ছয় বছরের শিশু সানজিদা আক্তার আরেকটি শিশুর সঙ্গে খেলার সময় গতকাল বুধবার দুপুরে রাজধানীর মহাখালীর পয়োনিষ্কাশন নালার পানিতে পড়ে যায়। এর প্রায় ২০ ঘণ্টা পর আজ বৃহস্পতিবার সকালে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরিরা সানজিদার লাশ উদ্ধার করেন। স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, নালায় কোনো ঢাকনা না থাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটেছে।
নালায় ঢাকনা দেওয়া এমন কঠিন কোনো কাজ নয়। মানুষ এর চেয়ে অনেক কঠিন ও দুরূহ কাজ নিমেষে করে ফেলে। এই ঢাকনা না দেওয়ার পেছনের কারণ হচ্ছে স্রেফ গাফিলতি। ২০১২ সালের শেষ দিকে নালাটি তৈরি করে ওয়াসা। সে সময় ওয়াসার পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল ঢাকনা দেওয়া হবে। কিন্তু আজও তা হয়নি। এই নালার পানিতে মানুষ পড়ার ঘটনা যে এই প্রথমবার ঘটল তা নয়। গত দেড় বছরে অন্তত পাঁচজন এই নালায় পড়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উদ্ধার করায় তারা বেঁচেছে। স্থানীয় লোকজন একাধিকবার ওয়াসার কাছে ঢাকনার জন্য দাবি জানিয়েছিলেন, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। ওয়াসা কর্তৃপক্ষের মনে হয়নি যে নালায় ঢাকনা দেওয়া দরকার। কেন এই গাফিলতি? ওয়াসা কর্তৃপক্ষের কাছে প্রশ্ন রাখতে ইচ্ছে করে, মানুষের জীবনের কোনো মূল্য কি আপনাদের কাছে নেই?
ওয়াসার গাফিলতির কারণেই ২০১৪ সালের ২৬ ডিসেম্বর শাহজাহানপুরের রেলওয়ে মাঠসংলগ্ন পানির পাম্পের পরিত্যক্ত পাইপে পড়ে মারা যায় তিন বছরের শিশু জিহাদ। ওই পরিত্যক্ত পাইপের মুখেও কোনো ঢাকনা ছিল না। জিহাদের মৃত্যুতে ওয়াসার টনক নড়েনি। সানজিদার মৃত্যুর পর ওয়াসার কি টনক নড়বে? মনে হয় না নড়বে। ওয়াসার কাছে মনে হতে পারে, এ রকম ছোট ছোট দুর্ঘটনায় এক-দুটি শিশুর মৃত্যু এ আর এমন কী! এভাবে নালায় পড়ে আরও পাঁচ-ছয়টা শিশু মরলে যদি তারা নড়েচড়ে বসে।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকনার জন্য আমরা কি আরও পাঁচ-ছয়টি শিশুর মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করব? রাষ্ট্র এমনকি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে না, যাতে ওয়াসা আজকালের মধ্যে ওই নালায় ঢাকনা লাগিয়ে ফেলে। চাইলেই নিতে পারে। কিন্তু নেওয়া হয় না। কারণ ওই একটাই, গাফিলতি। এটাই নিয়মে পরিণত হয়েছে। কারণ, গাফিলতিকে কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয় না। গাফিলতির জন্য কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তার জন্য কোনো শাস্তি দেওয়ার নজির খুবই কম।
উন্নত দেশগুলোতে এ ধরনের অবহেলা বা গাফিলতির ঘটনায় ক্ষতিপূরণ আইনে মামলা করার ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অনেক নজির রয়েছে। বাংলাদেশেও ক্ষতিপূরণ আইন রয়েছে। কিন্তু সেই আইনে ক্ষতিপূরণ পাওয়ার কোনো নজির নেই বললেই চলে। এখন এ ধরনের নজির সৃষ্টি করার সময় হয়েছে। সরকারের প্রতি অনুরোধ, দায়িত্বে অবহেলাকারীদের কঠোর শাস্তি দিন। অবস্থার পরিবর্তন একদিন ঘটবেই।
রোকেয়া রহমান: সাংবাদিক