জলবায়ু পিরবর্তন

ধনী দেশগুলোকেই দায় নিতে হবে

রুষ্ট হয়ে উঠছে প্রকৃতি
রুষ্ট হয়ে উঠছে প্রকৃতি

প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর পার হয়ে গেলেও খুলনার দাকোপ, কয়রা, পাইকগাছা উপজেলার আইলাবিধ্বস্ত জনপদের বহু মানুষ এখনো বেড়িবাঁধে বাস করছেন। ২০০৯ সালের ২৫ মে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় আইলার প্রায় ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে বিধ্বস্ত হয় এসব জনপদ, তার পর অনেকেই মূল বাড়িতে ফিরতে পারেননি। ঝুপড়িঘর তুলে তাঁরা মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করছেন ওয়াপদার বেড়িবাঁধে। সঙ্গে রয়েছে সুপেয় পানির তীব্র অভাব। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক অধিকারের সংস্থানও তাঁদের নেই। আইলার পর সেসব এলাকায় নতুন করে পর্যাপ্তসংখ্যক ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রও গড়ে ওঠেনি।
এ অবস্থায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের আহ্বানে বিশ্বনেতারা আজ জলবায়ু সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন, আগামী বছর গ্রহণ করা হবে এমন একটি কর্মসূচিভিত্তিক উচ্চাভিলাষী বৈশ্বিক মতৈক্যের লক্ষ্য ঠিক করা হবে সেখানে। এ রকম বৈঠকও হচ্ছে আবার পাঁচ বছর পর, ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনের পর। আবার এই রোববার নিউইয়র্কে দুনিয়ার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জলবায়ু মিছিল হয়ে গেল, প্রায় তিন লাখ মানুষ এই মিছিলে অংশ নেন বলে দাবি করেছেন আয়োজকেরা। মিছিলকারীরা দাবি জানিয়েছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত হুমকি যেন বৈশ্বিক এজেন্ডার এক নম্বরে রাখা হয়। ৩৯টি দেশের একটি জরিপে দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনই আগামী দিনের প্রধান সমস্যা।
সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে আলোচিত কোপেনহেগেন জলবায়ু সম্মেলন ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত হয়। সে সম্মেলনে জলবায়ু পরিবর্তনে লাগাম দেওয়ার মতো কোনো মতৈক্যে পৌঁছাতে পারেনি শিল্পোন্নত দেশগুলো, এ লক্ষ্যে কোনো আইনি কাঠামো প্রণয়ন তো দূরের কথা । এসবের মধ্য দিয়ে সেই আক্রান্ত মানুষগুলোর জীবনে কোনো পরিবর্তন তো আসেইনি, উল্টো এই জলবায়ু ফান্ডের টাকা নয়ছয় হয়েছে এমন অভিযোগও উঠেছে।
জলবায়ু ফান্ডের টাকা প্রায় শেষ। ফলে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন ১০ থেকে ১৫ বিলিয়ন ডলারের একটি ফান্ড গঠনের জন্য ধনী দেশগুলোর ওপর চাপ প্রয়োগ করছেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এই সম্মেলনে কোনো অর্থের প্রতিশ্রুতি দেবেন না বলে জানা গেছে। কোপেনহেগেন সম্মেলনে ধনী দেশগুলো ২০২০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলারের একটি তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু এ পর্যন্ত শুধু জার্মানি এ তহবিলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ দিয়েছে। উন্নয়নশীল দেশগুলো চাইছে, ধনী দেশগুলো যেন এ সম্মেলনে অন্তত ১৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে দুনিয়ায় নতুন উদ্বাস্তু সৃষ্টি হয়েছে, তাঁদের বলা হচ্ছে জলবায়ু উদ্বাস্তু। বাংলাদেশে সিডর ও আইলার কারণে বহু মানুষ এই জলবায়ু উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জলবায়ু-শরণার্থী বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে সারা পৃথিবীতে প্রায় ২৫০ মিলিয়ন এবং বাংলাদেশে কমপক্ষে ২০-৩০ মিলিয়ন মানুষ বাস্তুহারা হবে। এতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে এরই মধ্যে ঢাকা শহরের সাত মিলিয়ন বস্তিবাসীর মধ্যে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন হচ্ছে পরিবেশ-শরণার্থী। আবার এই মানুষেরা শরণার্থী মর্যাদা ভোগ করে না, ফলে জাতিসংঘেরও এ মানুষগুলোর প্রতি কোনো দায় নেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে গ্রিনহাউস গ্যাস (কার্বন ডাই-অক্সাইড ও নাইট্রোজেন) নিঃসরণ। ফলে, দুনিয়ার তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রতি দশকই দেখা যাচ্ছে আগের দশকের চেয়ে উষ্ণ। দুনিয়ার তাপমাত্রা পরিমাপের ১৩০ বছরের মধ্যে ২০০৫ সাল ছিল সবচেয়ে উষ্ণ বছর, তার পরেই ছিল ২০০৯ সাল। দুনিয়ায় সবচেয়ে বেশি কার্বন উদ্গিরণ করে শিল্পোন্নত দেশগুলো। এর এক নম্বরে রয়েছে চীন ও তার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। অথচ যুক্তরাষ্ট্রই এ সম্মেলনে জলবায়ু তহবিলে কোনো অর্থ দেবে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, দুনিয়ার জলবায়ুর এমন পরিবর্তন হয়েছে যে এখনই পরিবেশদূষণ বন্ধ হলেও জলবায়ুর পরিবর্তন চলতেই থাকবে।
উন্নত দেশগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নের নামে যেভাবে প্রকৃতির সঙ্গে যথেচ্ছাচার করেছে, তাতে প্রকৃতি রুষ্ট হয়ে উঠেছে। কারণ, প্রকৃতি একটি জীবন্ত সত্তা, তাকে শুধু সম্পদ লাভের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। অথচ এ বিষয়টিকে আমলে না নিয়ে উন্নত দেশগুলো নিজেদের তথাকথিত উন্নয়নের স্বার্থে জলবায়ু তহবিল, কার্বন ট্রেড প্রভৃতি তৈরি করে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে টোপ দিয়ে যাচ্ছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিসের অধ্যাপক জেমস হাসসেন বলেছেন, জলবায়ু সম্মেলনগুলোর মূল সুরে সমস্যা সমাধানের কোনো ব্যাপার থাকে না। কারণ, এর মধ্য দিয়ে কার্বন নিঃসরণ কমানোর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কিন্তু এমন একটা ভাব করা হয় যে সমস্যাটি আমলে নেওয়া হয়েছে। কথা হচ্ছে, দুনিয়ার উন্নয়নের মডেল যেন প্রকৃতির ওপর আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা না করে প্রকৃতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত।
জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য উন্নত দেশগুলো সবচেয়ে দায়ী হলেও এর জন্য বাংলাদেশের মতো সমুদ্র উপকূলবর্তী উন্নয়নশীল দেশগুলোকে ভুগতে হচ্ছে। দ্বীপরাষ্ট্র কিরিবাতির প্রেসিডেন্ট বলেছেন, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে সে দেশ আগামী ২০-৩০ বছরের মধ্যে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বাংলাদেশের অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ১৭ শতাংশ।
ফলে স্বাভাবিকভাবেই উন্নত দেশগুলোকেই এর দায় নিতে হবে। তারা যত কার্বন উদ্গিরণ করবে, সে হারে তাদের ওপর কার্বন কর আরোপ করা যেতে পারে। সে অর্থ এসব ভুক্তভোগী দেশের মানুষগুলোর জন্য ব্যয় করা হোক। এতে হয়তো তাদের জীবন কিছুটা হলেও সহনীয় হবে। একই সঙ্গে দাবি তুলতে হবে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে গৃহহারা মানুষকে শরণার্থীর মর্যাদা দিতে হবে। আর এই মানুষের ভরণপোষণের ভার নিতে হবে শীর্ষ কার্বন উদ্গিরণকারী দেশগুলোকেই।
জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যাটি যেমন পরিবেশগত, তেমনি একই সঙ্গে তা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকও বটে। উন্নত দেশগুলোর কারণেই এই জলবায়ু পরিবর্তন হচ্ছে, ফলে তাদের কার্বন উদ্গিরণ হ্রাসে বাধ্য করতে হবে। তার জন্য প্রয়োজন সদিচ্ছা, কার্যকর কূটনীতি ও রাজনীতি। তা না হলে কিয়োটো, কোপেনহেগেন, কানকুন ও জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সম্মেলন করে দাকোপের সেই ওয়াপদার বেড়িবাঁধে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলোর কোনো লাভ হবে না। তিন লাখ মানুষের মিছিল করেও লাভ হবে না। আবার বাংলাদেশ সরকারও এই মানুষদের সম্পর্কে কেন এমন উদাসীন, সে প্রশ্নও তুলতে হবে। কোনো প্রতিকার না পেয়ে এই বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের জলবায়ু-শরণার্থীরা যদি এসব উদ্গিরণকারী দেশগুলোতে হিজরত শুরু করে, তাহলে কী অবস্থা দাঁড়াবে?
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক।