
বাংলাদেশের জনজীবন প্রকৃতিনির্ভর। এই নির্ভরতার কারণে আমরা নানাভাবে উপকার পাই। যেমন অঢেল মিষ্টি পানির প্রবাহ, অনেক জায়গায় বছরে তিনটা ফসল ফলানো, উর্বর জমি ইত্যাদি। আবার কোনো কোনো সময় প্রকৃতি দুর্ভোগেরও কারণ হয়। অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টির ফলে কৃষিকাজ ব্যাহত হয়, ফসল নষ্ট হয় এবং জনদুর্ভোগ বেড়ে যায়। প্রকৃতি সম্পর্কে খুব বেখেয়ালি হয়ে পড়লে আমরা দুর্ভোগে পড়ি। আবার প্রকৃতির ওপর অতিনির্ভরতা কাটানোর জন্য নানা আয়োজন আছে।
বর্ষায় যে পানির ঢল আসে, তা নিতান্তই স্বাভাবিক। কারণ, এ সময় হিমালয়ে বরফ গলে, প্রচুর বৃষ্টি হয়। আমাদের দেশের একটা বড় অংশ বেশ নিচু। বর্ষার পানিতে অনেক জমি ডুবে যায়। স্বাভাবিক নিয়মেই এটা হয়। যখন পানি বেশি চলে আসে, তখন মাঠের ফসল ডুবে যায়, বসতভিটা তলিয়ে যায়। এটাকে আমরা বন্যা বলি। বন্যা ঠেকানোর জন্য আমরা নানান প্রযুক্তি ব্যবহার করছি। তার একটি হলো, নদীর দুদিকে বাঁধ দিয়ে বর্ষার পানি নদীর মধ্যে আটকে রেখে উজান থেকে ভাটিতে প্রবাহিত করা। বন্যার জল বেশি হলে কিংবা বাঁধ দুর্বল হলে নদীর পানি বাঁধ ভেঙে কিংবা উপচে দুপাশের জমি এবং গ্রাম সয়লাব করে দেয়। তখন এটা আর স্বাভাবিক বর্ষা থাকে না। এটাকেই আমরা বন্যা বলি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে যখন বলা হয়, তিস্তার জল ডালিয়া কিংবা ধরলা পয়েন্টে বিপদসীমার ৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে, এটা আমরা বুঝি না। কোনটা বিপদসীমা, নদীর পানি কয় সেন্টিমিটার বাড়লে বিপদ ডেকে আনে, তা আমজনতার জানার কথা নয়। যখন ভিটায় পানি ওঠে, গরু-ছাগল-মানুষকে ঘরের মধ্যে মাচা বানিয়ে থাকতে হয়, তখন আমরা বুঝি, আমরা বিপদে আছি।
দেশের যত্রতত্র বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। সবই মাটির বাঁধ। ‘বন্যামুক্ত’ এলাকার পরিধি যত বাড়ছে, বাঁধবিহীন এলাকায় বন্যার ঝুঁকিও তত বাড়ছে। সমপরিমাণ পানি যদি অল্প জায়গা দিয়ে প্রবাহিত হয়, তাহলে ওই জায়গায় পানির উচ্চতা বাড়বেই। আমাদের দেশের সনাতন প্লাবনভূমি বাঁধ দিয়ে আমরা যত নিরাপদ করছি, যেসব এলাকায় বাঁধ নেই সেখানে ততই পানি বেশি যাচ্ছে, ঝুঁকিও বাড়ছে।
এর একটা সমাধান হতে পারত, সম্পূর্ণ না হলেও আংশিক, যদি উজানের পানি দ্রুত নদীপথে ভাটির দিকে চলে যেতে পারত। কিন্তু বছরের পর বছর উজান থেকে আসা প্রচুর পরিমাণ পলি ও বালি এসে নদীর তলদেশে জমা হয়েছে। ফলে নদীর পানিধারণক্ষমতা কমে গেছে। নদীর নাব্যতা বা পানিপ্রবাহ বাড়াতে হলে নদীর তলদেশে জমা হওয়া এসব ক্ষতিকর মেদ-চর্বি সরাতে হবে। একটা সহজ সমাধান হতে পারে নিয়মিত নদ–নদী খনন করা। যঁারা নদী কিংবা পানি বিশেষজ্ঞ, তাঁদের কাছে নানা সমাধান থাকতে পারে। আমি সহজ কথায় যেটা বুঝি, নদীকে তাজা রাখতে হলে নদী খনন করতে হবে। তবে প্রকল্প বানিয়ে নয়, এটা করতে হবে নিয়মিতভাবে এবং সারা বছর ধরে। এ জন্য দরকার বিশাল আয়োজন।
আমাদের অনেক নদী, কোনোটা বড়, কোনোটা ছোট। তাই ছোট-বড় অনেক খননযন্ত্র বা ড্রেজার দরকার। দরকার ড্রেজারগুলো সারা বছর ধরে কার্যকরভাবে সক্ষম রাখা। সে জন্য ড্রেজারের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কাজটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমরা কালেভদ্রে ড্রেজার আমদানি করে থাকি। এ দেশে অতীতে ড্রেজার কেনা হয়েছিল ১৯৫৩ সালে। তারপর ১৯৭৮-৭৯ সালে। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারেরর শেষ লগ্নে এসে আবার ড্রেজার কেনা হয়। এখন নতুন করে ড্রেজার কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। ড্রেজার সরবরাহে ঠিকাদারি নিয়ে তদবির চলেছে। জনমনে একটা ধারণা আছে, ড্রেজার রাখা আর হাতি পোষা একই রকম। খোরাকি অর্থাৎ ডিজেল জোগাতে হিমশিম খেতে হয়। তেল আবার সবটা ইঞ্জিনে পৌঁছায় না। কেমন করে জানি না, এর অর্ধেকটাই কর্পূরের মতো উড়ে যায়। একেবারেই ভৌতিক ব্যাপার।
আমাদের নদী খননের চাহিদা মেটাতে হলে নিজেদেরই একটা ড্রেজার কারখানা বানানো দরকার। জয়দেবপুরে একটা মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি আছে। চীনারা এটা বানাতে সাহায্য করেছিল। দরকার হলে এ ধরনের কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে ড্রেজার তৈরির একটা বড়সড় কারখানা বানানো দরকার, যেখানে নানা আকারের ড্রেজার তৈরি ও মেরামত করা যাবে। এটা করতে পারলে সম্পদের অনেক সাশ্রয় হবে।
ড্রেজার আমদানির ব্যাপারে অনেকেরই নানান রকম আগ্রহ। মন্দ লোকে নানান কথা বলে। দেশে কারখানা হলে আমদানির নামে যেসব কর্মকাণ্ড হয়, তা বন্ধ হবে। বন্ধ হবে লোকের মুখও। ড্রেজার আমদানি নিয়ে কী রকম তেলেসমাতি কাণ্ড হয়, তার একটা নমুনা পাওয়া যায় সাবেক অর্থমন্ত্রী অধ্যাপক এ আর মল্লিকের স্মৃতিকথায় (আমার জীবন কথা ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, আগামী প্রকাশনী)।
১৯৭৪ সালের অক্টোবরে তাজউদ্দীন আহমদ পদত্যাগ করলে অধ্যাপক মল্লিককে অর্থমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। একদিন তাঁর কাছে অনুরোধ এল একটা নথিতে সই দিতে হবে। বন্যানিয়ন্ত্রণ ও সেচ মন্ত্রণালয়ের আসফউদ্দৌলাসহ কয়েকজন কর্মকর্তা ব্রাসেলস গেছেন ড্রেজার কিনতে। সেখান থেকে টেলিগ্রাম এসেছে ড্রেজার কেনার জন্য অবিলম্বে টাকা পাঠাতে হবে। দরদাম করে ড্রেজার বুক করা পর্যন্ত হয়ে গেছে।
সে সময় সরকার অর্থসংকটে ছিল। অর্থমন্ত্রী এ আর মল্লিক তাঁর অনুমতি ছাড়া কোনো টাকা না দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দিলেন। বঙ্গবন্ধু তখন রাষ্ট্রপতি। তিনি ঢাকার বাইরে কক্সবাজারে। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বললেন, কর্মকর্তাদের যে দলটি ব্রাসেলস গেছে, তারা পানিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত ও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করেই গেছে। ড্রেজারের টাকা আসবে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে। টাকা আসতে দেরি হচ্ছে। এখন অর্থ মন্ত্রণালয় টাকা ছাড় করলে পরে তা স্থানান্তর করা হবে। অর্থমন্ত্রী এ আর মল্লিক টাকা দিতে অপারগতা জানালেন। উপরাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল বললেন, ঠিক আছে, আপনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলুন। তিনি কক্সবাজারে টেলিফোন সংযোগ করিয়ে দিলেন। অর্থমন্ত্রী এ আর মল্লিকের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কথোপকথন ছিল এ রকম:
‘মল্লিক: ব্রাসেলসে যে দলটি ড্রেজারের জন্য গেছে, সেই দল এবং মন্ত্রী সেরনিয়াবাত নাকি আপনার সঙ্গে দেখা করে ড্রেজার কেনার অনুমতি নিয়েছেন। এটা কি সত্য?
বঙ্গবন্ধু: তারা আমার সঙ্গে দেখা করেছে সত্য, তবে আমি তাদেরকে ড্রেজার কেনার কোনো কথা বলিনি।
মল্লিক: বঙ্গবন্ধু, আপনি আমাকে বলেছেন যে দেশের লোকে যেন আর না খেয়ে না মরে। আমি সে চেষ্টা করছি। আর্থিক সংকটের কথা বিবেচনা করে এখন ড্রেজার ক্রয় বাবদ টাকা দিতে পারছি না।
বঙ্গবন্ধু: না, না, টাকা দেবেন না। ইট্স ক্লিয়ার ফ্রম মাই সাইড যে আমি কাউকে ড্রেজার কিনতে বলিনি, বুঝলেন? দু–এক দিনের মধ্যে আমি আসছি, তখন কথা হবে।...ড. সাহেব, একটা নির্দেশ আছে। যারা ব্রাসেলসে গেছে তাদের সবাইকে অ্যারেস্ট করতে হবে অ্যাজ সুন অ্যাজ দে গেট ডাউন অ্যাট দি এয়ারপোর্ট।
মল্লিক: কেন?
বঙ্গবন্ধু: তারা অন্যায় কাজ কেমন করে করল? আর আমার নাম দিল যে আমি কিনতে বলেছি? তাদের অ্যারেস্ট করা হবে এবং তাদের কাছে কৈফিয়ত চাওয়া হবে।’ (আমার জীবন কথা ও বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম, আগামী প্রকাশনী)
ব্যাপারটার এখানেই ইতি। তাঁদের কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। মিটমাট হয়ে গিয়েছিল। তবে বোঝা যায়, বঙ্গবন্ধুকে অন্ধকারে রেখে কিংবা ভুল বুঝিয়ে দেশের স্বার্থবিরোধী অনেক কাজ হয়েছে। অধ্যাপক এ আর মল্লিকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সম্পর্কের ভিত্তি ছিল পরস্পরের প্রতি সম্মানবোধ। মল্লিকের ব্যক্তিত্ব ও যুক্তি এই ক্ষেত্রে কার্যকর হয়েছিল। মন্ত্রিসভায় চাটুকার ও ব্যক্তিত্বহীন লোকের অভাব ছিল না। সঠিক তথ্যটি পেলে বঙ্গবন্ধু যে অন্যায় আবদার সব সময় মেনে নিতেন না, এটাও সত্য।
আমাদের দেশে সরকারি খাতে ড্রেজার আছে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মালিকানায়। ড্রেজারের সংখ্যা কয়টি, এগুলোর মধ্যে কয়টি চালু, কয়টি নষ্ট, কয়টি কাগজে-কলমে নষ্ট এবং বাস্তবে বিভিন্ন প্রাইভেট পার্টিকে গোপনে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে, কী পরিমাণ মাটি কাটা হচ্ছে এবং কী পরিমাণ তেল পুড়ছে, আমাদের কাছে তার হিসাব নেই। মন্ত্রণালয়ের কর্তারা এটা বলতে পারবেন। তবে এটা যে একটা ‘ধূসর এলাকা’, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
নদীগুলো আমাদের সম্পদ। নদী বাঁচাতে হবে। সে জন্য নদীর দেখভাল করতে হবে। নদ–নদী খননের জন্য দরকার মহাপরিকল্পনা। সঙ্গে সঙ্গে এও দেখতে হবে, লাভের গুড় যেন পিঁপড়ায় খেয়ে না ফেলে। এ বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী ও কর্মকর্তারা যে খুব চিন্তিত, তা মনে হয় না। গণমাধ্যমে প্রায়শ ভয়াবহ খবর ছাপা হচ্ছে। আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ছে। দেশের টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। প্রকল্প মানেই কামধেনু। তার ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে ধান্দাবাজেরা। এর কি শেষ নেই?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক-গবেষক।
mohi2005@gmail.com