বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ

নিখোঁজ ও গুম এবং জঙ্গিবাদ মোকাবিলা

‘তোমাকেই খুঁজছে বাংলাদেশ’ বলে যাঁদের একসময় খোঁজা হয়েছিল, এখন তাঁদের আর খোঁজার দরকার হচ্ছে না, তাঁদের কেউ কেউ দূরদেশ থেকে বাংলাদেশকে খুঁজছে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে। আর অন্যদিকে এখন বাংলাদেশে নিখোঁজ তরুণদের অনুসন্ধানের জাতীয় প্রয়াস শুরু হয়েছে। গুলশানের হলি আর্টিজান ক্যাফে ও শোলাকিয়ায় জঙ্গি হামলায় জড়িত তরুণেরা অনেক দিন ধরেই পরিবার-পরিজনদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন ও নিখোঁজ থাকার প্রেক্ষাপটে এখন সারা দেশে জঙ্গিবাদ মোকাবিলাবিষয়ক আলোচনার একটি অন্যতম বিষয় হচ্ছেন নিখোঁজ তরুণেরা। ইতিমধ্যে ১০ জন নিখোঁজ তরুণের সন্ধান চেয়ে তাঁদের বাড়ি ফেরার জন্য আকুতি জানিয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে আবেদন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। গণমাধ্যমের খবরে এ–ও জানা গেছে যে শ খানেক তরুণ এখন নিখোঁজ; তাঁদের পরিবার এবং দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, গোয়েন্দা বাহিনী কারও কাছেই এঁদের কোনো হদিস নেই। এই সংখ্যা অনুমানভিত্তিক, বেশি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। সরকারের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়েছে তরুণ সন্তান হারিয়ে গিয়ে থাকলে পুলিশের কাছে জানাতে।
কিছু তরুণের নিখোঁজ হওয়া এবং জঙ্গি হিসেবে প্রত্যাবর্তন নিশ্চয় উদ্বেগের বিষয়। গুলশান ও শোলাকিয়ায় হামলায় নিহত ব্যক্তিদের অনেকে যে অনেক দিন কোথায় ছিলেন তা আমরা জানি না, কিন্তু তাঁদের সর্বশেষ কার্যকলাপে প্রমাণিত যে তাঁরা এই সময়ে সন্ত্রাস ও খুনের প্রশিক্ষণ লাভ করেছেন। প্রশিক্ষণ ছাড়া এ ধরনের হামলা চালানো যে সম্ভব নয়, আশা করি তা সবাই বুঝতে পারেন। এই প্রশিক্ষণ কোথায় হয়েছে, কীভাবে হয়েছে সেই তথ্য জানার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাঁদের পথরেখা খুঁজে বের করা। নিহত জঙ্গিদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানের কারণে এটি অনুমান করা অবাস্তব কল্পনা নয় যে তাঁরা চাইলেই দেশের বাইরে যেতে পারতেন। এখন যে ১০ জনের অনুসন্ধানে পরিবারের আকুতি প্রকাশিত হয়েছে, তাঁদের মধ্যে অন্তত চারজন যে দেশের বাইরে গিয়েছিলেন এবং বিভিন্ন দেশে অবস্থান করেছেন, সেটাও আমরা অবগত। এঁদের একজন আইএসের সদস্য অভিযোগে আটক হয়েছিলেন এবং জামিন লাভ করার পরে নিখোঁজ হন।
একজনকে আইএসের ম্যাগাজিন দাবিক-এ বাংলাদেশে আইএসের ‘আমির’ বলে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছিল। একজন নিজের নাম ও ধর্ম দুই-ই বদল করেছেন। নিখোঁজদের অনুসন্ধান নিয়ে যেসব আলোচনা হচ্ছে, সেখানে এই তথ্যগুলোকে এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। ফলে দেশের জঙ্গিদের বিদেশি যোগাযোগ নেই—এ দাবি বহাল রেখে এই আলোচনা সম্পূর্ণ হবে না। তবে আমাদের এই আশঙ্কাকেও বিবেচনায় নিতে হবে যে এই প্রশিক্ষণ দেশের অভ্যন্তরেও হতে পারে। সেটি আমার বিবেচনায় কোনো অর্থেই কম উদ্বেগের বিষয় নয়, সম্ভবত বেশি বলেই মেনে নেওয়া উচিত। কেননা, এ ধরনের প্রশিক্ষণকেন্দ্র যদি দেশের ভেতরেই থাকে, তবে সেখানে আরও অনেক জঙ্গি প্রশিক্ষণ লাভ করেছে এবং করছে বলেই ধরে নিতে হবে।
এখন সরকার ও অন্যরা নিখোঁজ তরুণদের বিষয়ে পরিবারকে বলছেন পুলিশের শরণাপন্ন হতে। কিন্তু প্রশ্ন উঠতেই পারে যে এ যাবৎ নিখোঁজ হওয়া সব তরুণের সন্ধান না করে কী করে কেবল ‘সম্ভাব্য জঙ্গি তরুণদের’ অনুসন্ধান করা যাবে? অনেকের মনে থাকবে যে ২০১৫ সালের ৩০ আগস্টে ঢাকা প্রেসক্লাবে গুম বা অপহরণের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস পালনের জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হয়নি। ২০১৪ সালে গুম ও অপহরণের বিরুদ্ধে ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামের একটি সংগঠনের উদ্যোগে সংসদ ভবনের সামনে মানববন্ধন করতে বাধা দিয়েছিল পুলিশ। এসব সমাবেশের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ। অভিযোগ আছে, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মোট ২৫৮ জন ‘গুম’ হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ৩৭ জনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, ১০৫ জনকে নিখোঁজ হওয়ার অনেক দিন পর বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং ১১৬ জনের অবস্থা এখনো অজানা।
এসব নিখোঁজ হওয়া মানুষের সন্ধানে পরিবারের লোকেরা পুলিশের বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শরণাপন্ন হননি এমন বলা যাবে না। আমি অনুমান করতে পারি, অনেকেই বলবেন যে ‘গুম’ হওয়ার সঙ্গে ‘নিখোঁজ’ হওয়ার বিষয় গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না। আমি যদিও সেই যুক্তিতে আস্থা রাখি না। তারপরও যদি আমরা তর্কের খাতিরে সেটা মানতেই চাই, তাহলে প্রশ্ন, এই পার্থক্য কে করবেন? কে হিসাব দেবেন পরিবারের কাছে যাঁরা ‘গুম’ এবং সরকারের কাছে যাঁরা ‘নিখোঁজ’ তাঁরা কোথায় এবং তাঁদেরও এখন সন্ধানের তালিকায় আনা হবে কি না? প্রশ্নটা তোলার কারণ হচ্ছে, ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইতালীয় নাগরিক সিজার তাবেলা হত্যার পর পুলিশ যাঁদের আটক করেছিল, তাঁদের কারও কারও পরিবার এই অভিযোগ করেছিলেন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আটক করার বেশ কয়েক দিন পরে পুলিশের পক্ষ থেকে স্বীকার করা হয়েছে।
এই কয়েক দিন কি তাঁরা নিখোঁজ ছিলেন, না গুম? পুলিশের পক্ষ থেকে তাঁদের পরিবার সাহায্য পেয়েছে কি না, সেটা সাংবাদিকেরা খোঁজ নিতে পারেন। নিখোঁজ হলে এবং তা পুলিশকে জানালে যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি তার প্রমাণও রয়েছে। নিহত জঙ্গি রোহানের বাবা ইমতিয়াজ খান বাবুল অভিযোগ করে বলছেন, তিনি সন্তানের খোঁজ পেতে বারবার থানায় গেছেন। কোনো সাড়া মেলেনি। এ প্রসঙ্গে আর্টিজান ক্যাফেতে হামলার পরে ‘উদ্ধারকৃত’ এবং পরে ‘নিখোঁজ’ হয়ে যাওয়া হাসনাত করিম ও তাহমিদ খানের কথাও স্মরণ করতে হবে। পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের পরে ছেড়ে দিয়েছে বলে দাবি করেছে, কিন্তু পরিবার বলছে তাঁদের খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আর্টিজান ক্যাফেতে হামলার ঘটনায় করা মামলায় এঁদের নাম নেই। এ ধরনের পরিস্থিতি কোনো পরিবারের মধ্যে পুলিশের ব্যাপারে আস্থা তৈরি করতে সাহায্য করবে বলে কি কেউ মনে করেন?
আস্থার প্রশ্নটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, সাধারণ মানুষের আস্থা ও সহযোগিতা ছাড়া যে জঙ্গিবাদ মোকাবিলার কোনো উপায় নেই সেটা সবাই জানেন, সরকারের উচ্চমহলের কথাবার্তায় স্পষ্ট। কিন্তু তাঁদের কার্যক্রমে সেটা এখনো স্পষ্ট নয়। নিহত দুই জঙ্গির পিতা এবং পরিবারের সদস্যদের আটকের ঘটনা কথা ও কাজের এই অসংগতিকেই তুলে ধরেছে। এর দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া হবে বলেই ধারণা করা যায়। প্রথমত, দরিদ্র ও ধনী পরিবারের মধ্যে পার্থক্য করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে পরিবারই অভিযুক্ত হয়ে পড়ছে। তদন্তের জন্য পরিবারের সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজনকে অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সে ক্ষেত্রে গ্রামের দরিদ্র পরিবার, যাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি বা বিত্তের অভাব, তাঁদের যদি হেনস্তার শিকার হতে হয় তবে তা পুলিশকে সাহায্য করতে উৎসাহী করবে না।
তাহলে যাঁরা নিখোঁজ তাঁদের অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়ার উপায় কী? এ বিষয়ে সরকার যদি আন্তরিক হয়, তবে একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করাই হবে এখন প্রথম পদক্ষেপ। উচ্চ আদালতের একজন বিচারকের নেতৃত্বে একটি কমিশন যারা পরিবার বা অন্যদের দেওয়া তথ্য সংগ্রহ করবে, পরিবারগুলোর সব ধরনের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদান করবে এবং পরিবারের সদস্যদের যেকোনো ধরনের হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করবে। এই ব্যক্তিদের খোঁজার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে, কমিশনের কাছে তার জবাবদিহির ব্যবস্থা রাখতে হবে। তালিকা তৈরিই যেন শেষ কাজে পরিণত না হয়। শুধু তা-ই নয়, এই কমিশনের হাতে এই ক্ষমতাও দেওয়া দরকার, যাতে করে তারা কারা ‘গুম’ হয়েছেন আর কারা ‘নিখোঁজ’ হয়েছেন তা শনাক্ত করতে পারে। আর এর জন্য দরকার হবে সেই ক্ষমতা, যা ব্যবহার করে তারা নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে যদি কেউ ‘অলিখিতভাবে আটক’ থাকেন তাঁদের বিষয়েও পদক্ষেপ নিতে পারবে। কমিশন গঠনের প্রস্তাব মানে আরেকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান তৈরির আহ্বান নয়। এই কমিশনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে।
আমাদের আরও দুটি বিষয় মনে রাখতে হবে। প্রথমত, এই তরুণদের খুঁজে বের করা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এতে করেই জঙ্গিবাদ শেষ হয়ে যাবে, এমন ভাববার কোনো কারণ নেই। গত বছরগুলোতে হারিয়ে যাওয়া তরুণদের খুঁজতে খুঁজতে যে আরও অনেকে সেই পথেই পা বাড়াবেন না তার নিশ্চয়তা কোথায়? এই পদক্ষেপের ওপরে জোর দিতে গিয়ে যেন মনে না হয়, এটাই প্রধান এবং একমাত্র কাজ। কাউন্টার টেররিজম কৌশলের ক্ষেত্রে এটি একটি উপাদান, কিন্তু এটা একমাত্র উপাদান মনে করলে সামনে বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। দ্বিতীয়ত, একটি দেশে যদি মানুষ ‘উধাও’ হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি বহাল থাকে এবং সে বিষয়ে রাষ্ট্র ও সরকার দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করে, সেখানে জঙ্গিগোষ্ঠীগুলো তার সুযোগ নেবে, এতে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। সেই অবস্থার অবসান ঘটানো যেতে পারে কেবল রাজনৈতিকভাবে। রাজনীতির সেই সিদ্ধান্তও কাউন্টার টেররিজম কৌশলের অংশ হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। কার্যকরভাবে জঙ্গিবাদ মোকাবিলা করতে চাইলে এ নিয়ে দেরি করার সুযোগ নেই।
আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক।