দুর্যোগ

পাহাড় ধ্বংসের রাজনৈতিক অর্থনীতি

পাহাড়ে এত বড় দুর্যোগের কারণ কি কেবল প্রাকৃতিক?
পাহাড়ে এত বড় দুর্যোগের কারণ কি কেবল প্রাকৃতিক?

২০১৭-এর জুন মাসজুড়ে পাহাড়ধসে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও চট্টগ্রাম জেলায় নিহত হয়েছে ১৬০ জনেরও বেশি মানুষ। এর মধ্যে কেবল রাঙামাটিতেই নিহত হয়েছে ১২০ জন (ডেইলি  স্টার, ৫ আগস্ট ২০১৭)। নিহত ব্যক্তিদের তালিকায় বসবাসরত পাহাড়ি ও বাঙালি এবং উদ্ধারকাজে যুক্ত চারজন সেনাসদস্যও রয়েছেন। আহত হয়েছে ৫০০-এরও বেশি মানুষ। ক্ষতিগ্রস্ত, সাময়িক উদ্বাস্তু ও গৃহহারা হয়েছে পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ। ভয়াবহ ওই পাহাড়ধসের ঘটনায় তিন পার্বত্য জেলার সঙ্গে সারা দেশের সড়ক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ-সংযোগ বেশ কিছুদিন বিচ্ছিন্ন ছিল।

এত বড় দুর্যোগের কারণ কি কেবল প্রাকৃতিক? না, এটি বহুলাংশে মনুষ্যসৃষ্ট বিপর্যয় এবং এর পেছনে আছে ‘শাসকশ্রেণি ও অধিপতি গোষ্ঠীর মতাদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি’ এবং ‘জনমিতিক রাজনীতি’ আর আছে পাহাড় দখল ও হাতবণ্টনের রমরমা ব্যবসা। প্রতিপত্তি ও আধিপত্য, অর্থ ও পেশিশক্তি, লোভ ও অতি-লাভের আকাঙ্ক্ষার মধ্য দিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে যে ক্ষমতাকাঠামো তৈরি হয়েছে, তার ভেতরেই রয়েছে ‘পাহাড়ধস’ ও ‘পাহাড় ধ্বংসে’র রাজনৈতিক অর্থনীতি।

পাহাড়ধসের কারণ হলো: এক. পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বসবাস গড়ে তোলা ও পাহাড় কেটে আবাসন প্রকল্প ও সরকারি-বেসরকারি অফিস নির্মাণ; দুই. বন ধ্বংস এবং পরিকল্পিত বনায়নের অভাব; পাহাড়ের গাছ কেটে ভারসাম্য নষ্ট করা এবং পাহাড়ের ওপর যেসব গাছ লাগালে পাহাড়ধস হয় না, সেসব গাছ না লাগিয়ে বেশি লাভের আশায় কেবল সেগুনগাছ লাগানো; তিন. পাহাড়ে বালুর পরিমাণ বেশি থাকা এবং ভারী বা অতিবর্ষণ এবং ভারী বর্ষণে পাহাড় থেকে নেমে আসা বালু ও মাটি অপসারণে দুর্বলতা; চার. গেল ৩০ বছরে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ৮ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং পাহাড় থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকা; পাঁচ. অপরিকল্পিত  জুমচাষে আগাছানাশক ওষুধ ব্যবহার করায় পাহাড়ের মাটি দুর্বল হয়ে যাওয়া।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের ট্রাস্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিস (সিইজিআইএস) ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ওয়াটার এইড বাংলাদেশের একটি যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, ‘গত এক যুগে তিন পার্বত্য জেলায় বিভিন্ন ধরনের বনভূমি কমেছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৩৬ হেক্টর।’

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বিভাগে পাহাড়ধসের জন্য বনভূমি ধ্বংস হওয়া বা কমে যাওয়াই প্রধানত দায়ী। ২০০৩ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলায় ২৭ দশমিক ৫২ শতাংশ প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়েছে। এ ছাড়া ৬১ শতাংশ পাহাড়ি ঝরনা শুকিয়ে গেছে। এর ফলে পাহাড়ের মাটির বুনন নষ্ট হয়ে ক্রমাগত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। এতে পাহাড়গুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।’ (প্রথম  আলো, ১৭-১৮ জুন ২০১৭)

বন কেটে পাহাড়কে নাজুক করা হয়েছে। ভূমিখোর আর বনখেকোরা নদী-বন-খালবিল-গ্রাম-জনপদ-কৃষিজমি সব সাবাড় করে দিচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নানাভাবে পাহাড় ইজারা দেওয়া হচ্ছে। কলা বাগান, রাবার বাগান মুরগি চাষের জন্য লিজ দেওয়া হচ্ছে। ইজারাপ্রাপ্ত বিত্তবান ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা চুক্তির শর্ত না মেনে বাড়িঘর নির্মাণসহ নানা স্থাপনা তৈরি করছেন। এ পর্যন্ত বান্দরবান সদর, লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় প্রায় ৪০ হাজার ৭৭ একর জমি রাবার প্লট ও হর্টিকালচার প্লটের জন্য ইজারা দেওয়া হয়েছে।

গত ছয় বছরে পাহাড়ধসে যত মানুষ মারা গেছে, তার ৬৪ শতাংশ বাঙালি (প্রথম  আলো, ১৬ জুন, ২০১৭)। জেনারেল জিয়াউর রহমানের আমলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র ও অসহায় প্রায় চার লাখ বাঙালিকে পার্বত্য জেলায় কয়েকটি গুচ্ছগ্রাম করে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। নদীভাঙন ও হতদরিদ্র এলাকার ওই সব মানুষের জীবন-জীবিকার জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়নি।

তখন থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে বাঙালিদের বিভিন্ন কায়দায় পাহাড়ে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের সেখানে বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এর বাইরে আসতে শুরু করে রোহিঙ্গা শরণার্থী, তিন পাহাড়ে এদের সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজার।

পাহাড়ে বসবাসের একটি বিজ্ঞান আছে, একটি সংস্কৃতি আছে, পাহাড়ের সঙ্গে আত্মিক বোঝাপড়ার বিষয় আছে। পাহাড়ে বসবাসের জন্য দীর্ঘ অভিজ্ঞতাজাত যে লোকজ জ্ঞান জরুরি, সমতলের বাঙালিদের তা নেই। তারা পাহাড়ের পাদদেশে বাড়িঘর নির্মাণ করে এবং ভারসাম্যবিন্দুর অবস্থান না বুঝে পাহাড়কে কেটে ফেলে। অন্যদিকে পাহাড়িরা ঘর করে পাহাড়ের শীর্ষে বা গায়ে, বাড়িগুলো হয় বাঁশের মাচাং ঘর। মেঝে থাকে মাটি থেকে উঁচুতে, ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিয়ে। পাহাড়ের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে এটি মানানসই।

আদি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে পাহাড়ের বাইরে থেকে আসা বসতি স্থাপনকারীরা ভূমি দখলসহ বিভিন্ন ইস্যুতে বিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। বাঙালিদের ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে পাহাড়িদের ভূমির অধিকারের পার্থক্য রয়েছে। পার্বত্য জেলার তিনটি সার্কেলের আওতায় হেডম্যান ও কারবারিরা এর ব্যবস্থাপনায় কাজ করে থাকেন। কিন্তু গত ৩০ বছরে এই পার্বত্য পাড়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ভূমির পরিমাণ ৫১ শতাংশ কমে গেছে। গত ৬৪ বছরে সমতলের ১০টি ক্ষুদ্র নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর ২ লাখ ২ হাজার ১৬৪ একর জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। (২৬ জুন ২০১৭, ডয়চেভেলে)

সরকারি বনায়ন, ভূমি জরিপ ও খাস সম্পত্তি বণ্টনের অব্যবস্থাপনা; ন্যাশনাল পার্ক বা জাতীয় উদ্যান তৈরি; ট্যুরিস্ট সেন্টার ও ইকো পার্ক স্থাপন; তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ এবং বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন, শত্রু সম্পত্তি আইনের অপব্যবহার, ভুয়া জমির দলিল তৈরি, গুজব ছড়িয়ে সংঘাত সৃষ্টি ও দাঙ্গা বাধানো, জোর-জবরদস্তি করে ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ, ভয় দেখানো, আবাসন কোম্পানি বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান তৈরির জন্য বেশি টাকার লোভ দেখিয়ে পাহাড়িদের জমি কেনাসহ নানাভাবে উচ্ছেদ করা হচ্ছে। পার্বত্য  চট্টগ্রামে ১৯৬০ সালে পাহাড়ি-বাঙালি অনুপাত ছিল ৯১:৯, ১৯৮০ সালে হয় ৫৯:৪১, ২০১১ সালে আদমশুমারি অনুযায়ী এ অনুপাত পৌঁছায় ৫১:৪৯-এ। পাহাড়িরা হারিয়েছে ভূমি, বনাঞ্চল আর একশ্রেণির বাঙালি আমলা প্রশাসনের যোগসাজশে তা দখল করেছে।

পাহাড়ধস ঠেকাতে এবং পাহাড়িদের ভূমি অধিকার রক্ষায় যেসব বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া উচিত, তা হলো: এক. পাহাড়ে নতুন করে বাঙালি বসতি বন্ধ করা; দুই. পাহাড় জবরদখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া ও অবৈধভাবে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া; তিন. পাহাড় ইজারা দেওয়া বন্ধ করা; চার. পাহাড়ে জরুরি ভিত্তিতে বনায়ন করা; পাঁচ. ঢালু পাহাড়ে গাইড ওয়াল নির্মাণ করা এবং নিষ্কাশন ড্রেন ও মজবুত সীমানাপ্রাচীর তৈরি করা; ছয়. পাহাড়ের পানি ও বালু অপসারণের ব্যবস্থা করা; সাত. এলাকায় ১০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটার অনুমোদন না দেওয়া এবং ৫ কিলোমিটারের মধ্যে নতুন হাউজিং স্থাপন নিষিদ্ধ করা; আট. যততত্র পাহাড়ি বালু উত্তোলন নিষিদ্ধ করা; নয়. ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসতি স্থাপন নিষিদ্ধ করা; দশ. যেসব পাহাড় খাড়া অবস্থায় আছে, সেসব পাহাড়ে স্বাভাবিক বনায়ন সম্ভব না হলে মূলিবাঁশ রোপণ করা; এগারো. নির্বিচারে পাহাড়ের গাছ কাটা বন্ধ করা; বারো. পাহাড়ের জনজীবন-বসতি-জীববৈচিত্র্য ও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিবেশবান্ধব কৌশল গ্রহণ; তেরো. পাহাড়ে অবস্থানরত বাঙালিদের পার্বত্যবান্ধব উপায়ে বসতি স্থাপন এবং চাষাবাদের কৌশল রপ্ত করানো; চৌদ্দ. জুমচাষ প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কি না, তা খতিয়ে দেখা, জুমচাষ ÿক্ষতিকর হলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত চাষিদের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা এবং পাহাড়ধস বন্ধে একটি সমন্বিত স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ।

রোবায়েত ফেরদৌস: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

robaet.ferdous@gmail.com