড়েছিল। তাঁদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারেই খুরশিদ উদ্বিগ্ন ছিলেন। তখন রাজাপক্ষের সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখে আমি খুব একটা বিস্মিত হইনি: ‘ধন্যবাদ, কোনো সন্দেহ নেই নয়াদিল্লি মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বিশ্বের চাপে ছিল। কারণ, চীন ও পাকিস্তান কলম্বোকে সমর্থন দিয়েছিল, এ দুটি দেশে গণতন্ত্র খুবই সীমিত।’
এলটিটিই মূলত ছিল সন্ত্রাসী সংগঠন। ফলে তাদের ধ্বংসে আমার তেমন কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু মানবতাবাদী হিসেবে সংগঠনটির যোদ্ধা ও তাদের সমর্থকদের আত্মসমর্পণের পর তাদের হত্যা করা আমি সমর্থন করি না। কিন্তু শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী, দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপক্ষে ও তাঁর ভাই তৎকালীন প্রতিরক্ষাসচিব গোতাভায়া রাজাপক্ষের এই রক্তস্নান নিয়ে অনুশোচনা নেই।
বিবিসির উদ্যমী চ্যানেল ফোর এলটিটিই যোদ্ধা ও নিরীহ তামিলদের হত্যা ও তাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বৈরিতা নিয়ে তথ্যচিত্র না দেখালে দুনিয়া হয়তো এর কিছুই জানতে পারত না। কলম্বো যে তদন্ত করেছিল, তা ছিল নিছক আইওয়াশ। সেখানে সেনাবাহিনীকে দায়মুক্তি দিয়ে সব দোষ তামিলদের ঘাড়ে বর্তানোর চেষ্টা করা হয়েছে। যে তামিলরা শ্রীলঙ্কার শাসনব্যবস্থায় সম-অধিকারের দাবি করেছিল, নতুন সরকারের অধীনে তারা সেটা পাবে কি না, সেটাই হচ্ছে কথা; এটা গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য পরীক্ষাও বটে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।