
বাংলা সাহিত্যের ধ্রুপদি বইগুলোর বেশির ভাগই আমি পড়িনি। সমকালীন যেসব বইপত্র গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত, সেগুলোর অনেকগুলো আমার পড়া হয়নি। আমার অপঠনের তালিকা দীর্ঘ এবং আঁতকে ওঠার মতো। সেটা কোনো গুরুতর অপরাধ বলে বিবেচিত হওয়ার কথা নয়। কিন্তু সমস্যা হয়েছে, আমি যে বিদ্বৎমহলে চলাফেরা করি, আড্ডা দিই, সেখানে ধরেই নেওয়া হয়, এই বইগুলো সবার পড়া। ফলে যখন ওই ধরনের কোনো বইয়ের প্রসঙ্গ আলোচনায় চলে আসে, আমি একটা গাম্ভীর্যের পর্দা টেনে দিই, ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ি আর ডানে-বাঁয়ে মাথা দোলাই। জনসমক্ষে আমার অপঠনের গোমর সশব্দে ফাঁস করি না, পাছে সেটা আমার উন্নাসিকতা বলে প্রতিভাত হয়।
আমরা যে সমাজে বসবাস করি, ভেবে দেখলে, সেখানে পঠনের একটা অনুচ্চারিত অথচ সর্বসম্মত ঔচিত্যবোধ বিদ্যমান। একটা অদৃশ্য পাঠতালিকা যেন সবার পকেটে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে, একটা চেকলিস্ট। কী বললেন!? অমুক আর তমুক বইটা আপনি পড়েননি!? আরে, আগে বলবেন তো! আপনাকে তো সিরিয়াসলি নিয়ে ফেলেছিলাম, মশাই!
পঠনের এই নাগরিক ঔচিত্যবোধ থেকে স্খলন আমার মধ্যে শুধু যে সামাজিক অনুশোচনার জন্ম দেয়, তা-ই নয়; মাঝে মাঝে বেকায়দা পরিস্থিতিরও সৃষ্টি করে।
আমাদের সমাজে ধরেই নেওয়া হয়, কোনো বই নিয়ে আলোচনায় শামিল হওয়ার ক্ষেত্রে ওই বই পড়া থাকা হচ্ছে প্রধান পূর্বশর্ত। সমাজ কী করে এ রকম একটি ঐকমত্যে উপনীত হয়েছে, আমি জানি না, তবে এটুকু বুঝি, পাঠ না করেও কিছু বইয়ের ব্যাপারে আলোচনায় শামিল হওয়া দুঃসাধ্য নয়। এমনকি উৎকৃষ্ট চর্চা থাকলে অপঠিত বইয়ের ওপর জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতাও দেওয়া সম্ভব, বিশেষত শ্রোতারও যদি বইটা না পড়া থাকে। যত দূর বুঝেছি, শিক্ষকেরা শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের সময় হামেশাই এই কৌশলের আশ্রয় নিয়ে থাকেন।
অতি সম্প্রতি আমার হাতে একটি বই এসেছে। খুব কাজের বই। নাম ‘হাউ টু টক অ্যাবাউট বুকস ইউ হ্যাভন্ট রেড’। লেখক ফরাসি মনস্তত্ত্ববিদ পিয়েরে বায়ার্ড বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছেন, যে বই আপনার পড়াই হয়নি, সেই বই নিয়ে জনসমক্ষে মন্তব্য করতে বাধ্য হতে হলে আপনি কী করবেন। বায়ার্ড বলছেন, যে ভদ্রলোকি সমাজে আমরা বসবাস করছি, তাতে এ রকম বেকায়দা পরিস্থিতিতে আমাদের ঘন ঘনই পড়তে হয়, হবে। কেননা, প্রতিবছর সবার না-পড়া বইয়ের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। চেনাজানা বন্ধুবান্ধব-সহকর্মীরা বই লিখেই চলেছেন। তাঁদের মুখোমুখি হতে হলে বায়ার্ডের বই একটি অবশ্যপাঠ্য। এমনকি, হতে পারে এটাই আপনার পড়া শেষ বই। কেননা, একবার যখন আপনি বই না পড়েও সমাজে দিব্যি মেলামেশা করা শিখে যাবেন, তখন বই পড়ার তোয়াক্কা আর কে করে।
বায়ার্ডের এই বই অবশ্য ‘কী করিলে কী হইবে’ ধরনের ম্যানুয়েল বই নয়। এটা বই এবং বইপাঠ-বিষয়ক এক চমৎকার অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন গ্রন্থ। কিংবা বলা চলে এটার মুখ্য বিষয়বস্তু ‘বই অপাঠ’। এটি শুরুই হচ্ছে এ রকম এক বাক্য দিয়ে: বই না পড়ার সহস্র তরিকা আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে কার্যকর তরিকা হলো বইটি খুলেও না দেখা।
বায়ার্ড বলছেন, বিশ্বজুড়ে ইতিমধ্যে এত বিপুল পরিমাণ বই প্রকাশ হয়ে গেছে, আর এত বিপুল পরিমাণ বই প্রতিদিন প্রকাশ হচ্ছে যে একজন গোগ্রাসে গেলা পাঠকের পক্ষেও বিশ্বময় এই গ্রন্থভান্ডারের কণা পরিমাণও পড়ে শেষ করা সম্ভব নয়। যেকোনো পাঠকের ক্ষেত্রে অপঠিত বইয়ের সংখ্যা এত বিপুল যে দুনিয়ার প্রত্যেক ব্যক্তি আসলে শেষ বিচারে এক-একজন ‘অপাঠক’। পড়ার জন্য একটি বই হাতে তুলে নেওয়া মানেই হলো আরও অসংখ্য বই না পড়ার আশঙ্কার রাজ্যে প্রবেশ করা। বায়ার্ড বলছেন, এতে আফসোসের কারণ নেই। বরং এই সত্য অনুধাবন করা জরুরি যে পৃথিবীতে এমন অনেক বই আছে, যেগুলো না পড়লেই বরং সেগুলোর প্রতি সবচেয়ে সুবিচার করা হবে।
ইতালীয় দার্শনিক ও সাহিত্যিক উমবের্তো একো অবশ্য বলছেন, এমন অনেক বই আছে, যেগুলো আমাদের পড়ার কষ্ট করতে হয় না। সমাজ সামষ্টিকভাবে ওই বইগুলো পড়ে দেয়। সমাজে বইগুলোর প্রসঙ্গ এবং আধেয় এমনভাবে চর্চিত হতে থাকে যে বইগুলো না পড়েও সবাই ভাবতে থাকে সেগুলো পড়া হয়ে গেছে। কার্ল মার্ক্সের ‘ক্যাপিটাল’ সম্ভবত এ রকম একটি গ্রন্থ। এ বছর এটির প্রকাশনার দেড় শ বছর উদ্যাপন হচ্ছে।
জার্মান দার্শনিক শোপেনহাওয়ার তো বই পড়তেই নিষেধ করে দিয়েছিলেন। তাঁর মতে, আমি কারও বই পড়ছি মানেই আমার হয়ে অন্য কেউ চিন্তা করে দিচ্ছে। তার মানে কেউ অনবরত বই পড়তে থাকলে তাঁর মস্তিষ্ক অন্যের চিন্তার ক্ষেত্রে পরিণত হবে, তাতে তাঁর নিজের চিন্তাশক্তি অলস হয়ে পড়বে। নিয়মিত মোটরগাড়ি চড়ে বেড়ালে যেমন মানুষ হাঁটার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।
একদা হুমায়ুন আজাদের চারটি সাক্ষাৎকার বইয়ের একটি রিভিউ পড়েছিলাম এক সাহিত্য ক্রোড়পত্রে। বাংলা সাহিত্যে এ রকম অদ্ভুত পুস্তক সমালোচনা বোধ করি দ্বিতীয়টি লেখা হয়নি। সমালোচক শুরুতেই জানিয়ে দিয়েছেন, বইটি তাঁর পড়া হয়নি। তিনি বইটির প্রচ্ছদ এবং সৌষ্ঠব নিয়ে আলোচনা করে রিভিউ শেষ করেছেন।
দেখছি, বায়ার্ডের ‘অপাঠক তত্ত্ব’ আরেক দিক থেকেও সত্য। হাল আমলের নন্দনতত্ত্ব আর দার্শনিকতা জানাচ্ছে, একটা বই পড়ে ফেলার পরও সেটা আপনার অপঠিত থেকে যেতে পারে। বইয়ের সহজ-সরল কাহিনির ভেতরে এত সব লুকানো অর্থ নাকি ঠাসা থাকে, যেগুলো ধরতে না পারা বইটি না পড়ারই শামিল। এ কালের তাত্ত্বিক পণ্ডিতেরা ভারী ভারী বইপত্র লিখে প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন, ইতিমধ্যে পড়া বইগুলো আমরা আসলে ভুলভাবে পড়েছি। ওগুলোর অর্থই আমরা আসলে ধরতে পারিনি। এভাবেই পরিণত বয়সে আমি একদিন জানতে পারি, রবিনসন ক্রুসো বইটি আমি আসলে সেই অর্থে পড়িইনি। কেননা, নির্জন দ্বীপে ক্রুসো আর ফ্রাইডের সাক্ষাৎ যে আসলে উপনিবেশকর্তা আর উপনিবেশিতের রাজনীতির লুকানো বার্তা, সেটা তো আমার সরল চোখে গোচরেই আসেনি। ভেবে দেখলাম, রবিনসন ক্রুসো পড়া না থাকলেই আমি বরং আরেকটু সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতাম।
২০০৭ সালে বায়ার্ডের বইটা বের হওয়ার পর বেস্টসেলার হয়েছিল। ওই সময় একদিন রাতের খাবার শেষে বন্ধুস্থানীয় এক ফরাসি কথাসাহিত্যিকের সঙ্গে রাস্তায় হাঁটছিলেন বায়ার্ড। যা হয়, হাঁটতে হাঁটতে এই বই নিয়েই কথা হচ্ছিল। বন্ধু বইটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছিলেন। কিন্তু তাঁর কথা যতই শুনছিলেন, ততই আতঙ্কিত হয়ে পড়ছিলেন বায়ার্ড। কেননা, বন্ধু বইটি সম্পর্কে যেসব কথা বলছেন, তার অনেক কিছুই বইতে নেই।
শিবব্রত বর্মন: সাংবাদিক।