মতামত

প্রশিক্ষিত ডায়েটিসিয়ান ছাড়া সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জন কি সম্ভব?

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হলেও এই খাতে ‘দক্ষ মানবসম্পদের’ অভাব স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুতর ও জটিল প্রতিবন্ধকতা। আজও বাংলাদেশে স্বাস্থ্যসেবা খাতে দক্ষ চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফের সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পেশা হসপিটাল ডায়েটিসিয়ান। কিন্তু এ পেশা  স্বাস্থ্য খাতের কোনো আলোচনায় বা অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। যেখানে চিকিৎসক এবং দন্তচিকিৎসক, ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল’ কর্তৃক এবং নার্স ও মিডওয়াইফরা বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিল কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত, সেখানে হসপিটাল ডায়েটিসিয়ানদের জন্য কোনো শিক্ষা বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেই। সংক্রামক ব্যাধির চেয়ে অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস ও ক্যানসারে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে মৃত্যু বেড়েছে। এ সব রোগব্যাধি রোধে হসপিটাল ডায়েটিসিয়ানরা ভূমিকা রাখতে পারেন। বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধিতে ৬৭ শতাংশের মৃত্যু ঘটে। ক্রমবর্ধমান চাহিদার কারণে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের হাসপাতালে স্নাতক বা স্নাকত্তোর ডিগ্রিধারী পুষ্টিবিদ নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুপস্থিতি তাদের হসপিটাল ডায়েটিসিয়ান হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে উঠেছে। অথচ এ সব পুষ্টিবিদকে রোগীদের, এমনকি দীর্ঘ মেয়াদে ভুগছে এমন রোগীদের পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে।
ডায়েট (diet) শব্দটি লাতিন ডায়েটা (diaeta)  থেকে এসেছে, যার অর্থ জীবনের প্রকৃতি। এই অর্থটি প্রথম শতাব্দী পর্যন্ত বর্তমানের চেয়ে ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হতো। চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক হিপোক্রেটিসের মতে, ‘তোমার খাবারই তোমার ওষুধ, তোমার ওষুধই তোমার খাবার।’ এখানে রোগের চিকিৎসায় খাদ্যের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে এই পেশা স্বীকৃতি পায়নি, তবু প্রাচীন গ্রিকে ডায়েটিককে চিকিৎসাবিজ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে গণ্য করে রোগীদের খাদ্যাভ্যাসকে চিকিৎসা হিসেবে প্রদান করা হতো।

মানুষের সুস্বাস্থ্য ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আমেরিকান ডায়েটিক অ্যাসোসিয়েশন সম্প্রতি খাদ্য, পুষ্টি, যোগাযোগ, ব্যবস্থাপনা, শারীরিক, গঠনতান্ত্রিক ও আচরণ-সম্পর্কিত বিষয়াদির সঙ্গে সমন্বিতভাবে ডায়েটিসিয়ান পেশা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছে।
নার্সিং পেশার জননী ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলকে (১৮২০-১৯১০) প্রথমে একটি হাসপাতালের ডায়েটিসিয়ান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। ক্রিমিয়া যুদ্ধের সময় অল্প কজন নার্সের সঙ্গে স্কুটারির একটি সেনা ব্যারাকে আগমন করেছিলেন। তাঁরা লক্ষ করেন রোগীরা আশাহীন, বিভ্রান্ত ও প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত, অথচ খাবারের সরবরাহ নেই। তিনি আসার সময় তার সঙ্গে যে খাবার নিয়ে এসেছিলেন, তা দিয়ে রোগীদের জন্য বিশেষ খাবার রান্না করেন। এক সপ্তাহের মধ্যে তিনি রোগীদের বিশেষ খাবার তৈরির জন্য একটি রান্নাঘর প্রস্তুত করেন। তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা দিয়ে তিনি একটি বিশেষ খাবারের বিভাগ স্থাপন করেন। তিনি চিকিৎসাব্যবস্থার সঙ্গে খাবার ব্যবস্থাপনার একটি কর্মী বাহিনী গড়ে তোলেন এবং সৈনিকদের খাদ্য ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি পরিবর্তন ও উন্নত করেন।

অ্যালেক্স সয়ার (১৮০৯-১৮৫৮) নামের একজন বিখ্যাত পাচক ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করেন। ক্রিমিয়ায় যাওয়ার পর দেখতে পান যে তিনি সেনাবাহিনীর প্রথম ডায়েটিসিয়ান। তিনি ডায়েটিসিয়ান পেশাকে এগিয়ে আনার জন্য ফ্লোরেন্স নাইটিংগেলকে স্বীকৃতি প্রদান করেন। তিনি সৈনিকদের সুস্বাদু খাবার তৈরির প্রশিক্ষণ দেন। লন্ডন ফিরে আসার পর তিনি নাইটিংগেলের অনুরোধে হাসপাতালে রান্না-সম্পর্কিত একটি স্কুল ও বিশেষায়িত রান্নাঘর প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি অসুস্থ সৈনিকদের খাবার তৈরির একটি ম্যানুয়াল লেখেন, যেটি সামরিক হাসপাতাল কর্তৃক গৃহীত হয়।
সয়ার নেতৃত্ব থাকাকালীন ডায়েটিসিয়ান নারীদের একটি পেশা হিসেবে গণ্য হতো। ১৯৩৬ সালে আমেরিকান ডায়েটিসিয়ান অ্যাসোসিয়েশনে প্রথম পুরুষ ডায়েটিসিয়ান অন্তর্ভুক্ত হন। ‘ডায়েটিসিয়ানরা’ প্রশিক্ষিত পেশাদার, যাঁরা পুষ্টির সুফলতা প্রচারসহ চিকিৎসার অনুষঙ্গ হিসেবে পুষ্টি ব্যবস্থাপনাকে কাজে লাগান। তাঁরা দীর্ঘস্থায়ী রোগাক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। উদাহরণস্বরূপ একজন ডায়েটিসিয়ান, যাঁরা ডায়াবেটিকস, হাই কোলেস্টেরল বা স্থূলতায় ভোগা লোকদের অবস্থার উন্নতির জন্য একটি সুষম খাদ্যতালিকা প্রণয়ন করতে পারেন।

ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে পাকিস্তান, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ইতিমধ্যে প্রশিক্ষিত ডায়েটিসিয়ান তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ডায়েটিসিয়ানদের কাজের ব্যবস্থাপনা ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। ফলে ডায়েটিসিয়ানরা সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনো অবর্তমান।

একজন ডায়েটিসিয়ান একজন পুষ্টিবিদ হতে পারেন। অন্যদিকে তিনি একটি স্বাস্থ্যকর জীবনের জন্য সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আলোকপাত এবং অবদান রাখতে পারেন। তাঁরা অসুস্থ (ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপজনিত রোগে ভোগা) ব্যক্তিদের সরাসরি চিকিৎসা দেন। এর পরিবর্তে তাঁরা সুস্থ ব্যক্তিদের, যাঁরা পুষ্টিকর খাবার ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য খাদ্যাভ্যাস তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ডায়েটিসিয়ানরা শক্ত আইনি কাঠামো দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একজন ডায়েটিসিয়ান হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে হলে তাঁকে রাষ্ট্রীয় নির্দিষ্ট বিভাগ থেকে শর্ত পূরণ সাপেক্ষ তা করতে হয়। ক্ষেত্রবিশেষে ডায়েটিসিয়ান হিসেবে পেশা গ্রহণের আগে নির্দিষ্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে লাইসেন্স নিতে হয়। কারণ, ডায়েটিসিয়ানদের কাজের ক্ষেত্রটি চিকিৎসা ও রোগ শনাক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত। অন্যদিকে পুষ্টিবিদেরা কোনো বিধিবদ্ধ আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নন। যে কেউ নিজেকে একজন পুষ্টিবিদ দাবি করতে পারেন।

ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে পাকিস্তান, ভারতসহ দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ইতিমধ্যে প্রশিক্ষিত ডায়েটিসিয়ান তৈরির জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তারা স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতে ডায়েটিসিয়ানদের কাজের ব্যবস্থাপনা ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য আইনি কাঠামো দাঁড় করিয়েছেন। ফলে ডায়েটিসিয়ানরা সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। দুর্ভাগ্যবশত এ ধরনের ব্যবস্থা বাংলাদেশে এখনো অবর্তমান।

যদিও কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ইনস্টিটিউশন অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স এবং হোম ইকোনমিকস দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টি ও ডায়েটের ওপর স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করে আসছে। তথাপি তারা দক্ষ ডায়েটিসিয়ান তৈরির জন্য কোনো একাডেমিক প্রোগ্রাম চালু করে না। ফলে অনেক পুষ্টিবিদ যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়াই হাসপাতালে ক্লিনিক্যাল ডায়াটিসিয়ান হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দুর্বল করছে। এ ছাড়া যেসব রোগীর খাদ্যসম্পর্কিত নির্দেশনা বা পরামর্শ দরকার তারা বঞ্চিত হচ্ছে।

অনেক দেশে পুষ্টি ও ডায়েট প্রথমে একই পাঠ্যসূচির আওতায় পরিচালনা করা হয়। উভয় শাখায় মূল শরীরবিদ্যা ও খাদ্য, অ্যানাটমি ও ফিজিওলজি, জেনেটিকস, মাইক্রোবায়োলজি, খাদ্যবিজ্ঞান ও খাদ্য প্রস্তুত প্রণালি ইত্যাদি দিয়ে শুরু করা হয়। পরবর্তীকালে পুষ্টির ছাত্রদের গভীরভাবে পুষ্টিবিষয়ক, পুষ্টি কর্মসূচি পরিকল্পনা ও মূল্যায়ন, পুষ্টি শিক্ষা ও শরীর পরিচালনার জন্য পুষ্টি ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
পার্থক্য এই যে ডায়েটিসিয়ান শিক্ষার্থীরা বেশি চিকিৎসা-সম্পর্কিত বিষয় অধ্যয়ন করেন। যেমন ক্লিনিক্যাল বায়োকেমিস্ট্রি, মেডিকেল নিউট্রিশন থেরাপি ও থেরাপেটিক ডায়েট প্রিপারেশন। এ ছাড়া ডায়েটিক শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে ক্লিনিক্যাল অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয় এবং তাদের সাধারণত মেডিকেল স্থাপনায় কাজ করতে হয়, যেখানে তারা রোগীদের পুষ্টিগত অবস্থা নির্ণয় এবং রোগ নিরাময়ে অনুকূল খাদ্য গ্রহণসংক্রান্ত পরামর্শ প্রদান করে। কখনো কখনো তাঁরা ফার্মেসি, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিসহ স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য ক্ষেত্রেও কাজ করে থাকেন।

পরিশেষে বাংলাদেশকে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় হসপিটাল ডায়েটিসিয়ান নিয়োগের পদক্ষেপ নিতে হবে। নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অগ্রাধিকার প্রদান করতে প্রশিক্ষিত ডায়েটিসিয়ান তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এটি ছাড়া এ দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা দুর্বল থাকবে এবং কাঙ্ক্ষিত ‘সর্বজনীন স্বাস্থ্য সেবা’ অধরাই থেকে যাবে।

  • ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার বিশ্ব ব্যাংকের সিনিয়র স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ