গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানের আদর্শিক ভিত্তিকে নাড়িয়ে দিয়ে পরপর তিন বছরে (১৯৬৬, ’৬৭ ও ’৬৮ সালে) তিনটি সাড়া জাগানো বইয়ের লেখক ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক বদরুদ্দীন উমর ভেবেচিন্তে তাঁর সম্ভাবনাময় ১১ বছরের শিক্ষকতা জীবনের অকাল অবসান টেনেছিলেন। সেটা ১৯৬৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর। তখন তাঁর বয়স মাত্র ৩৭ বছর। পেশাগত জীবনের ইতি টানার সময়ই তিনি তাঁর ভবিষ্যৎ অভিযাত্রার পথরেখাটি সচেতনভাবে এঁকেছিলেন রাজনৈতিক মতাদর্শকে কেন্দ্র করে; নিপীড়িত মেহনতি মানুষের মুক্তির জন্য পূর্ণকালীন সক্রিয় রাজনৈতিক সংগ্রামে শামিল হওয়ার জন্য। সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামই হয়ে উঠেছিল তাঁর পরবর্তী জীবনের নতুন পেশা।
বদরুদ্দীন উমরের আত্মজীবনী আমার জীবন থেকে জানা যায় তাঁর রাজনৈতিক চিন্তা ও সক্রিয়তার কথা; যার শুরু ১৯৬৪ সালে। সে বছর ভিয়েতনামে মার্কিন বিমানবাহিনীর টংকিং উপসাগরে হামলার ঘটনায় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮০ জনের বেশি শিক্ষককে সমবেত করেন বিবৃতি প্রদান করে সাম্রাজ্যবাদী হামলার প্রতিবাদ করেন। তিনি বিবৃতি সংগঠিত করেই নিষ্ক্রিয় থাকেননি; ভিয়েতনামে হামলার প্রতিবাদে তিনি মার্কিন কনস্যুলেটে চিঠি দিয়ে তিন মাসের জন্য আমেরিকায় লিডারশিপ এক্সচেঞ্জ প্রোগ্রামে যাওয়ার আমন্ত্রণও প্রত্যাখ্যান করেন। একইভাবে পাকিস্তানের মতাদর্শকে চ্যালেঞ্জ করার কারণে সরকারের সঙ্গে তাঁর বৈরিতা প্রবল হতে থাকায় তিনি পাকিস্তান সরকারের বৃত্তি নিয়ে ব্রিটেনের সোয়সয়ে পিএইচডি করতে যাওয়ার বিষয়টি আর গ্রহণ করেননি।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদত্যাগের চার মাস পর পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টিতে (মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) যোগ দেওয়ার মাধ্যমে সাংগঠনিকভাবে শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবনের। প্রায় ছয় দশক ধরে নানা প্রতিকূলতা ও বৈরিতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, তিনি আজও সচেতনভাবে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে সক্রিয় আছেন মার্কসবাদী তাত্ত্বিক-বিশ্লেষক এবং সংগঠক হিসেবে। তাঁর লেখক ও রাজনৈতিক জীবনে বদরুদ্দীন উমরের কোনো আদর্শচ্যুতি ঘটেনি, তাঁর চিন্তাচেতনার ধারায় ও ধারে হতবুদ্ধিতা ও বিভ্রম স্থান পায়নি, পাকিস্তান জমানা থেকে বর্তমান পর্যন্ত তাঁর স্পষ্টবাদী ও আপসহীন স্পর্ধা-গ্লানির কলুষতায় মলিন হয়নি, কোনো মোহ তাঁকে স্খলিত করতে পারেনি। সর্বোপরি, তিনি শ্রমজীবী-নিপীড়িত মানুষের মুক্তি ও মর্যাদার লড়াইয়ে দার্ঢ্যময় অবিচল এক সংগ্রামীর দৃষ্টান্ত হিসেবে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর স্ফটিক স্বচ্ছ শ্রেণি-সচেতন দৃষ্টিভঙ্গিসংবলিত বিশ্লেষণ, ভাষ্য, গবেষণা ও লেখায় সমৃদ্ধ ১২০টি গ্রন্থ দিয়ে। শুধু প্রতীকার্থেই নয়; সত্যিকার অর্থেই বদরুদ্দীন উমরকে অবিচ্যুত নক্ষত্রের সঙ্গে তুলনা করায় ভ্রান্তি নেই। এ কারণেই সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারেন, ‘আই হ্যাভ লাইভড আ লাইফ দ্যাট আই ওয়ান্টেড টু লাইভ, মডেস্ট, অনারেবল অ্যান্ড প্রোডাক্টিভ’।
শিক্ষায়তন থেকে সরে এলেও বদরুদ্দীন উমর বিদ্যাচর্চাহীন বুলিসর্বস্ব রাজনীতিকে পরিণত করেননি নিজেকে। সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি এক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন পথিকৃত ইতিহাসবিদ ও পত্রিকার সফল সম্পাদক হিসেবে। ১৯৭০ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ হওয়া শুরু করে পার্টির প্রকাশ্য মুখপত্র সাপ্তাহিক গণশক্তি; ঘটনাক্রমে ১৩ মাসের স্থায়িত্বে পত্রিকাটি সারা দেশে রাজনৈতিক মহলে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে নিয়েছিল পরিচিতি ও প্রভাবে।
২০ ডিসেম্বর বদরুদ্দীন উমরকে, নব্বইতম জন্মবার্ষিকীর শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করতে তাঁর কর্মময় জীবন ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার দিককে স্মরণ করতে এ লেখা।
শিক্ষায়তন থেকে সরে এলেও বদরুদ্দীন উমর বিদ্যাচর্চাহীন বুলিসর্বস্ব রাজনীতিকে পরিণত করেননি নিজেকে। সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে তিনি এক বছরের মধ্যে উল্লেখযোগ্য দুটি কাজের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন একজন পথিকৃত ইতিহাসবিদ ও পত্রিকার সফল সম্পাদক হিসেবে। ১৯৭০ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশ হওয়া শুরু করে পার্টির প্রকাশ্য মুখপত্র সাপ্তাহিক গণশক্তি; ঘটনাক্রমে ১৩ মাসের স্থায়িত্বে পত্রিকাটি সারা দেশে রাজনৈতিক মহলে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে নিয়েছিল পরিচিতি ও প্রভাবে। পরিচিতি ব্যাপ্তির বিষয়টি বোঝা যায় পত্রিকাটির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সামরিক প্রশাসনের কাছে জাপানি ও মার্কিন দূতাবাসের পৃথক দুটি অভিযোগের ঘটনা ও পত্রিকা অফিসে ব্রিটিশ হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারির আলোচনা করতে আসার ঘটনা থেকে। গণশক্তি পত্রিকায় বদরুদ্দীন উমরের লেখাসমূহ নিয়ে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত গ্রন্থ যুদ্ধপূর্ব বাঙলাদেশ থেকে ১৯৭০-৭১ সালের রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ধারণা পাওয়ার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার ধারা ও পরিপার্শ্বের ঘটনাবলির প্রতি সম্পাদক হিসেবে নজর দেওয়ার বিষয়টি লক্ষণীয়। যেমন, প্রত্যক্ষভাবে জামায়াতে ইসলামের রাজনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ লিখেছিলেন অন্তত চারটি। তাঁর লেখা থেকে ছায়াছবির (স্পষ্টত অনুমান করা যায় জীবন থেকে নেয়া প্রসঙ্গে) ওপর জামায়াতে ইসলামীর আক্রমণের প্রসঙ্গও বাদ যায়নি সম্পাদকের কলম থেকে।
একই সময়ে দ্বিতীয় উল্লেখযোগ্য মৌলিক কাজ হিসেবে বদরুদ্দীন উমর অতুলনীয় রাজনৈতিক অন্তর্দৃষ্টি, পরিশ্রম ও সৃজনশীলতায় নিজেকে হাজির করেন একজন ভিন্নধারার পথিকৃৎ ইতিহাসবিদ হিসেবে; ১৯৭০ সালে তাঁর তিন খণ্ডে পূর্ব বাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি বইটির প্রথম খণ্ড প্রকাশ করে। এ বইয়ের মাধ্যমে তিনি নব-গঠিত পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার মানুষের সংগ্রামের ইতিহাসকে যেভাবে বিবৃত করেছেন, তার সমতুল্য নজির বাংলাদেশে মেলা ভার। প্রথমত ইতিহাস রচনায় তিনি এ ভূখণ্ডের সাধারণ মানুষের সংগ্রামগুলোকে পাদপ্রদীপের আলোতে নিয়ে আসেন; যা প্রকৃতই ওই সময়ের ঘটনাবলির জনমানুষের ইতিহাস হয়ে উঠেছে। দ্বিতীয়ত, তিনি যেসব পন্থা অবলম্বন করে এ পর্বের ইতিহাসকে ধারণ করে রেখেছেন, তা কার্যত মৌখিক ইতিহাস রচনার প্রথম ও সফল প্রয়োগের দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে বাংলাদেশে। তিন খণ্ড বইয়ের মাধ্যমে তিনি দৃষ্টিভঙ্গিগত যে মান ও বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছেন, সেটাই তাঁকে অনন্য পরিচিতিতে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। কলকাতার দেশ পত্রিকা বদরুদ্দীন উমরের লেখা প্রকাশ করার পর চাপের মুখে সে সংখ্যাটি বাতিল করায় উভয় বাংলায় প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় উঠেছিল।
সে পরিস্থিতিতে ইংরেজি সাপ্তাহিক হলিডে তাঁকে ইতিহাস রচনার অবাধ সুযোগ করে দেওয়ায় তিনি ইংরেজিতে দুই খণ্ড রচনা করেন দ্য ইমার্জেন্স অব বাংলাদেশ: ক্লাস স্ট্রাগল ইন ইস্ট পাকিস্তান। উমরের নেতৃস্থানীয় বইগুলোর তালিকায় এভাবেই সংযোজিত হয়েছিল ইংরেজিভাষী পাঠকদের জন্য তৎকালীন ইতিহাসের একটি অন্য ভাষ্য; যা নামজাদা দুটি প্রকাশক কর্তৃক পৃথকভাবে পাকিস্তান ও ভারতে প্রকাশিত হয়।
গণশক্তি পত্রিকার সময় থেকে চারদিকের ঘটনাবলি দেখা, বিশ্লেষণ করা, সেসব সম্পর্কে ভাষ্য হাজির করার যে কাজ শুরু হয়েছিল; প্রায় নিয়মিতভাবে তার ধারা তিনি অব্যাহত রেখেছেন এখন পর্যন্ত; বিশেষত, একাধিক দৈনিক পত্রিকায় তাঁর লেখার সুযোগ নানাভাবে বন্ধ হওয়া পর্যন্ত। লেনিনের অনুকরণে তিনি নিজেকে ‘প্রচারপত্র লিখিয়ে’ হিসেবে বলে থাকেন। সাপ্তাহিক ভিত্তিতে লেখা তাঁর সেসব লেখা যুদ্ধপূর্ব বাঙলাদেশ থেকে যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ এ ঘটে যাওয়া ঘটনাবলির ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিসম্পন্ন ও মূল্যবান ধারাবাহিক বিবরণ হিসেবে রয়ে গেছে বাংলাদেশের সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি; এখানকার শাসকশ্রেণি ও তাঁদের পরিচালিত শাসনব্যবস্থার বয়ান হিসেবে। আবার এসব লেখার মধ্যেই খুঁজে পাওয়া যাবে বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম ও প্রতিরোধের বিবরণগুলোকে। এসব রচনার মধ্যে বাংলাদেশের বিগত ৫০ বছরের ইতিহাসের ছোট ছোট তাৎপর্যময় অনেক মালমশলা রয়ে গেছে আগামী দিনের গবেষক ও রাজনৈতিক সংগঠকদের জন্য। সে বিবেচনায় তাঁর সব লেখাই ইতিহাসের উপাদানে পূর্ণ।
বদরুদ্দীন উমর যুগপৎভাবে তাঁর পাণ্ডিত্য ও রাজনৈতিক সক্রিয়তার মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও তার উপযোগী উচ্চতর সাংস্কৃতিক মানে পৌঁছানোর সংগ্রামে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন ছয় দশকের রাজনৈতিক সক্রিয়তায়। তাঁর রচনাবলি ও সাংগঠনিক সক্রিয়তার দৃষ্টান্ত আগামী দিনে একই সংগ্রামে নিয়োজিত রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য নিঃসন্দেহে পথ দেখানোর মূল্যবান কাজ করবে। জন্মদিনে বদরুদ্দীন উমরকে আমাদের অভিবাদন!
ওমর তারেক চৌধুরী, লেখক ও অনুবাদক এবং প্রকাশিতব্য বদরুদ্দীন উমর সম্মাননা গ্রন্থের সম্পাদকীয় পরিষদের সদস্য।
otc 1960 @gmail. com